কুন্তল দাশগুপ্ত

চতুর্থ পর্ব

৫. ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ-কথা

আচ্ছা, খালি ডালে ফুল ভ’রে ওঠে কীভাবে? কীভাবে এই এট্টুখানি গাছ এত্ত বড়টি হয়ে পড়ে? চারপাশের কাণ্ডকারখানা যা ঘটে চলেছে রোজদিন তাতে কত যে প্রশ্ন মাথার মধ্যে কামড়ায়! বীরপুরুষেরা মায়ের কোলে চড়ে? মোতিবিল গাঁয়ে নেই তবে পুকুর আছে, আছে হাঁসের সাঁতার। রোজ সন্ধের আগে বড়দি সুর করে তার পোষা হাঁসেদের ডাকে— চৈ চৈ চৈ চৈ চোওওওওই। দল বেঁধে হাঁসগুলো পাড়ে চলে আসে। বড়দি বলে— চল চল চল চল… হাঁসগুলো থুপ থুপ করে হাঁটে। সোজা ঢুকে পড়ে ওদের ঘরে। ওদের ঘরকে বড়দি বলে খোঁয়াড়। মোট পাঁচটা হাঁস। সবচে বড়টার গায় কত রঙের ছিট ছিট নকশা, গলাটা কখোনো নীল, কখোনো সবুজ, রঙে ঝলকায়। সবাই বলে— অপার হাঁসাটা দেখবার মত গলাটা পুরো ময়ূরকণ্ঠী। হাঁসা বলে। কেন? ময়ূর নাকি সাপ খায়! বেশ করে। সাপ ভারি বাজে। ভয় লাগে। তবে ছোড়দা বলেছে পরিবেশে সাপ দরকার। ছাই দরকার। ভারি বদমাস। সাপুরেরা আসে। সাপ খেলায়। একটা সাপ ছিল লিকলিকে সবুজ। লাউডগা। উঠোনের মাচায় লকলকে লাউডগা গুলো হাওয়ায় দুলে উঠলে কেমন গা শিরশির করে। চোখ সরিয়ে নিয়ে তবে শান্তি। শান্তি ছেলে মেয়ে সকলের নাম হয়। শান্তিদি, সকলে বলে শান্দি, দুধ দিয়ে যায়। বটের আঠার মত দুধ। ফোটালে কী মিষ্টি গন্ধ ছাড়ে। সর তুলে রাখে। ঘি হয়। বাদামী রঙের ছিবড়ে মুড়িতে মেখে চিনি ছড়িয়ে খেতে যা লাগে না এ্যাব্বেরে ঝাক্কাস। হিরু বলে খুব। ঝাক্কাস মানে খুউউউব ভালো। হিরু বলেছে। হিরু খিস্তির ঝুড়ি। এমনিতে খিস্তি পাড়ে না, কারো সঙ্গে ঝগড়া হলে পাড়ে।

আচ্ছা দেওয়া আর পাড়া কি এক? না তো? তবে খিস্তির সঙ্গে এরা হাত ধরাধরি করে চলে। খিস্তি দেয় আর খিস্তি পাড়ে একই কথা। কেন? খিস্তি তো কথাই। কথা যদি বলা হয় তবে খিস্তি হবে না কেন? হিরু খুব খিস্তি বলে। নাঃ কেমন যেন লাগছে। অবলা মানে যে বলে না? শান্দি বলে গরুগুনি তো অবলা পানি, বলতে পারেনে। কিন্তু বলে তো। ডাকে যে। শান্দি ওদের বলা কথা বোঝে। জলের বাল্তি মুখের কাছে রাখে। অমনি ওরা চুপ। চোঁ চোঁ করে জল খায়। তাহলে বলে তো। ঐ যে কালো পিঁপড়েগুলো মুখে সাদা ডিম নিয়ে লাইন দিয়ে যখন যায় তখন শুঁড়ে শুঁড় ঠেকিয়ে কত কথা বলে। কী যে ভালো লাগে দেখতে! ওরা মানুষের মতো করে বলে না। তাতে কী? ওরা ওদের মতো করে বলে, বলে তো। তাহলে ওদের অবলা বলা কেনো বাপু। ওদের সুরসুরি পিঁপড়ে বলে। শান্দি বলে পিম্ড়ে। দিদুর থেকে শিখে হিরুও পিম্ড়ে বলে। শান্দি থেকে বলে না থেনে বলে। হিরু কিন্তু থেনে বলে না থেকেই বলে। থেকে মানে কী? কলেজে পড়া বুড়ো-কাকা বলতে পারেনি। বুড়ো কাকা বুড়ো নয়, একমাথা কুচকুচে কালো ঝাঁকড়া চুল। তবে হাতে লাঠিও নেই কানে জবা ফুলও গোঁজা নেই। থাকলেই বা কী? যা প্যাংলা শরীর আর মিহি গলা। খুব কালো হল কুচকুচে। কুচ ক’রে কাঁচি দিয়ে কাটে। ব্লেড দিয়ে পেনসিল ছুলতে গেলেও কুচ ক’রে আঙুল কেটে যায়। রক্ত বেরোয়। লাল রক্ত। লাল রং-কে টকটকে বলে কেন? টক তো লেবু, তেঁতুল। দক্ষিণের ঘরে তক্তপোশের তলায় তেঁতুলের আচার রাখে শান্দি। চুরি ক’রে আনে হিরু। সকলে ধারা পাড়ার বড় পুকুর ধারের জঙ্গলে বসে তারিয়ে তারিয়ে খায়। আচার খেয়ে জিভ দিয়ে টকাস টকাস শব্দ করতে ভারি মজা। গোতে সবচাইতে জোরে শব্দ করতে পারে। গোতের চার দিদি। সেজদির নাম চায়না। কেন, চায় না কেন? পাড়ায় অনেকেই তো চায়, জড়িয়ে ধরে আদর করে। গোতে জানে। গোতে ছড়া লেখে। আমরা লাল পিঁপড়ে/ একদিন দেব কামড়ে/ করবে ভীষণ জ্বালা/ বুঝবে তখন ঠ্যালা। ওর খুব রাগ। গাছের ওপর রাগ দেখায়। ফুল ছিঁড়ে পায়ে থেঁতো করে। পট করে গাছের ডাল ভাঙে, পাতা ছিঁড়ে নেয়। ওর পকেটে একটা ছোটো ভাঁজ করা ছুরি থাকে সবসময়। রথের মেলা থেকে কিনেছিল। কখনো কলাগাছে ছুরি গেঁথে দেয়। বার বার গাঁথে। কলাগাছ থেকে রস ঝরে। তা দেখে দাঁত বার ক’রে হাসে। পকেটের ছুরির জন্যে কেউ গোতের সঙ্গে লাগতে যায় না।

গোতে জানে সবাই ওকে ভয় পায়। একবার দুরুদা গোতের কান মলে দুগালে দুটো থাপ্পর মেরে খবর্দার বলে আঙুল নেড়ে শাষিয়েছিল। সেদিন গোতে পাগলের মত একটা সজনা গাছে ছুরি মারছিল। গাছেরা মারতে ধরতে পারে না বলে গোতে ঐরম করতে পারে। হাঁফাচ্ছিল গোতে। গাছেরা ডালপালা নেড়ে বাতাস করছিল। মা। গাছ মা। নাঃ মা তো মারে। গাছ তো মারে না। ওরা মায়ের থেকেও বেশি। বড়মা। হ্যাঁ, ঠিক বড়মা। বড়মা-ই তো। খেতে দেয়। বকুনি, মার-ধোর থেকে বাঁচায়। জলায় ছুটোছুটি করে হাঁফিয়ে পড়লে বটগাছের তলায় যেমন ঠাণ্ডা মেলে বড়মাকে জড়িযে ধরলে ঐরম ঠাণ্ডা লাগে। এসব পাড়ার খেলুড়েরা বুঝবে না। ইস্কুলের বন্ধুরা জানে। ইস্কুল- ইস্কুল, একদিন না গেলেই হাঁসফাঁস। ইস্কুল দোতলা। হুঁহুঁ ফাইভ অব্দি পড়া যায়। ইস্কুলের সামনে ইয়াব্বড় মাঠ। মাঠের পাশে ইয়াব্বড় পুকুর। পদ্ম ফোটে। ইস্কুলের পেছনে একটা সরু খাল। বর্ষার সময় ডুব-জল কিন্তু অন্য সময় হেঁটে পার হওয়া যায়। খালের ওপারে বরজ। প্যাঁকাটির ঘর। প্যাঁকাটি ফাঁক করে ঢোকো পানপাতা ছিঁড়ে খাও কেউ বকবে না। একটা পানপাতায় তিন জন। ঝাল। বোঁটা ভালো। ঝাল কম। পান খায় বড়মা। সুন্দর গন্ধ। জর্দা। রুপোর কৌটোয় থাকে। বড়মা বলে জার্মান সিলভার। সিলভার মানেই তো রুপো। গোল্ড মানে সোনা। সোনার কাজ করে পাড়ায় অনেকে। সোনার কাজ করে শীতল জেঠু। সে বুড়ো। এক মাথা সাদা চুল। শান্দি বলে ঢ্যাম্না বুড়ো। কেন? ঢ্যাম্না তো সাপ। মোটা কালো। ফণা তুলতে পারে না। ওর নাকি বিষ নেই। কিন্তু দেখলে ভয় লাগে। হেলে সাপে ভয় নেই। হলুদের ওপর কালোর নকশা। গোতে বলে শনি-মঙ্গলে নাকি হেলে সাপে বিষ জমে।

বড়মা প্রতি শনিবার শনি ঠাকুরের থানে পুজো দিতে যায়। কত জন আসে পুজো দিতে। লাল পেড়ে সাদা-শাড়ি পড়া সব কাকিমা-জেঠিমারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাতের থালায় নীল অপরাজিতার মালা। অপরাজিতা সাদা আর বেগুনি রঙেরও হয়। ইস্কুলের কলপারে অপরাজিতার ঝোপ হয়ে আছে। তিন রকম রঙেরই ফুল ফোটে তবে রঙের মিশেলে নীল রং ফিকে হয়ে গেছে, সাদা হয়ে গেছে আকাশি বেগুনি তো দেখাই যায় না কালচে রঙের ফুল ফোটে। মিহিদের বাড়িতে থোপা সাদা অপরাজিতা ফোটে। কী সুন্দর! যেন গোলাপ। গোলাপ যে কত রঙের হয়। জীবন কাকা গোলাপ বাগান করেছিল। হনুমানে নষ্ট করে দিত। ফুল খেয়ে নিত। গাছ উপড়ে দিত। কী কষ্ট পেত জীবন কাকা। কাঁদত। শেষে আর গোলাপ বাগান করেনি। বাগানই আর করে না। বাড়ির সামনে সেগুন আর মেহগনি গাছ লাগিয়েছে। সেগুন আর মেহগনি গাছের কাঠ দিয়ে পালঙ্ক বানায়। পালঙ্ক খুব উঁচু। সট করে ওঠা যায় না। বিন্তিদের বাড়িতে আছে। সেগুনের। পায়া আর ছত্রিগুলো কেমন প্যাঁচানো প্যাঁচানো। বিন্তিদের খুব বড়ো বাড়ি। খুব পুরোনো। ইস্কুল, মাঠ সব বিন্তির পূর্বপুরুষের দান করা জমি, তাঁর নামেই ইস্কুল— দেবীদাস নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়। চারদিকে সবুজ গাছপালা, ধানক্ষেত, সবজীক্ষেত, তারমধ্যে হলুদ রঙের দোতলা ইস্কুল-বাড়ি। একদম ঝকমক করে। শুধু সামনের থাম দুটো লাল। লাল-হলুদ। বাজে।

সবুজ-মেরুন ভালো। বাগান। মোহনবাগান। বাগান মানেই গাছ। গাছের যত্ন। জঙ্গল তো বাগানই তবে অযত্নের বাগান। না ভগবানের বাগান তিনিই যত্ন নেন। আগাছা গুলো কেমন তাগরা। ওদের জল তো মেঘ দেয়। সার দেয় কে? ধানক্ষেতে ইউরিয়া-সার চাপান দেয় কিন্তু আগাছা বলে ছোটো ছোটো গাছ সব নিড়িয়ে ফেলে। ওরা নাকি ধান গাছের খাবারে ভাগ বসাবে। ধান গাছের খাবার কম পড়ে যাবে। তাহলে বেশি করে দেয় না কেন? আগাছা বলে কি গাছ নয়? ওরাও কত সুন্দর ফুল ফোটায়। কেউ সোনালী, কেউ লাল, একদল তো থোপা থোপা ফুল ফোটায়। একএকটা থোপায় লাল-নীল-হলুদ রঙের ফুল। কোনো কোনো ফুলের পাপড়িতে ছোট্ট কালো ফুটকি। এত সাজগোজ কেউ দেখে না, উপড়ে ফেলে দেয়। ওদের তো দুঃখ হয়। মা-টি ওদের ফেলে না কখনোও। নিজের কোলে টেনে নেয়। সীতার মত।

জনম দুখিনী সীতা। সীতার জন্মও তো মা-টির কোলেই। জনক-রাজা তুলে এনেছিল। মাটিতে হওয়া এই গাছগুলো সবাই সীতা। সীতার মতই যন্ত্রণা পায় ওরা। গোতের মত কত জন যে ওদের মারে। মেরে আনন্দ পায়! যারা বাগান করে তারা বুঝি ভালোবাসে গাছেদের? ঘেঁচু। আগাছা বলে ছোট গাছেদের উপড়ে ফেলে দেয় গর্তে। বলে সার হবে। গাছ গাছের মাংস খায়? না। কচমচ করে খায় না। গাছের মড়া গর্তে পচে উঠলে সেই পচুই খায়। গোতের বাবা খায়। পচুই। নেশা করে পচুই খেয়ে। গোতে বলেছে। গাছেরাও নেশা করে পচুই খেয়ে? কই কোনো গাছ তো গোতের বাবার মত টলমল করে না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। না ঠিক পুরোপুরি সোজা নয়। ঝুঁকে পড়ে। আবার জড়িয়েও থাকে পাশাপাশি। এই যে বর-বউ গাছটা। বট আর অশ্বত্থ কেমন জড়িয়ে রয়েছে। বামুন-পাড়া পার হয়ে জঙ্গলে আছে, ভূমিদিদি বলেছিল— দেখবি? ভূমিদিদি ফোরে পড়ে। ভূমিদিদি ভালো। ফ্রকের পকেটে করে বাদাম ভাজা নিয়ে আসে। সবাইকে দুটি দুটি দেয়। মাঝে মাঝে ঠিফিন বেলায় বাঁধের রাস্তা ধরে দৌড়োয়। দুহাত মেলে দেয়। হাওয়ায় এলোমেলো উড়তে থাকে ওর চুল, ফ্রক ফুলে ওঠে— একটা পাখির মত দেখায় তখন ওকে।

আচ্ছা পাখি খাঁচায় পুরে রাখে কীকরে মানুষ? পাখি যদি উড়তে না পেল তবে সে আর পাখি থাকে? পাখিদের সব খাঁচা খুলে দেয় যদি রাজা তবে বেশ হয়। আমাদের রাজা কে। ক্লাসে জিগ্যেস করায় ছোড়দা নস্যি টেনে নাক মুছে বলেছিল— আঁমরা সঁবাই রাঁজা। ধ্যাৎ। ছোড়দা ভারি মজা করে পড়ায়। এত ভালো লাগে! ছোড়দা বলে— পড়াশোঁনাটাও একধরণের খেঁলা। নস্যি নেয় বলে ছোড়দা ঐরম নাকি সুরে কথা বলে। মিহি ছোড়দাকে নকল করে। ক্লাসে গোলমাল হলে হঠাৎ মিহি চেঁচিয়ে ওঠে— অ্যাঁয় সব পিঁটিয়ে লমবাঁ করে দেব চুঁপ সব চুঁপ। সকলে খিলখিল করে হাসতে থাকে। গোলমাল আরো বেড়ে যায়। ব্যাস, অপিস-ঘর থেকে বেরিয়ে ওমনি সোন্দা ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়ায়। সব চুপ। সোন্দাকে সকলে ভয় পায়। মারে। কড়া গলায় ধমকায়। ইংরাজী শেখায়। ধমক খেয়ে বংশী সেদিন মুতে ফেলেছিল প্যান্টে। সোন্দা ছুটি দিল বংশীকে আর নিজেই ফিনাইল ঢেলে ন্যাতা-বালতি নিয়ে এসে মেঝে মুছেছিল। কারো হাসবার জো ছিল? একটু বাদেই প্যান্ট পালটে বংশী ফের ক্লাসের দরজায়। সোন্দা তখন মেঝে মুছছে। দরজার দিকে সোন্দার পিঠ। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে বংশী। বিন্তির কী সাহস! জোরে বলে উঠল— সোন্দা বংশে এসেছে। সোন্দা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল— ভেতরে আর স্বর্ণালী, বংশে নয় বংশী, আর যেন এই ভুল না হয়। ভুল কথা বললে সোন্দা শুধরে দেয়। সোন্দার সামনে কেউ ডাঁইরে, এয়েছে বলে না। নিজেদের মধ্যে বলে। সোন্দা এমনিতে সকলকে তুই বলে রেগে গেলে তুমি। বিন্তি সোন্দার কাছে পড়ে।

বিন্তিদের বাড়িতে পড়ায় সোন্দা। আরো অনেকে পড়ে। ভূমিদিদি পড়ে। হাই-ইস্কুলের দাদা-দিদিরা পড়ে। ওদের মধ্যে কানুদা খুব ভালো খেলে। কী ভালো দেখতে কানুদাকে! তিন গাঁ জুড়ে কানুদার নাম। একদিন না একদিন কানুদা নামকরা প্লেয়ার হবে। মোহনবাগানে খেলবে? নিশ্চই নিশ্চই খেলবে। ইস্কুলের সামনের মাঠে কানুদা আর অন্য ছেলেরা প্র্যাকটিস করে। পাঁচ পিরিয়ডে ওয়ান, টু, থ্রি-র ছুটি হয়। কেউ বাড়ি যায় না। মাঠের একধারে জমা হয়ে বস্থাকে। খেলা দেখে। ছ’পিরিয়ডে ইস্কুল ছুটি হলে সোন্দার বকা খেয়ে সকলে বাড়ির দিকে দৌড়য়। দৌড় ভারি খেলা। সবাই মিলে বাঁধের রাস্তা ধরে বা জলায় নেমে দৌড়োও, বকার কেউ নেই। ভূমি দিদি ঠিক সবাইকে হারিয়ে দেবে। কানুদা ওর নাম দিয়েছে গ্যারিঞ্চা। কেন? গ্যারিঞ্চা তো ফুটবল খেলে। ব্রেজিলে। পেলে, গ্যারিঞ্চা। ব্রেজিল দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানে খুব ঘন জঙ্গল। সেলভা। রোজ বিকেল চারটেতে বৃষ্টি হয় জঙ্গলে। ফোর ও ক্লক রেন। রেন ফরেস্ট।

ছোড়দা ম্যাপে দেখিয়েছে। একটা ছবির বই এনে কত জীবজন্তুর ছবি দেখিয়েছে ক্লাসে। একটা জন্তু কী যেন খটমট নাম। পিঁপড়ে খায়। যা দেখতে! ছবি দেখেই ভয় লাগে। একটা কাকাতুয়া। কত যে রং। হ্যাঁ মনে পড়েছে। ম্যাকাও। ওদের সবার বাড়ি ব্রেজিলের জঙ্গল। গেল বছর ব্রেজিল বিশ্বকাপ জিতল। সবাই নাচানাচি করছিল। কেন? ব্রেজিল কি ভারত? নয় তো। মিহি বলেছে ব্রেজিল হল মোহনবাগান যুক্ত ইস্টবেঙ্গল সমান সমান ভারত। কেন? ব্রেজিলের রং নাকি সবুজ-হলুদ। সবুজ-মেরুণের সবুজ আর লাল-হলুদের হলুদ। মানে হল ভারত। ধ্যুৎ। বাজে কথা যত সব। ভারত তো চার রঙা। ওপরে গেরুয়া তারপর সাদা তারপরে সবুজ আর মধ্যিখানে নীল রঙা চক্র। অশোক চক্র।

ইতিহাস ক্লাসে মেজদা সম্রাট অশোকের গল্প বলেছে। কোন একটা যেন যুদ্ধে অনেক লোক মরে যেতে সে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করে। মেজদা বলেছিল কোথায় একটা স্তম্ভ তৈরি করে। তার মাথায় একটা তিনমুখো সিংহ আছে তার তলায় একটা চাকা। ধর্মচক্র বলেছে মেজদা। টাকার পেছনে ঐ তেমুখো সিংহটার ছবি আছে। পকেট থেকে টাকা বার করে দেখিয়েছে। বংশি আর শাবনকে অফিসঘর থেকে পতাকা আনতে বলে ক্লাসের সবাইকে বলেছিল— তোমাদের এই ধর্মচক্র দেখাব। হাঁফাতে হাঁফাতে ওরা পতাকা আনলে ওদের দুজনকে পতাকার উপর দিকের দুই খুঁট ধরে দাঁড়াতে বলল প্রথমে। সাইকেলের চাকার মত স্পোক আছে পতাকার মধ্যিখানের চাকাটার। স্পোক কটা আছে গুণতে বলল মেজদা। শাবন আঙুল দিয়ে দিয়ে গুণে বলল চব্বিশটা মেইদা। সোন্দা থাকলে যা বকত না। মেজদা কিছু বলেনি। তখন সে ঐ চাকার মানে বোঝাতেই ব্যাস্ত। ঐ চব্বিশটা স্পোকের মানে চব্বিশ ঘন্টা। মানে তোমরা চব্বিশ ঘন্টা ধর্ম পথে থাকো। আচ্ছা ধর্ম কী? পুজো? বড়মার সঙ্গে শনিঠাকুরের থানে যাওয়া? শনিঠাকুর। তালে রবিঠাকুর? রবীন্দ্রনাথ? কিন্তু তার থান কই। পঁচিশে বৈশাখে সবাই নাচ-গান করে। আবৃত্তি করে। পুজো করে না তো। পুজো তো ফুল-বেলপাতা-তুলসীপাতা ছিঁড়ে বামুনে করে। মন্ত্র পড়ে আর একটা মূর্তির দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফুল দেয়। ধোঁয়ায় ধোঁয়া করে দিতে হয়। দম আটকে আসে।। চোখ জ্বালা করে। প্রসাদ খাওয়াটাই আসল। নিজের পছন্দমতো ফল-মিষ্টি দিতে হয়। ঠাকুরের মূর্তি তো আর খায় না। গেলবার সত্যনারায়ণ পুজোতে বড়মা শুধুমার পছন্দের মিষ্টি মৌচাক আনিয়ে ছিল। ধ্যুৎ মৌচাক একটা মিষ্টি হল? কোথায় কড়াপাকের সন্দেশ আর কোথায় মৌচাক। থুঃ। শুধুমা খারাপ ওর পছন্দ খারাপ ওর গন্ধ খারাপ খারাপ খারাপ খারাপ…

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *