পাঠক মিত্র

নজরুলের সাম্যের সুর আজ এক ধোঁয়াশায় !

‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’-কবিগুরু যেমন এমন কথা বলেছেন, তেমন নজরুল বলেছেন ‘…উন্নত মম শির, শির নেহারি ঐ শিখর হিমাদ্রি’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের হয়ে শির উঁচু করে তাঁরা প্রতিবাদ করে গেছেন । প্রতিবাদ করেছেন তাঁদের লেখনিতে, প্রতিবাদ করেছেন পথে নেমে। 

‘আমি সত্য প্রকাশের যন্ত্র।..অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি-মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি–কাহারও তোষামোদি করি নাই ।’ নজরুল তাঁর সচল জীবনকালীন সময়ে এই কথাগুলো তাঁর সৃষ্টিতে স্থান দিয়েছেন । তাই তিনি অনায়াসে সমাজে নানা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পেরেছেন । অতি সহজে আর্থিক বৈষম্যের কারণ সহজভাবে বলতে পেরেছেন- ‘মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র, ঋণ, অভাব, অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মতো জমা হয়ে আছে ।’ চাষী, মজুর, কুলির জীবনের ধূসর ছবিকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন । বলেছেন- ‘যে চাষী সমস্ত বৎসর ধরিয়া হাড় ভাঙা মেহনত করিয়া মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়াও দু’বেলা পেট ভরিয়া মাড়-ভাত খাইতে পারে না, হাঁটুর উপর পর্যন্ত একটা টেনে বা নেংটি ছাড়া তাহার আর ভালো কাপড় পরা সারা জীবনে ঘটিয়া ওঠে না আজ তাহারই ধান চাল লইয়া মহাজনেরা পায়ের ওপর পা দিয়া বারোমাসে তেত্রিশ পার্বণ করিয়া নওয়াবী চালে কাটাইয়া দেন । …কয়লার খনির কুলিদিগের দিকে তাকাইয়া কেহ কখনও চিনিতে পারিবেন না যে, ইহারা মানুষ, কি প্রেতলোক ফেরতা বীভৎস নরকঙ্কাল ।..দেশের কলকারখানায়, আড়তে গুদামে ‘ভাবিয়া চিন্তিয়া মানুষ হত্যার’ এইরূপ শতশত বীভৎস নগ্নতা দেখিতে পাইবেন ।’ কবি নজরুলের কাছে মানুষ বলতে তিনি পরিচয় দিয়েছেন চাষী, মুটে, মজুরদের । এদেরই গান গেয়েছেন।

‘তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

তোমারে বহিতে যাহারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধুলি;

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদের গান,

তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান !’ 

মজুর, মুটে ও কুলি শুধু মানুষই নন, তাঁদেরকে দেবতা বলে সম্বোধন করেছেন । তাঁদের দুঃখকষ্টের কারণ অতি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলতে পেরেছেন–

‘জনগণে যারা জোঁকসম শোষে তারে মহাজন কয় 

সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।

মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ 

মাটির মালিক তাঁহারই হন।

যে যতো ভন্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান।’

এই ভন্ড ধড়িবাজ মহাজন যারা আয়েসে দিনযাপন করে । তারাই সমাজের মাথা হয়ে যায় । তাদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কারভাবে বলতে পেরেছেন-

 ‘তুমি শুয়ে রবে তেতলার পরে আমরা রহিব নীচে

অথচ তোমারে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে।’

এমনকি দারিদ্রপীড়িত মানুষদের কথা ব্রিটিশ আমলে তদানীন্তন রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রে ধড়িবাজ বিচরণকারীদের ভাবনায় কখনও আনাগোনা করেনি। সমাজে বৈষম্যের এই ছবি স্বরাজ আসার আগে কবি যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন তা এই সময়ে না ভাবিয়ে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘..আজ রাজনীতির ক্ষেত্রে কেবল ফাঁকিবাজি, সঞ্চিত ধনের গাদায় বসে অথবা পাবলিক ফান্ডের অপহরণে অথবা প্রজার রক্তে শোষণ করে সে নিশ্চিন্তে আছে, আজ তারই নেতাগিরির দিন।..স্বরাজ সাধনার শক্তি বলে আয়ত্ত প্রতিষ্ঠান সমূহ আজ লোভীর মধুচক্রে পরিণত । পলিটিক্যাল মহন্তের দল রাজনীতির পূণ্যতীর্থ যথেষ্ট ভাবে দীপ্তমান । নন্দী-ভৃঙ্গীর দল তাদের সিঙ্গা বাজিয়ে আকাশ ফাটিয়ে দিচ্ছে ।’ অথচ বৃহৎ জনগণ তো সাধারণ ও দারিদ্র-পীড়িত মানুষ । তাই জনগণের কাছে এক নবজাগরণের বার্তা দিয়ে আহ্বান জানালেন কবি । ‘মোরা জনগণ, শতকরা মোরা নিরানব্বই জন

মোরাই বৃহৎ, সেই বৃহতের আজ নবজাগরণ ।

ক্ষুদ্রের দলে কে যাবে তোমরা ভোগ বিলাসের লোভে ?’

ভোগবিলাসী উঁচু তলার মানুষদের সাথে কুলি-মজুর, চাষী-শ্রমিকদের যে বৈষম্য সেই বৈষম্যের অবসানে এক নতুন প্রভাতের আগমন উপলব্ধি করেছিলেন।

‘আজ নিখিলের বেদনা, আর্ত পীড়িতের মাখি খুন,

লালে লাল হয়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নিবারণ !’

সেই প্রভাতে মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘুচে যাবে বলেই কবি সাম্যের গান গেয়েছেন ।

‘গাহি সাম্যের গান 

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান’

সমাজে সকল মানুষের জন্য কবি সাম্যের গান শুধু গেয়েছেন তা নয়, তিনি ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন । মানুষের পরিচয় মানুষ, তার ধর্ম নয় । কবি বারে বারে সে কথাই বলেছেন । 

‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি’

অভেদ ধর্ম জাতির আলাদা কোন মন্দির হয় না, আলাদা কোন মসজিদ হয় না । মন্দির মসজিদ বলতে কবি মনে করেন মানুষের হৃদয় । 

‘মিথ্যা শুনিনি ভাই 

এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই ।’

হিন্দু-মুসলমান সমস্যা এক তৈরি করা সমস্যা যা তিনি জোরের সাথে ব্যক্ত করেছেন । এই সমস্যায় মানুষই মার খায় ও মরে।  

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন ? 

কান্ডারী ! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র !’

জাতের নামে বজ্জাতিদের এই খেলার বিবরণ দিয়ে বলেছেন,’জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া’।

জাতের নামে জুয়া খেলার বজ্জাতিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন- ‘উহাদের প্রত্যেকের মুখ শয়তানের চেয়েও বীভৎস, শূকরের চেয়েও কুৎসিত, হিংসার কদর্যতায় উহাদের গাত্রে অনন্ত নরকের দুর্গন্ধ ।’ তাদের এই কদর্যতার পিছনে থাকে শয়তান । তদানীন্তন সময়ে কলকাতার দাঙ্গা নিয়ে তিনি যে কথা বলেছেন তা সময়ের সাথে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে গেছে কিনা তা বিচার করার ক্ষমতা আজ কতটা সে প্রশ্ন এসে যায় । কবি বলেছেন, ‘দুই দলের নেতা একজন, তাহার আসল নাম শয়তান । সে নাম ভাঁড়াইয়া কখনও টুপি পরিয়া পর-দাড়ি লাগাইয়া মুসলমানদের খ্যাপাইয়া আসিতেছে, কখনও পর-টিকি বাঁধিয়া হিন্দুদের লেলাইয়া দিতেছে।’

এমন ধর্ম জুয়াড়িদের দেখে আস্তিকদের থেকে নাস্তিকদের পক্ষে বলেই কবি তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন,’ধর্ম কি কাঁচের মতো ঠুনকো যে একটুতেই ভেঙে যাবে ? ..এই সব কারণেই তাই আমি এইরকম আস্তিকদের চেয়ে নাস্তিকদের বেশি ভক্ত, বেশী পক্ষপাতী।’

হিন্দু মুসলমান সমস্যা সমাজের গভীরে ক্ষত সৃষ্টির লক্ষন তিনি চিহ্নিত করেছেন বলেই হিন্দু মুসলমান বিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনি এক মিলনের বার্তা দিয়েছে বরাবর। সবার অত্যন্ত চেনা তাঁর কবিতার লাইন-

‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম– হিন্দু মুসলমান। 

মোরা এক সে দেশের খাইগো হাওয়া এক সে দেশের জল,

এক সে দেশের মায়ের বক্ষে ফলে একই ফুল ও ফল।’

তাঁর সাহিত্যে এই মিলনের সুর জেনেশুনেই দিয়েছেন বলে তিনি ব্যক্ত করেছেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী । তাই তাদের এ সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই । অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্য্যহানি ঘটেছে । তবু আমি জেনেশুনে তা করেছি।’

তিনি সমস্ত ধর্মের মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন যে সবার ধমনীতে একই রক্ত বয়ে চলে —

‘আদম দাউদ ঈশা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ

কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর, বিশ্বের সম্পদ

আমাদেরই এঁরা পিতা-পিতামহ এই আমাদের মাঝে

তাঁদেরই রক্ত কমবেশি ক’রে প্রতি ধমনীতে বাজে।’

নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের প্রতি ধমনীতে একই রক্ত । তাই তিনি বলেছেন ধর্ম নয়, মানুষই সত্য । তিনি ব্যক্ত করলেন,’মানবতার এই মহাযুগে একবার গণ্ডি কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে, তুমি হিন্দু নও, মুসলমান নও, ব্রাহ্মণ নও, শূদ্রের নও, তুমি মানুষ–তুমি সত্য।’

মানুষে মানুষে তাঁর মিলন বার্তা সময়ের স্রোতে কিভাবে জাত-ধর্ম বিভেদের সমাধান করতে পারে তা নিয়ে কবিগুরুর সাথে নজরুল কবি তাঁর আলোচনায় বলেছেন, ‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু মুসলমান সমস্যা নিয়ে । গুরুদেব বললেন–দেখো, যে ন্যাজ বাইরের তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে ?’ কবিগুরুর এই ভিতরের ন্যাজ কাটার প্রশ্নে কবি নজরুলের মিলন-বার্তা সময়ের সাথে আরও গভীরে হারিয়ে যেতে বসেছে কি?

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(নজরুলের রচনা থেকে )

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *