কুন্তল দাশগুপ্ত
তৃতীয় পর্ব
৪. কালিন্দির-ই ঘাটে আইস
দুর্গা-দালানের দু’ধারে নারকেল গাছের সারি। গুনে দেখেছে সুকান্তি। মুখুজ্জে ভিটেতে পা রাখার প্রথম দিনেই গুনেছিল। মোট ষোলোটা। কেমন ভেতর থেকে নাড়া খেয়েছিল সে।
তাহলে এলে।
বাতাস ফিসফিসিয়েছিল।
এদেশে আসার ষোলতম বছরে এই ষোলোটা নারকেল গাছ এক সঙ্গে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করেছিল হঠাৎ ওঠা একটা হাওয়ায়।
সামনে নোনা ধরা ইঁটের প্রত্ন-প্রাচীন দুর্গা-দালান। সাধন-পীঠ, দুর্গাদাস ঠাকুরের। একজন উদ্বাস্তু মানুষ এই ভিটেতে এলে এত মন ভালো করা রোদ্দুর ওঠে! মায়াগ্রামে তারা সপ্তকে বাজতে থাকে তীব্র ঝালা! ঘুলঘুলিতে পায়রা-বাসা কেঁপে কেঁপে ওঠে! কেন এই বিভ্রম? সুকান্তি খুঁজে ফেরে নিজের মনন-ঘুঁজির অন্ধকার। এত থোপা থোপা অন্ধকার জমে আছে! এত কথা বলায় সে নিজের সঙ্গে অনর্গল! অনর্গল? না তো সুকান্তি বেশ জানে সে নিজের কাছ থেকে নিজেকে লুকোয় প্রতিটি নির্জনতায়। বিষম হৈচৈ আর মেকি ব্যস্ততার আগুনে নিজেকে পোড়াতে থাকে অগ্নিশুদ্ধ হতে চেয়ে। পঁয়তাল্লিশ সালের অগ্নিপথ দিয়েই তাদের অগ্নিদগ্ধ দৌড় দেখছিল যশোর রোডের দুপাশের বিপুল বৃক্ষ-শ্রেণী…
তাইলে সোনাদা শুরু করি?
সম্বিৎ ফেরে সুকান্তির। পুষ্কর। কাঁধে পাটের মোটা দড়ি গোল করে গুটিয়ে ঝোলানো। হাতে ধারাল হেঁসো। মাথায় আর কোমরে গামছা বাঁধা। পরণে লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে পরা এমন ভাবে যে পাছা প্রায় দৃশ্যমান।
হ্যাঁ। সবকটা গাছ ছাড়াতে পারবি? এতটা দেরি করলি কেন?
তুমি না এলে গাছে চড়তে না কল্লে তো বৌদি।
বৌদি… মধুজা। নামটা অরবে উচ্চারিত হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফুসফুস নিংড়ে বেরিয়ে এল। প্রতিবর্ত ক্রিয়া। মগজ জানে না তবু… কত কিছু যে ঘটে যায় এভাবে… মানুষের কৃত তবু মানুষের নয়। সৃষ্টির গাঢ় আঁতুরে মগজ কি কাজ করে? মগজ কী কাজ করে? তবে কেন অতৃপ্তির অসহ্য আঁধি স্রষ্টাকে গ্রাস করে? অপারগতার যন্ত্রণা অশেষ হয়? মানুষ আবার… আবার… আবারও খুঁড়তে থাকে… ভাঙতে থাকে নিজেকে। আপনাকে জানা মানুষের কখনো ফুরোয় না… আকাশের দিকে চোখ বুঁজে তাকিয়ে এই সব ভাবনার সঙ্গে মানসাঙ্ক কষতে কষতে নিতান্ত অবহেলায় চোখ মেলল সুকান্তি। গাছ বাইছে পুষ্কর। এই ছবিটা দেখেই হাসি লুকোতে জিভ কামড়ে ধরল সে… সমতট… বাপরে, কী ডানপিটে ছেলে… আরেঃ কত্ত ডাব খাবি? মোর মামাগো বাগান আসে না! তোগো লয়া যামুআনে।
হেই… তাইলে তো দ্যাশ ছাইড়া যাতি অয়।
ক্যান?
হেই দিন যে সাররে কলি মামাবাড়ি যাইসিলি হের লগে কামাই করছস। আর মুই জিগাইতে কলি বিদ্যাশ। তাইলে তর মামাবাড়ি বিদ্যাশে হইল কিনা?
আইরে বোহা পোলা… বাড়ি লয়া তো যামু না, যামু তো বাগানে। হেইডা তো আমাগো শঙ্খ জলায়…
শঙ্খ জলার বুক এতদিনে নির্ঘাৎ নরম নেই আর। কী বিপুল শরের জঙ্গল। কত যে দুপুর কেটেছে ঐ জলার ধারে… সেভেন প্যারাডাইস… অম্বুরি তামাকের সুগন্ধ… ভাবছিল সুকান্তি— উই ওয়্যার সেভেন, চোখ বুজে গভীর শ্বাস টানল সে… বাতাস ভাগ করা যায় না, যায়ওনি… ভূতবায়ু তার সবটুকু গন্ধনিয়ে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের দখল নেয়… মুখশ্রী জ্বলে ওঠে অপার্থিব আলোয়…
হাই আল্লা এ যে নিয়ামত চাচার বাগান! নিয়ামত চাচায় তর মামা অয় ক্যামনে?
আরেঃ জানস না? মোর বাপে অয় সম্বুন্ধি ডাহে তয় মুই ভাগনা অই কি না অই? তরা গাস-তলে বস। মুই গাস বাই গা…
পুষ্করে সমতট দেখে প্রতিবার সুকান্তি আর পাহারাদারের হাতে ধরা পড়ে কীভাবে অনর্গল ভুলভাল ইংরাজির ফোয়ারা ছুটিয়ে উদ্ধার পেয়েছিল তার স্মরণে হাসতে থাকে…
কাঁদি গুনো দুগ্গা দালানের ভিতরে রাকচি গো।
পুষ্করের বৌ। কালিন্দি। কাটা কাটা মুখ-চোখ। তোলপার যৌবন। রীতিমতো ব্লাউজ-বাহুল্য গৌরাঙ্গে গাছ কোমর করা লাল ডুরে। একবস্ত্র। তীব্র। শরীরি। ভাপ এসে লাগছে এতটা দূর থেকেও। নিজের কৈশোর-ভূত থেকে খর-যৌবনে সুকান্তি মুহূর্তেই… মাথা নেড়ে সায় দেয় সম্বোধন-হীন ছোঁড়া কথার অভিমুখ বুঝেই।
পাতাগুনো নে যাই।
তেরছা চোখের ঘাড় হেলানো প্রশ্নকত্রী সম্মতির অপেক্ষা না করেই পাতা টেনে নিজের উঠোনে নিয়ে যেতে শুরু করে। পাতা চেঁছে কাঠি বার করবে সে। বাজার দর ভালো এই নারকেল কাঠির। খ্যাংড়া বলে এখানে। আবাল্য নারকেল কাঠি বলে জেনে এসেছে সুকান্তি। ওর চোখ ছুঁয়ে যায় গৌরাঙ্গীর অসংস্কৃত বাহুমূলের কৃষ্ণাভা। অসহ্য অথচ কাম্য। অস্পৃশ্য স্বপ্ন। অন্তরাল-বিলাসী। ভয়ংকর। ব্যক্তিগত। অপরেশ স্যারকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় সে। মুখ ভাবলেশহীন রাখার কৌশল শিখিয়েছিলেন থিয়েটার-ওয়ার্কশপে। তীব্র অনুভূতির মাথায় চড়ার পরিশ্রম ভারি ক্লান্তিকর। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পেশা-কাঁটা বিক্ষত বর্তমান পদাধিকারের দায়বাহী।
এক কাঁদি ডাব নাব্বিচি মাসাই, তুমি বৌদি কে বলে ম্যানেজ কোদ্দিও। এ ন্যাও অ্যাট্টা খাও। বেশ মালাই দেকে দিইচি।
সামনে বাড়িয়ে ধরা মুখ-কাটা ডাবটার দিকে এক পলক দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ওঠে সুকান্তির।
ঘুষ দিচ্ছিস! নিজের অপকর্মের সঙ্গী করতে চাইছিস আমাকে!
গলাটা চড়ে যায় সুকান্তির। পাতা টানা থামিয়ে ছুটে আসে কালিন্দি। দুচোখে কৌতুহল। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ঝংকার দেয়—
ফের… ফের চুরি কল্লি! ঐ ঝন্যি তোর ঘর কত্তে ঘেন্না লাগে
আরো অপভাষা বেরোনোর মুখ হাত তুলে বন্ধ করে সুকান্তি। নীচু-গম্ভীর গলায় বলে—
সন্ধের আগে নিজের কাজটুকু গুছিয়ে নাও কালিন্দি আর পুষ্কর তুমি ডাবের কাঁদি আর মুখ-কাটা ডাবটা নিয়ে আমার সঙ্গে এসো।
কথা কটা বলেই হনহন করে অন্দরমহলের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। এই সোনা-মাস্টারের রকম এ গাঁয়ে সকলে চেনে। খুব রাগলে সে তুমি বা আপনি বলে সম্বোধন করে ছোট-বড় সবাইকে। মনে মনে প্রমাদ গুনল পুষ্কর। নির্ঘাৎ মার গেল মজুরীটা। অন্দরমহলের দরজা পেরতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সুকান্তি। দুবার গলা খাঁকরে কারো সাড়া না পেয়ে ঈষৎ উঁচু গলায় ডাকল—
মালতী… তোমাদের বৌদিকে বলো পুষ্করকে নিয়ে এসেছি কিছু কথা আছে। মালতীর সাড়া না পেলেও সুকান্তি জানে তার আগমন বার্তা জায়গা মতো পৌঁছে যাবে।
#
আপনার বিচারে পুষ্করের কী শাস্তি বিধান করেছেন? বেতস লতার মত হিলহিলে শ্যামাঙ্গী নীলাম্বরা মধুজার স্বরে সম্ভ্রম।
হয় মজুরী নয় ডাবের কাঁদি। ব্যারিটোনে সুকান্তি। এই টোন হেজিমনিক। গলে যায় মধুজা। অভিভাবকহীন নিরালম্বতা আলম্বন বিন্দু অভিসারী হতে প্রাণপণ করে।
আপনি কোনটা দেবেন ঠিক করেছেন? অর্ধনমিত মুখে প্রশ্ন রাখে মধুজা সাবধানে।
ডাবের কাঁদি। জানতে চাও কেন? সুকান্তির কথা-প্রান্তে মুখ তোলে সুনেত্রা মধুজা। পূর্ণ দৃষ্টিতে চায়… চেয়ে ব’সে থাকে…
পুষ্কর রোজ ভ্যান রিকশায় ঘুরে ঘুরে ডাব বিক্রী করে। কাঁদিটা বিক্রী করে সে মজুরী থেকে বেশিই পাবে কিন্তু নগদ মজুরী হাতে দিলে… কথা শেষ না করে অবাক হয় সুকান্তি চেয়ারে বসা মধুজাকে মুখ চাপা দিয়ে প্রবল হাসতে দেখে।
এতে হাসির কী হল? বিরক্তি ছলকে ওঠে সুকান্তির স্বরে! পুষ্করের হাত থেকে মুখ কাটা ডাবটা ছিনিয়ে নিয়ে বলে— এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? যা কাঁদিটা নিয়ে বিদায় হ। পুষ্কর চলে যায়। আরও কিছুটা সময় নিয়ে হাসি সামলে উঠে দাঁড়ায় মধুজা সুকান্তির মুখোমুখি। হঠাৎ সুকান্তির হাত টেনে নিয়ে একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলে—
এবারে অন্তত তোমার পকেটটা বাঁচালুম। যথাস্থানে পৌঁছে দিও।
উত্তরের অপেক্ষা না রেখেই ভিতরমহলে মিলিয়ে গেল মধুজা অকস্মাৎ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত সুকান্তির ধীরে অতি ধীরে যখন বোধজন্ম হল তখন সে কালিন্দির অন্ধকার উঠোনে প্রেতের মত দাঁড়িয়ে…
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
