প্রীতন্বিতা
জীবন কি অলৌকিক?
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব কি বিজ্ঞানের জঘন্যতম ভুল?
ইদানিং কালে এই প্রশ্ন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। মলিকুলার বায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও জেনেটিক্স গত ৫০ বছরে যে অকল্পনীয় উন্নতি করে গেছে তাতে মনে হয় যে এতদিন যুগের পর যুগ আমরা বোধ হয় এক ভ্রান্ত তত্ত্বকে ভিত্তি করে একের পর এক বানিয়ে এসেছি অলীক সমস্ত সৌধ। মাইক্রোবায়োলজির বৈজ্ঞানিক তথ্য, জীবাশ্ম, গাণিতিক সম্ভাব্যতা ইত্যাদি সমস্ত দিক বিচার করে বলতেই হয় যে ডারউইন এক কাল্পনিক তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন যার গোটাটাই আবেগ, যাতে অন্য আর যাই থাকুক না কেন, বৈজ্ঞানিক সত্যি নেই।
বিজ্ঞান জগতে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও অবশ্যই, যে কয়েকটি তোলপাড় তোলা বিতর্ক আছে তার মধ্যে অন্যতম: পৃথিবীতে প্রাণ কি বিবর্তনবাদের ফল নাকি তা কোন অজ্ঞাতপরিচয় সত্ত্বার সুচিন্তিত সৃষ্টিকর্ম। ডারউইনের অনুগামীরা বিবর্তনবাদকেই জীবনের চাবিকাঠি বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন। বিবর্তনবাদ ও প্রাকৃতিক নির্বাচনকে মেনে নিলে সরাসরি অস্বীকার করতে হয় ঈশ্বরের অস্তিত্ব। ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ঈশ্বর বিরোধীরা কিছুটা বেকায়দায় পড়ে গেছে।
বিবর্তনবাদ বা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে জীবনের উৎস বলে ধরে নিলে মানতেই হয় যে পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টি হয়েছিল আকস্মিকভাবে, কোন পরিকল্পনা বা লক্ষ্য ছিল না এই সৃষ্টির পিছনে। জীবনের এই উৎসের বীজ তাহলে সুপ্ত ছিল অজৈব উপাদান সমূহের মধ্যে। অজানা অতীতে কোন এক সময় অজৈব উপাদানগুলি থেকে হঠাৎ অকারণে, একেবারেই এলোমেলো ভাবে বিবর্তন ঘটেছিল জৈব উপাদানগুলির। এমন ঘটনা কি বাস্তবে ঘটতে পারে? গণিতজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী বলতে হয়, ব্যাপারটা অসম্ভব।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা নানাদিক থেকে বিষয়টির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। অজৈব উপাদান থেকে জৈব উপাদান হিসেবে একটি এককোষী প্রাণীর আবির্ভাব ঘটার সম্ভাবনা কতটা? হ্যারল্ড মরোউটজ্ নামে জনৈক বিজ্ঞানী হিসেব করে দেখিয়েছেন যে দশের পর দশ হাজার কোটি শূন্য বসালে যে বিশেষ সংখ্যা পাওয়া যায় তত সংখ্যক বিপুল রাশির মধ্যে ঐরকম সম্ভাবনা মাত্র একবার দেখা যেতে পারে। এমনিতে এই বিজ্ঞানী একজন ঈশ্বরের অবিশ্বাসী পদার্থবিদ। জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার ক্কাথকে প্রচন্ড উত্ত্যক্ত করে সমস্ত জটিল রসায়নকে ভেঙে প্রাথমিক নির্মাণ উপাদান তৈরি করে নেওয়া হলো এবং তার ওপর ভিত্তি করেই গাণিতিক মডেল প্রস্তুত করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব প্রয়োগ করে তিনি দেখান যে ওরকম মিশ্রণ থেকে একটি জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ১০০ হাজার কোটি ভাগের একভাগ। এরকম একটি ঘটনা ঘটা ততটাই অসম্ভব যতটা অসম্ভব সপ্তাহে মাত্র একটি লটারির টিকিট কেটে ১০ লক্ষ বছর ধরে প্রত্যেক সপ্তাহে ফার্স্ট প্রাইজ নিয়মিত পেয়ে যাওয়ার মত ঘটনা।
বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল ব্যাপারটাকে একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে অজৈব উপাদান থেকে জৈব উপাদান উদ্ভব ঘটার ব্যাপারটা একেবারেই অসম্ভব। মনে করা যাক, কেউ কোন মাঠে প্রচুর লোহালক্করের জঞ্জাল ফেলে রাখল। প্রবল ঝড় এসে সব এক জায়গায় জড়ো করে হিসেবমতো একের পর এক সাজিয়ে একটা বোয়িং ৭৪৭ বিমান বানিয়ে দিল। এই ব্যাপারটা যতটা অসম্ভব ততটাই অসম্ভব অজৈব উপাদান থেকে হঠাৎ অকারণে এলোমেলোভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে জৈব উপাদানের আবির্ভাব। হয়েল হিসেব করে দেখিয়েছেন যে সম্ভাবনাটা হবে দশের পর ৪০ হাজার শূন্য বসিয়ে যে বিশাল সংখ্যা পাওয়া যাবে তার মধ্যে মাত্র একবার। গণিতজ্ঞদের কাছ থেকে জানা যায় যে কোন ঘটনা ঘটার অসম্ভাব্যতা যদি দশের পর ৫০টি শুন্য বসিয়ে যে বিশাল সংখ্যা পাওয়া যাবে তার মধ্যে মাত্র একবারের চেয়েও বেশি হয় তো সেই বিষয় আর বিজ্ঞানের আওতায় থাকে না। সেই বিষয় মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার অন্তর্গত হয়ে যায়। তেমন কোন ঘটনা হয় অলৌকিক।
জীববিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন ফ্রান্সিস ক্রিক, ডি এন এ সংক্রান্ত তাঁর বিশেষ গবেষণার জন্য। জীবনের উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৮২ সালে ক্রিক মন্তব্য করেছিলেন: বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম জ্ঞান হাতিয়ার করে যদি সত্যি কথা বলতেই হয় তো বলব যে জীবনের উৎস সমস্ত দিক থেকেই বিচার করে মনে হচ্ছে প্রায় অলৌকিক, কারণ এই উৎস ঘটার পিছনে এত অজস্র শর্ত পূরণ হতে হবে যার এতটুকু বিচ্যুতি ঘটলেও চলবে না।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
