তাপস সরকার

লেখক পরিচিতি 

( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর  বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। ) 

অধ্যায় : তেইশ

হুড়জাই প্রদেশে চন্ডালু নদীর চরে এক নোলা থাকে। তার বৃত্তান্ত বলেছিল হাজু বলগাদার। হাজুর গোলালুর আরত, চরে যাতায়াত লেগেই আছে। নিত্যদিন সেই নোলাটাকে সে দেখে আর তাজ্জব হয়, এবং তার বিবরণ সে সবাইকে শোনায় না এই কারণে যে লোকজন জানলে হুড়মুড়িয়ে দেখতে গিয়ে ভিড় জমাবে চন্ডালু নদীর ধারে। তাতে নোলাটার বসবাস যেমন বিপর্যস্ত হবে তেমনি তারও ব্যবসার কাজে নানা ব্যাঘাত দেখা দেবে। তাই সে দিনের পর দিন নোলাটার কান্ডকীর্তি দেখে আর নিজেই অবাক হতে থাকে এবং সেসব আজব বিষয় আর কাউকে বলে না। মানুষের যা স্বভাব, কিছু একটা অদ্ভুতুড়ে জিনিসের কথা জানলেই তাকে ঘেঁটে তার হারপিত্তি বার করে দেবে। হাজু ভাবত, নোলাটা যেমন আছে থাক, আমার কাজেকর্মে যখন সে কোন বিঘ্ন ঘটায় না আমিও তার শান্তি বিনষ্ট করব না। পৃথিবীতে ভূত-ভগবান-মানুষ সবারই বসবাসের সমান অধিকার রয়েছে, কেউ কাউকে অকারণে বা কারণে ঘাঁটাতে গেলেই যত বিপত্তি। এই ভেবে হাজু কাউকে কিছু বলে না, নিজেই দেখে নিজেই অবাক হতে থাকে। তবে মানুষের অবাক হওয়ারও তো একটা লিমিট আছে? অবাক হতে হতে একসময় সকলেরই মনের পেট অ্যায়সা ফুলে যায় যে কাউকে কিছু না জানালে অশান্ত সেই পেট ফট করে ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। হাজুরও হল সেই দশা। তখন সে একদিন আমাকে পেয়ে ভালমানুষ ভেবে একান্তে বসে তার চেপে রাখা সব গোপন কথা খোলসা করে দিল। দীর্ঘকাল সেসব কথা আমি কাউকে বিন্দুবিসর্গ বলিনি। এখন সবাইকে জানাচ্ছি এই কারণে যে সেই নোলা আর নোলা নেই এবং লোকে তার বৃত্তান্ত জানলেও তার নোলাত্ব কোনমতেই আঘাতপ্রাপ্ত হবে না। 

দেড় ফুট জিভ সেই নোলাটার, তাতে নানাজাতীয় আবিল-কাবিল মাখানো। তাই দিয়ে দেড়ফুটি জিভ ক্ষণে ক্ষণে বার করে নোলাটা রকম-সকম ধরে ধরে গেলে আর উগরে দেয়। সারাদিন ধরে এই তার কাজ। কিছুই খেয়ে হজম করার ক্ষমতা নেই জীবটার, এমনি বিধির বিধান। কেন যে সেই নোলাটাকে বানিয়েছিল সৃষ্টিকর্তা, তার এই ফাজলামি বুঝবে সাধ্যি কার? হাজু তো দুরস্থান, আমিও তার কোন সদুত্তর খুঁজে পাইনি যদিও এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল আমাদের। সেই নোলাটার কপালে আবার চন্দ্রবিন্দু এবং কপালেরই একধারে একটা বিসর্গ। হাজু আর আমি অফুরন্ত গবেষণার পর ধারণা করতে পেরেছিলাম যে ওইগুলি অবশ্যই নোলাটার সুখদুঃখের প্রকাশ। এমনই তার বহুবিধ মানসিক ব্যাপার-স্যাপার জানান দিত বহিরঙ্গের নানাজাতীয় চিহ্নচরিত্র। সবগুলি কি আর খুঁটিয়ে দেখেছে হাজু? বা দেখলেও তেমন মাথায় রাখেনি বিস্মিত হওয়ার ঠ্যালায়। নোলাটার কার্যকলাপ বস্তুত এমনই বিচিত্র যে হতচকিত না হয়ে থাকা মুশকিল। জগতের আজব সমস্ত জীব বা নির্জীব পদার্থের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ভূচর প্রাণীটি। তাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টিচরিত্র বোঝা দায় যদিও তার কথা অবগত ছিল না কেউ। এটাই বা কিসে কম চমৎকারের কেত্তন? আমি জেনেও কাউকে বলিনি কেন তার কারণ তো জানিয়েছি। আর তাছাড়া হাজু নিজেও তো কাউকে কিছু বলেনি। আমিই বা হাজুর অমতে গোপন বৃত্তান্ত রাষ্ট্র করব কোন্ আক্কেলে? নোলার খবর ইতিপূর্বে জানাইনি বলে আমার কী দোষ?

তো সেই নোলা থাকে চন্ডালু নদীর চরে, দেড়ফুটি জিভ হড়াৎ-হড়াৎ বার করে করে জগতের রকম-সকাম গেলে আর উগরায়। কাউকে কিছু বলে না, কে কী বলে দেখেও না। যাদের গিলে গিলে উগরে দেয় তাদের কী অবস্থা হয় খোদায় মালুম। আমি তো আর স্বচক্ষে কিছু প্রত্যক্ষ করিনি। সব শুনেছি হাজুর মুখে, আর হাজুরও কি নোলাটাকে বাদ রেখে অন্যকিছু লক্ষ করার জো ছিল? নোলাকে নিত্যদিন দেখে তার তো মনে অগাধ বিস্ময়। দেখে আর কেবল দেখে, দেখে কেবল নোলাটাকেই, অন্য আর কিছু তার নজরে আসে না। আমাকে যে বৃত্তান্ত শুনিয়েছিল, শ্রবণকালে আমিও আদ্যোপান্ত সকল কিছু খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার ফুরসৎ পাইনি। কথায় কথায় ব্যাগড়া দিলে মূল ঘটনা বিস্তারিত জানায় ব্যাঘাত ঘটত। হাজু যা বলত আমি কেবল শুনে যেতাম, যতোধিক বিস্ময়বোধ হওয়া কর্তব্য হতাম, বিশেষ কিছু উচ্চবাচ্চ্য করতাম না।

তা সেই নোলা হুড়জাই প্রদেশে চন্ডালু নদীর চরে নোলা হয়ে ছিল ভালো কথা, নোলা হয়ে থাকলে কোন সমস্যাই হত না। তার যে কী দুর্মতি হল, সে ভাবল, তাকে মানুষ হতে হবে। মানুষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কার না হয়? ভগবানের হয় কিনা ভগবান জানে, ভগবান তো আর আমার ইয়ারদোস্ত নয় যে তার সঙ্গে হরদম আমার দেখাসাক্ষাৎ ঘটে আর সেই সূত্রে জেনে নেব তার মনোগত বাসনা কোনক্রমে মানুষ হওয়ার পক্ষে কিনা। আজ পর্যন্ত ভগবানের সঙ্গে দৈবাৎও আমার মোলাকাত হয়নি কোনোদিন। যারা দেখেছে বলে দাবি করে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার, আমি প্রতিবাদ না করে মেনে নিই, তবে তারা তাদের দেখার সপক্ষে কেউ ইট-কাঠ-পাথর জাতীয় কোন প্রমাণ উপস্থাপিত করতে পারেনি। যাক গে, সেসব আধ্যাত্মিক দুনিয়ার বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে আমি কোন মতামত ব্যক্ত করতে চাই না যেহেতু নানাবিধ অসুখে ভুগে মরছি দিনরাত। বলছিলাম, নোলাটা মানুষ হতে ইচ্ছেপ্রকাশ করেছিল তার বৃত্তান্ত। মানুষ হওয়ার ইচ্ছে সবারই হয়, খামোখা ভগবানের প্রসঙ্গ উত্থাপন হওয়ায় বিবরণটা বেচাল হয়ে গিয়েছিল। স্বয়ং মানুষের মনেও মানুষ হওয়ার ইচ্ছে সুপ্ত থাকে, ভূত-প্রেত বা অন্য সব জীবিত-মৃত বস্তুসমূহের কথা ছেড়েই দিলাম। নোলাটারও সেই ইচ্ছে হয়েছিল। কোন্ লগ্নে কে জানে, কুক্ষণে না সুক্ষণে কে বলবে?

মানুষ হওয়ার চিন্তা এল তার মনে ভালো কথা, চেষ্টাচরিত্র শুরু করল এবং একসময় সে মানুষে পরিণত হয়েও গেল। তাতে ভালো কি মন্দ হল সে বিচার যারা শুনবে তারা করবে, আমার মতামত জ্ঞাপনের কোন আগ্রহ নেই। সেই নোলা অতঃপর মানুষ হয়ে গেল, কিন্তু তার আদিম চরিত্র আর প্রাক্তন স্বভাববৈচিত্রের কোন পরিবর্তন ঘটল না। এ এক চমৎকার চিত্র, নোলা মানুষ হওয়ার পরও তার নোলাত্ত্ব ঘুচল না, সে সেই আদিম-অকৃত্রিম নোলার মতই জীবনযাপন করতে লাগল। দেড়ফুটি জিভ অকাতরে হরদম বার করে করে জগতের রকম-সকাম গেলে এবং উগরে দিতে বাধ্য হয়। নোলাত্ব বলে কথা! এই নোলাত্ব মানুষ হওয়ার পরও কি চরিত্র ছেড়ে যায়? মনুষ্যত্ব আর নোলাত্ব যে এক নয়!

আমি যা শোনাচ্ছি তার কিছুই আমার দেখা নয়, সব সেই হাজু বলগাদারের বর্ণনা করা উপাখ্যান। হাজু কী দেখেছে কী জেনেছে তা তার ব্যাপার, আমি যা শুনেছি তাই বলছি। এ হল নোলার নোলাত্ব ঘুচিয়ে মানুষ হওয়ার ইতিবৃত্ত, হাজুর মুখে শোনা, সত্যিমিথ্যে যাচাই করে দেখিনি কস্মিনকালে। যারা বলে, শোনা কথায় কান দিতে নেই তাদের উদ্দেশ্যে বলি, বেদওতো শোনা বিষয়, গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে পরে। তা বলে বেদবর্ণিত রহস্যসমূহ কি দূর-ছাই বলে উড়িয়ে দিতে পারে কেউ? হাজুর কথায় সমস্তটা না হোক খানিকটা আস্থা রাখতে ক্ষতি কী? তাছাড়া দেখেছি, হাজুবর্ণিত কিছু বিষয়ের বাস্তবানুগ অবস্থান রয়েছে। সে বলেছে, নোলাটা মানুষ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে সাফল্য অর্জনের পর মানুষ হল বটে কিন্তু চরিত্রটা থেকে গেল সেই অকৃত্রিম নোলাটারই মত। যেমন সে অতীতে চণ্ডালু নদীর চরে অবিশ্রাম পরিভ্রমণ করার কালে কারণে-অকারণে দেড়ফুটি জিভ বার করে করে বিশ্বগ্রাসী খিদের জ্বালায় জগতের রকম-সকম এন্তারসে গলাধহঃকরণ করত তেমনই করে যেতে লাগল আর তেমনই কোন কিছু পেটে ফেললেও হজম করে যেতে পারল না, অবিরল সেই পুরানকালের বদভ্যাস অনুযায়ী সব উগরে দিয়ে গেল। সব যে উগরে দিতে সে বাধ্য এ নিয়মটা ছাই কি তার নিজেরও মাথায় থাকত? থাকলে যা পাই তাই খাই করত না হরদম। আসলে যার যা স্বভাব! বহিরঙ্গ পাল্টিয়ে যতই পোশাক-আসাক পরে নিজেকে পালিশ করে অন্যরকম সাজুক যার যা খুশি, মৌলিক স্বভাব তার পাল্টাবে কোন্ জাদুমন্ত্রে? স্বভাব পাল্টায় না ভূত বা ভগবানেরও। মানুষ, অর্থাৎ নোলার পাল্টে যাবে ভাবে কোন্ মূর্খ?

নোলার এই অসুখ দেখছি আমার মধ্যেও ঘটমান বর্তমান, বিশ্বগ্রাসী খিদে নিয়ে জগতের সমস্ত রকম-সকম উদরে পূরণের চেষ্টায় মত্ত, পূরণ করে কী যে উপকার ঘটবে জগতের বা নিজের তার খেয়াল রাখতে পারি না। পেলাম বলেই খেলামও নয়, যা না পেলাম তাকেও নিরন্তর খেলাম-খেলাম করে বেড়াই। খেলে যে ছাই উগরে দিই, হজম করার কৌশল করায়ত্ব নয় তা মনে যে রাখতে পারি না। খাওয়ার নেশায় খেয়ে যাই। এ যে কী বিকৃতি বা আকৃতি জানাবে কোন্ বান্দা! খা রে খা, জন্মেছিস যখন খেয়ে যা, জন্ম তো খাওয়ার জন্যই, ওইটাই তো নিয়ম রে—- কে যেন মাথার গোপন প্রকোষ্ঠে আর অন্তরে আসীন থেকে নিরন্তর বলে যায়। তার অনন্ত তাড়নায় আমি হাঁ করেই আছি, আবিল-কাবিল মাখানো দেড়ফুটি জিভ বেরিয়ে থাকে আর গিলেই যাই যা পাই সম্মুখে। অতীত গিলে তো ফেলেইছি, বর্তমান গিলতে গিলতে ভবিষ্যতও আন্দাজে গিলতে থাকি। ঘড়াৎ-ঘড়াৎ উগরে দেব সব অচিরেই সেই হিতোপদেশ কে স্মরণে রাখে? খাওয়ার জন্য জন্ম তো খেয়ে যা, উদরসর্বস্ব নোলা হয়ে গেছিস আবিল-কাবিল মাখানো এক দেড়ফুটি জিভের অধিকারী প্রাণী তুই! নোলাটা তো মানুষ হয়েও নোলাত্ব ঘুচিয়ে মনুষ্যত্ব পেল না, তুই ধর্মের জীব মনুষ্যত্ব ঘুচিয়ে যদি নোলাত্ব পেতে পারিস তো তোর বাহাদুরি অতুলনীয় হবে। 

পৈত্রিক সূত্রে হাজু বলগাদারের গোলালুর ব্যবসা, চন্ডালু নদীর চরে। জগতে এতবিধ স্থান থাকা সত্ত্বেও তার পিতামহ-মাতামহ কেন হুড়জাই প্রদেশে গিয়ে গোলালুর ব্যবসার গোড়াপত্তন ঘটিয়েছিল কে জানে, তবে করেছিল ব্যবসাটা সেখানে বলেই না নোলার উপাখ্যান জানা হল।

দুনিয়ায় লাখো বস্তু থাকা সত্ত্বেও কেন গোলালুর ব্যবসা করেছিল তার পূর্বপুরুষ তার উত্তর কে দেবে? হাজু নিজেও জানে না, চালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পিতামহ-প্রপিতামহ বা তারও পূর্বতন পুরুষের কথা সেসব, গবেষণা চালিয়েও জানা মুশকিল। পুরাতত্ত্ব আর নৃতত্ববিদরাও থৈ পাবে না হাজু তো কোন্ ছাড়! বোধহয় দুনিয়া গোল আর গোলালুও গোল, এই সাদৃশ্যের কথা সেই পূর্বপুরুষদের মাথায় ছিল ব্যবসা পত্তন করার সময়। সে যা খুশি হোক গে, হাজুর গোলালুর বাণিজ্য তার ভূতপূর্ব পূর্বপুরুষ কেন চালু করেছিল, তার কী লাভ কী ক্ষতি বা কী গতিপ্রকৃতি সেসব বৃত্তান্ত জেনে কার কী হবে? নোলাটার কান্ডকীর্তি কী হতে লাগল উত্তরোত্তর সেটাই এই আখ্যানের মূল আকর্ষণ বা উদ্দেশ্য। নোলা তার দেড়ফুটি জিভ বার করে করে রকম-সকম গিলে খেত আর উদরে প্রবিষ্ট সকল বিষয়-আশয় অনতিবিলম্বে হড়হড় করে উগরে দিত। তাতে কোন সমস্যা ছিল না, ঝামেলা পাকালো তার মানুষ হওয়ার বাসনা। এবং অত্যাশ্চর্য ব্যাপার যে সে মানুষ হয়ে যেতেও পারল। এতে কোন দোষ ছিল না, গোল বাঁধালো তার সেই স্বভাব যার ফলে মানুষ হয়েও নোলাত্ব কাটল না। কোন্ মানুষের আবিল-কাবিল মাখানো দেড় ফুটি জিভ আছে তা সে যতই পাষণ্ড হোক না কেন? আপদ নোলাটা বহিরঙ্গে মানুষ হয়েও এই কথাটা বুঝল না যে মানুষরা মানুষ হয় তাদের অন্তরঙ্গে। নাহলে জগতে কত মানুষ রয়েছে কত কিসিমের চেহারাসম্পন্ন, দেখে বহু লোককে বহুবিধ অচেনা জীব বলে মনে হয়, অথচ তারা সবাই সার্থক মানুষ যেহেতু মানুষরা সবাই হান্ড্রেড পার্সেন্ট অন্তরঙ্গে খাঁটি মানুষ, কেবল ইদানিং আমাকে একমাত্র ব্যতিক্রম ঠেকছে। হাজুর মুখ থেকে নোলাটার বৃত্তান্ত শুনে অবধি দেখছি আমার চরিত্রও ওই নোলার মতই হয়ে আছে, উদরে বিশ্বগ্রাসী গেলার ইচ্ছে অথচ হজম করার সাধ্যি নেই। 

নোলাটার কথা বলছিলাম, নিজের দৃষ্টান্ত উত্থাপন করে ফেলছি। না করে উপায় কী ? আমার মধ্যে দেখি সেই নোলা বিরাজ করছে, কিংবা নোলা মানুষ হয়ে হবি তো হ ‘আমি’ হয়ে বসে আছে। যাই হোক না কেন, আমাকে আর নোলাতে গুলিয়ে ফেলছি অবিরত। তো সেই নোলা হাজুর চোখের সামনে মানুষে রূপান্তরিত হয়ে গেল, মানুষ হয়ে সে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল চন্ডালু নদীর চরে, তারপর ক্রমাগত সে বাইরের দুনিয়ায় বিচরণ শুরু করে দিল। এই করে করে মানুষ আর নোলা একাকার, কে কী বোঝা এখন দুষ্কর। এ এক দূরতিক্রম্য সংকট মানবসমাজের। হাজু বলগাদার কেবল জানে, নোলা তার আদিম বাসভূমিতে ফিরে আসে কখন এবং কখন সে মানুষের রূপ পরিত্যাগ করে স্বমূর্তি ধারণ করে। আবার ইচ্ছে হলে মানুষ সেজেই ঘুরে বেড়ায়। যাই করুক না কেন, মানুষ সাজুক বা নোলা হোক, তার আদিম চরিত্র অবিকল থাকে। 

হাজু যে কেন আমাকে নোলার কাহিনী শোনালো, আর কোন লোক জোটাতে পারল না কেন যে! তার তো চেপে রাখা রহস্য ব্যক্ত করে মনের পেটফাঁপা সারল আর আমি বিপদে পড়ে গেলাম। নিজেকে আমি সেই নোলা ভাবতে শুরু করে দিয়েছি। অদ্যাবধি নানান হিসেব-নিকেশ করে, পাটিগণিত-বীজগণিত ইত্যাকার যাবতীয় পদ্ধতির চুলচেরা ব্যবহার এবং বিবিধ উপায়ের মাপজোক, ইঞ্চি-ফুট-ক্যালোরি-ঘন্টা-মিনিট-লিটার-মিটার সমস্ত এককের ব্যবহার ঘটেছে তাতে, এবং দেখেছি আমাতে আর নোলাতে কোন প্রভেদ নেই। অতঃপর হুড়জাই প্রদেশে চন্ডালু নদীর চরে নোলা হয়ে কে ঘুরে বেড়াত এবং কে নোলা থেকে মানুষের চেহারা ধারণ করল এটা ক্রমশ সন্দেহজনক হয়ে উঠছে। এবং ওই হাজু বলগাদারই বা কেন বেছে বেছে আমাকেই নোলাটার বৃত্তান্ত শোনাতে এল এটাও বেশ ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে আমাকে। হাজুরও কি কোন সন্দেহ গোচরে এসেছিল? জগতে আর কাউকে তার অন্তরের গোপন সংবাদ শোনাবার জন্য পেল না সে?

মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল বলে দিনে কয়েকবার নিজের জিভ মেপে দেখতে লেগে গেলাম। নানা উপায়ে মেপেও জিভটাকে কোনমতেই দেড় ফুট লম্বা মনে হল না। তাছাড়া আবিল-কাবিল কী বস্তু তার কোন পরিচয় না জানলেও স্থিরনিশ্চিত ছিলাম যে ওটা আমার জিভে মাখানো নেই। তবুও আতঙ্ক কাটতে চায় না। উদরে বিপুল গেলার ইচ্ছে কেন? এ তো মানুষের লক্ষণ নয়? ভাবি আবার, জিভ মাপার নির্ঘাৎ অন্য কোন উপায় রয়েছে যার ব্যবহার দেখিয়ে দিতে পারে জিভটার কতটা প্রকৃত পরিমাপ। দেড়ফুটি জিভ থাকলে কী করব? কেটেকুটে ছেটেছুটে মানুষের জিভ বানানো যায় না? কিন্তু তাতেই বা কী লাভ? জিভ ছেটেছুটে নয় ছোট করা গেল, উদরের এই অতুলনীয় খাই-খাই মেটাবো কোন্ পন্থা অবলম্বন করে?

খোঁজাখুঁজি করে এক ডাক্তারের সন্ধান পেলাম। সবাই তাকে ধন্বন্তরি বলে। সে এমনই জবরদস্ত ডাক্তার যে নানাজাতীয় জবর-জবর অসুখ তার হাতে জব্দ হয়ে যায়। তাকে দেখাবার প্রবল হাঙ্গামা এবং প্রচুর হ্যাপা, তা সত্ত্বেও অকথ্য চেষ্টাচরিত্র করে আমি তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেলাম। সে আমার সমস্ত সন্দেহ ধৈর্য ধরে শুনে বলল,

‘আপনি নোলা কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তার জন্য আপনার ইউরিন, ব্লাড, স্টুল ছাড়াও মনের একটা ইউএসজি এবং এমআরআই করা দরকার। এইসব প্যাথলজিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল টেস্টগুলি করিয়ে আনুন। কোথায় করাবেন লিখে দিলাম। যদি এইসব টেস্ট অন্যত্র করান তো অনত্র যাবেন, আমার কাছে আসবেন না।’

শুনে বেশ ভয় খেয়ে জানালাম যে অন্যত্র যাওয়ার কোন সাহস হবে না আমার। তো সেই ডাক্তার নিশ্চিন্ত হয়ে এবার এক মোক্ষম কথা বলল,

‘আপনার ব্লাড, ইউরিন ইত্যাদির রিপোর্ট নোলাটার স্যাম্পলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। আপনি টেস্টগুলি করান এবং সেইসঙ্গে ওই নোলার ব্লাড, ইউরিন, স্টুল ইত্যাদির স্যাম্পল জোগাড় করে পরীক্ষা করিয়ে আনবেন।’

বড়ই মুশকিলে পড়ে গেলাম। আমার স্যাম্পল জোগাড় করা নিয়ে সমস্যা নেই, নোলার স্টুল, ব্লাড আর ইউরিন-এর স্যাম্পল আমি পাব কোথায়? সে ওইসব কর্ম করে কিনা বা তার দেহে রক্ত আছে কিনা সেসব তো হাজু আমাকে বলেনি। যদি হাজু বলতওবা নোলাটার কাছ থেকে ওইসব স্যাম্পল আমি সংগ্রহ করব কোন্ উপায়ে? তার পাত্তা পাব কোথায় বা পেলেও তাকে বললেই সে সুবোধ বালকের মত তার দেহস্থিত বা দেহনিঃসৃত ওইসব বস্তুসমূহ অকাতরে দান করে দেবে আমাকে এতটাই বেয়াকুব সে? টাকাপয়সার বিনিময়েও দেবে কিনা সন্দেহ ছিল। ডাক্তার যে কী ঘনীভূত ঘনক তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম এবং বেশ চটেও যাচ্ছিলাম। বিষণ্ণচিত্তে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ওইসব পরীক্ষা করাবার প্রস্তুতি নিলাম। ডাক্তারের আক্কেল দেখে বলিহারি যাই। নোলা যেন আমার ভায়রাভাই, তার ব্লাড-স্টুল-ইউরিন ইত্যাকার স্যাম্পল পেয়ে যাব যেন তার কাছে আবদার করে।

যাই হোক, নিজের টেস্টগুলি করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আবার তার চেম্বারে গেলাম। সব দেখেশুনে ডাক্তার প্রশ্ন করল,

‘নোলার স্যাম্পেল কোথায় ?’

জানালাম, নোলাটাকে চর্মচোক্ষে দেখিনি কোনজন্মে। হুড়জাই প্রদেশে চন্ডালু নদীর চরে সে থাকে বলেছিল হাজু বলগাদার। হাজু আমাকে নিয়ে যায়নি সেখানে আর ইদানিং হাজু এরোপ্লেনভর্তি গোলালু নিয়ে ঘাগামেনিয়া চলে গেছে সাপ্লাই দিতে। ঘাগামেনিয়া কোথায় জানি না, আর্মেনিয়ার ধারেকাছে হলেও হতে পারে। হাজুকে না পেলে জানার উপায় নেই। কবে হাজু ফিরে আসে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ডাক্তার বেশ রেগে গিয়ে বলল,

‘তাহলে নোলা হয়েই অপেক্ষা করুন। আপনার মত এমন কুলপিখোর পেশেন্ট আর বাপের জন্মে দেখিনি।’

কুলপিখোর কি জাতীয় পেশেন্ট বোঝার চেষ্টা না করে বিনীতভাবে বললাম,

‘ইয়ে, আজ্ঞে, আমার যে আরও অসুখ রয়েছে। যখন তখন উইদাউট নোটিশে ঘনঘন রং পাল্টাই আর যেকোন রূপ ধারণ করে ফেলি। ইদানিং হনুমানাইটিস হয়ে একটা হনুমানের আন্ডারে আছি। তাতে বিশেষ ক্ষতি হচ্ছে না যদিও তবুও তো রোগটা অস্বাভাবিক। তাই অতীব চিন্তায় আছি।’

শুনে দেখলাম ডাক্তার কিছুটা নরম হল। বলল,

‘আজকাল অনেক পেশেন্ট আসছে এসব কমপ্লেন নিয়ে। হাঙ্গরাইসিস, ব্যাঘ্রাইটিস, হায়েনাইসিস ইত্যাদি নানান রোগ। আমার চিকিৎসায় অনেকে স্বাভাবিক হতে পেরেছে। আপনিও সেরে যাবেন, কারণ হনুমানাইটিস ততটা মারাত্মক আসুখ নয়। তার জন্য বিশেষ চিকিৎসা আছে। ছাড়িয়ে দেব, কথা দিচ্ছি।’

হনুমানাইটিস রোগটা মন্দ নয়, থেকে গেলে ক্ষতি নেই, তবে সেরে গেলেও আপত্তি হবে না আমার। বেশ ভরসা নিয়ে বসে রইলাম। ডাক্তারবাবুর যে কী হল, আমাকে নির্ভয় করতে করতে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল। তাকে দেখে মনে হল নিজেই প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছে। লাফিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল গলা থেকে বিজাতীয় চিৎকার বার করে। আমি বিরক্ত হব না আশ্চর্য হব ভাবতে ভাবতে অনুভব করলাম শরীরটা কেমন যেন লম্বাটে হয়ে যাচ্ছে এবং পলকের মধ্যে মাথা গিয়ে ঠেকল ঘরের ছাদে। নিজেকে এত বৃহৎ মনে হল যে ডাক্তার যেন আমার তুলনায় ক্ষুদ্র এক কীট আর আমি হাঁ-মুখ নিয়ে গিয়ে ডাক্তারকে গিলে ফেললাম। ডাক্তার এখন আমার উদরে। কেমন ফোঁস-ফোঁস আওয়াজ করছিলাম, শুনে এবং ডাক্তারকে গিলে ফেলার কারণে নিজেই যেন কেমন হতভম্ব হয়ে গেলাম। অতবড় একটা লোককে গিলে ফেললাম কিভাবে? নোলার কি এত ক্ষমতা? সে আবিল-কাবিল মাখানো দেড়ফুটি জিভ বার করে রকমসকম ধরে ধরে গিলে খায় জানি। তা বলে আস্ত একটা মানুষ গিলে খেতে পারবে? নিজের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে আক্কেল গুরুম। দেখি কী, অতিকায় এক অজগর সাপ হয়ে বসে আছি। যে লোকটা আমার অসুখ সারিয়ে দেবে বলছিল তাকেই গিলে খেয়ে ফেললাম? এ কেমন খিদে উদরের? এ কেমন অসুখ আমার? আমি তো দেখছি অন্তরঙ্গেও মনুষ্য পদবাচ্য নই।

ইতিমধ্যে হৈ হৈ করে লোকজন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আসছিল। ডাক্তারের আর্তনাদ তারা শুনতে পেয়েছিল। ঘরে ঢুকে লোকেরা অতবড় এক অজগর সাপ দেখলে কী কাণ্ড ঘটবে এই নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু লোকগুলো ঘরে ঢুকতেই নিজের গলায় মিয়াঁও ডাক শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। ডাক্তারকে সদ্য গিলে ফেলা অজগর সাপটা বেড়াল হয়ে উত্তেজিত জনতার মাঝখান দিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল বাইরে। 

তা না হয় গেল, কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি এবার কী করব? একটা গোটা ডাক্তারকে গিলে খেয়ে ফেলেছি! এভাবে কেউ নিজের বারোটা বাজায়? ডাক্তার আমাকে ভালো করে দেবে বলেছিল। তার চেয়েও বড় কথা, একটা জলজ্যান্ত লোককে আমি গিলে খেয়ে বসে আছি! এ কী রোগ হল আমার? আমাকে নিয়ে আমি কোথায় যাই?

প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *