তপোপ্রিয়

সকালের রোদ পাখায়

ছোটবেলার অনেক আনন্দ আজ হারিয়ে গেছে। 

মনে করতে গিয়ে দেখি, এমন সব তুচ্ছ বিষয় ছিল যা খুব সহজেই আমাকে আনন্দে রাখতে পারতো। বিষয়গুলি তুচ্ছ এখনকার দৃষ্টিভঙ্গিতে, কিন্তু একসময় এদের মনে হতো মহা মূল্যবান। আজও যদি ছোটবেলার মানসিকতা আমার মধ্যে থেকে যেত তাহলে আনন্দে থাকার উপকরণ গুলির কোন অভাব থাকত না। বর্তমানে আমার আয়ত্তে সেই সব জিনিস সহজেই পেতে পারি ছোটবেলায় যারা একান্ত ভাবে নাগালের বাইরে ছিল। মজার কথা এই যে ছোটবেলাতে অনেক কিছুকেই অবহেলা করতাম যাদের এখন পেলে নিজেকে ধন্য মনে হবে। 

জীবনের প্রথমদিকে তের থেকে চৌদ্দটা বছর ত্রিপুরাতে কাটিয়েছিলাম। শৈশবের সমস্তটা এবং প্রায় পুরোটা কৈশোর ওই সময়ের মধ্যে পড়ে। যতবারই বিচার করি আমার মনে হয় জীবনের এত ভালো সময় আর কখনো পাবোনা। ওই সময়ের জীবন কালে আমি দেখি শরতের তরতাজা রোদ। 

কত বন্ধু আর কত খেলা তখন আমাকে ঘিরে। অশান্তি বা অভাব ছিল কোন কোন বিষয়ে, কিন্তু এরকম হতাশা বাকরুদ্ধ করে রাখত না সর্বক্ষণ। ওই সময়ের সঙ্গী যারা ছিল তারা যে আমার ধারায় ভাবতো সবকিছু এমন নয়। তবুও তাদের সঙ্গে যেমন আনন্দ বিহার করতে পারতাম এই বয়সের সঙ্গীদের তেমনভাবে জড়াতে পারি না কিছুতেই। একটা অনতিক্রম্য ব্যবধান তৈরি হতেই থাকে। 

ছোট বয়সে সঙ্গীসাথী বাছাইয়ের ছিল না কোন বাছবিচার। একটাই বিবেচ্য বিষয় ছিল, বয়স। তবে অসম বয়সীদের সঙ্গেও ভাব জমাতে কোন অসুবিধে হতো না। আমাদের কূলোপুরহিত চিন্তাহরণ চক্রবর্তী। তার চার-পাঁচটি ছেলে আর দু-তিনজন মেয়ে। তৃতীয় ছেলে বিভূতি আমার সমবয়সী। ডাকতাম বিভু বলে। সাধু বলে আমার দূর সম্পর্কীয় দাদার দুই ছেলে শঙ্কর আর দিলীপও বয়সে আমার প্রায় কাছাকাছি। আমার এক জ্ঞাতি কাকা শশীভূষণ এর ছোট ছেলে শিবুর বয়সও একই। আমাদের বাড়ি থেকে দশ-পনেরো মিনিট হেঁটে গেলে আইনদের বাড়ি। চার-পাঁচটি পরিবার থাকে সেখানে একটি উঠোন ঘিরে। তাদের সবারই লতায়-পাতায় আত্মীয়তা। আইনদের বাড়িতে অনেক ছেলেমেয়ে। এরা ছাড়াও কাছাকাছি আরো অনেক বাড়ির অনেক ছেলে-মেয়ে আমার খেলার সঙ্গী হতো। 

প্রায় রোজই দুপুরের পর বিভু এসে হাজির হত আমাদের বাড়িতে আর মিহি গলায় ডাকত আমাকে। ওকে দেখলেই মন নেচে উঠতো। কিন্তু আটকে দিত মা। একদমই মায়ের পছন্দ ছিল না বিভুকে। প্রায় দিনই ওকে চলে যেতে বলতো। আরো সঙ্গীরা আসতো আমাকে ডাকতে, কাউকেই মা আমল দিত না। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে দিদিও পছন্দ করত না এইসব সঙ্গীসাথীদের। আড়ালে মা বলতো, এদের কারোর সঙ্গেই আমার মেশা বা ঘনিষ্ঠতা করা উচিত নয়। কেন বুঝতাম না। শাসনের গলায় আড়ালে মা কারণটা বোঝাবার চেষ্টা করলেও মাথায় ঢুকতো না। এত এত সমবয়সীরা সারাদিন খেলে বেড়াচ্ছে, বনেবাদাড়ে ঘোরাঘুরি করছে, কেবল আমার বেলাতে কেন এমন নিষেধাজ্ঞা? আমি প্রচুর রাগারাগি জেদাজেদি করতাম, প্রবল অশান্তি বেঁধে যেত। শেষ পর্যন্ত কোন কোন দিন অনুমতি পেতাম, তবে শর্তসাপেক্ষে। আর লুকিয়ে চুরিয়ে যাওয়াটা তো ছিলই। ধরাও পড়তাম অনেক সময়। 

এক বিকেলের কথা। শুকনো বাঁশ পাতা বিছানো মন্থর ঢালে নেমে গেছে পথ কুয়োতলার দিকে। সেই পথের হেলানো দু’ধারে বড়-ছোট গাছপালা, ঝোপজঙ্গল আর বাঁশঝাড়। লাল মাটির ওই নেমে যাওয়া এবড়ো-খেবড়ো পথের একধারে বৃষ্টি ধারার নির্গম নালা। কুয়োতলা ঘিরে আবার বেশ কয়েকটি পেয়ারা গাছের ভিড়। একটি পেয়ারা গাছের কান্ডশরীর মাটিতে শুয়ে, ডালপালা উঠে গেছে ওপর দিকে। সেই কুয়োতলার চাতালটির একদিকে দুর্গম বুনো ঝোপ জঙ্গল, অসমানটিলার গা বেয়ে। মাঝখানে একটা ঝোপড়ানো গাব গাছ, রাতবিরেতে অনেকেই নাকি ওই গাছে অস্বাভাবিক উপস্থিতি দেখেছিল। 

কুয়োতলার চাতাল থেকে কয়েক ধাপ নিচে সবুজ ঘাসে ছাওয়া অপরিসর অথচ টানা এক সমতল ভূমি। তার আরেক ধাপ নিচে গায়ে জলচিন্ন নিয়ে আরেকটু নিচু জমির পর সুবিশাল ডাকমা জলা। সেই বিকেলে আমাদের ওই কুয়োতলার পাশে নিরিবিলি আমেজে শুয়ে থাকা ভিজে ভিজে সমতলভূমিটাতে আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম। ছেলে মেয়ে মিলিয়ে দশ-পনেরো জন তো হবেই। বুনো গাছের ডাল ভেঙে হৈ হৈ করে সবাই মিলে ঘাসের জমিটাতে দাগ কেটে কেটে দাড়িয়াবান্ধা খেলার ঘর বানানো হলো। কাজ এতোটুকু তো হল্লা চার গুণ। বহু বাদানুবাদ, চেঁচামেচি করে দল তৈরি হলো। এসব করতে করতেই বিকেল শেষের পথে। এবার খেলা শুরু হবে। উৎসাহে সবাই টকবক করে ফুটছি। খেলা ঠিক শুরু হতে যাওয়ার মুখে মা আর দিদি এসে হাজির ঘটনাস্থলে। এক কথায় আমার খেলা বন্ধ করে দিল। বকেঝোকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে চলল। আমিও যাবো না কিছুতেই। খেলবোই। আমার হয়ে অনেকে ওকালতিও করল। কিন্তু কোন লাভ হলো না। সেদিন যে কী ভীষণ হতাশ হয়ে ছিলাম তার উপলব্ধি আজও স্পষ্ট মনে আছে।

ফুটবল ছিল একটা অধরা সম্পদ। বাড়ির সামনে অবলীলায় বিছিয়ে থাকা সদ্য ফসলকাটা মাঠে একটু বড়বয়সী ছেলেরা ফুটবল খেলতো। তাদের দলে দু-একবার সুযোগ পেতাম হয়তো এক-আধটু সামিল হওয়ার। আমাদের ছিল রবারের তৈরি লাল বল। তাতে আসল ফুটবলের আভিজাত্য কোথায়? ওই নিয়েই বাড়ির উঠোনে বা ঘাস জমিতে চলত আমাদের রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা। রবারের বল মাঝেমধ্যেই ফেঁসে যেত। আমার জন্য আবার ছিল মায়ের রক্তচক্ষু। এত প্রতিবন্ধকতার পরও ফুটবল ছিল অদম্য উন্মাদনা। 

বিভূতি আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। একটা চামড়ার তৈরি আসল ফুটবল কি পেতে পারি না? পেলে তো আমরা সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। দেখিনা চেষ্টা করে যদি পাওয়া যায়। বিভু স্বপ্ন দেখিয়েছিল, বিভুই আবার স্বপ্নভঙ্গ করলো। চামড়ার আসল ফুটবল কেনার প্রশ্নই ওঠে না। দাম যে অনেক। পাট ক্ষেতের ধারে ঘাস বিছানো আলপথে বা পুকুর ধারে মাটির ওপর জেগে থাকা আম গাছের বেখাপ্পা শিকড়ে কিংবা বড় রাস্তার ধারে মুকুট সদৃশ্য সবুজ সবুজ ঢিবিতে বসে চলতো আমাদের জল্পনা-কল্পনা। পাঁচ নম্বর, চার নম্বর ইত্যাদি নানা মাপের হয় ফুটবল। ছোট মাপের যেমন তেমন একটা হলেও হবে। কিন্তু তার দামও তো চল্লিশ টাকার কম নয়। কোন জন্মে কি চল্লিশ টাকা হাতে আসবে আমাদের? আমার কাছে সব মিলিয়ে দু-আড়াই টাকা হবে কিনা সন্দেহ, বিভূতির কাছে তাও নেই। চল্লিশ টাকা কবে জমবে? ভেবে ভেবে কাটতো সারা দিন, রাতেও ঘুম হতো না। যদি কোনক্রমে চল্লিশ টাকা পেয়ে যায় আর কিনে ফেলতে পারি একটা আসল ফুটবল তো পৃথিবী চলে আসবে হাতের মুঠোয়। সেই বিশেষ দিনটাকে যে কত বর্ণে কত বৈচিত্র্যে সাজাতাম তখন! হতাশা আর উন্মাদনার এক মিশ্র মেলবন্ধন নেশাগ্রস্ত করে রাখতো। ক্রমে একদিন ফিকে হয়ে গেল সেই মাতামাতি। স্বপ্নপূরণ ঘটলো না। চল্লিশ টাকা একটা বিরাট অংক। কত টাকা জীবনে কোনদিন হাতে পাবো বলে ভাবতেই পারতাম না। বড়লোক কাকে বলে বুঝতাম না। তারাও কি যখন তখন চল্লিশ টাকা হাতে পায়? কিছুদিন উথাল-পাতাল ভেবে বুঝলাম যে কোন অবস্থাতেই আমাদের পক্ষে কতগুলি টাকা জীবদ্দশায় পাওয়া সম্ভব নয়।

মায়ের কাছে চাইবো কিনা ভাবলাম। বিভুর সাহস নেই তার বাবার কাছে চাওয়ার। চাইলেও তার বাবার সাধ্য ছিল কি? পুরুতগিরি করে কোনক্রমে সংসার চালায় চিন্তাহরণ চক্রবর্তী। অতগুলি ছেলে মেয়ে। দুবেলা খাবার জোটাতেই প্রাণান্ত। বিভূতি প্যান্টের পকেটে রাখে কাঁঠালের পোড়া বিচি। খিদে পেলে খায়। ওটা এলাকায় প্রায় সবারই জনপ্রিয় টিফিন। আর পোড়া রাঙা আলু। জন্মভূমি ছেড়ে উৎখাত হয়ে আসা মানুষগুলি এমনই সব বিকল্প জীবন ধারণের উপায় এর সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই জঙ্গোলাকীর্ণ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি জীবনকে অস্বীকার না করলেও অর্থ উপার্জন অসম্ভব করে রেখেছে। 

আমার যদি বাবা বেঁচে থাকতো তো অত চিন্তা ছিল না। বাবার নিশ্চয় ক্ষমতা থাকতো। কিন্তু মায়ের কাছে কি চাওয়া যায়? উদয়স্ত মাকে কী পরিমাণ খাটতে হয় দেখতাম। মাসে মাসে একশ-দেড়শ টাকা পেতেই হত মাকে। দাদাকে হোস্টেলে রেখে পড়াবার খরচ। জমির ধান, গরুর দুধ, মাছ, ডিম অবশ্য কিনতে হতো না। তবে তেল, ডাল, নুন, চিনি, আলু-পেঁয়াজ-সবজি সব বাজার থেকেই আসতো। তার জন্য নগদ টাকা লাগতো। সেই নগদ টাকা কি সহজে পাওয়া যেত? কটা বাঁশের দাম এক টাকা বা দেড় টাকা, মাসে পাঁচটা ছটা বাঁশ বিক্রি হতো কিনা সন্দেহ। পঞ্চাশ-ষাটখানা গাছ আমাদের বিশাল কাঁঠাল বাগানে। ইজারা দিয়ে বছরে পাওয়া যেত দু-তিনশ টাকা। এক মণ ধান কুড়ি-পঁচিশ টাকা। খাওয়ার জন্য রেখে বিক্রি করা যেত বছরে কুড়ি থেকে ত্রিশমণ ধান। এজমালি পুকুর ছাড়াও কয়েকটি ডোবা ছিল ডাকমা জলার ধান জমিতে। ইজারা দিয়ে বছরে পাওয়া যেত দু-চারশ টাকা।

ওসব কথাই বুঝিয়েছিল মা আমাকে। বিষণ্ণ গলায় জানিয়েছিল যে টাকা রোজগার করতে গায়ের রক্ত জল হয়ে যায়। আমি আসলে উপায়ান্তর হয়ে ফুটবল কেনার জন্য চল্লিশ টাকা চেয়েছিলাম মায়ের কাছে। কিন্তু যে নির্মম যুক্তিগুলি মা শুনিয়ে ছিল তারপর নিজের ইচ্ছেটাকে অবান্তর বলে মনে হয়েছিল। 

রবারের লাল ফুটবলে বা মন্দ কী? তাছাড়া বাতাবি লেবু দিয়েও তো ফুটবল খেলা যায়। আর না হয় পাটের দড়ি গোল্লা পাকিয়ে নিলেও তো দিব্বি চলে। মা বলেছিল, 

‘জগতে কিছুর জন্যই কিছু আটকায় না রে বাবা।’

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *