পাঠক মিত্র

বিষণ্ণ বর্ণমালার নেপথ্যে

সমাজ ও মানুষের জীবনযাপনের ছবি সাহিত্যের পাতায় স্থান পায় । এ কথা নতুন কিছু নয়। তাই ‘সাহিত্য সমাজের দর্পণ’ কথাটির ব্যাখ্যা নতুন করে বলার আর অপেক্ষা রাখে না। মানুষের জীবনযাপনের দুঃখ-কষ্ট,  আনন্দ সাহিত্যের রসে এমনভাবে কাহিনীকার পরিবেশন করেন যা পাঠককে শুধু মুগ্ধ করে না পাঠকের ভাবনাকেও বহুক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। সাহিত্যসৃষ্টির এমন উদাহরণ একনিষ্ঠ পাঠক মাত্রই জানেন। সাহিত্যের সমাজ দর্পণের সার্থকতা এখানেই। তবে এই সমাজ দর্পণে মানুষের জীবনযাপনের টানাপোড়েনের ছবির বর্ণনা কেবল শেষ কথা হয়ে থাকে না, সেই টানাপোড়েনে সামাজিক উৎস যদি ধরা না পড়ে। যে উৎস স্রোতে সময়ের সাথে সমাজের তথাকথিত প্রতিফলন ঘটে। আর তা যদি সাহিত্য সৃষ্টির দর্পণ হয়, তাহলে সেই সৃষ্টি পাঠকের কাছে অন্যমাত্রায় হাজির হয়।

এমনই এক সৃষ্টি ‘বিষণ্ণ বর্ণমালা’ । মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তনে উঠে আসে সময় পরিবর্তনের ছবি। যে পরিবর্তনে শুধু মানুষের জীপনযাপন নয় মননও পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। যারা পরিবর্তনের স্রোতে অতি অনায়াসে ভেসে যেতে পারে তাদের বিষণ্ণতা সহজে গ্রাস করতে পারে না। আর যারা এমন পরিবর্তনে সামাজিক-মনন ধ্বংসের পথে অগ্রসরের দিকে ইঙ্গিতের পূর্বাভাস উপলব্ধ করতে পারে তারা বিষণ্ণতা একেবারেই এড়িয়ে যেতে পারে না। সেই বিষন্নতা বর্ণের বিন্যাসে গড়ে উঠেছে চলমান সমাজের পরিবর্তনশীল মনন-চিত্র ‘বিষণ্ণ বর্ণমালা’। বিষণ্ণ মানুষের বর্ণমালা কিংবা জীবনের বর্ণমালাজুড়ে বিষণ্ণতা যাই বলিনা কেন চলমান সমাজের বর্ণমালায় বিষণ্ণ পরিবর্তিত মনন। যে বিষণ্ণতায় ব্যক্তিস্বার্থ সমাজস্বার্থের উপর স্থান পেতে চায়, যেখানে সম্পর্কের আবেগ-অনুভূতি মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কেবল অর্থনৈতিক সত্তার বিচারে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে যায়। আর এই পরিবেশ তৈরি হয় যখন গ্রামীণ অর্থনীতি তার গ্রাম্য কৌলিণ্য হারায়। গ্রামীণ মানুষের আর্থিক-স্বাচ্ছল্য নগরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। আর নগরকেন্দ্রিক জীবন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার শিকারে পরিণত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দৈনিক মজুর তার শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। আর একশ্রেণীর লড়াই শুধু আর্থিক আভিজাত্যের লড়াই। এই পরিস্থিতি শুধু কি চলমান ব্যবস্থায় মানুষই দায়ী ? অভাবী সংসারে স্বাচ্ছল্য থাকে না তার উপযুক্ত আয়ের অভাবে। সে চাষী, শ্রমিক থেকে অন্যান্য নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবার সবার ক্ষেত্রে একই। কিন্তু উপযুক্ত আয়ের জন্য সমাজে যে সুযোগ থাকা প্রয়োজন তা যদি না থাকে তাহলে তার দায় কি মানুষের ? মানুষের দায় নিয়ে দায়সারা কথা হতে পারে। কিন্তু সমাজব্যবস্থার যে দায় থাকতে পারে তা নিয়ে সাধারণ মানুষ সাধারণত বিচলিত হয় না। অথচ টিকে থাকার লড়াই নিয়ে বিচলিত সকলেই। যা গ্রাম অতিক্রম করে শহর, শহর অতিক্রম করে দেশ, এমনকি দেশের সীমা অতিক্রম করে। এই ব্যবস্থায় শ্রমিক পরিযায়ী হয়েছে, মেধা পরিযায়ী হয়েছে। কখনো মেধা পরিযায়ী যাত্রা থেকে আর শিকড়ের টানে ফিরে আসে না। শিকড়ের অনুভূতি এদের কাছে ফিকে হয়ে যায় সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরচূড়া স্পর্শ করার লক্ষ্যে। এদের কাছে অর্থের মূল্যেই সবকিছুর হিসেব। এমনকি এই মূল্যেই তাদের কাছে সম্পর্কের হিসেব। এমনই পরিস্থিতির জন্য মানুষই দায়ী নাকি তার সমাজ ? চলমান সমাজে মানুষের মননের এই চিত্র সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়। যে ব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাপনের, মনন ও মূল্যবোধের পরিবর্তন সহজে ধরা যায়, কিন্তু ব্যবস্থাটি সাধারণ মানুষ সহজে অনুধাবন করতে পারে না। আর সেই ব্যবস্থাই যে এই পরিবর্তনের মূল কারণ তা বিশেষ রাজনীতির বিষয় হলেও সাহিত্যের বিষয়ে সাধারণত প্রতিফলিত হয় না। এই ব্যবস্থার সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাজনীতি আর রাষ্ট্রের। এই ব্যবস্থাই আজ রাষ্ট্রের রাজনীতি কিংবা রাজনীতির রাষ্ট্র। যে ব্যবস্থা মানুষের মননকে আবেগহীন করে তুলছে, সমাজস্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে । এই ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার কথা বামপন্থাদের কথায় কেবলই পাওয়া যায়। এমনই বিষয় চরিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে কথাকার অমিয়কুমার জানা’র সৃষ্টি ‘বিষণ্ণ বর্ণমালা’। পুঁজিবাদ ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ করে কথাকার দেখিয়েছেন তাঁর কাহিনীর প্রধান চরিত্র কেমন করে আবেগহীন সম্পর্কে নিজেকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

পাঁচটি মূল চরিত্রের বর্ণমালায় এই উপন্যাসিকা। প্রধান চরিত্র ঋতব্রত ছাড়া তার বাবা-মা অভ্রনীল ও অনুপমা, ঋতব্রতর প্রতিবেশী বন্ধু সমীকরণ আর চালচুলোহীন ভোলা পাগলা। ভোলার আচরণে পাগলামি থাকলেও তার কথায় সমাজের সংকট ঘনিয়ে আসার কথা থাকে। কেউ বুঝুক না বুঝুক সে বলে যায় তা, আর সবাইকে সাবধান করে দিতে চায়। অভ্রনীল গ্রামে নিজের মা-বাবা ভাইবোন সহ পরিবারকে স্বচ্ছল রাখার লক্ষ্যে শহরে স্থানান্তরিত হয়। শহরে নিজের পরিশ্রম ও মেধায় স্বচ্ছলতার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। তবুও শিকড়ের টান থেকে বিচ্যুত হয়নি। কিন্তু অনুপমার উপস্থিতিতে তার সব পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত অকেজো হয়ে যায়। ঠিক এই পরিবেশে স্বার্থপরের পথে এগিয়ে দিতে মেধাবী ঋতব্রতর মায়ের ভূমিকাই শেষ কথা। মেধাবী সন্তানের অগ্রগতি শিকড় ছুঁয়ে থাকবে সেই আশাই অভ্রনীলের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব আশাই শেষ হয়ে তার। অথচ সমীরণ সাধারণ পরিবেশে বেড়ে উঠেও সে সমাজস্বার্থ কে বিসর্জন দিতে পারেনি। এটাই অভ্রনীলের আশা ছিল। কিন্তু ঋতব্রত তার অর্থের মূল্যে মা-বাবার সুখ কে তাদের অনুমতি ছাড়াই বৃদ্ধাশ্রমে আটকে দিতে কুন্ঠিত হয়নি। বৃদ্ধাশ্রম থেকে অবশেষে অভ্রনীল নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। 

এই চরিত্রের কাহিনী বিন্যাসে কথাকার তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের কথোপকথনে দেখিয়েছেন পুঁজিবাদ ব্যবস্থায় ঋতব্রতর মত ছেলেরা দেশ থেকে কেমন করে হারিয়ে যায়। তার বাবা হারিয়ে যায় সন্তানের মনুষ্যত্বহীনতার জন্য। এটাই এই ব্যবস্থার উপসংহার। তবে আশার আলো সমীরণের মত ছেলেরা দিতে পারে বলেই কথাকারের বর্ণমালায় এমন চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। যার কাছে ব্যক্তিস্বার্থের উপরে সমাজস্বার্থ স্থান পায়। মানুষের জীবনের বর্ণমালা থেকে বিষণ্ণতা মুছে দিতে যার ভাবনা কাজ করে।

সরাসরি সাহিত্যে সমাজের ক্ষয়িষ্ণুতায় পুঁজিবাদের উপস্থিতি নিয়ে ছুঁৎমার্গ থাকতে পারে। তবে কাহিনী বিন্যাসে কথাকারের উপস্থাপনা এক আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে। বিন্যাসের গতিময়তার ছন্দ আরো নিবিড় হলে আলাদাভাবে গঠনশৈলীর প্রশংসার দাবি রাখতে পারত। তবে সামগ্রিকভাবে এই উপন্যাসিকা পাঠকের ভাবনায় রেখাপাত করবে। 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

 বিষণ্ণ বর্ণমালা

–অমিয় কুমার জানা

নিউ পাবলিশিং কনসার্ট

কলকাতা–৯ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *