কুন্তল দাশগুপ্ত

প্রথম পর্ব

১.

শোনো বীতশোক, তুমি অনাহুত তা জানি, জানি তোমার অনিবার্য গতায়াত, কিন্তু তুমি ভুলেও আমার ঘরে এসো না। তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। আমি দু’হাতে আপন-পোড়া ছাই মেখে পাঁকাল-বাজার ধরতে চাইছি, যাতে নিজের মাংস কেটে বিক্রি করতে পারি। তোমার আশ্চর্য মলমের কারবার ফেঁদে বসলে না কোনোদিন! সবাইকে ইচ্ছেমতো মলম লাগিয়ে বেড়াও, অথচ… 

যাগ্গে, আমার-ছাই মাখা হাতে বাজার ধরতে পারছি না বটে তবে নাছোড় চেষ্টায় ছুটে চলেছি। আমার ফুসফুস ফেটে পড়ছে, হৃৎপিণ্ড তুমুলতার শীর্ষ ছুঁয়েছে, অস্থিসন্ধিগুলো গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে, শিরদাঁড়া ‌ঋজুতা হারিয়ে অনুভূমিক— হাঁটু ভেঙে প’ড়ে জান্তব হামাগুড়ি দিতে দিতে হাঁটু খুইয়ে হয়ে উঠছি ক্রমশ সরীসৃপ। 

আমার চোখের সামনে রুমালগুলো সব বিড়াল হয়ে গেল। তাদের কপিশ চোখ থেকে লালা ঝরতে ঝরতে চিটচিটে সমুদ্দুর। আমি বুকে হেঁটে হেঁটে যত ওপরে উঠছি তত বেড়ে চলেছে পতন সম্ভাবনা। আমার আকাশ ছোঁয়ার নেশা লেগেছে। আমি জানছি কিন্তু কিছুতেই স্বীকার করছি না আমার নিরালম্বতা। চোখের সামনে পুকুর, বন, পাহাড় সব চুরি যাচ্ছে। আমি বহুতলের সোনা বাঁধানো টয়লেটে বুক ঘসছি। সবাই অপরূপ হতে হুড়োহুড়ি করছে। বর্ণমালা লোপাট হয়ে বিবর্ণে ধ্বনিমালা গাঁথার অসুখ মহামারী হয়ে দখল নিচ্ছে মগজ। আমি টয়লেটের মার্বেল মেঝে খুঁড়ে মাটি তুলে আনতে গিয়ে রক্তাক্ত হচ্ছিলুম। 

জানো বীতশোক, আমার রক্ত-ভেজা চোখে ভেসে উঠল সেই মা-টির বাসন্তী বাহার যার হাসি-রোদ আমার ছুট-আকাশ ধুয়ে দিত। এই গতায়মান এপ্রিলে পাচ্ছি সেই চাহনি, যা না পড়লে কথাফুল ফুটতো না ভিতরের বাগানে। এখন তাকে তাই চোখে চোখে রাখি। দেখতে পাচ্ছি— তার শ্রীমণ্ডিত গ্রীবা, সবজে রঙা জংলা ছাপ শাড়ি, আশ্রয় মুদ্রা কিন্তু না ফেরার নৌকায় চলে যেতে যেতে আমার জন্যে শুধু রেখে গেল লবণ-জল… এই গতায়মান এপ্রিল আমাকে ব’লে যাচ্ছে মা-টি কাঁদছে: কিন্তু স্বীকার করছে না। আমি তার দুঃখ বুকে ক’রে পেরোতে চাই বাঁধের রাস্তা। তার অদৃশ্য অশ্রু আমার মরুঠোঁটে শুষে নিতে চাই। আমি বেশ বুঝতে পারছি তুমি তার কাছে গিয়েছিলে। তোমার আশ্চর্য মলম তাকে দিয়েছো। দয়া করো বীতশোক— তুমি ভুলে যাও আমাকে। আমাকে ভোর হতে দাও… 

চলে যাও বীতশোক… চলে যাও… যাও।

.

২.

অ্যায়…যাসনি সাপ আচে।

এমনিতেই সবকটা কেঁচো তার ওপরে পাড়াটে ধমকিতে কেন্নো হয়ে গেল মুহূর্তে। আট চোরা চোখে চোখে কথা খেলে যেতেই ধমকদারের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি কান ছুঁয়ে গেল— যাক বিটলে চারটে ভয়ে দৌড় দিয়েছে। টিপিনবেলা ইস্কুলের মাটে যত পারিস লাপাগে কারো কিচু বলার নেই। তা নয় ঝোপ হাঁটকানো। কবে কোনটাকে সাপে কাটে এইটেই ভয়। 

ধমকদার পিছু পিছু এলে দেখতে পেত চার জোড়া খালি পা বাঁধের রাস্তা থেকে নেমে পড়েছে ধান ক্ষেতে। চার জোড়া জুতো বাঁধের রাস্তার ধুলো মেখে টিফিন-টাইম শেষের ঘন্টা শোনার প্রতীক্ষায় পড়ে থাকে।

ঐ আল ধরে চ। সব থেকে সামনে থাকা সাড়ে তিন ফুটির কথা মান্য করে সকলে। 

মাটির দুধ খেইচিস বুবু? এই বুবুকে আশ্চর্য করতে সকলেই ভারি মজা পায়। বুবু আসলে বুবুন। ভর্তি হবার দিনেই সহপাঠিরা ‘ন’ বাদ দিয়ে বুবু ক’রে নিয়েছে। ও খুব সরল, সোজা কথায় বোকাসোকা। পালের গোদাটি মিহির। সেও ‘র’ বাদ দিয়ে মিহি হয়ে সর্বাগ্রে বিরাজ করছেন। 

ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ নাচিয়ে মিহির বলল— কী রে খাসনি তো? বুবুন ঘাড় নেড়ে না জানাতেই সকলে হি হি ক’রে হেসে উঠল। খুব লজ্জা করছিল বুবুনের। তার সহপাঠিরা যার স্বাদ নিয়েছে সে বিষয়ে সে জানেই না! নিজের অজ্ঞানতায় নিজের ওপর বিরক্ত হল বুবুন। 

আজ তোকে মাটির দুধ খাওয়াতেই নে এলুম— মিহিরের মুখে এমন একটা ভাব যেন বুবুনকে ও একটা রূপকথার দেশে নিয়ে চলেছে। মাটির দুধ! কেমন স্বাদ তার? কারা কীভাবে দোয়? তার বাড়িতে গরু আছে। মাসী দোয়। কারা মাটি দোয়? কৌতুহল চাপতে না পেরে বুবুন জিজ্ঞেস ক’রে ফেলে— মাটির দুধ কে দোয় রে? আবার হেসে ওঠে সবাই। বুবুন বোঝে তার বোকামিতে হাসছে ওরা। মিহির আঙুল দেখিয়ে বলে— ঐ ওরা। মিহিরের আঙুল নির্দেশ করছে মাঠে নিড়োচ্ছে যে চাষীরা তাদের দিকে দেখে বুবুনের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। পেছন থেকে বিভু বলে— ঐ মিহি, ক্যানো বুবুকে ওরম কচ্চিস। চ ক্ষেতে নামি। ও গুপীকাকা আমরা কজনে দুদ খেতে এইচি গো। 

লুঙ্গি গুড়িয়ে প্রায় কুঁচকি অব্দি তোলা, মাথায় গামছা জড়ানো গুপি কাকা যেন ভুস করে সবুজ সমুদ্দুর থেকে মাথা তুলল বলে মনে হল বুবুনের। জলা। সবুজ সাগর মনে মনে নাম দিয়েছে বুবুন। রোজ বাঁধের রাস্তা ধরে স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় রাস্তার দু-পাশারি এই জলা বুবুনের হাতছানি দেয়। ডুব দিতে ডাকে সবুজের ভিতর। আবার সবুজের হাতছানি ক্রমে সোনালী হয়ে যেন দুহাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে। খুব খুব ইচ্ছে করে বুবুনের ছুটে যেতে, সারা গায়ে মেখে নিতে জলার আমেজ। জন্ম ভীতু সে। কানে বাজতে থাকে বড়মার স্বর— জলার তালগাছে একানড়ে থাকে। সে ছোট ছেলেদের কান কেটে নেয়। খবদ্দার জলায় নাববি না। 

সেই জলায় আজ সে এসেছে। সামনে মিহি, পেছনে শাবন, শাবনের পেছনে বিভু। নাঃ ভয় করছে না। অনেকদিনের সাধ পুরণের আনন্দে ভরপুর বুবুনের কানে কই বেজে ওঠেনি তো বড়মার গলা! 

বুজে খেয়ো বাবারা। গলায় ঝ্যানো খোসা আটকায়নি। গুপি কাকার কথায় চটকা ভাঙে বুবুনের। খোসা! দুধে খোসা! ব্যাপারটা কী? ততক্ষণে চারজনের দলটা নেমে পড়েছে ভুরভুরে কাদা মাটির ক্ষেতে। বুবুনের পা পুঁতে গেল গোছ অব্দি। শাবন পেছন থেকে না জড়িয়ে ধরলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত। 

ঐ মিহি বুবু ক্ষেত ঠেলতে পারবে না রে। ওব্যেস নেই তো। ও পুঁতে গেচে। 

পিছন থেকে বিভু বলে ওঠে — তুই ওকে জইরে ধত্থাক আমি এগ্গে যাই। তোদের দুজনের জন্যে দুমুটো নেসচি। চুক্করে ডাঁরা। কাদা ঠেলে এগোয় বিভু। 

ছড়া বাঁচচে তুলো বাবারা— চেয়ে কথাটুকু বলে গুপী কাকা ডুব দেয় সবুজ সাগরে। বুবুনের খুব ইচ্ছে করে গুপী কাকার সঙ্গে ঐরম ডুবে ডুবে নিড়োবে। আপাতত তা হচ্ছে না। শাবন চেপে ধ’রে আছে তাকে।

একবেরে নড়বিনি। চুক্করে দাঁড়া। শাবন ধমকায়। 

এদিকে বুবুনের বুক ফেটে যাচ্ছে কৌতুহলে। মুঠো ভরে দুধ আনবে বিভু আর মিহি? সামনে ওদের দেখাও তো যাচ্ছে না। পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে ওরা।

আচ্ছা বুবু বলতো বাপ কাক গুনোর সবচেয়ে দুক্খু কী?

জানি না। একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দেয় বুবুন। এটা ইয়ার্কি মারার সময়? বলে— ছাড় দেখি। এতো চেপে ধরেছিস দম নিতে পারছি না। হেসে গড়িয়ে পড়ে শাবন। ছেড়ে দেয়। বলে—  আমি তাইলে হাওয়া ধত্তে পারি বল?

কথাটা আর এগোয় না কারণ মিহির আর বিভুকে দুহাত মুঠো করে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।

নে তোরা হাত পাত, বিভুর কথায় হাত পাতে বুবুন শাবনও। মিহির বুবুনের হাতে মুঠো উপুর করলে বুবুন হতবাক। দুধ কই? এতো ধান, একদম কচি— সবুজ। মাটির দুধ কই? জিজ্ঞেস করে বুবুন।

ওর মোদ্দে আচে। মুকে ফেলে চিবো। কথাটা শুনে ঘাড় ঘুড়িয়ে শাবনের দিকে চায় বুবুন। চোখ বুজে শাবন ততক্ষণে চিবোতে শুরু করেছে। ওর দুই কষে দুধের দাগ। মুখে কী সুখ কী সুখ!

নে বুবু মুকে পুরে চিবো— মিহিরের কথা শেষ হবার আগেই বুবুন মুখে পুরে ফেলেছে মুঠো ভর কচি সবুজ ধান। আ-আ-আ-আঃ কী মিষ্টি! মুখ ভরে উঠল মিষ্টি রসে। কচি ধানের সাদা মিষ্টি রস দুধের বাড়া।

কি রে বুবু কেমন লাগছে মাটির দুদের টেস। শাবনের কথার উত্তর দিল না বুবুন। সে প্রাণ ভরে শুষে নিচ্ছিল মাটিদুধের স্বাদ।

ছিবড়েটা ফেলে দিবি বুবু। এখন চ ইস্কুলে। ঘন্টা পড়ার আগে হাত-ধুয়ে নে গেলে উঁমম্। শাবন ঘুঁসি দেখায়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর ক’রে রাস্তায় উঠে চারজনে জুতো হাতে দৌড় দেয়… 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

দ্বিতীয় পর্ব

৩. লুকোচুরি

– ও মা… কে বলে মলিন! নতমুখী কাজরী মাথা নামিয়ে রেখেই চোখ তুলল। প্রৌঢ়া। মাথায় নুন-মরিচ কদম-ছাঁট। পাকা চাঁপা কলার মত সোনালী-ফর্সা। মুখ তুলল কাজরী। ততক্ষণে প্রৌঢ়ার কথায় হাসির ঢেউ উঠেছে ঘরে। চোখাচোখি হতেই ‘মম’-এর ‘সালভাদর’-এ পড়া কেয়ারফ্রি-আইজ-এর খোঁজ এতদিনে পেয়ে গেল সে। মনে মনে বলল সুন্দরী।

ও ঠাগমা… চিকন স্বর, সুরেলা… গান শেখে? যদি শেখে তবে… মনের আন্দোলন চাপা পড়ে যায়… ডে লাইটের আলোয় তোমার চোকে ধাঁদা নেগেছে কাল দিনের আলোয় দেকো বুজতে পারবে… দপ করে নিভে গেল মগজে জ্বলে ওঠা ক্ষীণ শিখাটি… এ কী অমার্জিত ভাষা-ভঙ্গি! আবাল্য শহর-বাসে অভ্যস্ত শ্রবণ অযুত ঝিঁঝিঁ ডাকে রূদ্ধ হয়ে পড়ল কাজরীর, জলে ভরে এল চোখ

 কতবার বলেছি এগুলো পেট্রোম্যাক্স তাও সেই ডে-লাইট বললি? ভিড় থেকে ব্যারিটোন। কেমন শিহর জাগল। বুজে এল চোখ। মরা ক্যানভাসে 1950-এর আমহার্স্ট স্ট্রিট। বাদুর ঝোলা অন্ধকার ঘর ক্লান্ত ব্যারিটোন প্রত্যাশী। দাদা। অকূলের কূল। শরীরটা কেমন অস্থির লাগে কাজরীর। 

 তোরা থাম বাপু। এই মেয়ে জোরে জোরে হাওয়া কর। ভির পাতলা কর তো একটু… নতুন বৌ কেমন ঘামছে দেখেছিস। তোদের রঙ্গ পরে করিস বাপু। প্রৌঢ়ার অভিজ্ঞ অনুভূতির পায়ে অদৃশ্য প্রণাম জানিয়ে চোখে এক পৃথিবী কৃতজ্ঞতা ভরে মুখ তুলে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল কাজরী। হ্যাঁ চাইলই— বাৎসল্য। কেয়ার ফ্রি আই যুগলে ঝিকমিক করছে হাসি। পাশে রাখা রেকাবি থেকে ধান-দূর্বা নিয়ে আশির্বাদ করে কাজরির হাতে ছোট্ট একটা বাক্স দিয়ে বললেন— নাক বিঁধিয়ে নিও বৌমা। কাজরী জবাব লুকোলো শরীরী মুদ্রায়। সে বুঝে গেছে এমন লুকোচুরি খেলে যেতে হবে তাকে পরবর্তী কত বছর কে জানে।

প্রথার নির্মন গণ-মান্যতা থেকে রেহাই পেতে পেতে সাত-সন্ধে। ঘর পেল কাজরী, পেল পোশাক পাল্টানো পরিসর। দ্রুত দ্রষ্টব্যের কর্কশতা থেকে নিজেকে কেড়ে এনে নগ্ন তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে একটা পিতলের জগ, পাশে উপুর ক’রে রাখা কাঁসার গ্লাস। এই হ্যারিকেন আলো-ছায়াতেও ঝকঝক করছে। পরপর দু’গ্লাস জল মরুভূমির মত শুষে নিয়ে নিজেকে বিছিয়ে দিল সে তক্তপোষের বিছানায়। ঘাম প্রতিটি রোম-কূপ থেকে বার করে আনছিল দেহ-মনের তপ্ততার প্রতিষেধক। বেশ কিছুক্ষণ গলগল করে ঘামার পর কাজরীর শরীর ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে শুরু করল। গুরুজীর কণ্ঠস্বর অধিকার করে নিল শ্রবণ— শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই-ই সয়… 

  কাজু কী খেয়ে এসেছ? কী হল মুখে কথা নেই কেন? 

আর কেন! কাজু মানে কাজরী তখন মনে মনে বলছে— হে ধরণী দ্বিধা হও।

  স্কুলে টিফিন করোনি? দু’বিনুনীর কাজু আখড়া মুখর হাসির রোল শুনতে না পেয়ে এবার মুখ তুলল। গুরুজীর দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে না জানাল। 

  কেন? 

  মা-র শরীর খারাপ রান্না করতে পারেনি। 

  সে কী! তার মানে সকাল থেকে এই বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তুমি এম্টি স্টম্যাক! হাউ হরিবল! ঐ জন্যই তোমার পেটে চাপ পড়তে অমন সশব্দে উইন্ড পাস। বুঝেছি। অশেষ… প্র‍্যাকটিস পরে হবে আগে যাও রুটি-সবজি আর একটা করে ডিম সিদ্ধ ব্যবস্থা করো। রেজিস্টার কার কাছে? দাও তো। হুঁ। অশেষ তুমি একশোটা লাল আটার রুটি, পরিমান মতো সবজী আর তিরিশ টা ফুল বয়েল্ড ডিমের অর্ডার দিয়ে এসো গবার হোটেলে। আর কাজু তুমি ম্যাট পেতে পবনমুক্তাসন করো। খাবার খেয়ে আজ ছুটি করবে দাদাকে দেখা করতে বলবে। সকলে প্র‍্যাকটিসে শুরু করো… 

কাজরীর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। গুরুজী। আচার্য বিষ্ণু চরণ ঘোষ। আপনা-আপনি দু’হাতের ঝিনুক মুদ্রা চন্দন-আঁকা কপাল ছুঁল। তক্তোপোষ থেকে নেমে এতক্ষণে আড়ষ্ট শরীরটাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার জন্য কয়েকটা ফ্রি-হ্যান্ড করে আর্চ করতে দু’পায়ে ভর রেখে শরীরটা পিছনে বেঁকিয়ে মাটি ছোঁওয়ার আগেই স্প্রিং-এর মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কাজরী। বসে পড়ে তক্তপোষে। মাথা নীচু। প্রতিটি দেহ-রেখায় ফুটে উঠতে থাকে প্রার্থিত ক্ষমা।

 ও বৌদি… বৌদি…

ছোট ননদের গলা। বেশিক্ষণ এই ব্যস্ত-বাড়ি তাকে নিজের সঙ্গে থাকতে দেবে না জানে কাজরী। হ্যারিকেন-আঁধারির নম্রতা তাকে আরামে রেখেছিল। কৃষ্ণতা তাপশোষী। জেনেছে সে। স্কুলে পড়িয়েছিলেন শ্যামবাবু স্যার কিন্তু নাঃ অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, ডাক পড়েছে পেট্রোম্যাক্সের অবাঞ্ছিত ঔজ্জ্বল্যে লুকোচুরির বেলায়। শ্বশুর-বাড়ি বুঝি সেই ঝোপ-ঝাড় যেখানে নিজেকে লুকোতে লুকোতে কবে যেন চুরি হয়ে যায় মেয়ে-মানুষের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ। হ্যারিকেনের অকম্প অথচ ম্রিয়মান আলোর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ানো কাজরী দেওয়ালে গড়ে ওঠা নিজের বিপুল ছায়ার মুখোমুখি অবস্থান থেকে ক্লান্ত স্বরে সাড়া দিল— যাই। 

  তাড়াতাড়ি নাও। কতক্ষণ লাগে তোমার চেঞ্জ করতে?

স্পষ্ট বিরক্তি ছোট ননদের  গলায়। প্রতিটি মানুষই কি “আমাকে দেখুন” শ্রেণির? মাথায় এই চিন্তাটা ভর করতেই হেসে ফেলে কাজরী। সেও কি তাই-ই নয়। নিজের ক্লান্তি, অপরিচয়ের অস্বাচ্ছন্দ্য কে সে যেমন প্রাধান্য দিচ্ছে তেমন-ই ছোট ননদও তাকে ডাকতে আসার বিরক্তিকে…

সঙ্গে আসা ট্রাঙ্ক থেকে পছন্দ ক’রে আটপৌরের নরমে নিজেকে দ্রুত জড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে এল কাজরী। নাঃ, তার জন্য কেউ অপেক্ষা ক’রে নেই। দুহাতে তোয়ালের নরমটুকু আঁকড়ে অচেনা কাঠিন্যে আঁচড় কাটতে চাইছিল কাজরী। চন্দন চর্চা ঘোচাতে তার জল আর আড়াল চাই এখন কিন্তু…

এটা বাড়ির পিছন দিক। পশ্চিম মুখো বাড়ি। পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা ঢুকে তবে উঠোন। পালকি ক’রে বড়রাস্তা থেকে তাকে আনা হয়েছে। গ্রাম ঝেঁটিয়ে বউ-ঝিরা তাকে দেখতে কাঁচা রাস্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। পালকি থেকে নামতে নামতেই সে দেখেছিল ডুবন্ত সূর্যের মুখোমুখি বাড়ির সদর। এ তবে পূব, টানা বারান্দায় দুটো পেট্রোম্যাক্স একলা। তার জন্য বরাদ্দ ঘর বারান্দার উত্তর প্রান্তে। এই ঘরের দেয়াল সংলগ্ন আরেকটা ঘর রয়েছে কিন্তু বাড়ির মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। ভেতরে বোধয় কুপি জ্বলছে। কাঁপছে আলোটা জানলার ফাঁকে। বাড়ির এই অংশ নির্জন। সময় পেরচ্ছে নীরবে নাকি অরবে অনুভব করতে চেষ্টা করে কাজরী। পায়ে পায়ে এগোয় বারান্দা থেকে নীচু কেমন যেন দুঃখী মতোন টালি ছাওয়া ঘরটার ডাকে। দরজা জাত কাঠের নয়। দরজার প্রসাধন বাহারের সুর-সাধন থেকে বহু দূরে। ব্ল্যাকজাপান নাকি আলকাতরা বুঝতে পারল না সে তবে মনটা ভারি কেমন কেমন ক’রে উঠল যেমন ক’রে উঠত পথে পড়ে থাকা আহত কুকুর ছানা দেখে, উঁচু ভেন্টিলেটার থেকে ক্লাস রুমের মেঝেতে আছড়ে পড়া কাঠবিড়লীর ছানা দেখে… ভারি সন্তর্পণে বন্ধ কালো দরজার গায়ে গাল ঠেকিয়ে রাখল কাজরী। যেন অনুমতি চাইছিল প্রবেশের। তার বোধ ছুঁয়ে দিল ঘর। আলতো ভাবে চাপ দিল সে দরজায় যেভাবে সদ্যোজাত সন্তানকে বুকে জড়ান জননী। একটু খানি মুখ দেখাল ঘর তার কালো ঘোমটা সরিয়ে। এই এই-ই তার যৌবনের উপবন… বার্ধক্যের বারানসী… ঘোমটা ফেলে সেই যজ্ঞ-গৃহ বুকে জড়িয়ে নিল কাজরীকে। বেশ কিছুক্ষণ এই ঘরের সঙ্গে অরবে কথা বলে যেতে লাগল কাজরী।

  ও নতুন বৌ তুমি ভয় পাচ্ছ?

  না তো। 

  তবে চুপটি করে এক কোণে জড়োসড়ো কেন?

  কই, এই তো তোমার বুকের ওপর মুখ রেখেছি… পাশাপাশি দুটো উনুন। একটা কয়লার একটা কাঠের জ্বালের। সুন্দর ক’রে নিকোনো। উনুন দুটিকে কোনো ভরন্ত নারীর দুধে ভরা স্তনের মত মনে হয়েছে কাজরীর। চোখ বুজে এক উনুনের গায়ে গাল ঠেকিয়ে শিশু যেমন মায়ের অপর স্তনে হাত রাখে তেমন ক’রে হাত বোলাতে বোলাতে কাজরী বিড়বিড় করছিল মা… মা… মা… মাও যেন সন্তানের এই সমর্পণে ভারি খুশি হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে… 

কাজরীর একটু সময় লাগল বুঝতে যে এ হাসি  নিতান্তই পার্থিব সত্য। হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ভাসুরঝি কে দেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় কাজরী।

  ও কী কচ্ছিলে কাকিমণি? আমি তোমার ঘরে গিয়ে তোমায় না দেকতে পেয়ে সারা বাড়ি চক্কর কেটে এলুম। শেষে রান্নাঘরে তুমি!চল চল মা ডাকচে

  আমায় একটু বাথরুমে যেতে হবে— এই বলে নিজের মুখমণ্ডলের দিকে নির্দেশ ক’রে তর্জনী ঘোরাল কাজরী।

  হ্যাঁ তাই তো! ছোটোপিসিকে মা যে পাঠাল তোমাকে বাথরুম নিয়ে যেতে! আসেনি?

  এসেছিলেন… তবে দরজা খুলে তাঁকে দেখতে পাইনি

  রোসো হচ্ছে।

  না না কিছু বোলো না। অশান্তি কোরো না।

  সে দেখা যাবে। এখন চলো তো। ঐ দিকে কলপাড়ে বাথরুম।

যে দিক নির্দিষ্ট হল সে দিকে অন্ধকার। অন্ধকার তাপশোষী। 

কুপি হাতে পথ দেখানিয়ার পিছু পিছু যেতে যেতে অরবে সুর ভাঁজছিল কাজরী— ওগো পথ-দেখানিয়া তোমায় গান শোনাব…

মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে…

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

তৃতীয় পর্ব

৪. কালিন্দির-ই ঘাটে আইস
 

তাহলে এলে।  

বাতাস ফিসফিসিয়েছিল। 

এদেশে আসার ষোলতম বছরে এই ষোলোটা নারকেল গাছ এক সঙ্গে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করেছিল হঠাৎ ওঠা একটা হাওয়ায়। 

সামনে নোনা ধরা ইঁটের প্রত্ন-প্রাচীন দুর্গা-দালান। সাধন-পীঠ, দুর্গাদাস ঠাকুরের। একজন উদ্বাস্তু মানুষ এই ভিটেতে এলে এত মন ভালো করা রোদ্দুর ওঠে! মায়াগ্রামে তারা সপ্তকে বাজতে থাকে তীব্র ঝালা! ঘুলঘুলিতে পায়রা-বাসা কেঁপে কেঁপে ওঠে! কেন এই বিভ্রম? সুকান্তি খুঁজে ফেরে নিজের মনন-ঘুঁজির অন্ধকার। এত থোপা থোপা অন্ধকার জমে আছে! এত কথা বলায় সে নিজের সঙ্গে অনর্গল! অনর্গল? না তো সুকান্তি বেশ জানে সে নিজের কাছ থেকে নিজেকে লুকোয় প্রতিটি নির্জনতায়। বিষম হৈচৈ আর মেকি ব্যস্ততার আগুনে নিজেকে পোড়াতে থাকে অগ্নিশুদ্ধ হতে চেয়ে। পঁয়তাল্লিশ সালের অগ্নিপথ  দিয়েই তাদের অগ্নিদগ্ধ দৌড় দেখছিল যশোর রোডের দুপাশের বিপুল বৃক্ষ-শ্রেণী… 

  তাইলে সোনাদা শুরু করি? 

সম্বিৎ ফেরে সুকান্তির। পুষ্কর। কাঁধে পাটের মোটা দড়ি গোল করে গুটিয়ে ঝোলানো। হাতে ধারাল হেঁসো। মাথায় আর কোমরে গামছা বাঁধা। পরণে লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে পরা এমন ভাবে যে পাছা প্রায় দৃশ্যমান। 

  হ্যাঁ। সবকটা গাছ ছাড়াতে পারবি? এতটা দেরি করলি কেন? 

  তুমি না এলে গাছে চড়তে না কল্লে তো বৌদি। 

বৌদি… মধুজা। নামটা অরবে উচ্চারিত হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফুসফুস নিংড়ে বেরিয়ে এল। প্রতিবর্ত ক্রিয়া। মগজ জানে না তবু… কত কিছু যে ঘটে যায় এভাবে… মানুষের কৃত তবু মানুষের নয়। সৃষ্টির গাঢ় আঁতুরে মগজ কি কাজ করে? মগজ কী কাজ করে? তবে কেন অতৃপ্তির অসহ্য আঁধি স্রষ্টাকে গ্রাস করে? অপারগতার যন্ত্রণা অশেষ হয়? মানুষ আবার… আবার… আবারও খুঁড়তে থাকে… ভাঙতে থাকে নিজেকে। আপনাকে জানা মানুষের কখনো ফুরোয় না… আকাশের দিকে চোখ বুঁজে তাকিয়ে এই সব ভাবনার সঙ্গে মানসাঙ্ক কষতে কষতে নিতান্ত অবহেলায় চোখ মেলল সুকান্তি। গাছ বাইছে পুষ্কর। এই ছবিটা দেখেই হাসি লুকোতে জিভ কামড়ে ধরল সে… সমতট… বাপরে, কী ডানপিটে ছেলে… আরেঃ কত্ত ডাব খাবি? মোর মামাগো বাগান আসে না! তোগো লয়া যামুআনে। 

  হেই… তাইলে তো দ্যাশ ছাইড়া যাতি অয়। 

  ক্যান? 

  হেই দিন যে সাররে কলি মামাবাড়ি যাইসিলি হের লগে কামাই করছস। আর মুই জিগাইতে কলি বিদ্যাশ। তাইলে তর মামাবাড়ি বিদ্যাশে হইল কিনা? 

  আইরে বোহা পোলা… বাড়ি লয়া তো যামু না, যামু তো বাগানে। হেইডা তো আমাগো শঙ্খ জলায়… 

শঙ্খ জলার বুক এতদিনে নির্ঘাৎ নরম নেই আর। কী বিপুল শরের জঙ্গল। কত যে দুপুর কেটেছে ঐ জলার ধারে… সেভেন প্যারাডাইস… অম্বুরি তামাকের সুগন্ধ… ভাবছিল সুকান্তি— উই ওয়্যার সেভেন, চোখ বুজে গভীর শ্বাস টানল সে… বাতাস ভাগ করা যায় না, যায়ওনি… ভূতবায়ু তার সবটুকু গন্ধনিয়ে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের দখল নেয়… মুখশ্রী জ্বলে ওঠে অপার্থিব আলোয়… 

  হাই আল্লা এ যে নিয়ামত চাচার বাগান! নিয়ামত চাচায় তর মামা অয় ক্যামনে? 

  আরেঃ জানস না? মোর বাপে অয় সম্বুন্ধি ডাহে তয় মুই ভাগনা অই কি না অই? তরা গাস-তলে বস। মুই গাস বাই গা… 

পুষ্করে সমতট দেখে প্রতিবার সুকান্তি আর পাহারাদারের হাতে ধরা পড়ে কীভাবে অনর্গল ভুলভাল ইংরাজির ফোয়ারা ছুটিয়ে উদ্ধার পেয়েছিল তার স্মরণে হাসতে থাকে… 

  কাঁদি গুনো দুগ্গা দালানের ভিতরে রাকচি গো। 

পুষ্করের বৌ। কালিন্দি। কাটা কাটা মুখ-চোখ। তোলপার যৌবন। রীতিমতো ব্লাউজ-বাহুল্য গৌরাঙ্গে গাছ কোমর করা লাল ডুরে। একবস্ত্র। তীব্র। শরীরি। ভাপ এসে লাগছে এতটা দূর থেকেও। নিজের কৈশোর-ভূত থেকে খর-যৌবনে সুকান্তি মুহূর্তেই… মাথা নেড়ে সায় দেয় সম্বোধন-হীন ছোঁড়া কথার অভিমুখ বুঝেই। 

  পাতাগুনো নে যাই। 

তেরছা চোখের ঘাড় হেলানো প্রশ্নকত্রী সম্মতির অপেক্ষা না করেই পাতা টেনে নিজের উঠোনে নিয়ে যেতে শুরু করে। পাতা চেঁছে কাঠি বার করবে সে। বাজার দর ভালো এই নারকেল কাঠির। খ্যাংড়া বলে এখানে। আবাল্য নারকেল কাঠি বলে জেনে এসেছে সুকান্তি। ওর চোখ ছুঁয়ে যায় গৌরাঙ্গীর অসংস্কৃত বাহুমূলের কৃষ্ণাভা। অসহ্য অথচ কাম্য। অস্পৃশ্য স্বপ্ন। অন্তরাল-বিলাসী। ভয়ংকর। ব্যক্তিগত। অপরেশ স্যারকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় সে। মুখ ভাবলেশহীন রাখার কৌশল শিখিয়েছিলেন থিয়েটার-ওয়ার্কশপে। তীব্র অনুভূতির মাথায় চড়ার পরিশ্রম ভারি ক্লান্তিকর। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পেশা-কাঁটা বিক্ষত বর্তমান পদাধিকারের দায়বাহী। 

  এক কাঁদি ডাব নাব্বিচি মাসাই, তুমি বৌদি কে বলে ম্যানেজ কোদ্দিও। এ ন্যাও অ্যাট্টা খাও। বেশ মালাই দেকে দিইচি। 

সামনে বাড়িয়ে ধরা মুখ-কাটা ডাবটার দিকে এক পলক দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ওঠে সুকান্তির।  

 ঘুষ দিচ্ছিস! নিজের অপকর্মের সঙ্গী করতে চাইছিস আমাকে! 

গলাটা চড়ে যায় সুকান্তির। পাতা টানা থামিয়ে ছুটে আসে কালিন্দি। দুচোখে কৌতুহল। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ঝংকার দেয়—

  ফের… ফের চুরি কল্লি! ঐ ঝন্যি তোর ঘর কত্তে ঘেন্না লাগে

আরো অপভাষা বেরোনোর মুখ হাত তুলে বন্ধ করে সুকান্তি। নীচু-গম্ভীর গলায় বলে— 

  সন্ধের আগে নিজের কাজটুকু গুছিয়ে নাও কালিন্দি আর পুষ্কর তুমি ডাবের কাঁদি আর মুখ-কাটা ডাবটা নিয়ে আমার সঙ্গে এসো। 

কথা কটা বলেই হনহন করে অন্দরমহলের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। এই সোনা-মাস্টারের রকম এ গাঁয়ে সকলে চেনে। খুব রাগলে সে তুমি বা আপনি বলে সম্বোধন করে ছোট-বড় সবাইকে। মনে মনে প্রমাদ গুনল পুষ্কর। নির্ঘাৎ মার গেল মজুরীটা। অন্দরমহলের দরজা পেরতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সুকান্তি। দুবার গলা খাঁকরে কারো সাড়া না পেয়ে ঈষৎ উঁচু গলায় ডাকল—

  মালতী… তোমাদের বৌদিকে বলো পুষ্করকে নিয়ে এসেছি কিছু কথা আছে। মালতীর সাড়া না পেলেও সুকান্তি জানে তার আগমন বার্তা জায়গা মতো পৌঁছে যাবে।

#

  আপনার বিচারে পুষ্করের কী শাস্তি বিধান করেছেন? বেতস লতার মত হিলহিলে শ্যামাঙ্গী নীলাম্বরা মধুজার স্বরে সম্ভ্রম। 

  হয় মজুরী নয় ডাবের কাঁদি। ব্যারিটোনে সুকান্তি। এই টোন হেজিমনিক। গলে যায় মধুজা। অভিভাবকহীন নিরালম্বতা আলম্বন বিন্দু অভিসারী হতে প্রাণপণ করে। 

  আপনি কোনটা দেবেন ঠিক করেছেন? অর্ধনমিত মুখে প্রশ্ন রাখে মধুজা সাবধানে। 

  ডাবের কাঁদি। জানতে চাও কেন? সুকান্তির কথা-প্রান্তে মুখ তোলে সুনেত্রা মধুজা। পূর্ণ দৃষ্টিতে চায়… চেয়ে ব’সে থাকে…

  পুষ্কর রোজ ভ্যান রিকশায় ঘুরে ঘুরে ডাব বিক্রী করে। কাঁদিটা বিক্রী করে সে মজুরী থেকে বেশিই পাবে কিন্তু নগদ মজুরী হাতে দিলে… কথা শেষ না করে অবাক হয় সুকান্তি চেয়ারে বসা মধুজাকে মুখ চাপা দিয়ে প্রবল হাসতে দেখে। 

  এতে হাসির কী হল? বিরক্তি ছলকে ওঠে সুকান্তির স্বরে! পুষ্করের হাত থেকে মুখ কাটা ডাবটা ছিনিয়ে নিয়ে বলে— এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? যা কাঁদিটা নিয়ে বিদায় হ। পুষ্কর চলে যায়। আরও কিছুটা সময় নিয়ে হাসি সামলে উঠে দাঁড়ায় মধুজা সুকান্তির মুখোমুখি। হঠাৎ সুকান্তির হাত টেনে নিয়ে একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলে—

  এবারে অন্তত তোমার পকেটটা বাঁচালুম। যথাস্থানে পৌঁছে দিও। 

উত্তরের অপেক্ষা না রেখেই ভিতরমহলে মিলিয়ে গেল মধুজা অকস্মাৎ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত সুকান্তির ধীরে অতি ধীরে যখন বোধজন্ম হল তখন সে কালিন্দির অন্ধকার উঠোনে প্রেতের মত দাঁড়িয়ে… 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

চতুর্থ পর্ব

৫. ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ-কথা

আচ্ছা, খালি ডালে ফুল ভ’রে ওঠে কীভাবে? কীভাবে এই এট্টুখানি গাছ এত্ত বড়টি হয়ে পড়ে? চারপাশের কাণ্ডকারখানা যা ঘটে চলেছে রোজদিন তাতে কত যে প্রশ্ন মাথার মধ্যে কামড়ায়! বীরপুরুষেরা মায়ের কোলে চড়ে? মোতিবিল গাঁয়ে নেই তবে পুকুর আছে, আছে হাঁসের সাঁতার। রোজ সন্ধের আগে বড়দি সুর করে তার পোষা হাঁসেদের ডাকে— চৈ চৈ চৈ চৈ চোওওওওই। দল বেঁধে হাঁসগুলো পাড়ে চলে আসে। বড়দি বলে— চল চল চল চল… হাঁসগুলো থুপ থুপ করে হাঁটে। সোজা ঢুকে পড়ে ওদের ঘরে। ওদের ঘরকে বড়দি বলে খোঁয়াড়। মোট পাঁচটা হাঁস। সবচে বড়টার গায় কত রঙের ছিট ছিট নকশা, গলাটা কখোনো নীল, কখোনো সবুজ, রঙে ঝলকায়। সবাই বলে— অপার হাঁসাটা দেখবার মত গলাটা পুরো ময়ূরকণ্ঠী। হাঁসা বলে। কেন? ময়ূর নাকি সাপ খায়! বেশ করে। সাপ ভারি বাজে। ভয় লাগে। তবে ছোড়দা বলেছে পরিবেশে সাপ দরকার। ছাই দরকার। ভারি বদমাস। সাপুরেরা আসে। সাপ খেলায়। একটা সাপ ছিল লিকলিকে সবুজ। লাউডগা। উঠোনের মাচায় লকলকে লাউডগা গুলো হাওয়ায় দুলে উঠলে কেমন গা শিরশির করে। চোখ সরিয়ে নিয়ে তবে শান্তি। শান্তি ছেলে মেয়ে সকলের নাম হয়। শান্তিদি, সকলে বলে শান্দি, দুধ দিয়ে যায়। বটের আঠার মত দুধ। ফোটালে কী মিষ্টি গন্ধ ছাড়ে। সর তুলে রাখে। ঘি হয়। বাদামী রঙের ছিবড়ে মুড়িতে মেখে চিনি ছড়িয়ে খেতে যা লাগে না এ্যাব্বেরে ঝাক্কাস। হিরু বলে খুব। ঝাক্কাস মানে খুউউউব ভালো। হিরু বলেছে। হিরু খিস্তির ঝুড়ি। এমনিতে খিস্তি পাড়ে না, কারো সঙ্গে ঝগড়া হলে পাড়ে।

আচ্ছা দেওয়া আর পাড়া কি এক? না তো? তবে খিস্তির সঙ্গে এরা হাত ধরাধরি করে চলে। খিস্তি দেয় আর খিস্তি পাড়ে একই কথা। কেন? খিস্তি তো কথাই। কথা যদি বলা হয় তবে খিস্তি হবে না কেন? হিরু খুব খিস্তি বলে। নাঃ কেমন যেন লাগছে। অবলা মানে যে বলে না? শান্দি বলে গরুগুনি তো অবলা পানি, বলতে পারেনে। কিন্তু বলে তো। ডাকে যে। শান্দি ওদের বলা কথা বোঝে। জলের বাল্তি মুখের কাছে রাখে। অমনি ওরা চুপ। চোঁ চোঁ করে জল খায়। তাহলে বলে তো। ঐ যে কালো পিঁপড়েগুলো মুখে সাদা ডিম নিয়ে লাইন দিয়ে যখন যায় তখন শুঁড়ে শুঁড় ঠেকিয়ে কত কথা বলে। কী যে ভালো লাগে দেখতে! ওরা মানুষের মতো করে বলে না। তাতে কী? ওরা ওদের মতো করে বলে, বলে তো। তাহলে ওদের অবলা বলা কেনো বাপু। ওদের সুরসুরি পিঁপড়ে বলে। শান্দি বলে পিম্ড়ে। দিদুর থেকে শিখে হিরুও পিম্ড়ে বলে। শান্দি থেকে বলে না থেনে বলে। হিরু কিন্তু থেনে বলে না থেকেই বলে। থেকে মানে কী? কলেজে পড়া বুড়ো-কাকা বলতে পারেনি। বুড়ো কাকা বুড়ো নয়, একমাথা কুচকুচে কালো ঝাঁকড়া চুল। তবে হাতে লাঠিও নেই কানে জবা ফুলও গোঁজা নেই। থাকলেই বা কী? যা প্যাংলা শরীর আর মিহি গলা। খুব কালো হল কুচকুচে। কুচ ক’রে কাঁচি দিয়ে কাটে। ব্লেড দিয়ে পেনসিল ছুলতে গেলেও কুচ ক’রে আঙুল কেটে যায়। রক্ত বেরোয়। লাল রক্ত। লাল রং-কে টকটকে বলে কেন? টক তো লেবু, তেঁতুল। দক্ষিণের ঘরে তক্তপোশের তলায় তেঁতুলের আচার রাখে শান্দি। চুরি ক’রে আনে হিরু। সকলে ধারা পাড়ার বড় পুকুর ধারের জঙ্গলে বসে তারিয়ে তারিয়ে খায়। আচার খেয়ে জিভ দিয়ে টকাস টকাস শব্দ করতে ভারি মজা। গোতে সবচাইতে জোরে শব্দ করতে পারে। গোতের চার দিদি। সেজদির নাম চায়না। কেন, চায় না কেন? পাড়ায় অনেকেই তো চায়, জড়িয়ে ধরে আদর করে। গোতে জানে। গোতে ছড়া লেখে। আমরা লাল পিঁপড়ে/ একদিন দেব কামড়ে/ করবে ভীষণ জ্বালা/ বুঝবে তখন ঠ্যালা। ওর খুব রাগ। গাছের ওপর রাগ দেখায়। ফুল ছিঁড়ে পায়ে থেঁতো করে। পট করে গাছের ডাল ভাঙে, পাতা ছিঁড়ে নেয়। ওর পকেটে একটা ছোটো ভাঁজ করা ছুরি থাকে সবসময়। রথের মেলা থেকে কিনেছিল। কখনো কলাগাছে ছুরি গেঁথে দেয়। বার বার গাঁথে। কলাগাছ থেকে রস ঝরে। তা দেখে দাঁত বার ক’রে হাসে। পকেটের ছুরির জন্যে কেউ গোতের সঙ্গে লাগতে যায় না।

গোতে জানে সবাই ওকে ভয় পায়। একবার দুরুদা গোতের কান মলে দুগালে দুটো থাপ্পর মেরে খবর্দার বলে আঙুল নেড়ে শাষিয়েছিল। সেদিন গোতে পাগলের মত একটা সজনা গাছে ছুরি মারছিল। গাছেরা মারতে ধরতে পারে না বলে গোতে ঐরম করতে পারে। হাঁফাচ্ছিল গোতে। গাছেরা ডালপালা নেড়ে বাতাস করছিল। মা। গাছ মা। নাঃ মা তো মারে। গাছ তো মারে না। ওরা মায়ের থেকেও বেশি। বড়মা। হ্যাঁ, ঠিক বড়মা। বড়মা-ই তো। খেতে দেয়। বকুনি, মার-ধোর থেকে বাঁচায়। জলায় ছুটোছুটি করে হাঁফিয়ে পড়লে বটগাছের তলায় যেমন ঠাণ্ডা মেলে বড়মাকে জড়িযে ধরলে ঐরম ঠাণ্ডা লাগে। এসব পাড়ার খেলুড়েরা বুঝবে না। ইস্কুলের বন্ধুরা জানে। ইস্কুল- ইস্কুল, একদিন না গেলেই হাঁসফাঁস। ইস্কুল দোতলা। হুঁহুঁ ফাইভ অব্দি পড়া যায়। ইস্কুলের সামনে ইয়াব্বড় মাঠ। মাঠের পাশে ইয়াব্বড় পুকুর। পদ্ম ফোটে। ইস্কুলের পেছনে একটা সরু খাল। বর্ষার সময় ডুব-জল কিন্তু অন্য সময় হেঁটে পার হওয়া যায়। খালের ওপারে বরজ। প্যাঁকাটির ঘর। প্যাঁকাটি ফাঁক করে ঢোকো পানপাতা ছিঁড়ে খাও কেউ বকবে না। একটা পানপাতায় তিন জন। ঝাল। বোঁটা ভালো। ঝাল কম। পান খায় বড়মা। সুন্দর গন্ধ। জর্দা। রুপোর কৌটোয় থাকে। বড়মা বলে জার্মান সিলভার। সিলভার মানেই তো রুপো। গোল্ড মানে সোনা। সোনার কাজ করে পাড়ায় অনেকে। সোনার কাজ করে শীতল জেঠু। সে বুড়ো। এক মাথা সাদা চুল। শান্দি বলে ঢ্যাম্না বুড়ো। কেন? ঢ্যাম্না তো সাপ। মোটা কালো। ফণা তুলতে পারে না। ওর নাকি বিষ নেই। কিন্তু দেখলে ভয় লাগে। হেলে সাপে ভয় নেই। হলুদের ওপর কালোর নকশা। গোতে বলে শনি-মঙ্গলে নাকি হেলে সাপে বিষ জমে।

বড়মা প্রতি শনিবার শনি ঠাকুরের থানে পুজো দিতে যায়। কত জন আসে পুজো দিতে। লাল পেড়ে সাদা-শাড়ি পড়া সব কাকিমা-জেঠিমারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাতের থালায় নীল অপরাজিতার মালা। অপরাজিতা সাদা আর বেগুনি রঙেরও হয়। ইস্কুলের কলপারে অপরাজিতার ঝোপ হয়ে আছে। তিন রকম রঙেরই ফুল ফোটে তবে রঙের মিশেলে নীল রং ফিকে হয়ে গেছে, সাদা হয়ে গেছে আকাশি বেগুনি তো দেখাই যায় না কালচে রঙের ফুল ফোটে। মিহিদের বাড়িতে থোপা সাদা অপরাজিতা ফোটে। কী সুন্দর! যেন গোলাপ। গোলাপ যে কত রঙের হয়। জীবন কাকা গোলাপ বাগান করেছিল। হনুমানে নষ্ট করে দিত। ফুল খেয়ে নিত। গাছ উপড়ে দিত। কী কষ্ট পেত জীবন কাকা। কাঁদত। শেষে আর গোলাপ বাগান করেনি। বাগানই আর করে না। বাড়ির সামনে সেগুন আর মেহগনি গাছ লাগিয়েছে। সেগুন আর মেহগনি গাছের কাঠ দিয়ে পালঙ্ক বানায়। পালঙ্ক খুব উঁচু। সট করে ওঠা যায় না। বিন্তিদের বাড়িতে আছে। সেগুনের। পায়া আর ছত্রিগুলো কেমন প্যাঁচানো প্যাঁচানো। বিন্তিদের খুব বড়ো বাড়ি। খুব পুরোনো। ইস্কুল, মাঠ সব বিন্তির পূর্বপুরুষের দান করা জমি, তাঁর নামেই ইস্কুল— দেবীদাস নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়। চারদিকে সবুজ গাছপালা, ধানক্ষেত, সবজীক্ষেত, তারমধ্যে হলুদ রঙের দোতলা ইস্কুল-বাড়ি। একদম ঝকমক করে। শুধু সামনের থাম দুটো লাল। লাল-হলুদ। বাজে।

সবুজ-মেরুন ভালো। বাগান। মোহনবাগান। বাগান মানেই গাছ। গাছের যত্ন। জঙ্গল তো বাগানই তবে অযত্নের বাগান। না ভগবানের বাগান তিনিই যত্ন নেন। আগাছা গুলো কেমন তাগরা। ওদের জল তো মেঘ দেয়। সার দেয় কে? ধানক্ষেতে ইউরিয়া-সার চাপান দেয় কিন্তু আগাছা বলে ছোটো ছোটো গাছ সব নিড়িয়ে ফেলে। ওরা নাকি ধান গাছের খাবারে ভাগ বসাবে। ধান গাছের খাবার কম পড়ে যাবে। তাহলে বেশি করে দেয় না কেন? আগাছা বলে কি গাছ নয়? ওরাও কত সুন্দর ফুল ফোটায়। কেউ সোনালী, কেউ লাল, একদল তো থোপা থোপা ফুল ফোটায়। একএকটা থোপায় লাল-নীল-হলুদ রঙের ফুল। কোনো কোনো ফুলের পাপড়িতে ছোট্ট কালো ফুটকি। এত সাজগোজ কেউ দেখে না, উপড়ে ফেলে দেয়। ওদের তো দুঃখ হয়। মা-টি ওদের ফেলে না কখনোও। নিজের কোলে টেনে নেয়। সীতার মত।

জনম দুখিনী সীতা। সীতার জন্মও তো মা-টির কোলেই। জনক-রাজা তুলে এনেছিল। মাটিতে হওয়া এই গাছগুলো সবাই সীতা। সীতার মতই যন্ত্রণা পায় ওরা। গোতের মত কত জন যে ওদের মারে। মেরে আনন্দ পায়! যারা বাগান করে তারা বুঝি ভালোবাসে গাছেদের? ঘেঁচু। আগাছা বলে ছোট গাছেদের উপড়ে ফেলে দেয় গর্তে। বলে সার হবে। গাছ গাছের মাংস খায়? না। কচমচ করে খায় না। গাছের মড়া গর্তে পচে উঠলে সেই পচুই খায়। গোতের বাবা খায়। পচুই। নেশা করে পচুই খেয়ে। গোতে বলেছে। গাছেরাও নেশা করে পচুই খেয়ে? কই কোনো গাছ তো গোতের বাবার মত টলমল করে না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। না ঠিক পুরোপুরি সোজা নয়। ঝুঁকে পড়ে। আবার জড়িয়েও থাকে পাশাপাশি। এই যে বর-বউ গাছটা। বট আর অশ্বত্থ কেমন জড়িয়ে রয়েছে। বামুন-পাড়া পার হয়ে জঙ্গলে আছে, ভূমিদিদি বলেছিল— দেখবি? ভূমিদিদি ফোরে পড়ে। ভূমিদিদি ভালো। ফ্রকের পকেটে করে বাদাম ভাজা নিয়ে আসে। সবাইকে দুটি দুটি দেয়। মাঝে মাঝে ঠিফিন বেলায় বাঁধের রাস্তা ধরে দৌড়োয়। দুহাত মেলে দেয়। হাওয়ায় এলোমেলো উড়তে থাকে ওর চুল, ফ্রক ফুলে ওঠে— একটা পাখির মত দেখায় তখন ওকে।

আচ্ছা পাখি খাঁচায় পুরে রাখে কীকরে মানুষ? পাখি যদি উড়তে না পেল তবে সে আর পাখি থাকে? পাখিদের সব খাঁচা খুলে দেয় যদি রাজা তবে বেশ হয়। আমাদের রাজা কে। ক্লাসে জিগ্যেস করায় ছোড়দা নস্যি টেনে নাক মুছে বলেছিল— আঁমরা সঁবাই রাঁজা। ধ্যাৎ। ছোড়দা ভারি মজা করে পড়ায়। এত ভালো লাগে! ছোড়দা বলে— পড়াশোঁনাটাও একধরণের খেঁলা। নস্যি নেয় বলে ছোড়দা ঐরম নাকি সুরে কথা বলে। মিহি ছোড়দাকে নকল করে। ক্লাসে গোলমাল হলে হঠাৎ মিহি চেঁচিয়ে ওঠে— অ্যাঁয় সব পিঁটিয়ে লমবাঁ করে দেব চুঁপ সব চুঁপ। সকলে খিলখিল করে হাসতে থাকে। গোলমাল আরো বেড়ে যায়। ব্যাস, অপিস-ঘর থেকে বেরিয়ে ওমনি সোন্দা ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়ায়। সব চুপ। সোন্দাকে সকলে ভয় পায়। মারে। কড়া গলায় ধমকায়। ইংরাজী শেখায়। ধমক খেয়ে বংশী সেদিন মুতে ফেলেছিল প্যান্টে। সোন্দা ছুটি দিল বংশীকে আর নিজেই ফিনাইল ঢেলে ন্যাতা-বালতি নিয়ে এসে মেঝে মুছেছিল। কারো হাসবার জো ছিল? একটু বাদেই প্যান্ট পালটে বংশী ফের ক্লাসের দরজায়। সোন্দা তখন মেঝে মুছছে। দরজার দিকে সোন্দার পিঠ। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে বংশী। বিন্তির কী সাহস! জোরে বলে উঠল— সোন্দা বংশে এসেছে। সোন্দা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল— ভেতরে আর স্বর্ণালী, বংশে নয় বংশী, আর যেন এই ভুল না হয়। ভুল কথা বললে সোন্দা শুধরে দেয়। সোন্দার সামনে কেউ ডাঁইরে, এয়েছে বলে না। নিজেদের মধ্যে বলে। সোন্দা এমনিতে সকলকে তুই বলে রেগে গেলে তুমি। বিন্তি সোন্দার কাছে পড়ে।

বিন্তিদের বাড়িতে পড়ায় সোন্দা। আরো অনেকে পড়ে। ভূমিদিদি পড়ে। হাই-ইস্কুলের দাদা-দিদিরা পড়ে। ওদের মধ্যে কানুদা খুব ভালো খেলে। কী ভালো দেখতে কানুদাকে! তিন গাঁ জুড়ে কানুদার নাম। একদিন না একদিন কানুদা নামকরা প্লেয়ার হবে। মোহনবাগানে খেলবে? নিশ্চই নিশ্চই খেলবে। ইস্কুলের সামনের মাঠে কানুদা আর অন্য ছেলেরা প্র্যাকটিস করে। পাঁচ পিরিয়ডে ওয়ান, টু, থ্রি-র ছুটি হয়। কেউ বাড়ি যায় না। মাঠের একধারে জমা হয়ে বস্থাকে। খেলা দেখে। ছ’পিরিয়ডে ইস্কুল ছুটি হলে সোন্দার বকা খেয়ে সকলে বাড়ির দিকে দৌড়য়। দৌড় ভারি খেলা। সবাই মিলে বাঁধের রাস্তা ধরে বা জলায় নেমে দৌড়োও, বকার কেউ নেই। ভূমি দিদি ঠিক সবাইকে হারিয়ে দেবে। কানুদা ওর নাম দিয়েছে গ্যারিঞ্চা। কেন? গ্যারিঞ্চা তো ফুটবল খেলে। ব্রেজিলে। পেলে, গ্যারিঞ্চা। ব্রেজিল দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানে খুব ঘন জঙ্গল। সেলভা। রোজ বিকেল চারটেতে বৃষ্টি হয় জঙ্গলে। ফোর ও ক্লক রেন। রেন ফরেস্ট।

ছোড়দা ম্যাপে দেখিয়েছে। একটা ছবির বই এনে কত জীবজন্তুর ছবি দেখিয়েছে ক্লাসে। একটা জন্তু কী যেন খটমট নাম। পিঁপড়ে খায়। যা দেখতে! ছবি দেখেই ভয় লাগে। একটা কাকাতুয়া। কত যে রং। হ্যাঁ মনে পড়েছে। ম্যাকাও। ওদের সবার বাড়ি ব্রেজিলের জঙ্গল। গেল বছর ব্রেজিল বিশ্বকাপ জিতল। সবাই নাচানাচি করছিল। কেন? ব্রেজিল কি ভারত? নয় তো। মিহি বলেছে ব্রেজিল হল মোহনবাগান যুক্ত ইস্টবেঙ্গল সমান সমান ভারত। কেন? ব্রেজিলের রং নাকি সবুজ-হলুদ। সবুজ-মেরুণের সবুজ আর লাল-হলুদের হলুদ। মানে হল ভারত। ধ্যুৎ। বাজে কথা যত সব। ভারত তো চার রঙা। ওপরে গেরুয়া তারপর সাদা তারপরে সবুজ আর মধ্যিখানে নীল রঙা চক্র। অশোক চক্র।

ইতিহাস ক্লাসে মেজদা সম্রাট অশোকের গল্প বলেছে। কোন একটা যেন যুদ্ধে অনেক লোক মরে যেতে সে যুদ্ধ করা ছেড়ে দিয়েছিল। তারপর বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করে। মেজদা বলেছিল কোথায় একটা স্তম্ভ তৈরি করে। তার মাথায় একটা তিনমুখো সিংহ আছে তার তলায় একটা চাকা। ধর্মচক্র বলেছে মেজদা। টাকার পেছনে ঐ তেমুখো সিংহটার ছবি আছে। পকেট থেকে টাকা বার করে দেখিয়েছে। বংশি আর শাবনকে অফিসঘর থেকে পতাকা আনতে বলে ক্লাসের সবাইকে বলেছিল— তোমাদের এই ধর্মচক্র দেখাব। হাঁফাতে হাঁফাতে ওরা পতাকা আনলে ওদের দুজনকে পতাকার উপর দিকের দুই খুঁট ধরে দাঁড়াতে বলল প্রথমে। সাইকেলের চাকার মত স্পোক আছে পতাকার মধ্যিখানের চাকাটার। স্পোক কটা আছে গুণতে বলল মেজদা। শাবন আঙুল দিয়ে দিয়ে গুণে বলল চব্বিশটা মেইদা। সোন্দা থাকলে যা বকত না। মেজদা কিছু বলেনি। তখন সে ঐ চাকার মানে বোঝাতেই ব্যাস্ত। ঐ চব্বিশটা স্পোকের মানে চব্বিশ ঘন্টা। মানে তোমরা চব্বিশ ঘন্টা ধর্ম পথে থাকো। আচ্ছা ধর্ম কী? পুজো? বড়মার সঙ্গে শনিঠাকুরের থানে যাওয়া? শনিঠাকুর। তালে রবিঠাকুর? রবীন্দ্রনাথ? কিন্তু তার থান কই। পঁচিশে বৈশাখে সবাই নাচ-গান করে। আবৃত্তি করে। পুজো করে না তো। পুজো তো ফুল-বেলপাতা-তুলসীপাতা ছিঁড়ে বামুনে করে। মন্ত্র পড়ে আর একটা মূর্তির দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফুল দেয়। ধোঁয়ায় ধোঁয়া করে দিতে হয়। দম আটকে আসে।। চোখ জ্বালা করে। প্রসাদ খাওয়াটাই আসল। নিজের পছন্দমতো ফল-মিষ্টি দিতে হয়। ঠাকুরের মূর্তি তো আর খায় না। গেলবার সত্যনারায়ণ পুজোতে বড়মা শুধুমার পছন্দের মিষ্টি মৌচাক আনিয়ে ছিল। ধ্যুৎ মৌচাক একটা মিষ্টি হল? কোথায় কড়াপাকের সন্দেশ আর কোথায় মৌচাক। থুঃ। শুধুমা খারাপ ওর পছন্দ খারাপ ওর গন্ধ খারাপ খারাপ খারাপ খারাপ…

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

পঞ্চম পর্ব

৬. আয় রে তবে ভুলের ভবে…

তুমুল শ্রাবণ। চারদিকে সবুজ ঝামরে উঠেছে। ডিভিসি জল না ছাড়লেই হল। বাঁধ না ভাঙে। বাঁধের আড়ালে লুকিয়ে বেড়াই সাগর যেন না টানে। অতলে তলিয়ে না যাবার চেষ্টায় একটার পর একটা ঢেউ ভেঙ্গে মাথা উঁচু রাখা কতো যে কঠিন! ছায়াবৃত্ত অতি ধীরে এগিয়ে আসছে। সূর্য থেকে মুখ ফেরাচ্ছে পূর্ব গোলার্ধ। বহু পথ পার হয়ে দিঠির খুশিয়া নিয়ে মেহলী আকাশ জুড়ে এসেছ। ভুল। এই ভুলগুলো বেঁচে থাক। অথই দুঃখ-সাগরে সাঁতরাতে  সাঁতরাতে মানুষ নয় ভুলেই বাঁচুক। লাল মেঘ সাঁতরায়ে আসিতেছে ফিরে…  নাঃ আপাতত  আকাশে কোনও ধবল বক নেই তবে মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে… কে যে কাকে বসিয়ে রাখে একা দ্বারের পাশে। একা… সাহিত্য সম্রাট বলেছেন  “কেহ একা থাকিও না”। ভুল তো। বিপুলা এ ধরণীতে কেই বা দোকা? একা এসেছিস ভবে একাই তোকে যেতে হবে নারী বাড়ি টাকাকড়ি সঙ্গে তো যাবে না।

তবু সবাই সঙ্গী খোঁজে। কেন?  ভাব বিনিময়য়? আড়ি বিনিময় নয়? আরেঃ জম্পেশ  শত্তুর জীবনে না থাকলে যাপনটাই আলুনি।  অজাত-শত্রু ধারণাটাই ভুল।  ভুল করা সকলের বার্থ -রাইট। ভুল করলে তবে না শিখবে। শেখাবে কে? শিক্ষক। ভুল। পৃথিবীতে শিক্ষক বলে কেউ কোনদিন ছিল না, নেই, আর আসবেও না। মানুষ শেখে নিজে নিজে। যারা শিক্ষক বলে পরিচিত তারা আসলে পরামর্শ বিক্রেতা। শিক্ষা নাকি দানের জিনিষ? ফুঃ। মাইনে না পেলে কটা মাস্টার পড়াত তা জানা আছে। তবে হ্যাঁ, সে সব ছিল এককালে। বাঘেরহাটে , হেড স্যার অনঙ্গবিহারী  চট্টরাজ। জমিদারের করুণা আর ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের খামখেয়ালের ওপর চূড়ান্ত অভরসায় চলত তাঁর একলার সংসার। গরীব ছিলেন কিন্তু পাঠদানে দানবীর। ভুল ছিলেন স্যার … শুনতে পাচ্ছেন… আপনি ভুল ছিলেন, নইলে আপনার মৃত্যুর পর ঘাট খরচা যোগার করতে, শ্রাদ্ধ করতে ভিক্ষের দরকার পড়ল কেন? এত সিনিয়র দাদারা থাকতে একটা ক্লাস এইটের বাচ্চাকে আপনার মুখাগ্নি করতে হল কেন?  আপনার বইপত্র অধিকার করে নিতে যেদিন স্কুলের লাইব্রেরিয়ান এলো সে আপনার ডায়রিগুলো পায়নি। চুরি গিয়েছিল। চোর কে আপনি জানেন?

জানেন!…জানি, জানেন আর চোরের দণ্ড বিধানও করেছেন। স্বাধীন ভারতের মাটি পায়নি আপনার স্বপ্নের ইতিবৃত্ত। চোরটা পেয়ে হারানোর প্রথম শোকটাকেই শেষ ভেবেছিল। ভুল ভেবেছিল… ভুল ভাবনার মাশুল মানুষকে সারা জীবন গুনে যেতে হয়। … এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার সাজি নতুন মেঘের লালিমার দিকে চেয়ে রহিয়া রহিয়া নহে ঝরঝর করি তুমুল বৃষ্টি যাইতেছে শুধু ঝরি। মেঘ-মুলুক থেকে যতই চোখ রাঙাও ঠাকুরমশাই ভুল গাওয়া ইজ আওয়ার বার্থ রাইট। এই একার বৃষ্টি এত কথা বলে! কথাগুলো একটা আরেকটার ওপর অভারল্যাপ করতে থাকে। শেষতক কী হল? না গান দাঁড়াল। যে গানের সুরই ধরা দিক না কেন গলা ছেড়ে গেয়ে নিলেই হল। বাণীর তোয়াক্কা করে কোন আহাম্মক ? এবার এসেছে শ্রাবণ আকাশ ছেয়ে আসে মৃত্তিকা সুবাস বাতাস বেয়ে… হে-হে ঠাকুরমশাই বৃষ্টির সুবাস পাচ্ছিলে লেখার সময়? হয়? বাপু হে যেটা পাচ্ছিলে সেটা ভেজা মাটির গন্ধ। তুমি ঠাকুর কাব্যের দোহাই দিয়ে বাস্তবতার তোয়াক্কা করনি। ওই যে গানটা ভেঙে মোর ঘরের চাবি… হি-হি-হি ও ঠাকুর চাবি যদি ভেঙে ফেলি তবে তালা খুলব কি করে সেটা তোমার মাথায় আসেনি বোলো না, পেত্যয় যাবে না। আসলে যাবির সাথে রাইমের ঝোঁক, ব্যাস হয়ে গেল রাইমের ফান্দে পড়ে বগার মত কাঁদছ আজও, কাঁদবে আগামীতেও।

নাঃ বৃষ্টিটা ধরছে না তো। আঁধার ঘনাচ্ছে। একটু পরেই বর্ষানন্দে মাতোয়ারা সবুজের মহিমা কালো ঘোমটায় মুখ ঢাকবে। চোখাচোখি হবে না। ধুৎ, তারচে সাইকেলটা সিঁড়ির নীচে রেখে হাঁটা লাগাই, তুমুল ভেজাও হবে আর সবুজ মাখাও হবে। হুঁ হুঁ মোর কোন ইন্দ্রধনুউউউউ কার হুঁ হুঁ  হুঁহুঁতে চায় হৃদয় হারাতে চায়। এবেরে গেটে তালা দিয়ে চাবি দিতে যেতে যেতে একলা পথে পাব সবুজ সাথি ঘোর লেগেছে ওরে আমার ঘোর চায় না ছাতি… আহ… কে যে বৃষ্টিকে চপলা চঞ্চলা মেয়ে রূপে দেখেছে এ তো শালা প্রবল পুরুষ যেন বর্শাধারী শিকারী বন্য মহিষ বা বরাহ কিংবা গণ্ডার শিকারে দৌড়ে চলেছে… স্কুলের পেছনের বরজটায়  কাজের ধুম লেগেছে পিনুর। বরজের মাথার ছাউনি হালকা করছে ওরা। ভিজে ঝুপ্পুস তিনজনে। পিনুর বউ ছাউনি হালকা করছে বাইরে থেকে… ওর শঙ্খের মতো স্তন মথিত করছে  বৃষ্টিপুরুষ। শিহরিত হচ্ছে মেয়ে। ওর বৃন্ত যুগল প্রখর। এতটা দূর থেকেই স্পষ্ট। পিনু আর তার শাগরেদ ভোলা ভিতরে জল নিকাশি পোক্ত করছে। থাক ওরা ওদের মতো।

আহ…  বেড়াচিতাগুলো  চেতিয়ে উঠেছে… একটু হ্যান্ডসেক হয়ে যাক… তোমরা বুঝি শক্তি সঞ্চয় করে রাখছ বসন্তে ফুল ফোটাবে বলে? ও বাবা আবার গা দুলিয়ে হাসি হচ্ছে! বেশরম কাঁহিকা। হুঁ কদমের গন্ধ… তাহার ছাদে যখন ওঠে তারা  আমার মনে পুবাল হাওয়া ছোটে তাহার হৃদে ঝরে শ্রাবণধারা এবং তাহে  কদম ফুটে ওঠে… আরেঃ এটা কীসের ঝাড়? একটা থোপায় দুই রঙের ফুল! কিন্তু তোরা ভারী বজ্জাত… লাল-হলুদই পছন্দ করলি?  কী বলছিস? সবুজ ফুল দেখেছি কিনা?  দেখেছি কী রে, রীতিমতো চাষ করেছি। আমাদের বাঘেরহাট স্কুলের বাগানে ফুলিয়েছিলাম সবুজ ক্রিসেন্থিমাম। বর্ষার ফুল। এত হাসাহাসি কেন?  ও ফুলিয়েছিলাম বলেছি বলে? বেশ বাবা ফুটিয়েছিলাম… হয়েছে তো?  ওহে দীর্ঘ  শিরঃ তৃণ দল তোমরা যে সকঞ্চি মার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছ হে। যাই কী করে? শালা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় সাধে বলেছে! হামাগুড়ি দেওয়াবি নাকি তোরা? এই দ্যাখ ধুতির কামাল… অ্যায়  ডান-বাম কোমরে গুঁজে দিলুম… হুঁহুঁ কেমন মিনি স্কার্ট! এইবার কী আটকাতে পারবি?  চারিদিকে সুধাভরা ব্যাকুল শ্যামল ধরা কাঁদায় রে অনুরাগে প্রভু তোমা লাগি… অ্যাঃ পেইরে এইচি… হিহি  গেরামের ভাষা… থাউক গা, ধুতি নাবায়ে আর কাম নাই। যাই গা চাবি দিয়া আসি। টুক কইরা কুলুঙ্গিতে গোছাখান রাইখ্যা হেরপর বাঁধের রাস্তা ধইরা…

অরে তোগো সোন্দা সোটে দ্যাখবি যদি আয়…  হাইরে… হেইডা কেডা, গাল ফোলায়ে অ্যাক্কেরে উঁ…  মত্ত দাদুরী! বুজঝি বুজঝি, অ্যাক্কেরে ফাটি যাওত ছাতিয়া।  ডাকো বাছা ডাকো। এ ভরা শ্রাবণ মাহ শ্রাবণ শূন্য মন্দির তোর… শরীর শরীর তোমার মন নাই ব্যাঙ? মন না মিললে কী শরীর মেলে?  মেলে বাবা মেলে। নইলে মা  দুগগার মাটি মিলত না। ফুঃ। যত সব বাখোয়াজ। কামেতে ভুবন ভরিছে দপ দপ করি রক্ত-আলোক সব বেপাড়ায় জ্বলিছে… ওরাই রাতে ভ্রমর হয়ে নিশি পদ্মের মধু যে খায়। সব জানি হে। মানুষ মাত্রেই মাপনদার। মানুষের চোখে হুল, জিভ, এমনকি আঙুলও… এ এ এ ই দেখেছ  এত লাফালাফি কেন রে? নিশ্চয়ই এটা মাদী ব্যাঙ… অভিসারে চলেছে… এখুনি তো ভবলীলা সাঙ্গ হোতো রে মেয়ে। যা যা ডাক এসেছে তোর। ডাকঘরে তোর রাজার চিঠি ধূলায় হচ্ছে ধূলি হারিয়ে না যায় গভীর প্রেমের আখর গুলি। অভিসার মানে যাওয়া, ততটা নয় যতটা যেতে চাওয়া… চির অভিসারী মানুষ চলেছে অনন্তের পথে… এই বরষা-দিন এই ভিজে হাওয়া  সেঁতিয়ে ফেলে কই জীবকুলকে? বরং সে কী গভীর বাণী আসে ঘন মেঘের আড়াল ধ’রে সারা শরীর আকুল ক’রে দিগন্তরের শরীর চাহে সে কী … আচ্ছা মেয়েরা কী লুঠ হতে চায়?  লৌকিক জীবনে বা ইতিহাসে তাকালে এমন উদাহরণ প্রচুর।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা বারো খণ্ড জুড়ে উত্যক্ত এমনকি ধর্ষিত হয়েও রাধা বিরহ পর্বে কৃষ্ণবিরহী হয় কীভাবে? সাহিত্য তো জীবন থেকেই নেওয়া। কী জানি, নারীর মন? দেবা ন জানন্তি কুতঃ মনুষ্যা। বুঝি এখানে খেলা চলিবে না, সাবধানে দূরে দাঁড়ানোই ভালো। যাক, সন্ধ্যে নামলেও সদরে তালা পড়েনি। চাবিটা বৈঠকখানায় টেবিলের ওপর চুপচাপ রেখে চলে যাই, ডাকব না কাউকে। এস্রাজ… মধুজা… দক্ষিণী তালিম… এই শ্রাবণ সন্ধ্যায় ছেড়ে যাওয়া…  শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে… কাকে চাও মধুজা এই বেহাগে এই সিক্ত সন্ধ্যায় কার সুর বাহারে মথিত হতে চাও… কার মধুজা তুমি কার… পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে …  এই গভীর আকুতি কি ভূতকালের প্রতি নাকি আগামীর প্রতি মধুজা?  এক কুয়াশা জমাট দ্বীপের উপকূলে তুমি এক অস্পষ্ট তনুরেখা অথচ মনে তুমি মারিয়ানা… দেখা যায়… ডোবা… নিশিদিন এই জীবনের সুখের ‘পরে দুখের ‘পরে  শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে… আআআহ… মধুজা তুমি; তোমার গান বিঘন বর্ষায় তীব্র ছাতিম গন্ধ… অসময়ের… ভারী অসময়ের…  যা কিছু জীর্ণ আমার, শীর্ণ আমার জীবনহারা, তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ‘পরে ভুখের ‘পরে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক… ও ঠাকুর তুমি কেন এ গান লিখলে… একলামিকে এই কামমোহিত শ্রাবণ সন্ধ্যায় কেন উন্মাদের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় মাখিয়ে দিচ্ছে মধুজা… অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে মন থেকে বনে… স্থির থাকা অসম্ভব… এই বৈঠকখানা বাতাস চাহিদা পূরণে অক্ষম… পদক্ষেপ যেন মাতাল, নিয়ন্ত্রণহীন… বৃষ্টি; আবার; আমার তৃষার ‘পরে আমার ভুখের ‘পরে ঝরে ঝরে ঝম্পি ঘন গর্জন্তি সন্ততি, ভুবন ভরি বরখন্তিয়া কান্ত পাহুন কাম দারুণ,সঘনে খর শর হন্তিয়া… বৃষ্টি মথিত বনজ কুসুম গন্ধ এ কী আনন্দ একী আনন্দ আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ আজি বিশ্ব মথিয়া উঠিছে জাগিয়া অচেতন থেকে চেতন ছুটি ঝড়ের সঙ্গে করতালি দিয়া পথ থেকে পথে উন্মাদ পথ হারানোর নেশাতুর  নিশি বৃষ্টি ঝরিয়ে আরো কাঁদ সে যে গান শুনিয়েছিল তাহার পরশ লেগে হৃদয়ের পদ্ম বনে শ্রাবণ ওঠে জেগে …

শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার খুলেছে ওই অনেক দূরে, বনের মাথায় মেঘ আকাশে ডমরু বাজে কী গম্ভীরে! কাজল মেঘের রহস্য ছায় যাবৎ জীবতনুর ‘পরে, ঝর ঝর ঝর বৃষ্টি পরে একলা আমার ভিতর ঘরে। অন্ধকারের ঘনিমাতে হারিয়ে গেছে সুপথ খোঁজা, উল্টো হাওয়ায় সেই বিরহীর অন্ধ বিমন যাচ্ছে বোঝা,  মরতে বসা নদীর বুকে ষাঁড়াষাঁড়ি বাণের ভুল; ভুলের ভবে অসম্ভবে ভাঙছে ভাঙছে নদীর কূল… ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা…  ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি নেমেছে অন্ধকার… এই অন্ধকারে জন্মের ক্রন্দন ওঠে…  আমাদের মৃত্যু আলোয় আলোময় আমার আঁধার ভালো … পৃথিবীর সব বীজ অঙ্কুরিত হোক মা-টির গর্ভে  এসো হে ধাত্রী খুলে ধরো গর্ভমন্দিরদ্বার ধারণ করো আগামীকে… বৃষ্টি ধুয়ে দিক সর্ব কলুষতা দুজনে চলো গাই আগামী-গান, বাতাসে কান পেতে শুনতে পাও নাকি প্রাচীন রাগে বাজে নতুন তান। আআআআআহ … উমমমম্ম… হা আআআআআআ… 

  #

কালিন্দী যখন দোর খুলে বাইরে এলো তখন রাত ঘন হয়েছে। বৃষ্টি থেমেছে। আকাশ নিকষ অন্ধকার। ওই অন্ধকার উঠোনে কেটে রাখা তাল-গুঁড়ির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা বীর্যে-বৃষ্টিতে মাখামাখি সুকান্তিকে যখন কালিন্দী পাঁজাকোলা করে ঘরে তুলে আনল তখন তার ধুম জ্বর।   

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *