শিশির আজম
Man with a Movie Camera (১৯২৯)
ফর্ম ও টেক্সচারের দিক থেকে গোদারের হাত ধরে চলচ্চিত্র যে নিজেকে অনেকটা পাল্টে নিতে বাধ্য হয়েছে তা একদমই বিস্ময়কর মনে হবে না যদি জিগা ভের্তভের ‘ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা’র সামনে আমরা দাঁড়াই। ব্যাকরণ, রুচি আর গতানুগতিক আচার-বিচারের ছাতার নিচে শিল্প পরিপূর্ণভাবে নিজেকে বিকশিত করতে পারে না। তার দরকার খোলা হাওয়া। নিজের প্রতি বিশ্বাস দরকার। তাহলে ট্রাডিশান ভাঙার সাহস তার হবে। আর্টের নতুন মাধ্যম হিসেবে তখন কেবলই শৈশবকাল পার করছে চলচ্চিত্র। অর্থাৎ তখনও সিনেমায় রং আসেনি, শব্দ আসি আসি করছে।
এরকম সময়ক্ষণে ভের্তভের ‘ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা’ (১৯২৯) যেন চলচ্চিত্রে রীতিমতো এক বিপ্লব। মনে রাখা দরকার, সোভিয়েতের তৎকালীন বিপ্লবী সরকার শিল্পের নতুন মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের যে দিগন্তপ্লাবী সম্ভাব্য উল্লম্ফন তা অনুধাবন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র শিক্ষার সুযোগ করে দেন তরুন চলচ্চিত্রকর্মীদেরকে। বলা ভাল, ফরাসি ও মার্কিনদেশে সিনেমা নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় সত্তেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র শিক্ষার ধারণা সোভিয়েত সরকারই প্রথম ভেবেছে। রাশিয়ায় আইজেনস্টাইন, লেভ কুলেশভ, পুদভকিন, দভজেঙ্কো, জিগা ভের্তভসহ আরও অনেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্বে চলচ্চিত্র নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন, পরষ্পর তর্ক করেছেন। তারই ফলশ্রুতিতে বিস্ময়কর সব চলচ্চিত্র আমরা পেয়েছি ওই সময়। এটা একটা গোষ্ঠী বলা যায়। সিনেমার ইতিহাসে সিনেমাকে সৃষ্টিশীল, প্রভাববিস্তারী ও বদলাবার কথা বললে সোভিয়েতের এই গোষ্ঠি সম্ভবত ফরাসি নবতরঙ্গের মাস্টারদেরকেও টেক্কা দেবে।
এরা নিজেরা ভেবেছেন। কিন্তু তাদের চলচ্চিত্র তাদের এই ভাবনার চাপে নুয়ে পড়েনি। এসময় সের্গেই আইজেনস্টাইন তৈরি করেছেন ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ (১৯২৫), পুদভকিন তৈরি করেছেন ‘মাদার’ (২৯২৬), কুলেশভ ‘বাই দ্য ল’ (১৯২৬), দভজেঙ্কো ‘আর্থ’ (১৯৩০) অথবা ভের্তভ ‘ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা’ (১৯২৯) এর মতো চলচ্চিত্র। ‘ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা’য় ধরাবাঁধা কোন কাহিনী নেই। ক্যামেরা নিজের মতো চলছে দৈনন্দিন শহুরে রাস্তায়।

এই সিনেমার প্রধান চরিত্র সম্ভবত ক্যামেরা নিজেই। নিজের চোখে সে সবকিছু দেখছে। ধর্ম, রীতি, নৈতিকতা কিছুই তার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। ভের্তভের এই সিনেমা পরবর্তীতে চলচ্চিত্রকারদের ওপর কতোটা প্রভাব ফেলেছে তা চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীগণ সবাই জানেন। গোদার-ক্রুফো-ব্রেঁসো-রেহমারের কথা তো বলেছিই। আরেকটু পরে আব্বাস কিয়ারোস্তামি বা মোহসেন মাখমালবাফকে আমরা দেখবো সিনেমাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিতে। এবং সেখানে চলচ্চিত্রের দৃশ্যে ক্যামেরাকে লুকিয়ে রাখার দরকার পড়ছে না। জাফর পানাহি তো রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহবন্দী অবস্থায় বসবাসের ছোট্ট ফ্লাটটাকেই স্টুডিও বানিয়ে ফেলেছেন। ক্যামেরা তার দৈনন্দিন জীবন যাপনের অংশ। আর এই অভিজ্ঞতারই সারাৎসার ‘দিস ইজ নট ফিল্ম’ (২০১১) চলচ্চিত্রটি। এটা গতানুগতিক সিনেমা না। বলা যায় এটা জাফরের, এবং আরও বড় ল্যান্ডস্কেপে ধরলে আজকের ইরানের বিভৎস ও দম বন্ধ করা দিনপঞ্জি।
ভের্তভ দেখিয়েছেন কোন প্রতিবন্ধকতাই শিল্পকে থামিয়ে রাখতে পারে না। দরকার ক্যামেরাকে নিজের মতো হাঁটতে দেওয়া। চিত্রকলায় ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টরা যেমন আলো আর রংকে ক্যানভাসে মুক্তি দিয়েছেন। আর তাতে যা আমরা পেয়েছি তা স্বতস্ফূর্ত আর নন্দনতত্ত্বের নতুন পাঠশালা। ‘ম্যান উইথ এ মুভি ক্যামেরা’র পর আমাদের যে বুনুয়েল-ক্রুফো-গদারের দানবীয় অভিরুচির মুখোমুখি হতে হবে, এটা যেন অবধারিতই ছিল। স্প্যানিশ মাতাদোর লুই বুনুয়েল তো বানিয়েই ফেললেন ‘এ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ’ (১৯২৯) আর ‘দ্য এজ অব গোল্ড’ নামে বিপজ্জনক দুই পরাবাস্তব সিনেমা যা ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া সমাজের প্রতি চাঁচাছোলা থাপ্পড়, বুর্জোয়া নৈতিকতার প্রতি সরাসরি কটাক্ষ। এর সঙ্গে কি দালির তুলির কোনরকম ষড়যন্ত্রমূলক সম্পর্ক ছিল? ব্রাকের? পিকাসোর? কেন না একই সময়ে আর্টে এদের দানবীয় দৌরাত্ম আমরা দেখছি। ব্রাক-পিকাসো-দালি এসময় রঙে-রেখায় ক্যানভাসকে যেভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছেন তাতে প্যারির নন্দনবোধে রীতিমতো সাইক্লোন। এই পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণে ভের্তভের মুভি ক্যামেরা কি কোনভাবে সম্পৃক্ত? এই আলোচনা এসে যায়।
এমন কি বাংলায় রামকিংকর বেইজের ওপর ঋত্বিকের ডকুমেন্টারি বা সুবিমল মিশ্রের গল্প-উপন্যাস (যেমন ওর উপন্যাসের নাম ‘আসলে এটি রামায়ন চামারের গল্প হয়ে উঠতে পারতো’, ‘নাঙা হাড় জেগে উঠেছে’, ‘রং যখন সতর্কীকরণের চিহ্ন’, ‘ওয়ান পাইস ফাদার মাদার’ বা ‘চেটে চুষে চিবিয়ে গিলে’। গল্প ‘হারাণ মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া বা সোনার গান্ধীমূর্তী’। আনকনভেনশনাল ফর্ম-টেক্সচার-কনটেন্ট তো আছেই, ওর গল্প-উপন্যাসের নামকরনই তথাকথিত শুদ্ধ নিষ্কলুষ আর্টকালচারের পশ্চাদ্দেশে লাথির সমতুল্য।) পড়তে গিয়ে যখন অবচেন হিংসা, ক্ষমতা, যৌনতা আর নৈতিকতার সংকটে আমরা পড়ে যাই তখন ভের্তভের ক্যামেরার দৌরাত্মকে আমরা আর অস্বীকার করতে পারিনে।

এখানে কেউ কেউ ফ্রয়েডকে ডেকে আনবেন হয় তো। সেটা স্বাভাবিক। যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’-য়ে ফ্রয়েডকে পাই, এমন কি মার্কসকেও। তবু তার ফর্মে-টেক্সচারে যে উল্লম্ফন-বিবর্তন তা আর্টের দেখায়-অনুভবে খুব একটা ভড়কে দেয় না পাঠককে। হ্যা, বিস্মিত করে, আনন্দ দেয়, বিরক্ত করে আবার হয় তো উৎসাহিতও করে। যেটা ধ্রুপদী আর্টের কাছ থেকে সময় ও মহাকাল প্রত্যাশা করে। কিন্তু আর্টের চিরাচরিত আকর্ষণীয় উপভোগ্য কাঠামোই যখন ভেঙে পড়ে, তখন? ভের্তভের ক্যামেরা কিছুই মান্য করে না। অথবা বলা যায় কোন কিছুতেই তার অনীহা নেই। সে একসময় বিশাল ভবনের সুপরিসর ছাদে নিজেকে দাঁড় করায় যেন পাখির চোখে সে দেখতে পায় পুরোটা শহর। আবার আমরা তাকে দেখি সন্ধ্যার বারে বিয়ারের উত্তাল গ্লাসের ভিতর থেকে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার ক্যামেরার লেঞ্চ শুষে নিতে চায় বারের পিপাসাকাতর টেবিলগুলোকে। হয় তো এটাই চেয়েছেন ক্যামেরার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ফিল্মমাস্টার জিগা ভের্তভ।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
