পাঠক মিত্র

পৃথিবীর মানুষের জীবনগাথার কবিতা

আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসে আমার কবিতাখানি কৌতুহলভরে । কবিগুরু তাঁর কবিতার এই লাইনে বলেছেন শতবর্ষ পরে পাঠক কৌতুহলভরে তাঁর কবিতা পড়বে । এই কৌতুহল নিয়ে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে কতকিছু পর্যবেক্ষণে নিবিড় হয়ে থাকবে পাঠক । কবিতা-যে শব্দের জাদু । কবিদের শব্দের জাদুতে কবিতায় উঠে আসে জীবনের গভীর সত্য ও অনুভূতি । কবিগুরু অবশ্য বলেছেন যে কবিতা কেবল শব্দ বিন্যাস নয়, বরং তা হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে ভাষায় রূপ দেওয়া । কবিগুরুর কথায় কবিতা হল হৃদয়ের গভীর অনুভূতি । আবার অন্য কবিদের কেউ বলেছেন এই অনুভূতি যা কখনো সত্যের অন্বেষণ, কখনো আবেগের সুসংগত রূপ, আবার কখনো সমাজের প্রতিচ্ছবি । যে ছবিতে কবিদের শব্দ জ্বলে ওঠে । বিশিষ্ট আমেরিকান কবি ইমিলি ডিকিনশন বলেছেন, ‘আমি যখন কোন বই পড়ি এবং সেটি আমার পুরো শরীরকে এতটাই ঠান্ডা করে দেয়, যেকোনো আগুনই আমাকে উষ্ণ করতে পারে না, আমি জানি সেটাই কবিতা ।’ আর এক আমেরিকান কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ বলেছেন, ‘কবিতা হল সেইসব সৃজনশীল মনের চিন্তা ও অনুভূতি, যারা তাদের বাসস্থানের বিশ্বে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না ।’ বিশ্বজুড়ে এমনতর চিন্তা ও অনুভূতির প্রতিচ্ছবি এক মলাটে লিপিবদ্ধ করেছেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । সময়, স্বদেশ ও মনুষ্যত্বের এই কবির কবিতা কখনো দেশ-সীমানার কাঁটাতারে আবদ্ধ থাকেনি । তাঁর অনূদিত কবিতার সংকলন ‘মহাপৃথিবীর কবিতা’ কোন সীমানায় বাঁধা পড়ে না । বিভিন্ন দেশের লোকগাথা, উপকথা থেকে অন্যান্য কবিতার অনুবাদে এই সংকলন তিনি যেন কোন এক প্রয়োজনের তাগিদেই করেছিলেন । লোকগাথা, উপকথা থেকে আধুনিক সময়ের কবিতার ছবি যেন কোন নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট দেশের জলহাওয়ায় তৈরি হলেও তা কেবল সেই দেশ ও সময়ের নয় । এই সংকলনের পনেরোটি পর্বে সেই ছবিই তুলে ধরেছেন কবি । পৃথিবীজুড়ে সেই ছবিগুলোর ভাষা এক । 

 খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ(৫১৮-৪৩৮) পিন্ডার নামক গ্রীক কবির এক কবিতা ‘স্বর্গ-নরকের ইতিহাস’ শুধু গ্রীক দেশের তদানীন্তন সময়কে বলছে কি ? ‘তাদের জন্য সূর্য জ্বলে পূর্ণ তেজে/আমরা যখন অন্ধকারে রাস্তা হাঁটি এইখানে ।…/তাদের মাটি তাদের আকাশ আতরের গন্ধে ভরা;/চোখ মেলতেই ঈশ্বরের বেদীতে জ্বলে পূজার আগুন –/ আশীর্বাদ করেন তাদের স্বয়ং জগন্নাথ।/তাদের রাজধানীর বাইরে নদী যেন রাত্রি, যেন খড়্গ হাতে কালী—/ বমন করছে নরমুন্ড–অন্তহীন বেদনা; আর, আছড়ে পড়ছে পাথরে পাথরে/শোক আথালি-পাথালি !’

‘আদিম অরণ্যের গান’ পর্বে ‘কার তামাক কে খায় ?’ কবিতা যা আফ্রিকার জনৈক ‘পিগমি’ আদিবাসীর বিলাপ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে । এই কবিতার বিষয় আজকে এই সভ্যতায় বিলীন হয়েছে তা কি জোর দিয়ে বলা যায় কি ? ‘…কে রে, শুয়োরটাকে মারলো ?/ নিকু মারলো/ কিন্তু খায় কে ? হতভাগা নিকট!/ শুয়োরটার ছাল ছাড়ালি তুই; কাটলি, কুটলি ।/ তোর ভোজনের জন্য বরাদ্দ হলো নাড়ি-ভুঁড়ি !…. কে মারলো হাতটাকে ?/ নিকু মারলো।/ কে পেলো বাহারের দাঁত-দুটো ? হতভাগা নিকট !/ সবসময় তুই করবি হাতি শিকার; তোর জন্য ওরা রেখে দিয়েছে হাতির লেজ !/ তোর বাড়ি নেই, ঘর নেই; যেন তুই একজন বানর রে নিকট !/ মানুষ নোস !/ কিন্তু মৌমাছি তাড়িয়ে মধু জোগাড় করার বেলায় তুই!/ কে ঐ মধু খায়?– যতক্ষণ না পেট ফুলে ফেটে যাওয়ার মতো হয় ?/ না রে, হতভাগা ! তুই না ! তোর জন্য পড়ে আছে শুধু কয়েক টুকরো মোমের !/ ঐ-যে, তোর সামনেই ব’সে, সাদা চামড়ার ভালো-মানুষরা !/ কে তাদের ঘুরে-ফিরে নাচ দেখায় ? তুই রে নিকট ! তুই!/ কিন্তু তোর তামাক খেয়ে নিলো কে ? হতভাগা নিকট !/ নিকু রে! চুপ ক’রে ব’সে থাক । অপেক্ষা কর !/ ওরা ফেলে দেবার আগে / সিগারেটের শেষ টুকরোটা কখন তোর দিকে এগিয়ে দেয় ।’   

‘প্রাচীন গ্রীক কবিতা’ পর্বের আর একটি কবিতা ইউরিপিদিস(খ্রীঃপূঃ ৪৮৫-৪০৬)-এর রচনা ‘দেবতা কেউ নেই’ । এই কবিতার নাম বলে দেয় কবিতার বিষয় । প্রথম ছত্রে বলছে, ‘কেউ-কী বলছে, ঊর্ধ্বে দেবতা আছেন বিরাজমান ?/ না মশাই, ওটি মিথ্যা-ভাষণ !’ এই কবিতার আর এক অংশে বলছে, ‘শুধু চোখ মেলে দেখুন, সত্যি ঘটছে কি চারদিকে ।/ রাজারা করছে শাঠ্য, ডাকাতি,/ হামেশা কথার খেলাপ–/ জালিয়াতি ক’রে শহরের পর করছে ধ্বংস ।’ কবিতাটির শেষ ছত্রে-‘ সেই সব দেশ যারা ধর্মের কোনো তোয়াক্কা রাখে না,/ কিন্তু যাদের গায়ে অসুরের শক্তি–/তারা ভোগ করে পৃথিবী, বাকিরা হুকুমের ক্রীতদাস ।’  

বিখ্যাত জার্মান কবি ও নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেশট যিনি দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন । তাঁর কবিতায় ‘প্রাচীন গ্রীক কবিতা’ কিংবা ‘অরণ্যের গান’ পর্বের উল্লেখিত কবিতার মেলবন্ধনের সুরে সভ্যতার প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠেছে । তাঁর একটি কবিতা ‘যারা টেবিল থেকে মাংসের ভাগ তুলে নেয়’ সেই প্রতিচ্ছবি –‘ অল্প তুষ্ট হ’তে শেখার ।/ যাদের কাঁধে চাপানো হয়েছে খাজনা পাহাড়/ তাদের কাছে দাসী করো আত্মত্যাগ।/ যারা আকন্ঠ গিলছো, তারা ক্ষুধার্তদের বাণী দাও,/তোফা দিন আসছে ।/যারা দেশকে জাহান্নামে পাঠিয়েছ, গলা উঁচিয়ে বলো–/সাধারণ মানুষের পক্ষে দেশ শাসন ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ ।’ ‘মধ্যপ্রাচ্যের উপকথা’ পর্বের ‘হিতোপদেশ’এ এটাই সহজ করে বলেছে- ‘ফুর্তি ক’রে যা গিলগামেস্ ! যতটা পারিস ফুর্তি ক’রে যা !/ দিনরাত নাচ, গান, খেলা নিয়ে থাক; ভালো পোশাক পর;/ বিয়ে-থা কর; ছেলেপুলে নিয়ে আনন্দ কর!–/ তোর যা কাজ । মানুষের যা কাজ । এর বেশি আর কোথাও/ হাত বাড়াস নে ।’

ব্রেশটের একটি কবিতা ‘নেতারা যখন শান্তির কথা বলে’ এই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে সেই শান্তি কোন দিকে । কবিতার লাইনগুলো যেন এই সময়েরই দলিল । ‘নেতারা যখন শান্তির কথা বলেন/ সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে/ যুদ্ধ আসছে।/ নেতারা যখন যুদ্ধকে অভিশাপ দেন/ ততক্ষণে পল্টনদের ছাউনিগুলিতে তৈরী হওয়ার হুকুম পৌঁছে গেছে ।’ চীনের এক কবি ৎসাও সুঙ (৮৩০–৯১০ খ্রীঃ) তাঁর সময়ে যুদ্ধের চেহারা দিয়ে যুদ্ধ বিরোধের কথা বলেছেন । ‘মানুষ মারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে’ কবিতার লাইনগুলো এই সময়কেই যেন ব্যঙ্গ করেছে–‘রক্তে ভাসছে দেশ, নদী, পাহাড়, চারদিকেই মানুষ-মারা লড়াই।/ কী করে খেটে খাওয়া মানুষ কাঠ কাটতে যাবে, জ্বালানী কুড়িয়ে আনবে ?/ মহাশয় ! বড় গলায় খ্যাতি, মান, সম্মানের কথা এখন থাক,/ একদল যুদ্ধবাজ সেনাপতির সম্মান বাড়াতে দশহাজার মানুষ জবাই হয়ে যায়,/ পড়ে থাকে শুধু শেয়াল-শকুনের পরিত্যক্ত হাড়গুলি !’ 

‘লাতিন কবিতা’ পর্বের ‘কয়েকটি বচন’এর অংশ   বলে দেয় এমন নেতাদের ধর্ম । একটি বচন-‘ পুত্র ! তুমি জানো না, এই পৃথিবীকে কত অল্প জ্ঞান নিয়ে শাসন করা যায় ।’ আর একটি বচন-‘জুপিটার যাদের ধংস করতে চান, প্রথমে তাদের উন্মাদ করে দেন ।’ আরো একটি বচন যা জনসাধারণের অজ্ঞতা নেতাদের এক অস্ত্র কি সহজ কথায় ব্যক্ত হয়েছে-‘ জনসাধারণ বোকা বলতে চায়, সুতরাং তাদের বোকা বানাও ।’ ‘মধ্যপ্রাচ্যের উপকথা’ পর্বের এক কবিতা ‘একটি দুঃস্বপ্ন’ সেই কথারই যেন পুনরাবৃত্তি করেছে, ‘তিনি তাঁর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে/ আমার ভিতরে এমন পরিবর্তন ঘটালেন/ যে আমার হাত দুটি পাখির পায়ের মতো সরু/ ও দুর্বল হ’য়ে গেল ।/ আমাকে চোখের ইশারায়/ তিনি নিয়ে গেলেন/ এক অন্ধকার নরকের গহ্বরে; যাকে পাহারা দেয়/ যমদূতেরা; যেখানে প্রবেশ করলে আর ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই। ঐ অতিকায় গহ্বরের বাসিন্দারা/ আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। ধুলোই হলো/ তাদের পোশাক; কর্দম তাদের খাদ্য…।’

‘জার্মান কবিতা’ পর্বে কবি এরিক ফ্রাইড-এর কবিতা ‘পেরুর শিশুটি’ সেই বঞ্চিতের বর্ণনা দেয়–‘যেহেতু বেঁচে-থাকার সামান্য উত্তাপটুকু এখন তার নাগালের বাইরে; সমাজ ব্যবস্থা আজ তার এই হাল করেছে এবার তাকেও তল্পীতল্পা গুটিয়ে চিরদিনের মত বিদায় নিতে হবে ।’ সমাজের এমন ছবি যাদের ভাবনার তুলিতে প্রাণ পায়, যদিও ভাবনাগুলো কোন নতুন কথা বলে না, নতুন ছবি আঁকে না, তবু সেই ভাবনাগুলো বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকে এক শক্তি । ‘পোল্যান্ডের কবিতা’ পর্বে কবি সি কে নরউইড-র কবিতা ‘তাদের সংহত শক্তি’ সেই শক্তির রূপকে বর্ণনা করেছেন–‘বিশাল সেনাবাহিনীগুলি, বীর সেনাপতিবৃন্দ, পুলিশ–/ সাদা-পোশাকপরা, পুরুষ ও মহিলা;/ কাদের বিরুদ্ধে এরা সবাই একজোট ? মাত্র গুটিকয়/ ভাবনার বিরুদ্ধে; আর ঐ ভাবনাগুলিও নতুন নয় ।’

শুধু এমন ভাবনার রূপ দিয়ে সংকলনের কলেবর তৈরি করেননি কবি চট্টোপাধ্যায় । এই সংকলনে তিনি দেখিয়েছেন স্রোতস্বীনী সময়ের সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের বেঁচে থাকার অর্থই কেবল বেঁচে থাকা । এমনই পরিস্থিতিতে মানুষ তবু স্বপ্ন দেখে, জাগরণের অনুভূতি তৈরি হয় । প্রেমে-অপ্রেমে, দুঃখে-কষ্টে তাদের জীবনের চাহিদা কত সহজ করে ভাবতে পারে সে ঘটনাও এই সংকলনে ব্যক্ত হয়েছে । কিন্তু সমাজ ব্যবস্থার এই ছবি ঢাকা পড়ে যায় ক্ষমতা সংঘর্ষে সূর্য হয়ে ওঠা তাপে । এক অজ্ঞাত কবির কবিতা ‘একদিন যারা মানুষ ছিল’ সেই কথারই প্রামাণ্য হয়ে ওঠে –‘দেশের রক্তস্রাব/ আগ্নেয়গিরির বমনের মতো/ আর সব দৃশ্যকে ঢেকে দিয়েছে;/ দুপুরের প্রচন্ড সূর্য/ মৃত মানুষের শরীরগুলিকে/ চর্বির মতো/ চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে…।’

পনেরোটি পর্বের এই সংকলনে বিভিন্ন দেশ-বিদেশের লোককথা, উপকথা ও কবিতার অনুবাদের সমন্বয় মানুষের জীবন কাহিনীর যে ছবি ধরা পড়েছে তা স্থান-কাল-পাত্রে সীমাবদ্ধ নেই। ভিন্ন প্রদেশের জীবনগাথা কোন কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে আবদ্ধ নেই। সকল দেশের মানুষের জীবনগাথার সুর এক, ছন্দ এক, স্বপ্ন এক । তাই অনূদিত এই সংকলন ‘মহাপৃথিবীর কবিতা’ সত্যিই পৃথিবীর মানুষের জীবনগাথার কবিতা । প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

মহাপৃথিবীর কবিতা

–বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দে’জ পাবলিকের

কলকাতা-৭৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *