সুদীপ ঘোষাল 

পাখিরালয়

আমার এক বন্ধু পক্ষীপ্রেমী। তিনি মাঝে মাঝে পাখি দেখে বেড়ান সবুজ পোশাক পরে। আমি জিজ্ঞেস করি, সবুজ পোশাক কেন? তিনি বলেন, সবুজ রঙকে পাখি  ভয় পায় না। কারণ ওরা তো সবুজের সন্তান। আমি ওদের কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করি আর লিখে রাখি হৃদয়ের পাতায়।

বন্ধু বললেন, চলো আমরা চুপিচুপি পাখিরালয় চুপি যাই।

বন্ধু বলেন, ভিড়ে পাখিপ্রেম জমবে না। চলো আগে নৌকোয় চেপে হ্রদে  ঘুরে আসি। মাঝিকে বলামাত্র নৌকা করে ঘুরিয়ে আনলেন চুপির চর। গঙ্গা নদী থেকে গঠিত লেক বা হ্রদ  চুপি এবং কাষ্ঠশালীর মতো অতীতের গ্রামগুলিকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলে পরিণত করে। অক্স বো লেকের ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের স্ফটিক স্বচ্ছ জল এবং আশেপাশের ফলের বাগান এবং কৃষি জমিতে ৭০টিরও বেশি প্রজাতির স্থানীয় এবং পরিযায়ী পাখির আশ্রয় রয়েছে। অক্স বো হ্রদটি প্রায় ৩.৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে এবং তিনটি গ্রাম সহ একটি দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে। হ্রদে পাখি পর্যবেক্ষণ স্থানীয় দেশের নৌকায় করা হয় এবং বোটম্যানরা অতিথিদের পাখি দেখতে সহায়তা করে।

হ্রদটিতে গঙ্গার সাথে সংযোগকারী একটি সরু চ্যানেল রয়েছে এবং তাই হ্রদে ঢালা জলের একটি স্থায়ী উত্স রয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার সমৃদ্ধ পলিমাটি এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত পূর্বস্থলী অঞ্চলকে সবুজের অত্যধিক পরিমাণে সমৃদ্ধ করেছে। তাই এখানে ভুট্টা, ধান, ভুট্টা, সরিষা, পাট, আলু এবং সারা বছর ধরে বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি, ফল ও ফুলের মতো ফসল নিয়ে একটি নিবিড় কৃষি চর্চা করা হয়।

পাখি পর্যবেক্ষকদের স্বর্গ ছাড়াও পুরো পূর্বস্থলী অঞ্চলটি ইতিহাস ও ধর্মে ভারাক্রান্ত। ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে নবদ্বীপ এবং মায়াপুরের মতো শহরগুলি রয়েছে। এবং মন্দির ও ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির ধ্বংসাবশেষ সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, পূর্বাস্তালি ইতিহাস প্রেমীদের কাছেও প্রিয়। কলকাতা থেকে পূর্বস্থলী যাওয়ার পথটি কালনা, হংসেশ্বরী, গুপ্তিপাড়া এবং সুখরিয়া মন্দিরের শহরগুলির মধ্য দিয়ে যায়, যা পূর্বস্থলীতে যাত্রাটিকে আরও উপভোগ্য এবং সমৃদ্ধ করে তোলে। এটি সমুদ্রনগর এবং নাতুনগ্রামের মতো টেক্সটাইল এবং হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত সবুজের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং গ্রামগুলির মধ্য দিয়েও যায়।

সাম্প্রতিক অতীতে, এক্সিকিউটিভ অফিসার (BDO)-এর কার্যালয় – পূর্বস্থলী II, স্থানীয় হিরো ক্লাব এবং কাষ্ঠশালী গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের যৌথ প্রচেষ্টায় লেকের পাশে পর্যটকদের থাকার বিকল্প সহ একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য পার্ক তৈরি করা হয়েছিল৷ বর্তমানে, এখানে পর্যটন সুবিধায় চারটি নবনির্মিত লেকসাইড কটেজ, একটি আট শয্যার ডরমিটরি এবং দুটি ডাবল বেড রুম রয়েছে। একটি শিশু পার্ক এবং একটি ওয়াচ টাওয়ারও সম্প্রতি চালু হয়েছে।

 এখানকার নীরবতা ভেঙ্গে যায় যখন চুপীর চরের পালক বন্ধুদের সাথে দেখা হয়। এই ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অক্সবো হ্রদটি সারা বিশ্বের পাখিদের আকর্ষণ করে। আপনি গাডওয়াল, ইউরেশিয়ান উইজেনস, নর্দার্ন পিনটেলস, কিংফিশার, ইন্টারমিডিয়েট এগ্রেট, স্যান্ডপাইপার, পোচার্ড এবং আরও অনেকের ঝাঁক দেখতে পারেন। নৌকা যাত্রার খরচ প্রতি ঘন্টায় ১৫০ টাকা। এই অক্সবো হ্রদটি এখনও গঙ্গা নদীর সাথে সংযুক্ত এবং এটি এখানকার জলের প্রধান উত্স। স্ফটিক স্বচ্ছ জলের নীচে আপনি বিভিন্ন ধরণের প্লাঙ্কটন এবং আগাছা দেখতে পাবেন।

ভিড় ফাঁকা হলে বন্ধু নিয়ে গেলেন চরের ধারে সবুজ বনে।সেখানে দুটি তিতির পাখি সঙ্গমে রত। বন্ধু মুখে আঙুল দিয়ে বললেন, চুপ, চুপিচুপি গেলে  ওদের  কথা শোনা যায়। সত্যি বন্ধুর সঙ্গে আমিও হারিয়ে গেলাম পাখিরালয়ের  ডানার আড়ালে। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

উজানি সতীপীঠের সন্ধানে

অজয় নদের পাড়ে এই মন্দির অবস্থিত। মূল মন্দিরটিতে প্রথমে একটি বারান্দা আছে। তার ভিতরে আয়তাকার গর্ভগৃহ। এই গর্ভগৃহের মধ্যে মা মঙ্গলচণ্ডীর ছোটো কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি রয়েছে। প্রাচীন মূর্তিটি নব্বইয়ের দশকে চুরি হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে মল্লিক উপাধিধারী গ্রামের এক ধনী পরিবার বর্তমানের কষ্টিপাথরের দশভুজা মূর্তিটি নির্মাণ করে দেন। সেই থেকে এই কষ্টিপাথরের মূর্তিটির পূজা হচ্ছে। ২০০৬ সালে মন্দিরটি সারানো এবং বাড়ানো হয়েছে। মূল মন্দিরের সামনে একটি ছোট নাটমন্দির যোগ করা হয়েছে।

প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকে। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। উজানি সতীপীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী। উঁচু কালো রঙের পাথরের একটি শিবলিঙ্গ হল দেবীর ভৈরব । ভৈরবের নাম কপিলাম্বর। অনেকে কপিলেশ্বর বলেও উল্লেখ করেন। শিবলিঙ্গের সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট মূর্তি আছে। শুধু তাই নয়, ভৈরবের বাঁদিকে একটি বজ্রাসন বুদ্ধমূর্তিও আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এই মূর্তিটি পাল যুগের।কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে বর্ণিত ভ্রমরার দহ, মাড়গড়া, শ্রীমন্তের ডাঙা প্রভৃতি স্থানগুলি উজানিতেই। বর্তমানে সেই স্থানগুলির হদিশ পাওয়া যায় না। কথিত আছে সপত্নীপীড়িতা খুল্লনা উজানির কাছে ছাগল চরাতেন। যে স্থানে ভাত রান্না করে মাড় গালতেন সেই স্থানটি মাড়গড়া নামে পরিচিত ছিল। চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতি দত্ত এই ভ্রমরার দহ থেকেই ডিঙায় চেপে সিংহলে বাণিজ্যে গিয়েছিলেন। আবার তাঁর পুত্র শ্রীমন্তও মঙ্গলচণ্ডীর চরণে পুজো দিয়ে সিংহলে পিতার অনুসন্ধানে যেতে ভ্রমরার দহ থেকেই সাত খানি ডিঙা ভাসিয়েছিলেন। যে স্থানে দাঁড়িয়ে সাতখানি ডিঙা দেখেছিলেন সেই স্থানটি শ্রীমন্তর ডাঙা নামে পরিচিত ছিল। সেগুলির সন্ধান বর্তমানে না পাওয়া গেলেও উজানির সতীপীঠ-কপিলাম্বর রয়েছেন স্বমহিমায়। দেবীর মূল পুজো হয় শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময়। পুজো চলে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত। এটি সতীপীঠ হওয়ার কারণে পুজোয় আলাদা করে মূর্তি আসে না এবং নবপত্রিকা আনা হয় না। শুধু ঘট বারি আনা হয়। বছরে তিনবার ঘট বদল হয়। প্রথম ঘট আসে বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার এবং বাৎসরিক পুজো হয়। এরপর ঘট আসে জিতাষ্টমীর পরদিন, যাকে বোধনের ঘট বলা হয়। তারপর ঘট আসে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন। এছাড়াও বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবারে মঙ্গলচণ্ডীর পুজো হয়। এখানে বলিপ্রথা চালু আছে। দুর্গাপুজোর সপ্তমী এবং অষ্টমীতে চালকুমড়ো, নবমীতে চালকুমড়ো, কলা, আখ এবং ছাগ বলি হয়। মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীরা লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর মিশ্রণ। লৌকিক দেবদেবীদের সঙ্গে কালে কালে যুক্ত থাকে পরিপুষ্ট গভীর আবেগ, ভক্তির উচ্ছ্বাস, অন্ধবিশ্বাসের ঐকান্তিকতা। শ্রীমন্ত এই স্থান থেকে সিংহলে যাত্রা করে সিদ্ধকাম হয়েছিলেন এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই উজানি শক্তিপীঠের প্রতি সাধারণ মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাস আজও অমলিন।

 পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর বাঁ হাতের কনুই পড়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী মঙ্গলচন্ডী এবং ভৈরব হলেন কপিলাম্বর বা কপিলেশ্বর। পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরার কাছে কোগ্রামে অবস্থিত এই সতীপীঠ।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখন্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। বলা হয় কোগ্রামের সতীপীঠ উজানিতে মাতা সতীর বাঁ হাতের কনুই পড়েছিল। এদেশের প্রতিটি ঘরে রয়েছে ঈশ্বর আরাধনার বাতাবরণ। রয়েছে সেই মহাশক্তির ছায়া। বাকি ভারতের সঙ্গে তুলনা টানলে দেখা যাবে যে এই বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। এমনকী এখানে নাস্তিকতার আড়ালেও চলে দৈব সাধনা, পুজো-অর্চ্চনা, জপ-তপ। চলে তন্ত্রচর্চাও। যার সাহায্যে জীবনের অনেক কঠিন পরিস্থিতিকে সহজে সামলে নেন ভক্তরা।

এই বাংলার আরও বড় সুবিধা যে এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি শক্তিপীঠ। বেশ কয়েকটি সিদ্ধপীঠ। এই বাংলায় জন্ম নিয়েছেন একের পর এক মহাপুরুষ। এমনই এক শক্তিপীঠ হল পূর্ব বর্ধমান জেলার কোগ্রামের উজানি। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী যেখানে দেবী সতীর বাম হাতের কনুই পড়েছিল। এখানে দেবী মণ্ডলচণ্ডী। আর ভৈরব কপিলাম্বর বা কপিলেশ্বর।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

দেখতে গেলাম ভারতের শেষ জনপদ

কাজের ফাঁকে নির্জনতা খোঁজেন মানুষ। আর এই নির্জনতা খুঁজতেই তার ঝালং এর কথা মনে পড়ে।আমি সুমনদাকে বললাম,সুমনদা চলো আমরা বেড়াতে যাই ঝালং এ।

  আমি সুমনদার সঙ্গে ছায়ার মত থাকি তার পরিবারের একজন হয়ে।শিয়ালদহ থেকে, কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। রাত সাড়ে আটটায় ছেড়ে পরের দিন দুপুরে পৌঁছবে নিউ মাল জংশন। এখান থেকে ঝালং ৪৫ কিলোমিটার। গাড়ি রিজার্ভ করে আসতে হবে। হাজার দেড়েক টাকা ভাড়া পড়বে। এ ছাড়া, নিউ জলপাইগুড়িতে নেমেও আসা যায় ঝালং। নিউ জলপাইগুড়ি বা এনজিপি থেকে ঝালংয়ের দূরত্ব ১০৪ কিলোমিটার। ঝালংয়ে সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা হল পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের তাঁবু। নদীর ধারে পরপর কয়েকটি তাঁবু রয়েছে। যেন প্রকৃতির কোলে বসবাস। 

সুমনদা বললেন, গরম অনেকটাই কমে গিয়েছে। বর্ষাও বাংলার দরজায় কড়া নাড়ছে, চল এবার ঘুরে আসি। তাই বাঙালির ভ্রমণ পিপাসু মন আবার জেগে উঠেছে। এই বর্ষায় যদি ২ থেকে ৩ দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে আর আপনি যদি রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তা হলে ঘুরে আসুন ঝালং থেকে। শিলিগুড়ি থেকে ৯৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। শিলিগুড়ি থেকে ভুটান যাওয়ার পথেই আসে এই গ্রাম। জলঢাকা নদীর ধারে অবস্থিত এই  অঞ্চলের সৌন্দর্য চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো। এই সরু নদীতে গিয়ে মিশেছে ঝোলুং-এর মতো বেশ কিছু ঝোরা। জলের টলটলে নীল জল দেখে স্বপ্নের জগতে পৌঁছে যাওয়া যায়। নদীর উপরের দোলনা ব্রিজ অ্যাডভেনচার প্রেমীদের জন্য আদর্শ। যাঁরা ভিড় পছন্দ করেন না, তাঁরা অনায়াসে ঝালং গিয়ে নির্জনতা উপভোগ করতে পারেন। এখানে গাড়ি-হর্নের আওয়াজের কোনও চিহ্ন নেই। সারা দিন ধরেই ঝর্নার জলের শব্দ। বর্ষায় তার সঙ্গে বৃষ্টির আওয়াজ আর ঝিঁঝির শব্দ মিশলে পরিবেশটা আরও রোমাঞ্চকক হয়ে ওঠে এছাড়াও সবুজে ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে রঙ বেরঙের কাঠের বাড়িগুলি দেখার মতো। সঙ্গে রয়েছে রাস্তার ধারে সার দেওয়া কমলালেবুর বাগান। বর্ষার সময়ে পুরো চিত্রটাই আরও রঙিন হয়ে ওঠে। রাতেও ঝালং-এর সৌন্দর্য দেখার মতো। রাতে জোনাকি যেন সৌন্দর্য আরও নিবিড় করে তোলে। আর একটু দূরে, ঝালং-এর কাছেই রয়েছে বিন্দু গ্রাম। এই পাহাড়ি গ্রাম নানা রকমের গাছ দিয়ে সাজানো। গ্রামে একটি বাঁধ রয়েছে, তার উপরে উঠলে ভুটানকে এক ঝলক দেখে নেওয়া যায়।চালসা থেকে কুমানি, গৈরিবাস হয়ে পথ গিয়েছে ঝালং-এ। ঝালংয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে জলঢাকা নদী। বনবাংলোর পাশে ঝোলুং ঝোরা এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে জলঢাকা নদীতে। সামনে জলঢাকার ওপর ব্রিজ। ঝালং থেকে পাহাড়ি পথে ছোট্ট গ্রাম প্যারেন হয়ে ভুটান সীমান্তে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। পথে পড়বে ঝালং-এ জলঢাকা হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্ট, প্যারেনে রঙিন রঙিন কাঠের বাড়িঘর আর রাস্তার ধারে কমলালেবুর বাগান। ছবির মতো পাহাড়ি গ্রাম বিন্দু। রঙিন কাঠের বাড়ির জানলায়, বারান্দায় টব আলো করে রয়েছে ফায়ারবল, পিটুনিয়া, গ্ল্যাডিয়োলা আর অর্কিডের ফুল। বিন্দুতে জলঢাকা ব্যারেজের ওপারে ভুটান। বাঁধের ওপর পায়ে হেঁটে ওঠা যায়, ছবি তোলা নিষেধ। হেঁটে আসা যায় ওপারে ভুটানের চৌহদ্দি থেকেও। হাটবারে ভুটানের গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসেন বিন্দুতে বাজারহাট সারতে। প্রয়োজন মুছে দেয় রাজনৈতিক সীমারেখা। এখানে বিন্দু নদী জলঢাকায় মিশেছে। নদীর গা থেকে খাড়াই উঠে গেছে ভুটান পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে বিন্দু থেকে হিমালয়ের বরফশৃঙ্গ দেখা যায়। বুধবারে ঝালং-এ আর বৃহস্পতিবারে বিন্দুতে হাট বসে। শিলিগুড়ি থেকে বিন্দুর দূরত্ব ১০৪ কিমি। ঝালং থেকে বিন্দু ১৩ কিমি। ঝালং থেকে দলগাঁও হয়ে রঙ্গো বেরিয়ে নেওয়া যায়। প্যারেন থেকে ঘুরে আসা যায় তোদে।

এছাড়াও চালসা থেকে কুমানি, গৈরিবাস হয়ে পথ গিয়েছে ঝালং-এ। ঝালংয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে জলঢাকা। ঘন কাঠের বনভূমি এবং পটভূমিতে ভুটানের বিস্ময়কর পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত, ঝালং নিঃসন্দেহে প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।

দ্য পাহাড় স্টেশন কাছাকাছি অবস্থিত ইন্দো-ভুটান তীরে সীমানা জলdাকা নদী, পথে বিন্দু। জলধাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপর জলdাকা নদী এই অঞ্চলে একটি প্রধান আকর্ষণ। পাখি প্রেমীরা পার্বত্য পাখির পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ উপভোগ করতে পারেন জলের পাখি। আছে জলঢাকা নদী। বনবাংলোর পাশে ঝোলুং ঝোরা এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে জলঢাকা নদীতে। 

সামনে জলঢাকার ওপর ব্রিজ। ঝালং থেকে পাহাড়ি পথে ছোট্ট গ্রাম প্যারেন হয়ে ভুটান সীমান্তে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। পথে পড়বে ঝালং-এ জলঢাকা হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্ট, প্যারেনে রঙিন রঙিন কাঠের বাড়িঘর আর রাস্তার ধারে কমলালেবুর বাগান। ছবির মতো পাহাড়ি গ্রাম বিন্দু। রঙিন কাঠের বাড়ির জানলায়, বারান্দায় টব আলো করে রয়েছে ফায়ারবল, পিটুনিয়া, গ্ল্যাডিয়োলা আর অর্কিডের ফুল। বিন্দুতে জলঢাকা ব্যারেজের ওপারে ভুটান। বাঁধের ওপর পায়ে হেঁটে ওঠা যায়, ছবি তোলা নিষেধ। হেঁটে আসা যায় ওপারে ভুটানের চৌহদ্দি থেকেও। হাটবারে ভুটানের গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসেন বিন্দুতে বাজারহাট সারতে। প্রয়োজন মুছে দেয় রাজনৈতিক সীমারেখা। এখানে বিন্দু নদী জলঢাকায় মিশেছে। নদীর গা থেকে খাড়াই উঠে গেছে ভুটান পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে বিন্দু থেকে হিমালয়ের বরফশৃঙ্গ দেখা যায়। বুধবারে ঝালং-এ আর বৃহস্পতিবারে বিন্দুতে হাট বসে। শিলিগুড়ি থেকে বিন্দুর দূরত্ব ১০৪ কিমি। ঝালং থেকে বিন্দু ১৩ কিমি। ঝালং থেকে দলগাঁও হয়ে রঙ্গো বেরিয়ে নেওয়া যায়। প্যারেন থেকে ঘুরে আসা যায় তোদে।

কয়েকদিন ওখানে কাটিয়ে আমরা ফিরে আসি।কিন্তু ঝালং এর প্রকৃতির শোভা মানসপটে ভেসে ওঠে বারে বারে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

অট্টহাস সতীপীঠ

ধর্মতলা থেকে নিরোলের সরকারি বাস (SBSTC) পাওয়া যায়। তবে বাসে সময়টা একটু বেশিই লাগে। বাস ছাড়ার সময় হল বিকেল তিনটে। ওই বাসটি নিরোল পৌঁছায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ। নিরোলে নেমে টোটো রিক্সাকে বললেই পৌঁছে দেয় অট্টহাস সতীপীঠে। আপনি চাইলে মন্দিরে আগে থেকে ফোন করেও আসতে পারেন। তাতে আপনারই সুবিধা। অতিথিতের থাকার জন্য জায়গা আছে। ভক্তদের থাকা, খাওয়া মন্দির থেকেই পরিচালিত হয়।

এছাড়াও কাটোয়ার আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্মস্থান। যেমন, চৈতন্য চরিতামৃতের লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজের বাড়ি ঝামতপুর নামের এক গ্রামে। বাংলায় মহাভারতের রচয়িতা কাশীরাম দাসের বাড়ি কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত সিঙ্গি গ্রামে। ফলে অট্টহাসে এলে এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্মস্থানেও ঘুরে আসা যায়। অন্যদিকে কাটোয়া থেকে ১০ কিলোমিটার দূরেই জগদানন্দপুর গ্রাম। সেখানে রয়েছে রাধাগোবিন্দ জিউয়ের মন্দির। যদি পুরাতত্ত্ব নিয়ে কারুর আগ্রহ থাকে, তাহলে এই মন্দিরের গঠনশৈলি আপনাকে অবাক করবেই। মন্দিরের পূর্বপাশে সাধক ভোলাবাবার মন্দির ৷ পঞ্চমুন্ডির আসন ৷ রটন্তী কালিকা মন্দির ৷এই কালীর কাছে ডাকাতরা পুজো করত ৷ আগে অট্টহাসে পূজার পর শিবাভোগের( শিয়ালকে খাওয়ানো ) ব্যবস্থা ছিল ৷ ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় শৃগালকূল ধ্বংস হওয়ায় এখন ওই প্রথা উঠে গেছে ৷ শাক্তদেবী হলেও এখানে বাৎসরিক পুজো হয় বৈষ্ণবীয় উৎসবের সময় দোল বা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ৷ এখানে ধূমধাম সহকারে ওই উৎসবের প্রচলন করেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ বা কাটোয়ার বিখ্যাত দুলাল সাধু ৷

এই সতীপীঠে দেবীর পাথরের প্রতিমার উপর মহিষমর্দ্দিনীর পাথর মূর্তি রেখে নিত্যসেবা করা হয় ৷ মহাভোগ যোগে কালীমন্ত্রে দেবী পূজিতা হন ৷ এখানে মূল অধিষ্ঠাত্রী দেবী দন্তরা চামুন্ডা ৷ ভূগর্ভের কয়েক হাত নিচে রয়েছে সতীর মূল শিলা বা পাথর ৷ হাজারেরও বেশি বছর আগের একটা নথি পাওয়া গেছে যেখানে একটা স্কেচ আছে, তাতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়৷ “অট্টহাসে চ চামুন্ডা তন্ত্রে শ্রী গৌতমেশ্বরী “৷ তাই , অনেকে বলেন এখানে প্রাচীন বৌদ্ধ দেবীর হিন্দুআয়ন হয়েছে ৷ তাই, মনে হয় হিন্দু ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক, বজ্রযানী ও সিদ্ধাচার্যগণ এখানে সাধনা করেছেন ৷

মায়ের কাছেই ছোট মন্দিরে বিল্লেশ থাকলেও মূল বিল্লেশ মন্দির বিল্লেশ্বর গ্রামে ৷ সেখানে শিব লিঙ্গ মাটিতে বসা ৷ কষ্ঠি পাথরের শিববাহন ষাঁড়ের মূর্তি ৷ মহাপীঠ নিরূপম গ্রন্থে এই পীঠের কথা বলা হয়েছে ৷ এই পীঠে একসময় ভয়ানক রঘু ডাকাত পুজো করে ডাকাতি করতে যেত ৷ সে  নরবলি দিত বলে জনশ্রুতি আছে ৷ আবার যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত “বাংলার ডাকাত ” বইয়ে বলেছেন এখানে বেহারী বাগদী নামে এক ডাকাত পুজো করে নরবলি দিত ৷ ত্রিশ একর জঙ্গলে ঘেরা এই মন্দিরে আজও গা ছমছমে পরিবেশ ৷ 

এরপর অনেক বছর কেটে যায়। এই স্থান জঙ্গল হয়ে ওঠে। তখন এ স্থানের নাম ছিল খুলারামপুর বা তুলারামপুর।পরবর্তীতে এই গ্রামের নাম দক্ষিণ ডিহি হয়।এই গ্রামে কিছু কৃষক বাস করত। তারা মাঠে চাষবাদ করত। ঈশানি নদীর ধারে অবস্থিত এ স্থান ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। দিনের বেলাতেও ওখানে কেউ যেত না। একদিন কৃষকরা চাষ করতে গিয়ে এক সাধুবাবাকে জঙ্গলে ধ‍্যানমগ্ন দেখতে পায়। তাড়া কৌতূহলী হয়ে দলবদ্ধভাবে তার কাছে যায় ও তাকে প্রণাম করেন।সাধুবাবা এখানে যজ্ঞ করেন। যজ্ঞ শেষে তিনি যজ্ঞস্থানে একটি ত্রিশূল পুঁতে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। চলে যাবার আগে বলেন, এটি একটি সতীপীঠ।

মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ঈশাণী নদী। কাছেই রয়েছে শ্মশান। এই এলাকাটি আগে এত বেশি জঙ্গলে ভরা ছিল যে, দিনের বেলায়ও যেতে সাহস পেতেন না অনেকে। তবে এখন খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে মন্দিরটিকে। রাতে ঘুমানোর সময় কানে আসবে শিয়ালের ও প‍্যাঁচার ডাক, সকালে উঠবেন পাখির ডাকে। শান্ত পরিবেশে ভক্তি ভরে পুজো দিতে পারবেন আপনি। কথিত আছে একমনে মাকে ডাকলে সতীমায়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায় আজও।

সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞে সতী শিবনিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত‍্যাগ করেন। এর পর মহাদেব বীরভদ্রকে পাঠান দক্ষকে বধ করতে। সতীর দেহ নিয়ে তিনি শুরু করেন তাণ্ডবনৃত্য। ফলে বিষ্ণু  সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ বিভিন্ন ভাগে খণ্ডিত করেন। এই অংশ গুলো যেখানে পরেছে সেখানে শক্তিপীঠ স্থাপিত হয়েছে। এগুলোকে সতীপীঠ বলে। যেগুলি তীর্থে পরিণত হয়েছে। এখানে দেবীর অধর / নিচের ঠোঁট, পতিত হয়, এরজন্য এই সতীপীঠের নাম অট্টহাস সতীপীঠ।

ছোটো থেকেই আমার পিসির বাড়ি শ্রীরামপুর, রাউন্দি গেলেই একবার অট্টহাস ঘুরে আসতাম। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে সেখানে পঞ্চমুন্ডির আসন মাটির বেদি ছিল আর ছিল মনোহরা সবুজ প্রকৃতি। সনৎ বাবা,অরুণবাবা,সোনামহারাজ পেরিয়ে আজকের মহারাজ বললেন, এখন সতীপীঠের উন্নতি হয়েছে খুব। ঘুরে দেখলাম বৃহৎ শিবের মূর্তি, মনি্দির অতিথি নিবাস ও নানারকম পরিযায়ী পাখি।

অট্টহাস শক্তিপীঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার নিরোল গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ ডিহি গ্রামে অবস্থিত। এর উত্তরে ঈশাণী নদী ও কিছুটা দূরে শ্মশান। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পীঠ। মন্দিরের কাছেই কিছু পিকনিক স্পট। জঙ্গলঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ। এখানে গাছে গাছে বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি, ফড়িং, পাখি দেখা যায়। রাতের বেলা প্যাঁচার ডাক ও প্রহরে প্রহরে শেয়ালের ডাক শোনা যায়, যা এখানকার পরিবেশে আলাদা এক মাত্রা যোগ করে। 

এখানে দেবীর দন্তুরা চামুণ্ডা মূর্তি। এই স্থানে দেবীকে অধরেশ্বরী নামে পূজা করা হয়। এখানে আছে এক প্রাচীন শিলামূর্তি।মন্দিরের অষ্টধাতুর মূর্তিটি চুরি হয়ে গেছে।

সারা বছর এখানে ভক্তরা আসে। তবে নভেম্বর থেকে মার্চ, এই পাঁচ মাস এখানে বহু ভক্তের সমাগম হয়। শোনা যায় অনেকের ইচ্ছাপূরণ হয়েছে এখানে পূজা দিয়ে। দোলের সময় এখানে বিশাল মেলা বসে। এখানে থাকার জন্য অতিথি নিবাস আছে। মন্দির থেকে ভক্তদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *