সুতপন চট্টোপাধ্যায়
বিপুলা ২
রাকেশ একদিন বিপুলাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়ি নয়, কাছের বস্তি। বস্তির ভিতর এক কোনে রাকেশের ঘরের পাশে একটা ঘর, সেখানেই থাকতে দেবে বিপুলাকে এমনই বুদ্ধি কাজ করেছিল রাকেশের মনে। ভেবেছিল মাকে গিয়ে বললেই মা রাজি হবে, দাদাকে রাজি করাবে, কিন্তু তা হল না। রাকেশের দাদা রাতে কাজ থেকে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে লাগিয়ে দিল তুমুল ঝগড়া। বিপুলাকে দেখে বলল, ওকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দে। না দিলে আমি তুলকালাম করে ছাড়ব। প্রথমে ভয় খেয়েছিল বিপুলা। কিন্তু রাকেশের কান্ড দেখে তার উপর ভরসা বেড়ে গেল তার। রাকেশ দাদার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে সপাটে কষিয়ে দিল জোরাল চড়। নেশার ঘোরে সে ছিটকে আছড়ে পরেছিল নর্দমায়। সেই ফাঁকে বিপুলাকে নিয়ে সে বাস ধরে চলে গিয়েছিল তার মাসির বাড়ি। নৈনিতালের কাছে পন্থনগরে। রাতের বাসে।
নৈনিতাল থেকে পন্থনগরের দুরত্ব প্রায় সত্তর কিলোমিটার। মাসি ছিলেন এক ইস্কুলের শিক্ষিকা। তিনি দুজনকেই তার ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। বাইরে তাদের পরিচয় দিয়েছিলেন ভাইপো ও ভাইঝি । মাসির কোন সন্তান ছিল না। তাঁর জীবনে এক নতুন জোয়ার এল। রাকেশ ও বিপুলা পন্থনগরের গোবিন্দ বল্লভ পন্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর হবার পর যখন নিজেদের জীবিকার সন্ধানে খোঁজাখুঁজি করছে, সেই সময় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন মাসি। এই সময়ের মধ্যে দু’একবার দিল্লি গিয়েছিল রাকেশ কিন্তু থাকেনি। মায়ের সঙ্গে দেখা করেই রাতের বাস ধরে ফিরে গিয়েছিল পন্থনগরে। সে তার দাদার সঙ্গে আর কোনদিন কোন সম্পর্ক রাখেনি। বিপুলাকে বলেছিল, সে যেন কোন দিন দিল্লির বাড়িতে যেতে না চায়। মাসির দু’বছর আগেই মা মারা গেল। রাকেশ বাড়ি গিয়ে মায়ের কাজ করে ফিরে এসেছিল পন্থনগরে। ইচ্ছে ছিল, চাকরি পেলে মাকে নিজের কাছে রাখবে। কিন্তু তার আগেই মা চলে গেলেন। মাকে নিজের কাছে রাখা হলনা, সেই আক্ষেপ সারা জীবন বয়ে বেড়ায় রাকেশ। মাসি নিজের অবসরের এক মাসের মাথায় চলে গেলেন, অনেক অনেক দিন পর রাকেশ ও বিপুলা অবিভাবকহীন হলো পন্থনগরে।
২
রাকেশের মাথায় যখন চাকরি প্রধান হয়ে ওঠে তখন বিপুলা বেছে নেয় গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলা হর্টিকালচার নিয়ে গবেষণার দ্বিতীয় বর্ষে রাকেশ লুফে নেবার মতো চাকরি পেল কেনিয়ায়। চাকরিটা এতোই ভাল যে রাকেশ না করতে পারল না। রাজধানী নাইরোবি থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে থিকা নামের এক জেলা শহরের কাছে এক ফুলের কোম্পানির ম্যানেজারের চাকরি। অকল্পনীয় বেতন। মার্কিন ডলারের বেতনের চাকরি কে হাতছাড়া করে? রাকেশ করেনি। একাই চলে গিয়েছিল থিকা শহরে। কোম্পানি বিশাল এপার্টমেন্ট দিয়েছিল, গাড়ি ছিল চব্বিশ ঘন্টা। চাকর ছিল দুটো। এক কথায় রাজার চাকরি। চলে গেল রাকেশ , পন্থনগরে পড়ে রইল বিপুলা।
পাঁচ বছর গবেষণা শেষ করে বিপুলা চলে গেল থিকায়। রাকেশের সঙ্গে সংসার তার গড়ে ঊঠল পৃথিবীর অন্য এক অনুন্নত দেশে। এখানেই জন্ম গ্রহণ করে অন্তরা।
প্রতিদিন ভোরে নাইরোবি বিমানবন্দর থেকে দুটো বিমান নেদারল্যাণ্ডের দিকে রওনা হয়। নাইরোবির চারপাশে অনেক ফুলের গ্রিন হাউস। রাকেশ তেমনি দুটো গ্রিন হাউসের ম্যানেজার। প্রতিটি ফুলের বাগান থেকে ভোরে বিভিন্ন ফুল এসে আধুনিক পদ্ধতিতে মোড়কের মধ্যে জড়ো হয় বিমানবন্দরে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার নেদারল্যাণ্ডে । সেখানেই এই সব টাটকা ফুল বিমান থেকে নামান হয়। তারপর নিলামেও চড়ে। নেদারল্যাণ্ড থেকে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে যায় ফুলের সম্ভার। কেনিয়ার এই ফুলের ব্যবসা দীর্ঘদিনের ও লাভজনক । দিন দিন বেড়েই যাছে এই গ্রিন হাউসের সংখা।
এই সব গ্রিন হাউসে চাকরি করে তরুন তরুনী। যাদের বাড়িতে আর থাকার অনুমতি নেই। তারা সামান্য মাইনেতে নিজেদের খরচ চালানোর তাগিদে এই ফ্লোরি কালচারের বাগানে চাকরি করে। প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে, সন্তান হয়, বিয়ে ভেঙে যায়। একদিকে সুন্দর ফুলের সুগন্ধমাখা জীবন, পাশাপাশি জীবন কি যন্ত্রণাময়! প্রথম প্রথম রাকেশের খারাপ লাগত। ফোনে এই সব বলত বিপুলাকে।
বিপুলা শুনতো কিন্তু কিছুই করার ছিল না। অপেক্ষা ছিল গবেষণার সমাপ্তির।
এখানে এসে বিপুলা যে কোন কোম্পানিতে পরামর্শদাতা হিসেবে যোগদান করতে পারত অনায়াসে। তা সে করে নি। সে এই ছন্নছাড়া ছেলেমেয়েরদের নিয়ে এক সমিতি করেছিল যেখান থেকে দক্ষ শ্রমিক গড়ে ওঠে। অনেক বড় দায়িত্ব নিতে পারে গ্রিন হাউসে। বেশি মাইনে দাবি করতে পারে। কাজ টা যে মহৎ কিন্তু অনেকের পছন্দ হল না। বাধা আসতে লাগল। একদিন দুটো ছেলে এসে শাসিয়ে গেল রাকেশকে।
অন্তরা বড় হচ্ছে। বিপদ কোন দিক থেকে আসবে আন্দাজ করা মুশকিল এই বিদেশের মাটিতে। কিন্তু বিপুলা বুঝতে পেরেছিল, এভাবে সে এখানে থাকতে পারবে না।
এক বসন্তের মাসান্তে বিপুলা অন্তরাকে নিয়ে চলে এলো সি এস আই আরে চাকরি নিয়ে ভারতে । পড়ানো, গবেষণা ও গবেষণার দায়িত্বে চলে এসেছিল বিপুলা। একা মেয়েকে নিয়ে প্রথম বছর খুব অসুবিধা হল। পরের বছর রাকেশ চাকরি থেকে অবসব নিয়ে আগেই চলে এল বিপুলার কাছে।
অধ্যাপিকা শর্মা চেয়ারে নড়ে চড়ে বসলেন। তারপর বললেন, আমি অনেকবার বারণ করেছিলাম রাকেশকে। বলেছিলাম দরকারে আমি বছরে দুবার তার ওখানে চলে যাব। ছুটিতে থেকে আসব। কিন্তু রাকেশ শোনেনি। সে মেয়ের কাছে থাকতে চেয়ে নিজের কেরিয়ার ছেড়েছিল। আমার কোয়ার্টারসে এসে সে কিছুদিনের পর এক অদ্ভুদ রোগের শিকার হল। সে রোগের জন্য আমাকে কিছুদিন ছুটি নিয়ে বিভিন্ন ডাক্তারের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে।
বলতে বলতে তিনি কেমন নিস্প্রভ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, আপনাকে একটা কথা বলার আছে।
আমি বললাম, বলুন।
অধ্যাপিকা শর্মা বললেন, রাকেশ মানসিক ভাবে সুস্থ নয়। তার ভিতরে এক গভীর ডিপ্রেশন কাজ করে কখনো কখনো। আর সেই ডিপ্রেশন শুরু হলে সে উদাসীন, বাক্যহারা, নিথর মানুষে বদলে যায়। আমি তখন তাকে কিছুই বলিনা। সে যা চায় তাই করতে দিই। এর মধ্যে অন্তরা, বলে থেমে গেলেন অধ্যাপিকা শর্মা।
অন্তরা কোথায়? মনের ভিতর প্রশ্নটা ডলফিনের মত লাফিয়ে উঠল। অন্তরা ইস্কুল শেষ করে বিদেশে চলে গিয়েছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে রাজেশ পাঠাতে চায় নি। অন্তরার জোরের কাছে কোন কিছুই দাঁড়ায়নি। খর কুটোর মত ভেসে গিয়েছিল তার জেদের তোড়ে। দু’বছর পর তার আর হদিশ পায়নি। অনুমান করা যায় সে স্নান করতে গিয়ে তলিয়ে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরে। খবরটা অনেক পরে আসে তাদের কাছে। দুজনেই উড়ে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসে । তারপর থেকে রাকেশ কেমন মন মরা হয়ে থেকে, অসংলগ্ন ব্যবহার করে, রাতে না ঘুমিয়ে নানান ফুলের নাম ধরে কাকে যেন ডাকে। নিজের মনে অন্তরার সঙ্গে কথা বলে। তখন তাঁর শরীরে এই অশরীরী ভর করে। সে না চিনতে পারে বিপুলাকে, না চিনতে পারে তার ঘর বাড়ি। একা একা বসে থাকে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটা নিমগ্ন মানুষ, কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে তার নিজস্ব পৃথিবীতে।
দরজাটা আসতে খুলে গেল। পর্দা সরিয়ে ঘরে এল রাকেশ। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন দেখছেন?
আমি কী উত্তর দেব ভেবে পাচ্ছি না। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। রাকেশ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন দেখছেন বিপুলাকে?
এবারও কোন উত্তর মুখে এল না। বিপুলা বলল, হঠাৎ হয়তো মনে পরেছে তার দিল্লির কথা। আপনাকে ও চেনে। অনেককাল আগে দেখেছে। ও জানে সব। কিছু একটা মনে পড়েছে। তাই চলে এসেছে আমাদের মধ্যে। না হলে সচরাচর আসে না।
আমি বললাম, আপনি বসুন। রাকেশ বসল। তারপর বলল, আজ ম্যাগনোলিয়া গাছটাতে অনেক ফুল ফুটেছে। সাদা ফুল। আমি কাল অনেকগুলো কুড়ি দেখেছিলাম। আজ আস্তে আস্তে ফুটছে। বলে ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে চলে গেল।
বিপুলা নিচু গলায় বলল, ম্যাগনোলিয়া ফুলের গাছ এখানে চৌহদ্দির মধ্যে নেই। ও সারা দিন এই সব দেখে। কোন এক গভীর যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খোঁজে সারা দিন।
আর আমি ছাত্রীদের নিয়ে থাকি।
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি বিপুলার দিকে। কোলাঘাট থেকে আসা এক মানুষের জীবন ম্যাগনোলিয়া ফুলের মত শুভ্র নয় কিন্তু তার চিহ্ন বিপুলার চোখে মুখে কোথাও নেই।
এতো কিছুর পরেও সে কী করে যে গবেষণা করায়?
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
