সুতপন চট্টোপাধ্যায়

    বিপুলা

বিপুলাকে পাঠিয়েছে বিতস্তার মা। কোলাঘাটের মেয়ে গ্রামের কোন দাদার হাত ধরে এসেছিল কলকাতায়। নেহাত কিশোরী তাই কাজের লোকের বাড়িতেই লাগিয়ে দিয়েছিল সেই পাড়াতুতো  দাদা। বেশ ছিলো বিতস্তাদের বাড়ি। বাড়ির কাজ ছাড়া তাকে বিতস্তার মাকে পা টিপে দিতে হত। বিতস্তার মা তাতে খুশি হয়ে  খুব আশীর্বাদ করতেন এবং বেশি বেশি করে পা টিপিয়ে নিতেন। কিন্তু ঝামেলা হল বিতস্তা প্রেম করে বিয়ে করল। দিল্লি চলে গেল। গিয়েই এক  বছরের মাথায় গর্ভবতী হল। মেয়ে হবার কিছুদিন পর  নাজেহাল হয়ে মা কে বলল, বিপুলাকে আমার কাছে পাঠাও। আমার চলছে না। সংসার  যে এত কঠিন আগে বুঝলে বিয়েই করতাম না। এখন সাপোর্ট না হলে চলছে না। বিপুলাকেই চাই।  

বিতস্তার মা একেবারেই বিপুলাকে ট্যাকে করে নিয়ে হাজির করল বিতস্তার বাড়ি। আহা মেয়েটার কি কষ্ট! একা হাতে চাকরি, সংসার কি সামলান সহজ? মাস খানেকের জন্য চলে এল দিল্লিতে।  

কালকাজী একটেনশান নামের এক জনবসতির একদিক ঘিরে আছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রবাসী শ্রমিকের দের এক বিশাল বস্তি। এখানের মহিলারা দিল্লির অবস্থাপন্ন পরিবারে ঠিকে কাজ করে আর পুরুষরা কাজ করে এলাকা সংলগ্ন ওখলা শিল্পাঞ্চলে। দিল্লির বুকে এমন একটি মিনি বাংলা যেখানে দুর্গাপুজো থেকে দুনিয়ার পুজো হয়। ইদানিং শনিপুজোও শুরু হয়েছে। বিতস্তার একটা কাজের লোক ছিল। বিপুলা আসতেই তাকে বিদায় করে দিল। ধীরে ধীরে সব চাপ এসে পড়ল বিপুলার ঘাড়ে। এটা ছিল ভবিতব্য। বিপুলা এখানেই থাকতে থাকতে  নীরা, বিতস্তার মেয়ে বড় হল। ইস্কুলে ভর্তি হল। বেবি ইস্কুল। বেবির সঙ্গে সঙ্গে বিপুলাও বড় হতে লাগল।

এখানে বিপুলার একটু অন্য পরিচয় দেওয়া দরকার। বিপুলা খুব ছোটবেলায় দেখেছে তার  বাবা নেই। বাবা না থাকলে গ্রামে মেয়েদের মুল্য অর্ধেকের নীচে নামে। বিপুলা সেটা বুঝেছিল বলে সে অল্প বয়সে ইস্কুলে রান রেসে, স্পুন রেসে, হাই জাম্পে, সব খেলাতেই প্রথম হতো। কারণ একটাই, সবাই যেন তার কথা আলোচনা করে। লোকের চোখে পড়ে। 

এটাই লক্ষ্য করেছিলেন ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। বিপুলার মাকে বলেছিলেন, ওকে জেলা স্পোর্টস-এ ভর্তি করে দিতে। বিপুলার মা রাজী হয়নি। তার বদলে বিপুলার মা তার পরিচিত এক ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল কলকাতায়। বিতস্তাদের বাড়ি। 

২

দিল্লি বিপুলার ভালো লেগে গেল।  আবাসনের উল্টোদিকে একটা মিশনারি ইস্কুল।  তাদের ইস্কুলের সামনে বিশাল এক ফুটবলের মাঠ, চারদিক মাধবিলতার‍্ ঘেরা পাঁচিল, বিতস্তার বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছে, দৌড়চ্ছে, ক্লাস করছে। দিদিমনিদের আনাগোনা। ছেলেদের ফুটবল ম্যাচ , এ যেন এক অন্য কোলাঘাট। সেই গ্রামের ছবি কিন্তু গ্রাম নয়, শহর। তবে কলকাতার মিত্র লেনের সরু গলির মত দিদিদের বাড়ি নয়। উন্মুক্ত খোলা আকাশ, রোদ যেমন, মেঘও তেমন। সব নিজের মত চরে বেরাচ্ছে। সে বাইরে বেড়োয় বিকেল তিনটের সময়। বিতস্তার মেয়ে আসে আবাসনের গেটে। সেখান থেকে তাকে বাড়ি এনে বাইরের কাজ শেষ। 

এখান থেকে একদিন বিপুলা হটাৎ গায়েব হয়ে গেল দিল্লীর মত অচেনা শহরে। অনেক খোজা খুজি হল। বিতস্তা তার অফিসের সোর্স কাজে লাগিয়ে কিছুই কিনারা করতে পারল না যখন, তখন তার মাকে জানান হল বিপুলা নিজের ইচ্ছেয় চলে গেছে। সে নিরুদ্দেশ।

এবার তার কথায়, “জীবনের এক অবাক করা অধ্যায় যা আমাকে একদিন চমকে দিয়েছিল”।

একদিন আমাদের বাড়ির নীচে দেখা হয়েছিল এক যুবকের সঙ্গে। দেখেই মনে হল মেদিনীপুরের ছেলে হবে! সেখানকার ছেলেদের মত দেখতে। এলোমেল চুল কানের দুপাশে দুলছে, ঠোট পুরু, ছোট চোখ আর কেমন কেবলা কেবলা চলাফেরা। গেটের কাছেই সাইকেল নিয়ে দাড়িয়ে ছিল  বিপুলা বলল, কি নাম তোমার?

ছেলেটি ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে হতচকিত হয়ে বলল, রাকেশ।

কোথায় থাকো?

রাকেশ অসহায় চোখে তাকিয়ে কোন উত্তর দিল  না। বিপুলা বুঝতে পেরে বলল, ঘর কাহ্যা হ্যায়?

আঙুল তুলে বলল, ওই বস্তিতে। 

বিপুলা বুঝতে পারল, ছেলেটি অবাঙালি। বাংলা জানে না।  কথা না বলে সে চলে এল সেদিন। 

তারপর বেশ কদিন ছেলেটিকে দেখা গেল না। চারতলার ছাদে পোশাক মেলতে মেলতে সে হটাৎ একদিন দেখতে পেল রাকেশ তাদেরই আবাসনের নীচ দিয়ে সাইকেল চেপে যাচ্ছে। সিড়ি দিয়ে তর তর করে নেমে এল বিপুলা। পিছন থেকে ডাকতেই রাকেশ দাঁড়াল। বিপুলা তাকে জিজ্ঞেস করল, কেয়া হূয়া? বিপুলার হিন্দি ভাষার দৌড় এতই কম যে সে আর গুছিয়ে কিছুই বলতে পারল না। কেবল তাকিয়ে রইল। 

মনে আছে এক বর্ষাস্নাত বিকেলে বিপুলা উধাও হয়েছিল। কাউকে না জানিয়ে। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় এতোই বিপন্ন হয়েছিলাম যে বার বার মনে হচ্ছিল একটা সাধারণ মেয়ের এই অচেনা শহরে কি কোন নিরাপত্তা নেই? কেউ কি দেখতে পেল না, মেয়েটা উধাও হয়ে গেল?

 ৩

নাগপুরে ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে প্রায় সবাই গেলাম একমাত্র বিতস্তা য়ায়নি। তার অফিসের একটা জরুরি কাজে তাকে বিদেশ যেতে হয়েছিল। ভাইয়ের মেয়ে এবার পি এইচ ডি করার জন্য যার কাছে নাড়া বেধেঁছে তাকেও বিয়েতে নেমতন্ন করেছিল। সেই বিয়ে আমাদের বাড়ির শেষ বিয়ে। আমার মেয়েও এসেছে সপরিবারে। অতিথি আপ্যায়ন শেষ হলে আমার ভাইঝি আলাদা করে ডেকে বলল,জেঠু চল তোমার সঙ্গে একজনের আলাপ করিয়ে দেব। পাশের ঘরে নিয়ে যেতেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। 

ভাইঝি বলল, আমার রিসার্চ গাইড অধ্যাপক বি শর্মা। 

হাত তুলে নমস্কার করলেন অধ্যাপিকা শর্মা। তারপর অনেক পারিবারিক কুশল বিনিময়ের পর আমি কেমন হীনমন্যতায় ভুগছিলাম। অধ্যাপক শর্মা বললেন, শুনলাম আপনার একবার ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়েছে।

আমি সচকিত হয়ে প্রশ্ন করলাম, কে বলল?

উনি শান্ত গলায় বললেন, আমার ছাত্রী। আপনার ভাইঝি ভাল ছাত্রী। ওর অনেক দূর যাবার কথা।

আমি সাহস পেয়ে বললাম,শুনে খুব ভালো লাগছে।

–আর আপনার মেয়ের কি খবর?

বললাম, ভালই।

অধ্যাপিকা বললেন, আমি জানি। আমি আপনাদের সব খবর পাই ছাত্রীর কাছে থেকে। তারপর খুব অকপটে নিজের বাড়িতে একদিন যাবার আমত্রণ জানালেন। বললেন, আপনি একাই আসবেন। আমি ছাত্রীকে ঠিকানা দিয়ে দেব।

৪

নিউ মুম্বাইএর একটি সুন্দর আবাসনে অধ্যাপিকা শর্মার ফ্ল্যাট।  বেল বাজাতেই এক সুদর্শন মানুষ দরজা খুলে বসার ঘরে বসালেন। পরিচ্ছন্ন হিন্দিতে নিজের পরিচয় দিলেন। বসতে  বললেন। খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কি পছন্দ , চা না কফি?

আমি বললাম, কফি। বাড়ির ভিতর সেই একই গলায় হুকুম গেল। তিন কাপ কফির। উল্টো দিকের সোফায় বসে বললেন, প্রোফেসর শর্মা একটু ঠাকূর ঘরে আছেন। এখুনি এসে পরবেন। ততক্ষুণ আমার উপর হুকুম, আমি যেন আপনার সঙ্গে কথা বলি।

আমি বললাম , আপনাকে  ব্যস্ত হতে হবে না। 

ভদ্রলোকের সারা মাথা সাদা, পরনে খাদির পাঞ্জাবী, লম্বা ছিপ ছিপে চেহারা, চোখ দুটো কিছুটা কোটরে। খুব সাধারণ  গলায় প্রশ্ন করলেন, আপনাদের অনেক দিনের পরিচয় বুঝি?

আমি বললাম, না না, এই তো আমার ভাই-এর মেয়ের বিয়েতে পরিচয়। কথা হচ্ছিল। উনি  আমাকে আপনাদের বাড়িতে  আমন্ত্রণ করেছেন। তাই এসেছি।

–বেশ করেছেন। আজকাল তো নেমতন্ন করলেও মানূষ নানান অজুহাতে এড়িয়ে যায়। সবার হাতে সময় কম। কেমন যেন সমাজটা বদলে যাচ্ছে। অস্থির হয়ে যাচ্ছে। খুব খারাপ  লক্ষণ, কি বলেন?

আমি উত্তর দিলাম, ঠিক  বলেছেন। কিন্তু কোথায় যে সময়গুলো যাচ্ছে তা তো বোঝা যাচ্ছে না। 

ভদ্রলোক কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন, আসলে সময়ের মূল্য বলে কিছু নেই। 

আমি বললাম, জীবনেরই বা কি মূল্য আছে বলুন?

আর ঠিক সেই সময় অধ্যাপিকা শর্মা ঘরে ঢুকলেন। প্রথমে ক্ষমা চেয়ে  আমার ঠিক উল্টো দিকে বসে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমার স্বামী রাকেশ শর্মা। তিনি আর একবার প্রতি নমস্কার করলেন। তার পর তিনি ঘর ছেড়ে চলে গেলেন বাইরে।

আমি আর অধ্যাপিকা শর্মা মুখোমুখি। কি করে তিনি ডঃ বিপুলা শর্মা হয়ে উঠেছিলেন সেই কাহিনি পরের পর্বে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *