আশিস ভৌমিক
লেখক পরিচিতি
(জন্ম 5 ই এপ্রিল 1974, গ্রাম -বৃন্দাবনচক , পাঁশকুড়া , পূর্ব মেদিনীপুর ।প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামে ।উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় ।সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ।গৃহ শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য চর্চা । বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন । প্রথম কাব্যগ্রন্থ “”হিরণ্ময়ী ” । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” কালবেলা “।
প্রথম পর্ব
বিখ্যাত হলিউড থ্রিলার মুভি 2012 -এর কথা মনে আছে নিশ্চয়। ২০০৯ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র, যেটি রচনা এবং পরিচালনা করেছিলেন রোলান্ড এমেরিখ। প্রযোজনা করেছেন হ্যারাল্ড ক্লোজার, মার্ক গর্ডন এবং ল্যারি জে. ফ্রাঙ্কো। চলচ্চিত্রে মায়াবাদ ও মেসোআমেরিকান লং কাউন্ট পঞ্জিকা থেকে সূত্র অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ২০১২ সালের রাহস্যিক বিষয়ের আকস্মিক ও প্রচণ্ড পরিবর্তনের ঘটনা বর্ণনাকারে উন্মোচিত হয়েছে। পৃথিবীর ভূত্বক অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার মুহূর্ত নিখুঁত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমায়। একদিকে প্রবল ভূ-আলোড়নে ধ্বসে পড়া বহুতল, রাস্তায় বড় বড় ফাটল আর আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা, প্রান বাঁচাতে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি আর অন্যদিকে উত্তাল সমুদ্র সুনামি।
মায়া সভ্যতা’- কথাটা শুনলেই কেমন একটা রহস্যের কুয়াশাঘেরা শিরশিরে অনুভূতি হয়। হ্যাঁ, আমি সেই মায়ান সভ্যতার নিদর্শন,পুরাণ তাদের বিশ্বাস লোকাচার, শিক্ষা আর অবশ্যই পুরাণের আড়ালে কিছু রহস্যময়তার শেকড় খুঁজতে চলেছি। তার আগে মায়ানদের সম্বন্ধে দুচার কথা বলে নিই।
রহস্যে ঘেরা মায়া সভ্যতার ইতিহাস!
চার হাজার বছর আগের কথা। সভ্য মানুষের জীবন যাপন কিংবা সভ্য সমাজের কথা ভাবাটা অন্তত সেই সময়কালে অবান্তর ছিল বটে! কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্য কথা। যে যুগে পৃথিবীর অনেক অংশের মানুষ ঘর তৈরি করতে শেখেনি মানুষ, সেই যুগেও এমন জাতি ছিল যারা নিজেদের সংস্কৃতি সভ্যতায় রীতিমত সচ্ছল জীবন যাপন করত সগৌরবে! প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মায়ারা চাষাবাদ করা শুরু করে এবং কৃষিজীবী গ্রামের উৎপত্তি ঘটে। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত গৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম মায়া জনবসতি নিঃসন্দেহে প্রশান্ত উপকূলের সোকোনুস্কো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বিশ পঁচিশ তলা পর্যন্ত ভবনও তৈরী করেছিল তারা। শুধু তা নয়, জ্যোতির্বিদ্যা আর ভাষা নিয়েও ছিল তাদের অভাবনীয় জ্ঞান! অবাক করার মত বিষয় বটে! এমনই হৈ চৈ ফেলে দেয়া ইতিহাস সৃষ্টিকারী জাতি ছিল মায়ানরা। যা বছরেরে পর বছর রয়েছে অন্যান্য জাতির কাছে একদমই অজানা। অদ্ভুত এক পান্ডুলিপি আবিষ্কার হলো হঠাত, যার কোনো অক্ষর নেই, বর্ণ নেই। ভাষা যায় না বোঝা। কিন্তু কিছু একটা বলা আছে তাতে, কিছু একটা যে বলা আছে সেটা ঠিকই বোঝা যায়। ছোট ছোট ছবি পাশাপাশি আঁকা। নৃতত্ববীদদের মনযোগ কাড়লো। ফলত ধীরে ধিরে আবিষ্কৃত হলো অনেক কিছুই। আলোয় আসলো মায়ান সভ্যতার সাতকাহন।
বিশেষজ্ঞদের মতে মায়ারা ছিল মেসো আমেরিকা, বা বর্তমান মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে পরাক্রমশালী প্রাচীনতম জাতি। মায়ারা অন্যান্য জাতির মত বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল না, তারা ভৌগলিক একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মাঝেই ছিল। মায়ারা প্রধানত গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভেদরের উত্তরাংশ, কেন্দ্রীয় মেক্সিকোর তাবাস্কো আর চিয়াপাস সহ আরো প্রায় এক হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসতি স্থাপন করেছিল। সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে থাকার কারণেই অন্য অনেক শক্তিশালী জাতি মায়াদের লোকালয়ে প্রবেশ করতে বা আক্রমণ করতে পারতো না।
মায়া সভ্যতার লোকেদের তৈরি করা পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে, তারা ভাবের আদান-প্রদান করার জন্যে একটি ভাষার ব্যবহার করত। অদ্ভুত এবং মজাদার ছিল মায়াদের সেই ভাষার লিখিত রূপটি। তাদের কোনো বর্ণমালা ছিল না, তারা লেখার জন্যে ছবি বা চিহ্ন ব্যবহার করত। খানিকটা হায়ারোগ্লিফিক লেখা। তাদের লেখায় প্রায় ৮০০টির বেশি ছবি তারা ব্যবহার করেছিল। মায়ানদের এইসব লেখা থেকে তাদের সভ্যতা আর সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারা যায়। এছাড়াও মায়ারা গাছের বাকল দিয়ে তৈরি করা কাগজ দিয়ে বই বানাতো, সেগুলোকে বলা হয় কোডেক্স। মায়ান সভ্যতার মাত্র ৪টি কোডেক্স উদ্ধার করা হয়েছে অক্ষতভাবে। মায়া জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে আমরা যা জানি তার বেশিরভাগই আমরা সংগ্রহ করি কোডেক্স নামক বার্ক-পেপার বইয়ের পাতায় তৈরি বিস্তারিত নথি থেকে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ফ্রান্সিসকান মিশনারিরা তাদের ধর্মকে নির্মূল করার প্রচেষ্টায় মায়াদের প্রায় সমস্ত লিখিত নথি পুড়িয়ে ফেলেন। আজ, মাত্র তিন বা চারটি মায়া কোডেক্স অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যে তিনটির নামকরণ করা হয়েছে ইউরোপীয় শহরগুলির নাম অনুসারে যেখানে এগুলি রাখা হয়েছে – ড্রেসডেন, প্যারিস এবং মাদ্রিদ। চতুর্থ বই গ্রোলিয়ার কোডেক্স, যা বর্তমানে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত, তার সত্যতা এখনও বিতর্কিত। কোডেক্সগুলি সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর আগে লেখা হয়নি , তবে মায়ারা অনেক আগে লেখা বইগুলি অনুলিপি করে থাকতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যান্থনি আভেনির মতে, কোডিসগুলি আচার-অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করা হত, প্রায়শই জ্যোতির্বিদ্যার ঘটনার সাথে সংযুক্ত করে।
কোডেক্সগুলির পৃষ্ঠাতে সাধারণত একজন দেবতাকে চিত্রিত করা হয় এবং দেবতা কী করছেন তা বর্ণনা করে এমন গ্লিফের একটি সিরিজ থাকে। এই বইগুলির অনেক পৃষ্ঠায় এমন সংখ্যার তালিকাও রয়েছে যা মায়াদের চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রের পর্যায় এবং মঙ্গল ও শুক্রের গতিবিধির ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহায্য করেছিল। এর একটি উদাহরণ ড্রেসডেন কোডেক্সের তিনটি পৃষ্ঠার একটি সিরিজ যা শুক্রের পর্যায়গুলি লিপিবদ্ধ করে এবং সেই সাথে অশুভ এবং শুভ গ্রহের সাথে সম্পর্কিত তিজোলকিন তারিখ এবং গ্লিফের একটি তালিকা। মায়ারা বিশ্বাস করত যে শুক্র বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সহিংসতা এবং দুর্ভাগ্যের সাথে জড়িত ছিল। সিরিজের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এই সম্পর্কটি স্পষ্ট, যেখানে শুক্রের প্রতিনিধিত্বকারী দেবতা কুকুলকানের একটি চিত্র দেখানো হয়েছে, যিনি শত্রুকে বর্শা দিয়ে মারার ভঙ্গিতে রয়েছেন। মায়ানরা আঠারোটি মাস নিয়ে বছর গননা করত আর প্রত্যেক মাস ছিল কুড়ি দিনের (১৮×২০=৩৬০) আর পাঁচ দিন অতিরিক্ত নির্দিষ্ট সময়ে যোগ করা হোত। এই পাঁচদিন তারা অনাগত দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার ভয়ে কালাতিপাত করত এবং দেবতাদের তুষ্ট করতে নানান আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকর্ম করতো।
পণ্ডিতরা মায়া সভ্যতার যুগের শুরু নিয়ে অবিরত আলোচনা করে যাচ্ছেন। বেলিজের কিউল্লোতে মায়া বসবাসের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কার্বন পরীক্ষা হতে পাওয়া তারিখ অনুযায়ী এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগের। তারা বিস্ময়কর কাঠামো নির্মাণ করে। মায়ার বর্ষপঞ্জিকা তথাকথিত মেসআমেরিকানর দীর্ঘ গণনীয় বর্ষপঞ্জিকার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১১ই আগস্ট, ৩১১৪ খ্রিস্টাব্দের সমতুল্য। আর এই বর্ষপঞ্জির শেষ ছিল ২০১২, ২৩ শে/ মতান্তরে ২১শে ডিসেম্বর। এটিই ছিল মায়ানদের এক যুগ। এর ওপরেই চলচ্চিত্রটি আখ্যায়িত। যদিও পৃথিবীর ধ্বংসের কথা উল্লেখ ছিলনা কিন্তু বানিজ্যিক চলচ্চিত্র সাফল্যের কথা মাথায় রেখে একটু আধটু ইতিহাস বিকৃতি বা গুজব ছড়ানো হয়েই থাকে!
যাইহোক আমার গন্তব্য পুরাণ। আর সব পুরাণের মতো এর সুচনা করবো সৃষ্টি তত্ত্ব দিয়ে। স্পেনীয় আক্রমণে বেশিরভাগ বিনষ্ট হলেও কিছু গোপন দলিল বা নিদর্শন রয়েই যায় আর কিছু জমা থাকে শ্রুতি হিসেবে লোকমুখে যা কৌতুহলীরা সংগ্রহ করে। আমি মায়ানদের পুরাণ “পপোল ভুহ” নিয়ে বলতে যাচ্ছি। যেখানে সৃষ্টি তত্ত্ব অর্থাৎ পৃথিবীর বাসযোগ্য হয়ে ওঠা এবং মানুষের সৃষ্টির পৌরাণিক কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
উপনিবেশ-পূর্ব মায়ারা দক্ষ শিল্পী ছিলেন, তারা চমৎকার মূর্তি, মৃৎশিল্প এবং অলংকার তৈরি করতেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো লেখক ছিলেন বলে জানা যায়। তারা হরিণের চামড়া এবং গাছের ছালের মতো পচনশীল উপাদান থেকে বই তৈরি করতেন এবং পাথরে স্থায়ী গ্লিফিক বিবরণও লিখতেন। তবে, মায়া সংস্কৃতি সম্পর্কে আধুনিক ধারণা সীমিত, মূলত কারণ বিজয়ী স্প্যানিশরা পরিকল্পিতভাবে মায়া বই ধ্বংস করেছিল এবং ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসকে দমন করেছিল, যা তারা শয়তান উপাসনা দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করত।
মায়া সাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে একটি হল এই পপোল ভুহ, যা প্রায়শই মায়া সৃষ্টির মিথ হিসেবে পরিচিত। পোপোল ভুহ, ‘কাউন্সিল বুক’ কিংবা ‘বুক অব দ্য কমিউনিটি’ হিসেবে পরিচিত এই বইটির আসল কপি কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, স্প্যানিশরা অন্য বইগুলোর মতো এটিও পুড়িয়ে ফেলে। তবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে এক কিশে মায়া রোমান হরফে নিজের ভাষায় এটি লিখে রাখে। পরবর্তীতে ফ্রান্সিসকো জিমেনেজ নামক এক পাদ্রীর কাছে পৌঁছালে তিনি তা স্প্যানিশে অনুবাদ করেন। এই ডকুমেন্ট নিয়ে গবেষণার কমতি নেই। ইতিহাসবিদ, জ্যোতির্বিদ থেকে শুরু করে দার্শনিকরাও এটি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছেন মায়া সভ্যতার রহস্য। আসলে স্প্যানিশ দমনের সময়কালে, পশ্চিম গুয়াতেমালার উচ্চভূমিতে বসবাসকারী কুইচে ব্যান্ডের অভিজাত সদস্যরা গোপনে ” পোপোল ভুহ” রচনা করেছিলেন , যার অর্থ “পরিষদ বই” বা “পরামর্শের বই”, অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে। এই বিশাল কাব্যিক রচনাটি মায়া জনগণের একটি আধা-ঐতিহাসিক বিবরণ। পোপোল ভুহ একটি জটিল পৌরাণিক ব্যবস্থা বর্ণনা করে যা আকাশ, পৃথিবীর দেবতা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সহ দেবতাদের পরিচয় বহন করে। যদিও এটি তারিখবিহীন, অভ্যন্তরীণ প্রমাণ থেকে জানা যায় যে এটি 1550-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লেখা হয়েছিল, স্প্যানিশ আক্রমণকারীরা মায়া মাতৃভূমি জয় শুরু করার তিন দশক পরে।
পোপোল ভু– এর লেখক দাবি করেন যে এই কাজের বিষয়বস্তু একটি পূর্ববর্তী বই মায়ান কোডেক্স থেকে এসেছে, যা লেখার সময় তখনও তার কাছে ছিল। স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের সমসাময়িক বিবরণ থেকে জানা যায়, যাদের অনেকেই এই ধরনের কোডেক্সগুলি ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে রেখেছিলেন যা পরে হাত বদল হয়। এগুলো বিশেষভাবে প্রস্তুত হরিণের চামড়া এবং ভাঁজ করা বাকল বইয়ের উপর প্রচুর পরিমাণে মায়া ধর্মীয় সাহিত্য (কোডেক্স) লেখা ছিল। কুইচে লেখকরা যে মূল উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন তা সম্ভবত এই ধরণের পচনশীল উপাদান দিয়ে তৈরি ছিল।
পোপোল ভুহ– এর পৌরাণিক কাহিনীগুলিকে প্রাচীন মায়া বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে কতটা গ্রহণ করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ সময়ের দাবি মেনে তাতে নতুন গৃহীত পৌরাণিক বিশ্বাসে কিছু পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
কিংবদন্তী আর উপকথায় ভরপুর পোপোল ভুহ-এ বৈজ্ঞানিক তথ্যও কম নয়, বিশেষ করে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে অনেক কিছুই লিপিবদ্ধ করা আছে এখানে। কোনো গ্রহ বা নক্ষত্র কখন দেখা যাবে, কখন আবার হারিয়ে যাবে, সবই হিসাব করে দেখানো হয়েছে এখানে। মায়াদের কাছে প্রতিটি নক্ষত্র ও প্রতিটি গ্রহই একেকটি দেবতার প্রতিরূপ। নক্ষত্রের উদয়াস্ত পর্যবেক্ষণ করে তারা বিভিন্ন উৎসব পালন করত, শিকারে যেত, যুদ্ধের মহড়া দিত কিংবা দুর্ভিক্ষের প্রস্তুতি নিত।
বিশ্বের প্রতিটি উপকথাতেই তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের ব্যাখ্যা, মহাজগৎ কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে কিংবা কীভাবে মানুষ সৃষ্টি করা হল। পোপোল ভুহতে লিপিবদ্ধ সে উপকথাগুলোই তুলে ধরা হল।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
দ্বিতীয় পর্ব
মায়ান পুরাণ অনুযায়ী স্বর্গ পাতাল
দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ-পূর্ব উপনিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে, মায়াদের একটি অত্যন্ত উন্নত পৌরাণিক কাহিনী ছিল। মায়া পুরাণে, পৃথিবীর সৃষ্টির সাথে অ্যাজটেক পুরাণে দেখা পৃথিবীর সৃষ্টির অনেক মিল রয়েছে । এটি ভৌগোলিক নৈকট্য (দুই জনগোষ্ঠী প্রতিবেশী ছিল) দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে অবশ্য তাদের উৎপত্তি দ্বারাও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে অ্যাজটেক এবং মায়াদের পূর্বপুরুষদের একই ছিল।
মায়া পুরাণে, আকাশ তথা স্বর্গের একক সত্তা ছিল না বরং ১৩টি স্তরে বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি স্তরের প্রতিটি স্তরে একজন দেবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোত। মুয়ান পাখি ছিল এক ধরণের শস্যাগার পেঁচা যা সর্বোচ্চ স্বর্গীয় স্তরে বাস করত। এই স্বর্গীয় স্তরগুলি সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবে, অ্যাজটেকদের মতো কিছু নির্দিষ্ট আত্মা কিছু কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে স্বর্গে বাস করতে পারত। মায়াদের মতে, স্বর্গের চার কোণে অপরিসীম শারীরিক শক্তিসম্পন্ন দেবতারা ছিলেন তাদের বলা হয় বাকাব।
পাতালের কথা বলতে গেলে, মায়ানদের পাতাল অ্যাজটেক পুরাণের খুব কাছাকাছি। মায়াদের জন্য, পাতাল ৯টি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত, প্রতিটি স্তর এক বা একাধিক দেবতা দ্বারা শাসিত হোত। বেশিরভাগ মায়াদের মৃত্যুর পর এই পাতিলের স্তরগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হোত, এমনকি যদি তারা “ভালো মানুষ”ও হয় (তাই একেশ্বরবাদী ধর্মের মতো মায়া পাতালপুরী নরকের সমতুল্য নয়)।
মৃতদের আত্মা ছাড়াও এই পাতালপুরীতে সূর্য (রাতে) এবং চাঁদের (দিনের বেলা) মতো স্বর্গীয় বস্তুও বাস করত।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে সেনোট (গুহার ছাদ ভেঙে পড়ার ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক খাদ) হল পাতালের প্রবেশদ্বার। মেক্সিকোর ইউকাটান প্রদেশে, এই ধরণের প্রায় ১০,০০০ সেনোট রয়েছে। এই স্থানগুলিতে, মায়ারা মন্দকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য অথবা পাতালের দেবতাদের সম্মান করার জন্য আচার-অনুষ্ঠান এবং বলিদান পালন করত।
পৃথিবীর সৃষ্টি
অ্যাজটেকদের মতো, মায়ারা সৃষ্টি ও ধ্বংসের চক্রের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। মায়ানদের মতে, প্রতিটি পৃথিবী ৫,২০০ বছর ধরে সমৃদ্ধ ছিল এবং ধ্বংস হওয়ার আগে এবং তার জায়গায় আরেকটি পৃথিবী এসে দাঁড়ায়। এর আগে দুইবার পৃথিবী ধ্বংস হয়েছিল। বর্তমান পৃথিবী হোল তৃতীয় পৃথিবী।
প্রথম পৃথিবী বামনদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল যারা শহর তৈরি করে। তারা সায়াম উইনিকোব (বিশেষজ্ঞ পুরুষ) নামে পরিচিত। এই বামনরা অন্ধকারে তাদের শহর তৈরি করে কারণ সূর্য তখনও বিদ্যমান ছিল না অর্থাৎ বায়ুমন্ডল বিষাক্ত গ্যাসে ঢাকা। এই প্রজাতির ধ্বংস হয় সূর্যের প্রথম রশ্মি থেকে উদ্ভূত তেজে যা বামনদের পাথরে পরিণত করে। এরপর এই পৃথিবী একটি মহাপ্লাবনের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপর দ্বিতীয় পৃথিবীর জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে একটি নতুন প্রজাতি বাস করে ‘জোলোব’। আমরা এই প্রজাতি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না, কেবল এর প্রতিনিধিরা “সীমালঙ্ঘনকারী” হিসেবে গন্য। তাই আমরা কল্পনা করতে পারি যে এই প্রজাতি দেবতাদের দ্বারা নির্ধারিত এক বা একাধিক নিয়ম মেনে চলেনি। এই পৃথিবী মহান স্বর্গীয় সর্পের মুখ থেকে আসা বন্যার দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়।
তৃতীয় এবং শেষ পৃথিবী হল সেই পৃথিবী যেখানে মায়ানদের জন্ম হয়েছিল এবং আজও তা বিদ্যমান।
এই পৃথিবী সৃষ্টির জন্য, ৪ জন বাকাব এবং অন্য ৩ জন দেবতা (কর্মী টেপু, সবুজ পালকের আবরণধারী প্রভু সমুদ্রের দেবতা গুকুমাটজ এবং স্বর্গের দেবতা হুরাকান) মিলিত হন। তাঁরাই এই পৃথিবীতে প্রাণের সূত্রপাত করেন। পুরাণে হুরাকানকেই সৃষ্টির দেবতা হিসেবে দেখা হয়।
মায়া পুরাণে পৃথিবী ও জীবের উৎপত্তি
বাইবেলে যেমন ঐতিহাসিক বিবরণ এবং পৌরাণিক কাহিনীর মিশ্রণ রয়েছে, তেমনি পবিত্র গ্রন্থ পপোল ভুহ্ তে মায়ার ইতিহাস এবং পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা পাওয়া যায়। বইটিকে যদি আমরা চারটি পর্বে ভাগ করতে পারি। এর প্রথম ও চতুর্থ পর্বে মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে পৃথিবী সমতল, এর উপরে ১৩টি স্বর্গ এবং নীচে নয়টি পাতাল। সময়ের অস্তিত্বের আগে, শূন্য আকাশের নীচে অসীমভাবে প্রবাহিত জল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। জলে বাস করতেন সমুদ্র দেবতা গুকুমাটজ। আকাশে, দেবতা হুরাকান।
দুই দেবতা এবং কর্মী টেম্পু আব স্বর্গের চার কোনে বসবাসকারী ৪ জন বাকাব মিলিত হন এবং পৃথিবীতে জীবন কেমন হওয়া উচিত (গাছ কীভাবে বৃদ্ধি পাবে, মানুষের কীভাবে হাঁটা উচিত ইত্যাদি) তা নিয়ে আলোচনা এবং কথোপকথন শুরু করেন। তারা আরও আলোচনা করেন যে জল পরিষ্কার করা উচিত যাতে পৃথিবী বেরিয়ে আসতে পারে। তাদের কথাই জীবনের উৎপত্তি। তারা বলে উঠলো, “সৃষ্টি শুরু হোক! এই পরিত্যক্ত স্থান ভরে উঠুক প্রানে! সাগর নিচে নেমে যাক, উঠে আসুক মাটি! মাটি উঠে আসো!” তারা একটি বজ্রপাত নিক্ষেপ করে, যার ফলে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসল পাহাড়-পর্বত, হ্রদ, জলপ্রপাত, গাছপালা। প্রথমে, দেবতারা তাদের সৃষ্টি দেখে খুশি হলেন। উঁচু পাহাড়, দুরন্ত গতিতে বয়ে চলা ঝর্ণা, আর সবুজ সাইপ্রেস গাছ দেখে তারা উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। কিন্তু এ পৃথিবী যেন বড্ড নীরব। তাই দেবতারা আবার তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন, সৃষ্টি হলো হরিণ, সাপ আর কিছু পাখি।
তারপর দেবতারা আদেশ করল, “তোমরা, হরিণ, নদীর পাড়ে গিয়ে ঘুমাও, গিরিখাতের মধ্যে যাও, বনের মধ্যে থাকো। নিজেদের সংখ্যা বাড়াও। তুমি চার পায়ে দাঁড়িয়ে চলবে।। আর তোমরা, পাখিরা তোমাদের জায়গা হলো গাছে, ঝোপে, সেখানে তোমরা বাসা বানিয়ে থাকবে। সেখানে নিজেদের সংখ্যা বাড়াও। আর সাপ, তোমরা ছড়িয়ে পড় জলে স্থলে গিরি-কন্দরে। এইভাবে আরও অনেক পশু সৃষ্টি হলো। পৃথিবী মুখরিত হলো তাদের কলকাকলিতে।
দেবতারা পশুপাখিদের নিয়ে সন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু তখনো একটা সমস্যা রয়ে গেল। প্রাণীরা কথা বলতে পারছিল না,সামান্য কিছু শব্দ করতে পারে, যার কোনো মানেই নেই। তাই তারা হতাশ হয়ে পড়ল কারণ তারা এমন একটি প্রাণীর জন্য অপেক্ষা করছিল যা দিন গণনা করতে পারে এবং তাদের প্রশংসা করতে পারে এবং তাদের জন্য বলিদান করতে পারে। তাই তারা মানুষ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা অন্য পশুপাখিদের আদেশ করলেন, “আমরা তোমাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেব না, যা আমরা তোমাদেরকে দিয়েছি। বরং আমরা এমন কাউকে সৃষ্টি করবো যারা আমাদেরকে ভালোবাসবে এবং আমাদের শ্রদ্ধা করবে। এই নতুন সৃষ্টিগুলো তোমাদের চেয়ে সেরা হবে এবং তোমাদের শাসন করবে। এটা তোমাদের চূড়ান্ত ভাগ্য যে, তারা তোমাদের দেহ ছিঁড়ে ফেলে মাংস আলাদা করবে, তারপর তোমাদের খেয়ে ফেলবে। এটাই তোমাদের নিয়তি তোমাদের আয়ু জীবন।”
এরপর দেবতারা পশুপাখির চেয়েও ভালো কিছু বানানোর চেষ্টা করলেন। এরা হলো মায়া। এরা কথা বলতে পারবে, দেবতার প্রশংসা করতে পারবে। কিন্তু এদেরকে বানানো মোটেই সহজ কাজ নয়।
প্রথমে দেবতারা মাটি দিয়ে মানুষ তৈরি করলো। কিন্তু মাটি দিয়ে তৈরি এই মানুষরা ঠিক সেরকম না, যা দেবতারা চাইছিলেন। তারা খুবই নরম আর ভঙ্গুর, সোজা হয়ে দাঁড়াতেও এদের সমস্যা হচ্ছিল। আর বৃষ্টি হওয়ার পর তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো দেহ থেকে ধুয়ে চলে যাচ্ছিল। এর চেয়েও বড় কথা হলো, তাদের দেখার মতো চোখ কিংবা কাজ করার জন্য কোনো মস্তিষ্ক ছিল না। শুধু কথা বলার জন্য মুখ দেওয়া হয়েছে। মস্তিষ্কবিহীন এই মানুষরা ঠিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে না পারায় অর্থহীন কথা বলে বেড়াচ্ছিল। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে দেবতারা এই মাটির মানুষগুলোকে ধ্বংস করে দিলেন।
কাদা দিয়ে ব্যর্থ চেষ্টার পর, দেবতারা এক দেবতা দম্পতি, এক্সপিয়াকোক এবং এক্সমুকানের সাথে পরামর্শ করেন এবং তাদের জিজ্ঞাসা করেন যে কাঠ কি মানুষ তৈরির জন্য উপযুক্ত উপাদান হবে কিনা। দেবতাদের এই জুটি ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়, তাই গুকুমাটজ এবং হুরাকান পৃথিবীকে কাঠের মানুষ দিয়ে ভরে দেয়।
যদিও কাঠের মানুষ কাদামাটির মানুষের তুলনায় উন্নত ছিল, কিন্তু কিছুদিন পরেই দেবতারা বুঝতে পারলো, মাটির মানুষদের মতোই, কাঠের মানুষগুলোরও কোনো মস্তিষ্ক নেই, তারা অর্থহীন কথা বলে সময় নষ্ট করছে। তাদের দেহে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মতো কোনো শিরা নেই, তাই তাদের চামড়া সতেজ আর সজীব হওয়ার বদলে শুকিয়ে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে। তাদের কোনো হৃদয় নেই, এমনকি চেহারাও নেই যে তারা কোনোরকম মুখভঙ্গি করতে পারবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা ছিল বোকা, অনুভূতিহীন। তারা কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা আলাদা করতে পারছে না। এই নির্বোধ মানুষগুলো নিজেদের খাবার তৈরি করার পাত্রগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কুকুরগুলোকে খেতে না দিয়ে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া তারা দেবতাদের উপেক্ষা করছিল। তারা তাদের স্রষ্টাদের স্মরণ করত না, তাদের সম্মান করা তো দূরের কথা। শেষমেশ দেবতারা বুঝতে পারলেন, এই কাঠের মানুষগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলতে হবে এবং তৃতীয়বারের মতো আরও সম্পূর্ণ কোনো মানুষ তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে।
তবে দেবতারা কাঠের মানুষগুলোকে সহজে ছেড়ে দিলেন না। প্রথমে দেবতারা একধরনের আঠালো রজন পদার্থের বন্যা হওয়ার আদেশ দিলেন। ফলে মানুষগুলো মাটির সাথে আটকে গেল। পুড়িয়ে দেওয়া পাত্রগুলো তাদের পুড়ে যাওয়া অংশ দিয়ে কাঠের মানুষদের কাঠের উপর চেপে ধরে আগুন ধরিয়ে দিল। মার খাওয়া কুকুরগুলো তাদের দাঁত দিয়ে কাঠ কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। কয়েকজন পালিয়ে গাছে ওঠার চেষ্টা করল, কেউ কেউ বাড়ির ছাদে গিয়ে লুকাল। কিন্তু গাছ আর বাড়িও প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। গাছগুলো তাদের ডালপালা ঝাঁকিয়ে মানুষগুলোকে ফেলে দিল, বাড়িগুলো কাঠের মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার চেয়ে নিজেরাই ভেঙে পড়ল। আশ্রয়বিহীন কাঠের মানুষগুলো এবার পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু গুহাও পাথর ফেলে নিজেদের মুখ বন্ধ করে দিল। বেশিরভাগ মানুষই বন্যায় ডুবে গেল, যারা বেঁচে ছিল তাদের চেহারা দেখেও আর মানুষ বলে চেনার উপায় নেই। তারা পরিবর্তিত হলো এক নতুন ধরনের প্রাণীতে, বানর হিসেবে। তারা এরপর বেশ কিছু সময় মানুষ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকে।
পপোল ভুহ্ বইটিতে এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব জুড়ে আছে এক রোমাঞ্চকর অভিযানের বর্ননা। যেখানে ” হিরো টুইনস্” অর্থাৎ বীর যমজ ভাই পাতালে গিয়ে তাদের বাবা কাকাকে (এনারাও যমজ) মৃত্যুর পর আবার জীবিত করে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। আমি বইটির শেষ পর্বে চলে যাব যেখানে মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস
পাতাল হতে আকাশে যাওয়ার আগে, হিরো টুইনস তাদের পিতা, হুন -হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপুর দেহ পুনরায় একত্রিত করেছিলেন এবং জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের কাকা ভুকুব হুনাহপু পাতালেই রয়ে যান এবং তিনি দেবতা হিসেবে সকল মানুষের দ্বারা সম্মানিত হন। অপরদিকে হুন -হুনাহপু ভুট্টার দেবতা (বা প্রথম পিতা) হয়ে ওঠেন এবং তিনি বর্তমান বিশ্ব যুগের স্রষ্টা। প্রসঙ্গত উল্লেখ যোগ্য হুন -হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু ছিল এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের পুত্র ছিলেন, যারা কাঠের মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। হুন -হুনাহপুর প্রথম কাজগুলির মধ্যে একটি ছিল তিনি একটি বিশাল বিশ্ববৃক্ষ (একটি ভুট্টা গাছ) গড়ে তোলেন যা পৃথিবীর কেন্দ্রকে ধরে রেখেছিল এবং তিনটি রাজ্যকে সংযুক্ত করেছিল এগুলি হল পৃথিবী, স্বর্গ এবং পাতাল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত প্রশংসা করার মতো মানুষ তৈরির বিষয়টি ছিল অধরা। যা সমুদ্র ও আকাশের দেবতা গুকুমাটজ এবং হুরাকানের মূল কাজ ছিল। ইতিমধ্যে তারা চারটি প্রাণীর কাছ থেকে খবর পেয়েছিল (একটি কাক, একটি তোতাপাখি, একটি পাহাড়ি বিড়াল এবং একটি কোয়েট) পাহাড়ে ভুট্টা এবং অন্যান্য ভোজ্য জিনিসের উপস্থিতি সম্পর্কে। প্রাণীরা দেবতাদের ভুট্টার শীষের নমুনা দিল যা দেখে দেবতারা বুঝতে পারলেন, মানুষ তৈরির জন্য যা দরকার তা তারা পেয়ে গেছেন। দেবতারা ভুট্টো গুড়ো করে এই গুড়ো দিয়ে চারজন মানুষ বানালেন। এই চারজন হলো ‘ফোর ফাদার্স’। তারপর দেবতারা ভুট্টো আরও গুড়ো করে তরল বানিয়ে এই চারজনকে খেতে দিলেন। এটি খাওয়ার পর চার পিতার দেহে পেশি আর শক্তি তৈরি হলো। এই চারজন ঘুমিয়ে গেলে দেবতারা তাদের চারজনের জন্য চারজন সুন্দরী সঙ্গী বানিয়ে দিলেন। চার পিতা দেবতাদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানাল। তাদেরকে এই জগৎ সম্পর্কে সব জ্ঞান দেওয়া হলো। চার পিতা দেবতাদেরকে বলল, “আমরা দেখতে পারি, শুনতে পারি, কথা বলতে পারি, চলতে পারি, চিন্তা করতে পারি। আমরা অনুভব করতে পারি সবকিছু, আমরা সবকিছু জানি, আমরা এই পৃথিবী দেখতে পারি, দেখতে পারি ওই আকাশ। ধন্যবাদ আমাদেরকে বানানোর জন্য…”
তারপর হঠাৎ করেই আবার নতুন একটা সমস্যার সৃষ্টি হলো। দেবতারা বুঝতে পারলেন, মানুষদেরকে বেশি নিখুঁতভাবে তৈরি করে ফেলা হয়েছে। এতটাই নিখুঁত যে, তারা দেবতাদের মতোই জানে এবং দেখতে পারে! অর্থাৎ তারা নিজেদের সমান সৃষ্টি তৈরি করে ফেলেছে! তাই তারা জ্ঞান সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, সাথে তাদের অন্যান্য ক্ষমতাও।
দেবতারা চার পিতার চোখে কুয়াশার ঝাপটা মারলেন। ফলে তারা আর আগের মতো অনেক দূর পর্যন্ত দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো। জ্ঞানও কমিয়ে দেওয়া হলো, যতটুকু তাদের প্রয়োজন ততোটাই রাখা হোল। বেঁধে দেওয়া হলো তদের আয়ূ। দ্রুতই চার পিতা আর তাদের স্ত্রীদের সন্তান-সন্ততি হলো। এখন তারা বেশী কিছু জানতে চায়না, দেখতে চায়না কেবল নিজের স্ত্রী পুত্র সংসার নিয়ে আবদ্ধ থেকে কাটিয়ে দেয় আয়ু জীবন।
এবং এভাবেই পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল মায়ারা।
প্রসঙ্গত মায়া নামটি ফরাসি ভাষায় “মাইস” হিসাবে অনুবাদ করা হয়েছিল। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
তৃতীয় পর্ব
এবার আমরা প্রবেশ করব ‘পপোল ভুহ্’ বইটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে যেখানে হিরো টুইন্স অর্থাৎ যমজ ভাতৃদ্বয় তাদের বাবা কাকার প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল পাতালে, তার প্রতিশোধ নিতে তারা পাতাল রাজ্যে যাবে এবং মৃত্যুপুরী থেকে তাদের বাবা কাকাকে পুনরায় জীবিত করবে যা এই কাহিনীটি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড জুড়ে আছে। আমি ঘটনা পরম্পরা বজায় রাখতে আগে তাদের বাবা কাকার কাহিনী আগে শোনাবো পরে যমজ ভাইদের কাহিনীতে আসবো যদিও আসল বইটির শুরু হিরো টুইন্সের পাতাল গমন দিয়ে।
তবে সবার আগে মায়ানদের প্রিয় একটি খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) সম্বন্ধে কিছু না বললেই নয়, যা এই কাহিনীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
মায়ানদের প্রিয় খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok)
হ্যারি পটার এবং চেম্বার অফ সিক্রেটস মুভির কুইডিচ ম্যাচ এর কথা মনে আছে? সেই উত্তেজনাপূর্ণ খেলাটা ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। কিন্তু মায়া সভ্যতার পোক-তা-পোক খেলার সঙ্গে এর অনেক মিল আছে! যদিও এখানে জাদুর ঝাড়ু ছিল না, তবুও খেলাটি ছিল ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং আর রোমাঞ্চকর। এই খেলা হয়ে উঠেছিল একটি পুরো সভ্যতার জয় পরাজয়ের রাজনৈতিক নির্ধারক।
পোক-তা-পোক খেলার উৎপত্তি
পোক-তা-পোক (Pok-Ta-Pok) ছিল মেসোআমেরিকার অন্যতম প্রাচীন বল খেলা। এই খেলার শিকড় প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ওলমেক সভ্যতার সময়ে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেখানেই প্রথম এই ধরনের বল খেলার উদ্ভূত হয়েছিল। যদিও ওলমেকরা এই খেলার সূচনা করেছিল, তবে এটি মায়া সভ্যতায় সর্বাধিক বিকাশ লাভ করে। মূলত, সেই সময়েই এই খেলা বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে।
খেলোয়াড়দের সংখ্যা ও দল
পোক-তা-পোক খেলা সাধারণত দু’টি দলের মধ্যে খেলা হত। প্রতিটি দলে থাকত ২ থেকে ৫ জন। তবে কখনো কখনো আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়েও খেলা হতো।
বল ও খেলার কোর্ট
এই খেলাটি মূলত বিশেষভাবে নির্মিত “বল কোর্ট” বা পেলোটে ড্রোম (Pelote Drome)-এ খেলা হত। কোর্টগুলো ছিল আয়তাকার আকৃতির এবং এর দুপাশে ছিল উঁচু দেওয়াল, যা বলকে মাঠের বাইরে যাওয়া থেকে রোধ করত। অন্য দুই দিকে উঁচু প্রাচীরের ওপর থাকতো মন্দির। কিছু কোর্টে পাথরের গায়ে ধাতুর তৈরি রিং (হুপ) থাকত। যেটার মধ্যে দিয়ে বল ফেলা হতো। চিচেন ইৎজা, কোপান, টিকালসহ অনেক মায়া নগরে বিশাল আকারের বল কোর্ট পাওয়া গেছে, যা মায়াদের স্থাপত্যশৈলী আর নগর পরিকল্পনার নৈপূন্যতা প্রদর্শন করে। এই কোর্টগুলো শুধু খেলার জন্যই ছিল না, বরং এক ধরনের সামাজিক আর ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত।
খেলায় ব্যবহৃত বলটি ছিল রাবারের তৈরি, যার ওজন ছিল প্রায় ৩-৪ কেজি। বুঝাই যাচ্ছে, বলটি বেশ ভারী ও শক্ত হত। তাই খেলোয়াড়দের জন্য এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না।
খেলার নিয়ম
এই বল খেলার নিয়মগুলিকে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে, চিত্রিত উপস্থাপনা এবং পাথরের স্মৃতিস্তম্ভের জন্য। খেলার শুরুতে বলটি হাতে কোর্টে ছুঁড়ে ফেলা হত এবং সেই মুহূর্ত কাঁধ, কোমর, হাঁটু আর কনুই দিয়ে বলটিকে আঘাত করতে হতো। ভাবতে পারছেন, কতটা কঠিন? তার ওপর, বলটির ওজনের কারণে এটিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করাও বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। খেলার মূল ব্যাপার ছিল বলটাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা আর প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো। কেউ যদি বল মাটিতে ফেলে দিত, তাহলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পেত। অর্থাৎ পয়েন্ট কাটা যেত। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বলটাকে দেয়ালের পাথরের রিংয়ের ভেতর দিয়ে পাঠানো। যেটা করতে পারলেই, খেলা শেষ—সরাসরি জয়! তবে পয়েন্টের ভিত্তিতে সাধারণত নিষ্পত্তি ঘটতো। তবে স্কোরিং সিস্টেম বা বিজয়ী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ঠিক জানা যায় না। Popol Vuh-এর তথ্য অনুসারে আমরা অনুমান করতে পারি যে খেলাটি একের পর এক, জোড়ায় বা দলে খেলা যেতে পারে। চিত্রগুলিতে, খেলোয়াড়রা বিভিন্ন মনোভাব নিয়ে উপস্থিত হয়।
মজার ব্যাপার হলো, খেলাটি সাধারণত রাজা পুরোহিত এদের সঙ্গে বন্দী বা কয়েদির খেলা হোত। সেখানে নানান ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাকে হারানো হোত এবং খেলা শেষে তাকে বলি দেওয়া হোত। যদি কোনক্রমে সে রিং এর ভেতর বল গলিয়ে জিতে যায় তাহলে রাজা পুরোহিতের মাথাকাটা পড়ত। আসলে এই খেলার সঙ্গে পোপোল ভুহের যমজ ভাইদের কাহিনি জড়িত, যেখানে তারা ভূগর্ভস্থ দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। মায়ারা বিশ্বাস করতেন যে, এই খেলার মাধ্যমে আলো এবং অন্ধকারের শক্তির লড়াই প্রকাশ পায় এবং এটি জীবনের চক্র—যেমন জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের প্রতীকও বটে!
একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মায়া সভ্যতা ছিল মধ্য আমেরিকায় রাবার ব্যবহার করা প্রথম জাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পোক-তা-পোক খেলার বল ছিল রাবার দিয়ে তৈরি। আর এই রাবার ছিল মায়া সভ্যতার একটি বড় আবিষ্কার। মায়ারা এক ধরনের বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে রাবার তৈরি করত।
-: হিরো টুইন্স’- এর গল্প :-
পাতাল লোকে ফুটবল ম্যাচ
তখনও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়নি। সবুজ পালকের আবরণধারী প্রভু সমুদ্রের দেবতা গুকুমাটজ এবং স্বর্গের দেবতা হুরাকান সৃষ্টির নেশায় সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাহাড় পর্বত নদী ঝর্না তথা স্থলভাগককে ওপরে আনেন এবং সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলেন। পশু পাখি সাপ ইত্যাদিতে ভরে দিলেন চারণভূমি। তবে প্রত্যেকের জন্য ছিল নির্দিষ্ট নিজস্ব চারণভূমি। কিন্তু তারা এতে সন্তুষ্ট থাকলেন না। তারা চাইলেন আরও উন্নত প্রানী। যারা তাদের সৃষ্টিকর্তাদের স্মরণ করবে, তাদের মহান কীর্তি প্রচার করবে। আচার অনুষ্ঠান বলিদানের মাধ্যমে পূজার্চনা করবে। তাই বানাল মাটির মানুষ পরে আরও উন্নত মানুষ বানানোর অভিপ্রায়ে বানানো হলো কাঠের মানুষ। এরজন্য ডাক পড়েছিল দুই দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের। কিন্তু এই মানুষগুলো ছিল নৃশংস। তাই তাদেরও ধ্বংস করা হয়। কিছু কাঠ মানুষকে বাঁদরে পরিনত করা হলো। এই মর্তভূমিতে দেবতারা প্রায়ই আমোদ প্রমোদের জন্য আসতেন। মর্তভূমি তখন ছিল দেবভূমি।
দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের দুই যমজ পুত্র ছিল। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপু। এরা ছিল দুর্ধর্ষ “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) যা একপ্রকার মেসোআমেরিকান ফুটবল – এই খেলায় পারদর্শী। তারা দিনরাত এই খেলায় মেতে থাকতো। এই খেলায় মুখরিত হোত পৃথিবী।
তারা খুব প্রতিভাবান ছিল, সবসময়েই এই খেলায় তারাই জিতত। জিতলে কী হয়, তারা খেলবার সময়ে বড্ড জোরে জোরে চিৎকার করত। পাথরের বল কোর্টটি জিবালবার প্রবেশপথের ঠিক উপরে অবস্থিত ছিল। তাদের ক্রমাগত চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তথাকথিত মায়া নরক দেবতা এক্সিবালবার। এইরকম চিৎকারে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে তিনি নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে যমজ দেবতাকে সমন দিলেন। এই এক্সিবালবা অত্যন্ত বদরাগী এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের দেবতা ছিলেন।আকাশের দেবতারাও তাদের এড়িয়ে চলতো। মায়ারা সচরাচর এর নাম মুখে আনতে চাইত না। কেননা মায়াদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি ভুল করেও এর নাম মুখে আনে তবে তার আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।
সে যাই হোক,স্বর্গের দেবতাদের বারন সত্ত্বেও খেলার প্রতি ভালোবাসা আর আত্মসম্মান রক্ষার্থে তারা পাতালে যায়। হুন হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু দেবতাদের প্রায় ঠেলে দিয়ে অনায়াসে পাতালের নয়টি স্তরই অতিক্রম করতে পেরেছিল। এরপর তারা পাতালে প্রবেশ করলে হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে জিবালবার প্রভুরা(১২ জন দেবতা) তাদের ব্যবহারিক রসিকতার মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানালেন। তখন নরক দেবতা তাদের বেশ কয়েকটা কঠিন পরীক্ষার সামনে ফেললেন। প্রথমে তাদের বলা হল যে তারা যেন যেভাবেই হোক কাঁটার সেতু পেরোয়। এই সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নদী। তারা সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে নরকের দেবতার কাছে পৌঁছালেন। সেখানে নরক দেবতা একটা কাঠের ছড়ি কাঁধে ঠেকিয়ে অভিবাদন করলেন। তারপর দুজনকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে এই দেবতাদ্বয়কে কি তারা চিনতে পারেন! দেবতাদ্বয়কে তারা চিনতেন না। ফলে এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলেন। তখন এক্সিবালবা তাদের শয়তানি করে একটা নিরীহ কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। দুই ভাই তার চক্রান্ত ধরতে না পেরে সরল বিশ্বাসে সেই বেঞ্চিতে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন সে বেঞ্চিতে আগুন ধরে গেল। তারা আগুনে বেঞ্চি থেকে বেরুতে না পেরে পুড়ে মারা গেলেন। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে মারার পর হুন-হুনাহপুর মাথা পাতালের একটি ক্যালাবাস নামের গাছে কাঁটার সাহায্যে স্থাপন করা হয়। আর তার দেহ তার ভাইয়ের সাথে গাছের পাদদেশে সমাহিত করা হয়।
শিবালবার রাজাদের অবাক করে দিয়ে, গাছটি সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে এবং তারপর থেকে এই গাছটি পবিত্র হয়ে ওঠে।একদিন জিবালবার রাজকুমারী এক্সকুইক, (যাকে ব্লাড মুন দেবীও বলা হয়), যখন বাগানে বেড়াচ্ছিল তখন সে এই মাথাটি দ্বারা আকৃষ্ট হন, যদিও তাকে এটি থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। তিনি গাছের আসেন এবং একটি ফল কুড়োতে গেলে মাথাটি তার হাতে থুতু দেয়। এরফলে সে অলৌকিকভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এরপর তাকে পাতাল থেকে বহিস্কার করা হয়। সে তখন পাতাল ছেড়ে পৃথিবীর উপরের রাজ্যে তার শাশুড়ি এক্সমুকেনের(জুমুকেন) সাথে দেখা করেন এবং ঘটে যাওয়া সমস্ত কাহিনী বিবৃত করেন।
এক্সমুকেন তার ছেলেদের উপর ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির কারণে, এক্সকুইককে অবিশ্বাস করে এবং নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তাকে বেশ কয়েকটি কাজ দেয়। এক্সকুইক একে একে পরীক্ষাগুলি উত্তীর্ণ হন এবং কিছুটা বিশ্বাস অর্জন করে। এদিকে নির্ধারিত সময়ে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। অথচ তাদের দিদার মনে তাদের প্রতি অবিশ্বাস রয়েই যায়। তখন তাদেরও দেখাতে হয় যে তারা যোগ্য পিতার সন্তান। তারপর সে তাদের কাছে টেনে নেয়। দুই যমজ নাতি বড় হয়ে ওঠে।
জুমুকেন বা এক্সমুকেন তার ছেলেদের খেলার বল ও সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখত কারণ সে চায় না যে তার নাতিরা তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছে তা জানুক এবং তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করুক। কিন্তু ভবিতব্য খন্ডাবে কে? যমজরা সরঞ্জামটি খুঁজে পায় এবং তারা দুর্ধর্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া তারা দুর্দান্ত শিকারী এবং জাদুকরী ক্ষমতাও অর্জন করে। একদিন শিকার করতে গিয়ে তারা একটি ইঁদুর ধরে এবং ইঁদুরটি তাদের বলে, পাতালে তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছিল। তারা তখন মনেমনে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
