তপোপ্রিয়

নিরুত্তর রহস্য

আমি আজও বুঝতে পারিনি জীবনের ব্যাপ্তি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাকি মৃত্যু থেকে জন্ম পর্যন্ত। যে প্রচলিত চেতনায় আমরা প্রাণিত তাতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ব্যাপ্তিটাকেই সত্যি বলে ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু মৃত্যু থেকে জন্ম পর্যন্ত যদি সত্যিই কোন ব্যাপ্তি থেকে থাকে? সেই জীবনযাপন যেহেতু অদৃশ্য তাই অবাস্তব। কেন জানিনা কেবলই মনে হয় ওই উল্টো পিঠের জীবন মিথ্যে নাও হতে পারে। হতে পারি এ এক ধরনের সান্ত্বনা খোঁজার প্রয়াস, যেহেতু মায়ের হারিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না। আর আমার মত প্রিয়জন বিচ্ছেদকাতর অনেকেই নিশ্চয় এমন আশ্বাসকে জীবনযাপনের ভিত্তি করতে চায়। তাই কি প্রাচীনকাল থেকে মরণোত্তর জীবন কিংবা জন্মান্তর নিয়ে নানা ধ্যানধারণা গড়ে উঠেছিল?

মায়ের মধ্যে জন্মান্তরের বিশ্বাসটা অবিচল ছিল। জীবনভর মাকে যত কষ্ট দুঃখ ভোগ করতে হয়েছিল তার কারণ হিসেবে মা বলতো, 

‘পূর্বজন্মে কত যে পাপ করেছিলাম, তার ফল এখন পাচ্ছি।’

কর্মফলে মায়ের ছিল অগাধ বিশ্বাস। প্রায়ই শুনতাম মায়ের মুখে, 

‘কী যে কুকর্ম করেছিলাম! তার শাস্তি এখন ভোগ করছি।’

সারাদিনের কাজকর্ম ফিরে সন্ধ্যেবেলা হাত-পা-মুখ ধুয়ে মা তার গোপাল-গোবিন্দের আরাধনায় বসত। শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম দিয়ে শুরু হতো আরাধনা, তারপর একের পর এক চলতো নানা রকম বন্দনাগীতি। থাকতো নরোত্তম দাসের নানা রচনা। এই আরাধনার বিবরণ কিছু কিছু অনেকবার উল্লেখ করেছি। এক-দেড় ঘন্টা সন্ধ্যেবেলা মা কাটাতো ঠাকুরের আসনে, উঠে মাঝে মধ্যেই ঘটের জল আজলা করে ছিটিয়ে দিত ঘরে ঘরে। যদি এখনো কোন নির্জন অবকাশে নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে মায়ের সান্ধ্য আরাধনার বাণীচিত্র উদ্ধারের চেষ্টা করি তো দেখি মা জোড়াসনে নিমীলিত চোখে দুহাত জড়ো করে কোলের ওপর রেখে সটান বসে অপার্থিব দরদ আর ভক্তি মিশিয়ে গাইছে,

ভবসাগর তারণ কারণ হে 

তুমি বিষ্ণু প্রজাপতি শংকর হে 

মনো যেন রহে তব শ্রীচরণে 

রবিনন্দন বন্ধন খন্ডন হে

সন্ধ্যেবেলা পুজো সেরে উঠে মা সর্বত্র ঘটের জল ছিটিয়ে দিতে দিতে ফেলতো আমার গায়ে মাথায়ও দু-চার পশলা। মায়ের পুজোর আসনে গোপালের পায়ের কাছে একটা ছোট শিশি থাকতো। সেই শিশিতে ছিল কিছু শুকনো মাটি, সাদাটে ধুলোর মত। সেই মাটি কোত্থেকে এনে রেখেছিল মা জানিনা, বোধহয় মা বলেছিল এই মাটি বৃন্দাবনের। জল ছিটাবার আগে বা পরে সেই শিশি খুলে এক চিমটি মাটি হাতে নিয়ে মা বুলিয়ে দিত আমার মাথায়-গায়ে, বিশেষ করে হাতগুলিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে সুর করে বলতো, 

ধুলি নয় ধুলি নয় গোপীর পায়ের রেণু

যেই ধূলি মেখেছিল নন্দের বেটা কানু

মায়ের কাছে শুনেছি, নাকি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ একবার ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে নিদান হিসেবে গোপিনীদের পায়ের ধুলি মেখে পরিত্রাণ পেয়েছিল। সাধক নরোত্তম দাসেরও হয়েছিল দুরারোগ্য ব্যাধি। তিনিও ওষুধ হিসেবে এই ধুলি গায়ে মেখে রোগ সারাতে পেরেছিলেন। সেই বিশ্বাস এই মা আমাকে সযত্নে ওই ধুলি মাখাত রোজ, যদি আমারও দৈহিক ত্রুটিমুক্তি ঘটে।

নরোত্তম দাসের গল্প শুনেছিলাম মায়ের মুখে, একাধিকবার। ছিলেন নাকি চূড়ান্ত অবিশ্বাসী, নাস্তিক। এক সময়ে ভয়ানক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বহু চিকিৎসা করেও সুস্থ হতে না পেরে বৈষ্ণবদের শরণাপন্ন হন এবং তাদের দেওয়া নিদান অনুসরণ করে রোগমুক্তি ঘটাতে পারেন। তারপর এই নরোত্তম দাস মহা ভক্ত হয়ে যান আর রচনা করেন বহু বন্দনা গীতি। 

আমার দিন গুলিতে প্রায়ই এখন বিস্ময় ঘনিয়ে আসে। আমি বুঝতে পারি না কেন মাকে খুঁজে পাই না কোথাও। কেন মৃত্যু এত জীবন্ত কাউকে এমন বরাবরের মতো অদৃশ্য করে দেয়? এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মানে কি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া? এই যে আমার নিজস্ব চেতনা কিভাবে তা নিশ্চিহ্ন হতে পারে? কায়া না হয় হারিয়ে গেল, কিন্তু চেতনা? যাকে কোনদিনও চোখে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না সে কেন দেহের সঙ্গে একই নিয়মে বিনষ্ট হবে? জন্ম থেকে মৃত্যু ব্যাপ্তিটা দেহের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলেও আমার কেন জানি না মনে হয় জীবনের উল্টো পিঠে থাকা মৃত্যু থেকে জন্ম ব্যাপ্তিটাকে আশ্রয় করে থাকে সেই একই চেতনা, যেহেতু এই দুটি বিষয়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং অজানা।

মায়ের মধ্যে এই বিশ্বাস আরো প্রবল ছিল। আমি তবুও সন্দেহের দোলায় দুলি, প্রমাণ নেই বলে ‌ হতাশ হতে পারি। মা কিন্তু প্রমাণের ধার ধারতো না। মা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, মৃত্যু মানে সব শেষ নয়। মৃত্যু আসলে অন্য এক নতুন জীবনের সূচনা মাত্র। 

এই বিশ্বাসকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রমাণ যেমন নেই তেমনি অস্বীকারই বা করব কোন্ কারণে? আমার তো মনে হয় অস্বীকার করার চেয়ে স্বীকার করা অনেক ভালো। তাতে যে কেবল সান্ত্বনা খুঁজে পাবো তাই নয়, জীবনযাপনেও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।

মায়ের মত সরল বিশ্বাসে ভরসা করে যদি চলতে পারতাম তাহলে বোধহয় যাত্রা পথ অনেক সহজ হয়ে যেত। কথাপ্রসঙ্গে প্রায়ই মা বলতো,

‘বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর।’

এই যে উক্তি মাকে দেখেছি কেমন অবলীলাক্রমে অনুসরণ করে যেত, কোন প্রাণান্তকর চেষ্টা অথবা কষ্ট ছাড়াই। আমার দেখে মনে হতো বিশ্বাসটা মায়ের জীবনে এক স্বাভাবিক প্রত্যঙ্গ, তার উপস্থিতি অবিচ্ছেদ্য। কিছু কিছু বিষয়ে রহস্য হয়ে থেকেই যায়। যেমন আমি দেখেছি মায়ের বিশ্বাসগুলি কিভাবে যেন সত্যি হয়ে যেত। আমি ঐশী কোন প্রভাবে বিশ্বাসী না অবিশ্বাসী নিজেও সঠিক জানিনা, কিন্তু মায়ের বিশ্বাসগুলি বাস্তবায়িত হতে দেখে কেবলই ইচ্ছে হতো এমনি বিশ্বাসের কাছে যদি নিজেকে সমর্পণ করে রাখতে পারতাম তাহলে নিশ্চয়ই অনেক দুশ্চিন্তা কেটে যেত। 

মায়ের প্রধান আরাধ্য দেবতা ছিল শ্রীগোবিন্দ। আগেও বলেছি, এই কৃষ্ণপ্রীতি মায়ের গড়ে উঠেছিল সেই ছোট্ট বয়স থেকে। অনেকেই মাকে বলতো, কৃষ্ণঠাকুরের আরাধনা যারা করে তাদের নাকি অনেক কষ্ট পেতে হয়। আমার এক মাসি বলেছিল, 

‘দিদি, তুই কৃষ্ণঠাকুরের পূজা করিস কেন? কৃষ্ণঠাকুর খুব দুঃখ দেয়।’

মা শুনতো সবার মতামত, কিন্তু গোবিন্দের আরাধনা বন্ধ করেনি কোন অবস্থাতেই। মায়ের ঠাকুরের আসন ছিল একটু অন্যরকম। ওই আসনের ঠাঁই পেয়েছিল তেমন সব দেবতার ফটো যাদের দেখা মেলে না অন্য ঘরে নিত্য পুজোর আসনে। বাসি হাতে ত্রিভঙ্গমুরারি শ্রীকৃষ্ণ ছিল মায়ের আসনে সর্বপ্রধান। কৃষ্ণ পূজার বিরোধিতা করত সবাই, মা শুনতো, কিন্তু কখনো নিজের কষ্টদুঃখের জন্য কৃষ্ণঠাকুরকে দায়ী করত না। বরং বলতো, 

‘আমি কষ্ট পাই আমার কপালের দোষে। কৃষ্ণের কী দোষ?’

যেমন একটু আগে বললাম, কিছু কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই জীবনে অনুল্লেখ্য অনেক ঘটনা ঘটতে দেখেছি আপাতদৃষ্টিতে যাদের তুচ্ছ মনে হলেও আরেকবার ভাবতে গিয়ে থমকে গেছি। তুচ্ছ বিষয়টি ক্রমশ এমন হয়ে উঠেছে যে হিসেব করতে পারিনি তার ব্যাপকতা কোথায় শুরু কোথায় শেষ। 

তখন তার বয়স পাঁচ-সাড়ে পাঁচ। উমুমতুমুমকে নিয়ে তার মা আর দাদু-দিদা বেড়াতে গিয়েছিল বেলুড় মঠ। ওখানকার মত সংলগ্ন বুক স্টলে ঢুকে সবাই যখন বই কেনাকাটা করছে তখন উমুমতুমুম বায়না ধরল কৃষ্ণের ছবি মলাটে থাকা কৃষ্ণজীবনী মূলক একটি বই কিনে দেওয়ার জন্য। হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু লক্ষ্যণীয় ছিল ব্যাপারটা আমার কাছে। 

তার অল্প কিছুদিন পরের ঘটনা। সেটা ছিল জন্মাষ্টমীর তারিখ। আমার কাছে দিনটির তাৎপর্য কী জেনে নিল সকালের দিকে। দুপুরবেলা দেখি সংগোপনে উমুমতুমুম মায়ের ঘরে গিয়ে কোত্থেকে এক কৃষ্ণঠাকুরের ছবি জোগাড় করে তার সামনে খবরের কাগজ পেতে বসে চোখ বুজে আরাধনায় মত্ত। দু-একটা ফুল ও কোত্থেকে এনে কৃষ্ণের পায়ে রেখেছে, আর এক টুকরো কাগজকে থালা বানিয়ে ভোগ সাজিয়েছে, ক্যাডবেরি চকলেট ও চুইংগাম দিয়ে। 

তার ড্রইং খাতা খুলে একদিন দেখি সাড়ম্বরে সে কৃষ্ণ আর গোপালের ছবি এঁকে তলায় লিখে রেখেছে, ‘মাই ফেভারিট গোপালা’। তারডিস্কের পাটাতনে নন-রিমুভেবল ইঙ্ক দিয়ে সে এঁকেছে শিখিপুচ্ছ চূড়ায় হাতে বাঁশি ত্রিভঙ্গুরারি শ্রীকৃষ্ণের ছবি। 

এক্সমাস ডে-তে স্যান্টাক্লজ এখন এ দেশের বাচ্চাদেরও উপহার দেয়। উমুমতুমুম তার বন্ধুদের দেখাদেখি এবারই স্যান্টাক্লজের কাছে উপহার পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল, সেই মতো প্রার্থনার কথা কাগজে লিখে আগের দিন রাতে বালিশের তলায় রেখেছিল ঘুমোবার আগে। সে ঘুমলে সেই কাগজ খুলে দেখি সে প্রার্থনা জানিয়েছে যেন তাকে কৃষ্ণঠাকুরের একটি মূর্তি দেওয়া হয়। 

তার প্রায় দেড় বছর বয়সের সময় মা চলে গিয়েছিল। আমি মায়ের কথা প্রায়ই শোনাই তাকে, কিন্তু কখনো বলিনি মায়ের কৃষ্ণপ্রীতির কথা। মা চলে যাওয়ার পর ঠাকুর দেবতার প্রসঙ্গও চলে গেছে আমার ঘর থেকে। তাহলে তার মধ্যে এই কৃষ্ণপ্রীতির উন্মেষ কোন্ অজানা উৎস ঘটালো এমন করে? এত দৈহিক জিনঘটিত ব্যাপার নয়। তাহলে? এতটা কাকতালীয় ব্যাপার হতে পারে? 

অনেক রাতে বাড়ির ছাদে উঠে আকাশের তারাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি অন্যরকম কোন সাড়া। এই রাত এই আকাশ যদিও হবে হয়তো এক মৃত বাস্তব তবুও কিছুটা কল্পনা অবলম্বন করেই বোধহয় দেখতে পাই সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, দেখতে পাই ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা। ওই কাল্পনিক আলোক বিন্দু গুলির সমন্বয়ে আপ্রাণ আঁকার চেষ্টা করি চলে যাওয়া মায়ের মুখ, মায়ের অস্তিত্ব। কেবল একটি কথা শোনাবার জন্য। দেখো মা, কোন্ অচিন রহস্যে মেয়ে আমার তুমি হয়ে গেছে, তোমারই স্বভাবের ছায়া প্রলম্বিত তার স্বভাবে। এই প্রাণের বার্তা কোন অদৃশ্য কল্পনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার আকুল আকুতিতে নিদ্রাহীন নিঃসঙ্গ রাতে টালমাটাল পায়ে আমি ঘুরে বেড়াই ছাদে, মহাকাশের মহাকাশের দিকে চোখ ফেলে। বাঘ নিরুদ্ধরাতে হারিয়ে যাওয়া মায়ের ঠিকানা খুঁজে বেড়াই।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *