সুতপন চট্টোপাধ্যায়

    বিনতা

বিনতা যখন দ্বারবাসিনী ইস্কুলে মাস্টারির চাকরি নিয়ে এল, তখন বয়স প্রায় ছাব্বিশ। পকেটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের  এম এ ডিগ্রি, এই গণ্ডগ্রামে কেন যে চাকরি নিয়ে এল? তা দেখে সবাই অবাক। এ অঞ্চলে শহরের মানুষ চাকরি করতে আসতে  চায় না। বিনতা  খোদ শ্যামবাজারের মেয়ে। কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউসে আড্ডা দিত বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু সে নিজেই এসেছে। আসতেই  পারে, কিন্তু সে যে বেশি দিন এই দ্বারবাসিনী স্কুলে থাকবে না তা নিশ্চিত। ইস্কুলের প্রেসিডেন্ট তাকে নিতে চায় নি, কিন্ত তাঁর রেজাল্ট দেখে তাকে না করার কোন উপায় নেই। হেড স্যার বলেছিল, বিনতাকে ছেড়ে দিলে যে কেউ লুফে নেবে। লসটা হবে আমাদের। আমদের এই সুযোগ মিস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। 

এ কথা জেনে ছিলাম অনেক পরে। অগত্যা, বিনতা দিদিমনি আমাদের ইস্কুলের প্রথম মহিলা শিক্ষক। ইস্কুলে হৈ চৈ পরে গেল। এ ঘটনা যেমন আকস্মিক, তেমনি রোমাঞ্চকর। চারিদিকে খবর রটে গেল, ইস্কুলে একজন দিদিমনি এসেছে। যেন ইস্কুল নয় বিনতা দিদিমনিই সকলের প্রধান আকর্ষণ! 

স্কুলের সবুজ প্রাঙ্গণে দিদিমনি  পাট ভাঙা ভিন্ন ভিন্ন রঙের শাড়ি পরে ক্লাস নেয়। তার হাসিহাসি মুখ হাঁটার সময় গম্ভীর হয়, তাঁর প্রসাধন খুব প্রকট নয়। কিন্তু পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে পাউডারের মিষ্টি গন্ধ চারপাশ ছরিয়ে যায়। বিনতা দিদিমনিকে আসতে  দেখে ছাত্ররা সরে যেত, কিন্তু চলে যাবার পর ওই সুগন্ধের ট্রেইল ধরে অনেকটা হেঁটে যেতো ছেলেরা। তার পাশ দিয়ে যাবার সাহস ছিল না। যে ওই সুগন্ধের লোভে তার কাছ দিয়ে পাশাপাশি হাঁটে। এই সুগন্ধ শহরের লোকেরা মাখে, গ্রামে এমন শরীর-সুগন্ধের চলন ছিল না। । 

প্রথম এসে খুব হতাশ হলেন বিনতাদি। ইংরাজী পড়াতে এসে বুঝলেন এই ধারা বজায় থাকলে কেউ পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাবে না। তার সমস্ত পরিশ্রম জলে  যাবে। কিছুদিন পর তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, আমাদের টিউটোরিয়াল নেবেন ইস্কুলের পর। আমাদের ইস্কুলে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। শুনেছিলাম তিনি হেডমাস্টারের  সঙ্গে প্রায় লড়াই করে এই প্রস্তাবে রাজি করিয়েছিলেন। তাকে অন্যতম বাধা দেওয়ার কারণ তার ছাত্ররা যদি ইংরাজীতে ভাল ফল করে তবে অন্য মাস্টারদের বদনাম হবে। বিনতাদি সেই যুক্তি কে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। একদিন আমাদের ক্লাসে এসে বললেন, কে কে আমার টিউটোরিয়ালে পড়তে চাও? ইস্কুলের শেষ এক ঘন্টা  ক্লাস করতে হবে। 

বিনা পয়সায় এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়! প্রায় সবাই হাত তুলে সমর্থন জানালো। তখন বুঝিনি আমরা এক চরম অবস্থার মধ্যে ঝাঁপ দিয়েছি। আমাদের ইস্কুলের সামনে একটা ঘরে টিটোরিয়ালের ব্যবস্থা হল। দশম ক্লাসের ছাত্রছাত্রী প্রায় সবাই বেশ ধেরে। ততদিনে পৃথিবীর সব না হলেও অনেক কিছু জেনে ফেলেছি। স্ত্রী পুরুষের শরীর সম্পর্কে জ্ঞান ভালই তখন। ছেলেদের থেকে মেয়েরা অনেক আগেই টের পায়। বিনতাদির প্রস্তাবে রাজী হওয়ায় ক্লাসের বুলা ফিসফিস করে গীতাকে বলেছিল, ছেলেরা কেন রাজি হয়েছে জানিস? অনেকক্ষণ হাঁ করে বিনতা দিদিমনির দিকে তাকিয়ে থাকবে বলে। গিলবে বলে। আমাদের কানে সেকথা পৌঁছে দিয়েছিল গীতা। তার সঙ্গে অমলের তখন বইএর ভাঁজে চিঠি চালাচালি চলছে। প্রেম ঠিক না, তবে ইন্টুপিন্টু আর কি!

বিনতাদির এই  মূর্তি আমারা আগে দেখিনি। প্রথম দিন ক্লাসে এসে বললেন, টাস্ক যা দেব সব করে আসতে হবে। না করে এলে বেঞ্চির উপর মাথা নীচু করে দাঁড়াতে হবে। যাতে তাকে সবাই দেখতে পায়। আমরা ভাবলাম নিছক হুঁশিয়ারি। কি আশ্চর্য ক্লাসের সাত দিনের মাথায় বুলাকে পড়া না পারায় বেঞ্চির উপর কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন। প্রথমে আমরা মনে মনে লাফিয়ে উঠেছিলাম। ঠিক হয়েছে যেমন পাকা পাকা কথা। ছেলেদের নামে বদনাম? মজাটা দেখ এবার?  বিনতাদির এলেম আছে। বদমাইসটাকে ঠিক ধরেছে।  কিন্তু পরে তো ভয়ে আর আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলাম ভিতরে ভিতরে। মাথা নীচু করে বুলা দাঁড়িয়ে আছে কান ধরে। এরপর  যদি বাইরে ইস্কুল কম্পাউন্ডে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়? আমরা তো আর ছোট বাচ্ছা নই!

বিনতাদির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। যা আমরা ক্লাস  সেভেনে পরে  এসেছি সেই গ্রামারের প্রথম ভাগ থেকে শুরু করলেন। প্রথমে মন হয়েছিল এ আর কী? তুড়ি মেরে বলে দেব। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারলাম, মেঘ তলায় তলায় অনেক গাড় কালো করে ঘনিয়ে এসেছে। যা এতদিন করে এসেছি সব মুখস্ত বিদ্যা, মাথার মধ্যে কিছুই ঢোকে নি। গ্রামার যে এত সহজ ও কঠিন, মন আর মাথার কাজ কে জানত!

কিছুদিনের মধ্যেই আমরা অবাক। বুলা চড়চড় করে এমন গ্রামারে উন্নতি করল যে তার টেন্স, ভার্ব, প্রিপোজিসান, এডজেক্টিভ প্রায় নিখুত ব্যবহার। আমারাই বুঝতে পারলুম না, এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন হল কি করে?  খুব অল্পদিনের মধ্যে আমদের অনেকের উন্নতি চোখে পড়ার মত। অন্তত ভার্বের ও টেন্সের ব্যবহারে চ্যাম্পিয়ন সবাই। কিন্তু সবাই কি এক দলে সমান খেলে?  কয়েকজন পিছিয়ে পড়তে লাগল। একদিন ক্লাসে তিনি জিজ্জাসা  করলেন, তোমরা রবিবার আমার বাসায় কী আসতে পারবে, সকালে? আমি পড়াব। আমরা তো শুনে তাজ্জব। রবিবার ছুটির দিনেও পড়াতে ছাড়বে না! ওনার কি পড়ানোর নেশা নাকি? আমরাও তখন অল্পবিস্তর ধুমপান  শিখে নেশার ব্যাপারটা বুঝি। ইস্কুলের পরে একটা চারমিনার কিনে তিন বন্ধু তেতুল গাছের আড়ালে সুখটান দিয়ে বাড়ি ফিরি।   

এবার বিনতাদির সংক্ষিপ্ত  বিবরণ। বিনতাদির বাড়ি কলকাতায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্রী। ক্লাসে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় তার শিক্ষার মানচিত্র। বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, উচ্চমাধ্যমিকের পর কি খেয়ালে তিনি বিজ্ঞান ছেড়ে এসেছিলেন ইংরেজী পড়তে। মাথা যার সতেজ সেখানে যে কোন ফসল সমান উৎকর্ষে ফলে। বিনতাদি তাই। তিনি ইংরেজী নিয়ে পড়তে পড়তে বুঝতে পেরেছিলেন, অধিকাংশ মানুষ বাংলায় ভেবে ইংরেজী মনে মনে তর্জমা বা ট্রান্সলেট করে বলে ও কাজ চালায়্‌। রেগে গেলে আবার বাঙালীরা ভুল ইংরেজীতে চিৎকার করে। ভুল ব্যবহারের  ছড়াছড়ি। বিস্ময়ের ব্যাপার  এই ভাষাটাই অফিসের, নথীর ভাষা, চিঠির ভাষা, শাসন তন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ। এই বিশাল বিশ্বভুবনে বাঙালির বেঁচে থাকার সম্বল এই ভাষা, মাতৃভাষা নয়। যেখানে ব্রিটিশ রাজ করেছে , পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষকে ধর্মান্তরিত করেছে, সেখানে তাদের ভাষা রক্তে মিশিয়ে দিয়ে তবে দেশ ছেড়েছে। এর থেকে খুব সহজে মুক্তির পথ দু’একটা দেশ ছাড়া বেরিয়ে আসার সাহস কেউ দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি শহরের অলিতে গলিতে ইংলিশ মিডিয়াম ইস্কুল ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে। ছেলে মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়ালে ভবিষ্যত অন্ধকার। হয়ত ভিখিরী হয়ে ভিক্ষে করতে হবে!

ইংরেজী সাহিত্যের কারণে  বিনতাদি জানতে পেরেছিলেন, সারা পৃথিবীর কথা আর সেখানেই তার নিজের মধ্যে সঙ্ঘাত শুরু হয়। একদিন বাড়িতে ফিরে বাবাকে দেখায় তার আমাদের গ্রামের চাকরির নিযোগ পত্র। বিনতাদির বাবা কেঁদে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, তুই এই শহর ছেড়ে গ্রামে যাবি? এখানে তো অনেক চাকরী। এখানেই হয়ে যাবে। আর একটু অপেক্ষা কর। বিনতাদি সে কথা শোনে নি।

বিনতাদির ছাত্র আমরা টেস্ট পরীক্ষায় এমন রেজাল্ট করলাম যে টিচার্স রুমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকালো কিছুদিন। এর মধ্যে আমরাও ভয় কাটিয়ে বিনতাদির কাছের হয়েছি। অনেক সহজ হয়েছি। 

গ্রামের ছেলেদের পাকামো  শুরু হয় গোঁফ গজালে। তার আগে খুব  ইনোসেন্ট মুখ করে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের তখন বেশ স্পষ্ট গোঁফের রেখা, গালে দাড়ির  হাল্কা কালো ঘাস। চুলের স্টাইল বদলাই  মাসে মাসে। সবিতা, সন্ধ্যা, স্নিগ্ধা, বেলা, বুলা  এমন অনেক মেয়েদের গোপন নির্দেশে আমাদের মাথার চুলের টেরি কাটা বদলে বদলে যাচ্ছে। এমন এক দিনে ক্লাসের যুগল জিজ্ঞেস করল, দিদিমনি, আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

বিনতাদি বলল, বল।

যুগল বলল, বকবেন না তো?  

বিনতাদি বললেন,  না বকবোনা। বল।  

যুগল জিজ্ঞাসা করল, আপনি আমাদের গ্রামে চাকরি নিয়ে এলেন কেন? আপনি কি প্রেমে আঘাত পেয়ে গ্রামে চলে এসেছেন?

বিনতাদি বুদ্ধিমতি। কোন উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলেন, এ কথা তোর মনে হল কেন?

এক বুক সাহস নিয়ে যুগল বলল, আমাদের গ্রামের লাইব্রেরির একটা বই আমি  সম্প্রতি পড়েছি । বাবা মায়ের জন্য এনেছিল। বাবা বারণ করেছিল এই বই না পড়তে। আমি লুকিয়ে পড়ে ফেলেছি। সেখানে দেখলাম, ঠিক আপনার মত উপন্যাসের নায়িকা বিরহে কলকাতা শহর ছেড়ে গ্রামের ইস্কুলে মাস্টারি করতে চলে গেল। পড়তে পড়তে তখন আপনার কথা বারবার মনে পড়ছিল। আপনিও কি সেই কারণে…

বিনতাদি হেসে উঠলেন। এই প্রথম তার নির্মল হাসি আমরা অবাক হয়ে দেখলাম। তিনি সুন্দরী নন। কিন্তু তার এই হাসি মুক্তর মত ছড়িয়ে পড়ল সারা ক্লাসময়। ঝকঝকে দাঁতের পাটি, নিখুত সাজানো দাঁত, সারা মুখে হাসির আলো ঝলমল করে উঠল। দাঁড়িয়ে পড়াচ্ছিলেন।নিজের চেয়ারে বসলেন। তারপর যুগলের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি পড়তে পড়তে বুঝেছিলাম, আমাদের দেশে ঠিক ইংরেজী না শিখলে বড় চাকরি পাবি না, দেশের বাইরে যেতে পারবি না, জীবনে উন্নতি করতে হলে এই ভাষাটা শিখতে হবে। শহরে শেখানোর অনেক মাস্টার মশাই আছে। আমার  সেখানে দরকার নেই। আমি নরম মাটির সন্ধান করছিলাম।কাদা মাটি । যা দিয়ে আমি মনের মত করে শেখাতে পারি, গড়তে  পারি। তাই গ্রামে এসেছি। এসেছি একতাল  কাদামাটির সন্ধানে। শহরে, তোদের মতো কাদামাটি কোথায় বল?

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *