সুতপন চট্টোপাধ্যায়
শারাদ
শারাদ কাপুরের বাবা দেশ ভাগের আগে পাকিস্থান থেকে চলে এসেছিল দিল্লিতে। খুব ছোটো বেলার কালকাজীর এক দুস্থ ক্যাম্পের স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ঠিক কালকাজী নয় , এই এলাকার শেষ প্রান্তে বদরপুরের কাছাকাছি জায়গা পেয়েছিল শারাদের বাবা, বীর কাপুর। লাহোরে তাদের মুদিখানার ব্যবসা ছিল। খুব বড় না হলেও সংসার টগবগ করে চলত। বীর কাপুরের তেমন কিছু বড় সড় চাহিদা ছিল না। মধ্যবিত্ত মানুষের তার সংসার চলছিল বলে সে সন্ধেবেলা ছোট এক বোতল খুলে মৌজ করত বন্ধু নিয়ে। নেশা নয়, স্রেফ আমোদই ছিল সেই বৈঠকের প্রধান নির্যাস। কে জানত? নেতারা ভাগাভাগি করে দেবে দেশ টাকে? প্রথম যে দিন খবর এসেছিল বীর বিশ্বাস করে নি। কিন্তু তাঁর বুঝতে বেশী দিন লাগেনি যখন হাওয়ায় হিন্দু মুসল্মান ভেদাভেদের গন্ধ ভাসতে লাগল। একদিন সব গুটিয়ে মাকে ও বউ কে নিয়ে চলে এল এই রিফুইজি ক্যাম্পে।
সে দুর্দশার কথা ছেলেকে বলতে চাইত না বীর, কিন্তু তাঁর মা নাতিকে না জানিয়ে থাকতে পারত না। শারাদকে গল্পের ছলে বোঝাতে চাইত বীর তাঁর অসাধারণ ছেলে। দেশ ভাগ তাকে দমাতে পারেনি। অবাক হয়ে শুনতো শারাদ। বীর এখানে এসেই নেহেরু প্লেসের উলটো দিকে একটা গাড়ির গ্যারাজে ক্লিনারের চাকরি নিল। মাস মাইনেতে ডালরোটি কোন ক্রমে হয়ে যায়। তলে তলে সে খোঁজে ছিল এক চিলতে যায়গা। কারও বাড়ির নিচে। সেখানে সে মুদির দোকান করবে। এই কাজটা সে জানে। ভাল ভাবে জানে।
পেয়ে গেল কিছুদিনের মধ্যে কালকাজীর একটা ব্লকে। বেসমেন্ট। সেখানেই মাসিক বিক্রির চুক্তিতে যায়গাটা ভাড়া নিল। বীর ভাবতো দেশ ভাগ তাকে দেশ বদল করিয়েছে কিন্তু তার পেশাকে ভাগ করতে পারিনি। এখানে বলে রাখা ভাল এই কাহিনী বীরের নয় শারাদের।
২
শারাদের ভিতর বীজটা অঙ্কুরিত হয়েছিল কৈশোরে। সে ইস্কুল যেত কিন্তু তার মন পড়ে থাকত তার বাবার একচিলতে মুদির দোকানের আনাচে কানাচে। ইস্কুল থেকে এসে সে প্রতিদিন দোকানের জিনিস নানান কায়দায় সাজাত। বীরের দেখতে ভালো লাগত এই ভেবে, ছেলে বড় হলে তারই ব্যবসার হয়ত হাল ধরবে। বাবা হিসেবে তার এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কি? বীর ঠিক করেছিল সে ইস্কুল শেষ করলে নিজের জায়গাটা আস্তে আস্তে ছেড়ে দেবে। দেখতে দেখতে শারাদও সামলে নিতে শিখবে তার ও তার বাবার লাহোরে শুরু করা ব্যবসার দড়ি।
কালকাজীর অদূরে দেখতে দেখতে তৈরী হল নেহেরু প্লেস। লোকে বলে ছিল এতও বড় হতে কত বছর লাগবে কে জানে! দেশে তখন কমপিউটারের ঝড় আছড়ে পড়েছে। দিল্লিতে তার কোন সংগঠিত বাজার নেই। নেহেরু প্লেসের পরিতক্ত জমিকে বেছে নিল সরকার। কমপিউটার হাব হবে এখানে। তরুন শারাদের চোখের উপর নেহেরু প্লেস-এ গড়ে উঠতে লাগল এক বিশাল ইলেক্ট্রনিক্স ও কমপিউটারের উত্তর ভারতের বৃহত্তর বাজার। দেশী বিদেশি কোম্পানিরা এসে অফিস নিল, যা ভেবে হল তার ভিতর ঢুকে গেল আরো অনেক বাজার। দেখতে দেখতে পা ফেলার জায়গা রইল না। ইস্কুল ছেড়ে দিল শারাদ। পাড়ায় একটা সাউথ ইন্ডিয়ান হোটেল “নৈবেদ্যম”এ একটা ঠিকা কাজ নিয়েছিল সে। বাবাকে বলেছিল কাজ করলে রাতে খেতে দেয়। মন্দ কী?
নেহেরু প্লেস গড়ে উঠেছিল অনেকটা সময় ধরে, তার কারণ এখানের এক একটি বিল্ডিং এক সঙ্গে তৈরি হয় নি। অনেকগুলো বিল্ডিং এ বড় বড় অফিস ভর্তি হতে সময় লেগেছিল। শারাদ সবই লক্ষ করছিল। মাঝে মাঝে সে নেহেরু প্লেসে দেখে আসত। কুড়ি বছর বয়সে সে একটা সাউথ ইন্ডিয়ান রেঁস্তরা করার লাইসেন্স বের করল। এক বন্ধুর বাবার একটি বুক করা দোকান ভাড়া নিয়ে একার চেষ্টায়। সুদুর মাদ্রাজ থেকে কারিগর এনেছিল। সাজিয়ে ছিল দক্ষিণ ভারতের পটচিত্রে। তার হিসেব ছিল একটু অন্য অঙ্কের। সে নেহেরু প্লেসের অফিস-এর লোকজনকে তার ক্রেতা ভাবেনি। ভেবে ছিল যারা রোজ এখানে আসবে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরের কমপিউটার দোকানের ক্রেতা হিসেবে। দিল্লির চারদিকে বিস্তৃত অঞ্চল। জেলা শহর, আধা শহর, উন্নত গ্রাম থেকে দলে দলে ক্রেতারা আসতে লাগল কমপিউটার ও তার সঙ্গে যুক্ত সরঞ্জাম নিতে। তার চোখ ছিল সেই সব মানুষ যারা দিনের শেষে কম বা অল্প খরচায় খিদে মেটাতে পারে। দাম ও সে সেই ভাবে রেখেছিল মেনু বুকে।
একদিন শারাদের বউ শীলা বলল, ওখানে আর কোন জায়গা পাওযা যাবে না?
শারাদ বলল, কেন? কী হবে?
শীলা উত্তর দিল, আমি চালাব।
রেগে গেল শারাদ। বলল, ছেলেকে কে দেখবে? ড্যাডি তো আর দোকান চালাতে পারবে না।
অগত্যা ইচ্ছেটিকে দমিয়ে রাখল শীলা। সনু আর সিমরণ তার দুই সন্তান নিয়ে সে আটকে গেল সংসারে। কালকাজীর দোকানের উপরে শারাদ একটি ফ্ল্যাট কিনেছে। অবসরে শীলা ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে আসে। শ্বশুরের সঙ্গে হাত লাগায় ।
শারাদের মাথায় কিন্তু ঘুরতে লাগল শীলার কথাটা। মৌমাছির মত। শীলা মন্দ বলেনি। আরও বাড়াতে হবে ব্যবসা। তক্কে তক্কে ছিল। তার রেঁস্তুোরার পাশেই একটু দূরে ফুটপাতের উপর একটা জায়গা পেয়ে গেল সে চড়া ঘুষে। সেখানেই সে খুলে দিল ফ্রুট জুসের দোকান। দোকানের উপরে বসার জায়গা আর ফল, নীচে দই রাখার অনেকটাই যায়গা। এখানের ব্যবসার একটা মজা আছে। অফিস টাইম ব্যবসা। দশটা থেকে পাঁচটা। খুব জোর ছটা। তারপর শুনশান। কেউ থাকে না এই চত্বরে। মুদির দোকানের মতো সকাল সাতটা থেকে রাত দশটার গল্প নেই।
৩
চোখের সামনে তরতর করে উঠে গেল আনসাল টাওয়ার, দেবীকা টাওয়ার, সং্যোজ বিল্ডিং, স্ক্যাই লাইন বিল্ডিং, ইন্টারনাশানাল ট্রেড টাওয়ার, হেমকুন্ট চেম্বার, হেমকুন্ড টাওয়ারের মত পেল্লাই বাড়ি। শারাদের ফ্রুট জুসের দোকানটা রমরম করে চলতে আরম্ভ করল। বছর দুয়েকের মধ্যে এই একটি ফ্রুট জুসের দোকান থেকে চার চারটে দোকান করে ফেলল শারাদ। সাউথ ইন্ডিয়ান রেঁস্তুোরার একজন ম্যানেজার রেখে সে ফ্রুট জুসের দোকানের উপর নজর দিল বেশি। কারণ আমদানি এখানে বেশি। নো ক্রেডিট কার্ড। টাটকা নগদ। দিনের শেষে টাকার বান্ডিল নিয়ে কা্লকাজী ফিরত শারাদ।
বছর তিনের মাথায় ব্যবসা যখন বেশ কিছুটা বেড়েছে, ডোনেশান দিয়ে ছেলেকে সে ভালো একটা ইস্কুলে ভর্তি করে দিল। নিজে পড়াশোনা করেনি বলে তার কোন আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছেলের বেলায় সে ভেবেছিল, ছেলে তার মন্দ নয়। সে কেন এই দিল্লিতে পরে থাকবে। চাকরি নিয়ে বিদেশ যাবে। একদিন সে ও শীলা বিদেশে ঘুরতে যাবে। এই সব মাথায় যখন ঘুরছে, তখন নেহেরু প্লেসে একটা রেঁস্তুোরা নিলামে কিনে নিল সে। তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে ছয় মাসে তন্দুরস্ত উত্তর ভারতীয় রেস্তোঁরায় বদলে দিল শারদ। শীলাকে তার ব্যবসার ধারে কাছে ঘেঁষতে দিল না। যত বার শীলা বলেছে, সে রাজী হয় নি। হবেই বা কেন? একজন দুটো ঘর সামলাতে পারে না। সে বিশ্বাস করে , শীলা ঘর দেখলে , সে বাইরে তাকে সাজিয়ে তুলবে নিজের মর্জি মাফিক।
শিমরণ বড়, তার বিয়ে দিয়ে দিল একদিন চন্ডিগড়ে। পালটি ঘর মন্দ নয়। ব্যবসাদারের মেয়ে, খুঁজে পেতে মেয়েকে ঠিক কারোবারের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল শারাদ। শীলার ইচ্ছে ছিল, চাকরি করা দামাদ হবে, সে আর হোল না। শিমরণের যে খুব অপছন্দ তা নয়। শীলা দীর্ঘসশ্বাস চেপে মেনে নিয়েছিল। মনে মনে ভেবে ছিল, ছেলের সময় আমি তোমায় দেখাবো।
নতুন রেস্তোঁরা তাই এখন ধ্যানজ্ঞ্যান শারাদের। এইটা আইনক্নেস সিনেমার গায়ে লাগান। এখানে দশটা পাঁচটার গল্প নেই। সিনেমার সঙ্গে এই বিক্রি সমান তালে বাড়ে কমে। এভাবে চলতে চলতে শারাদ বুঝেছিল তার একটা অফিস দরকার। নেহেরু প্লেসের মধ্যেই একটা অফিশ স্পেস যোগাড় করে নিল শারাদ।
৪
বি টেক শেষ করেই সনু একটা চাকরি নিল আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। গুরগাও অফিস। প্রতিদিন সে সকালে চলে যায় , রাতে ফেরে। শীলা একদিন বলল, নোকরি করার কি দরকার, বাবার বিজনেসে যোগ দে।
মাকে বলল, আমি আমার কেরিয়ার নিজে তৈরি করতে চাই। ড্যাডি এখনও অনেক দিন বিজনেস করবে। চিন্তা কোর না। ড্যাডি একাই ম্যানেজ করে নেবে।
শীলা বলল, শারাদের বয়স হচ্ছে। ওর পাশে এবার একজন দাঁড়ানো দরকার সেটা বুঝিস?
সেটা যে সনু বোঝে না তা নয়, কিন্তু ততদিনে সে আলিগরের এক নবাব পরিবারের মেয়ে লুৎফার পাশে দাঁড়িয়েছে। লুৎফা এক খানদানি পরিবারের মেয়ে , কলেজ থেকেই সনুকে পছন্দ করে রেখে ছিল। এবার সেও চাকরি পেয়েছে অন্য এক কোম্পানিতে। সে থাকে বসন্তকুঞ্জে। ফেরার পথে প্রায় সনু বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসে তাকে।
একদিন সনু বাড়ি এসে মাকে এই কথাটা জানাতেই, ঝড় বয়ে গেল কালকাজীর বাড়িতে। শীলার মুখ গম্ভীর। প্রথম দিন শীলা শারাদকে বলল না। সনুর সঙ্গেও কথা বলল না। শুনে সে সনুকে বলেছিল, আমাদের কথা কি একবারেও মনে হয় নি? আমরা কি তোর মেয়ে ঠিক করতে পারতাম না। তার পরেই এই নিস্তব্ধতা।
কথাটা দুদিন পর শীলা খুব গম্ভীর মুখ করে শারাদকে বলল, সনু আলিগরের এক নবাবের পরিবারের মেয়েকে সাদি করবে বলছে। নাম লুৎফা।শারাদ প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর শীলার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই নাকি? কোথায় সনু? শীলা কিছুটা ভয়ার্ত গলায় বলল, ঘরে আছে, বেশি কিছু বলতে যেও না। শীলা ভেবেছিল আজ কিছু একটা করে ফেলবে শারাদ।
শারাদ সনুর ঘরের দরজা খুলে সনুকে জড়িয়ে ধরল। কানে কানে বলল, সাবাস বেটা। এবার লুৎফাকে বলে নবাবি বিরিয়ানির জবরদস্ত রেসিপি জোগাড় করে দে তো বেটা।
আমি নেহেরু প্লেসে একটা বিরিয়ানি সেন্টার খুলবো। আমার অনেক দিনের শখ।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
