রম্যরচনা
অধ্যায় : ১৯
সকালবেলা ডোরবেল বাজল।
সবে ঘুম থেকে উঠে চোখমুখ ধুয়ে প্রাতরাশ করতে বসেছিল হাচিয়া ফাল। আজ সে অন্য দিনের চেয়ে সকালে একটু বেশি জলখাবার খাবে বলে ঠিক করেছে যেহেতু গতকালই কবি পুলকিত পলায়নের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার মিথ্যে আশায় প্রাতরাশই করা হয়নি। আজ তাই দ্বিগুণ খাচ্ছে। পাউরুটি দুটো, কলা দুটো, দুটো বিস্কুট এবং একটা গোটা ডিম সেদ্ধ। সে স্বল্পাহারী যেহেতু স্বল্পাহারে স্বাস্থ্য এবং খরচ দুটোই বাঁচে। তাই সে একটা ডিমের অর্ধেক দিয়ে এবেলা পোচ বাকি অর্ধেক দিয়ে ওবেলা ওমলেট ভেজে খায়। ইচ্ছে থাকলেও ডিম সেদ্ধ খাওয়া হয় না কোনদিনই। ডিম বস্তুটার বিচিত্র চরিত্রের জন্য যেহেতু তাকে দু ভাগ করে একভাগ সেদ্ধ খেয়ে অন্য ভাগ দিয়ে ওমলেট বানানোর রাস্তা নেই। আজ সুযোগ পেয়ে সে গোটা ডিমটাই সেদ্ধ করে খাচ্ছে।
ডোরবেল বাজতে খাবার রেখে উঠতে হলো। প্লেটভর্তি খাদ্যবস্তু সাজিয়ে বসেছিল সবে, প্রথমে ডিমটাতেই এক কামড় বসাতে যাচ্ছিল। রান্নাঘর আর খাবার ঘর একসঙ্গেই। সেখান থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এসে দরজা খুলল এবং খুলেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং কবি পুলকিত পলায়ন। সে এতটাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল যে নড়াচড়া বা কথা বন্ধ হয়ে গেল তার আর সেই সুযোগে সে শুনলো এক উল্লাস,
‘ওহ্, বাঁচালেন। বড্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম আপনার জন্য।’
সম্বিত ফিরে পেল হাচিয়া ফাল। লোকটার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে গিয়েও পারলো না। তার কথা শুনে বরং কৌতুহল হলো তার। জিজ্ঞেস করল,
‘কেন, আমার জন্য দুশ্চিন্তা কেন?’
‘চলুন ভিতরে, বলছি।’
বলেই তার অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই পুলকিত পলায়ন এক রকম জোর করে তার বসার ঘরে ঢুকে গেল এবং বসল একটা চেয়ারে। হাচিয়া ফাল বাধ্য হয়ে দরজা ভেজিয়ে তার কাছে এসে সভয়ে দেখল লোকটা সঙ্গে করে এনেছে একটা মোটা খাতা। সে কী বলবে বা কী তার করা উচিত বুঝে ওঠার আগেই পুলকিত পলায়ন বলল,
‘আমি তো কবিতা পাঠ করছিলাম, কোন বাহ্যজ্ঞান ছিল না। আপনাকে তো বলেছি, এ এমনই মহাকাব্য যে পাঠ করলে বা শুনলে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ঘুম ইত্যাদি সব ভুলে যেতে হয়। ভুলেই ছিলাম তাই। কাল সকাল থেকে সারারাত কবিতা পাঠ করে আজ সকালে প্রথম পর্ব শেষ করে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি আপনি নেই। মহাকাব্য ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলিয়ে দেয়, ঘুম ভুলিয়ে দেয় জানি, কিন্তু জলজ্যান্ত কোন লোককে কি অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? মনে হল, এমন ক্ষমতা থাকলেও অবাক হওয়ার হেতু নেই। এই মহাকাব্য অভূতপূর্ব শক্তিশালী, আমার এক অক্ষয় কীর্তি। আবার দুশ্চিন্তাও হল। আপনার মত কাব্যপ্রেমী বিচক্ষণ বান্ধব যদি আমার কাব্য শ্রবণে বিলুপ্ত-বিলীন হয়ে যায় তো বড়ই দুঃখের কথা। তখন বুঝলাম, বেশ খিদেও পেয়েছে। কিন্তু এতই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম আপনার জন্য যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে ছুটে এলাম দেখতে কী হলো আপনার। সঙ্গে নিয়ে এলাম আরেক শক্তিশালী কাব্যগ্রন্থ যার ক্ষমতা আছে শূন্যে বিলীন হওয়া বন্ধুকে দেহধারণ করাবার। যাক, আপনি সুস্থ আছেন দেখে কী যে আনন্দ বোধ করছি! কিন্তু বড্ড খিদে পেয়েছে, প্রায় দুদিন না খেয়ে কবিতা পাঠ করে গেছি বাহ্য়জ্ঞান রহিত হয়ে। আপনার রান্নাঘরটা কোথায়?’
বলেই পুলকিত পলায়ন কবিতার খাতা হাতে উঠে নিজেই আন্দাজ করে রান্নাঘর অভিমুখে ধাবমান হল। হাচিয়া ফাল কিছু বলার সুযোগই পেল না। সে কেবল তাকে অনুসরণ করল। রান্নাঘরে ঢুকেই পুলকিত পলায়ন প্লেটে সাজানো খাবার দেখে সেদিকে ধেয়ে যেতে যেতে পুলকিত স্বরে বলল,
‘বাহ্, খাবার সাজিয়ে রেখেছেন দেখছি। আমি আসবো জানতেন নাকি?’
প্রথমেই সেই গোটা ডিম সেদ্ধটা মুখে পুরে দিল। তারপর হাচিয়া ফালের বিস্ফারিত চোখের সামনে একটা একটা করে কলা, পাউরুটির টুকরো ও বিস্কুট খেয়ে বাকি খাবারসুদ্ধ প্লেটটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,
‘নিন মশাই, আপনিও কিছু খেয়ে নিন। আমি আবার একা কিছু খেতে পারি না। বিশেষত সামনে কেউ না খেয়ে হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকলে। নিন, খান।’
হাচিয়া ফাল খিদেতে এবং রাগে জ্বলতে জ্বলতে প্লেটের বাকি একটি কলা, এক টুকরো পাউরুটি ও একটি বিস্কুট খেয়ে নিল বিনা বাক্যব্যয়ে এবং এই ভয়ে যে রাগ দেখিয়ে কিছু বলতে গেলে লোকটা হয়তো বাকি সবকটা খাদ্যদ্রব্য সাবার করে দেবে। খেতে খেতে সে শুনল লোকটা বলছে,
‘আপনি একটু বেয়াক্কেলে লোক আছেন মশাই। দুটো ডিম সেদ্ধ করলেই পারতেন। তাহলে আপনিও একটা ডিম সেদ্ধ খেতে পেতেন। দেখলেন তো, আমি কোন জিনিসই দুটো খাই না। জানতেন না বুঝি?’
হাচিয়া ফাল খেতে ব্যস্ত থাকায় কিছু বলতে পারছিল না। অবশ্য পুলকিত পলায়ন তাকে কিছু বলতেও দিচ্ছিল না। সে ততক্ষণে রান্নাঘরের টেবিলে তার কবিতার খাতা রেখে পাশের চেয়ারে বসেছে। বসে আবার বলতে লাগলো,
‘আজ সারাদিন আপনার এই রান্নাঘরে বসেই কাব্যচর্চা করা যাবে। বসুন মশাই, বসুন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন কেন? দাঁড়িয়ে খেলে হজম হয় না। বসুন। রান্নাঘরে কাব্যচর্চা বেশ লোভনীয় ব্যাপার। খিদে পেলেই হাতের কাছে খাবার মজুত। ওই তো, প্রচুর বিস্কুট-কলা-পাউরুটি আছে দেখছি। যাক, নিশ্চিন্ত তাহলে শুরু করা যাক। কী বলেন?’
হাচিয়া ফাল নিতান্ত অসহায়ের মতো একটা চেয়ারে বসে তাকিয়ে দেখল, তার রান্নাঘরে নানান তাকে সাজিয়ে রাখা বয়াম ভর্তি বিস্কুট-কলা-পাউরুটি। সে সব চোখের সামনেই রেখে দিয়েছে যেহেতু জানতো না জীবনে কখনো তাকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে।
ততক্ষণে পুলকিত পলায়ন খাতা খুলে কবিতা পড়তে শুরু করে দিয়েছে। পরবর্তী দু’ঘণ্টায় সাতখানা কবিতা পাঠের পর তার আবার খিদে পেল এবং সে বিস্কুট ভর্তি বয়াম এনে একের পর এক বিস্কুট খেতে লাগলো। দু’চারটে হাচিয়া ফালকেও খেতে দিল। দশ মিনিটে বিস্কুটের বয়াম পুরো ফাঁকা। তারপর আবার শুরু হলো কবিতা পাঠ। এভাবে আরো ঘন্টাচারেক সময় কাটিয়ে যখন সে বিদায় নিল তখন হাচিয়া ফালের রান্নাঘরের যাবতীয় খাবার শেষ। যাওয়ার আগে পুলকিত পলায়ন তাকে বলে গেল,
‘কাল আবার আসব। সকাল সকাল চলে আসব। রান্নাঘরে কাব্যচর্চা বেশ জমজমাট ব্যাপার। কী বলেন আপনি? আজই রাতের মধ্যে প্রচুর ডিম-কলা-পাউরুটি-বিস্কুট এনে রাখুন রান্নাঘরে। কিছু কেক-সন্দেশও এনে রাখবেন। সন্দেশ আবার আমার বেশ প্রিয়। কাল খুব জমবে আসর।’
সারারাত দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারল না হাচিয়া ফাল। পরদিন খুব ভোরে উঠে সে বাড়ি ছেড়ে পালালো। সারাদিন ঘুরে বেড়ালো স্টেশনে-ময়দানে নানা জায়গায়। ফিরল সন্ধের পর। রাতে কয়েকদিন এমনই করে বেড়ালো সে। বাকি জীবনটা এভাবে কাটাতে হবে কিনা যখন ভাবছিল তখনই একদিন খবর পেল যে পুলকিত পলায়ন কুকুরের তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে বেমক্কা পড়ে গিয়ে পা ভেঙে বিছানায় শয্যাশায়ী। হয়তো লোকটা কুকুরদের ধরে কবিতা শোনাবার চেষ্টা করেছিল আর তাই কুকুররা খেপে গিয়েছিল। হাচিয়া ফালের ওই কুকুরগুলিকে ডেকে বিস্কুট খাওয়াবার ইচ্ছে হলো তাকে এমন বেয়ারা-বেহায়া শত্রুর কবল থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। তবে ইচ্ছেটা দমন করল যেহেতু কুকুররাও তার শত্রু।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
![]()
