শেখ শাকিল আনোয়ার
শরৎপল্লী গ্রামের বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে একটা চায়ের দোকান আছে। দোকানটার কোনো নাম নেই, সবাই মুখে বলে, “ভজাদার দোকান”। তাই এখন দোকানটার পরিচয়ও তার মালিকের নামে হয়ে গেছে। দোকানটা তেমন বড়ো না আবার এলাহীও না। ইটের দেয়াল হলেও টালির চাল করা। দোকানের ভেতরে একটা কয়লার চুলা আছে তাতে ভজাদা চা তৈরী করে আর তার পাশে রাখা চারটে কাঁচের বোয়ামে চার ধরণের বিস্কুট রাখা। যেখানে মাঝে মধ্যেই পিঁপড়ের দল সংঘবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
দোকানের সামনে একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চ আছে। রং অনেক আগেই উঠে গেছে, শুধু কিছু কিছু জায়গায় লাল রঙের ছোপ এখনো রয়ে গেছে যেটা প্রমান দেই যে এটা কোনো একসয় ওর রং ছিলো। একটা পা একটু ছোট, তাই কেউ বসলেই হালকা দুলে ওঠে। তবু পাড়ার সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা সেটাই। চার জন অনায়াসেই বসতে পারে সেই বেঞ্চে। বেঞ্চটা ভজাদার বাবার আমল থেকেই আছে ওখানে। ওর বয়স এখন প্রায় চল্লিশ বছর। কিন্ত এখনো টিকে আছে আর সাক্ষী থেকেছে প্রতিদিন প্রত্যেক মানুষের জীবনের। তাদের বলে যাওয়া প্রতিটি কথার, হয়তো যাকে উদ্দেশ্য করে বলা তারা শুনেনি কিন্তু এই বেঞ্চটা শুনেছে, সবার হাসির সাথে হেসেছে -কেঁদেওছে,কিন্ত কেও বোঝেনি।
ভোরবেলা প্রথম এসে এই বেঞ্চে বসেন অবসরপ্রাপ্ত ঘোষ কাকু। উনি খুবই স্বাস্থ্য সচেতন তাই ভোরবেলায় ঘড়িতে পাঁচটা বাজার সাথে সাথে বেরিয়ে পড়েন জগিং করতে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই চলে আসেন শরৎপল্লীর পার্কে এখানে কয়েক রাউন্ড জগিং করে তারপর কিছু ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করে চলে আসেন ভজাদার দোকানে ঠিক ছয়টার সময়। তারপর বাম হাতে খবরের কাগজ আর ভজাদার তৈরী ধোঁয়া ওঠা স্পেশাল চায়ের ভাঁড় ডান হাতে নিয়ে মনোনিবেশ করেন কাগজের পাতায়। কিছু সময় বাদে ওই বেঞ্চে আর দোকানে ভিড় বাড়লে শুরু হয় ঘোষ কাকুর জ্ঞানের কথা। দেশের রাজনীতি নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেন, যেন প্রধানমন্ত্রী একটু পরেই ফোন করে তাঁর মতামত নেবেন পরবর্তী বাজেড কি ভাবে করবেন।
সকাল যত বাড়ে অফিসযাত্রীর ভিড় ততো বাড়তে থাকে। কেউ তাড়াহুড়ো করে দু’চুমুক চা খেয়ে বাস ধরতে দৌড় দেয়, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে বসের নামে দু-চারটে অভিযোগ করে তবেই ওঠে কাজের যাবার উদ্দেশ্যে।
একটু বেলা বাড়লে বেঞ্চটা দখল করে পাড়ার কিছু বেকার ছেলেগুলো। কারও হাতে চাকরির ফর্ম, কারও মোবাইলে নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন। কথার ফাঁকে কেউ বলে, — “এইবারটা হয়ে যাবে দেখিস।” সবাই জানে, কথাটা আসলে নিজেকেই সাহস দেওয়া।
দুপুরে স্কুল ছুটির পর কয়েকটা ছেলে-মেয়ে পাড়ার মোড়ে সাইকেলর পেছনে লাল কাপড়ে বাঁধা হাঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাকুর কাছ থেকে দশ টাকার ঘুগনি ভাগাভাগি করে এই বেঞ্চে বসে খায়। স্কুলের সারা দিনের দুস্টুমি থেকে শুরু করে বাড়িতে গিয়ে কি করবে, কাল কি করবে সব আলোচনা করতে থাকে। তখন ভজাদার দোকান বন্ধ থাকে। কিন্ত জেগে থাকে বেঞ্চটা। ও সাক্ষী থাকে ওই ছেলে মেয়েদের হাসির শব্দে মেতে ওঠা, দুপুরের গড়িয়ে বিকেল হবার চেষ্টার।
বিকেলে ভজাদা যখন দোকান খোলে তখন ওখানে লাইন দিয়ে বসে থাকে সেই সকালের বৃদ্ধগুলো। রাজনীতি থেকে খেলা সবাই যেন এক একটা এক্সপার্ট। কেও বলে সৌরভ বেস্ট ক্যাপ্টেন তো কেও বলে ধোনি। কেও কেও তো আবার কোহলি সচিনের ব্যাটিং পর্যন্ত ঠিক করে দেয় চোখে আঙ্গুল দাদার মতো। বেঞ্চ টা সব শোনে এবং হাসেও।
সন্ধ্যায় অফিস ফেরত ক্লান্ত মানুষগুলো এসে বসে। কেউ চুপচাপ চা খায়, কেউ দিনের ক্লান্তি নামিয়ে রেখে বাড়ি ফেরার আগে পাঁচ মিনিট নিজের মতো বাঁচে। তাদের ক্লান্তি তাদের ঘামের গন্ধ সবটাই বেঞ্চটা নিজের মধ্যে মিশিয়ে নেয়। তারপর রাত বাড়ার সাথে সাথে ভিড় কমতে থাকে আর কমতে থাকে ভজাদার মুখের হাসিও। সেটাও বেঞ্চটার দৃষ্টিগোচর হয় না।
রাতে দোকান বন্ধ করার আগে ভোজদা আমাকে একবার হাত দিয়ে ঝেড়ে দেন। যেন সারাদিনের সব গল্প, সব হাসি, সব দীর্ঘশ্বাস আমার গায়ে জমে আছে। সেটার বোঝা সরাতে নাকি আদর করে, সেটা আমি জানিনা জানে শুধু ভজাদা। আমার কাছে যদিও সেটা আদর মাখা ভালোবাসা।
আর আমার পরিচয়, আমিই সেই বেঞ্চটা।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
