তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। )
অধ্যায়: পঁচিশ
ওইখানে কারা থাকে?
ওইখানে মানে যে জগৎটাকে দেখতে পায় না কেউ চোখে, এমনকি উপল্বদ্ধিও করতে পারে না অথচ জানে সবাই কোথাও না কোথাও তার উপস্থিতি থাকতে বাধ্য। এই দৃশ্যমান পৃথিবী বা বিশ্বজগতের সমান্তরালে। সেখানে আকাশ নেই, মাটি নেই, নেই জল-হাওয়া-আগুন বা পরিচিত অন্যান্য বস্তুসমূহ। সেখানে দু’ শ্রেণির জনতার সন্ধান পাওয়া যাবে, খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক তাদের। খাদক যারা তাদের আবার রক্ষক হিসেবে পরিচিতি, শুনতে অদ্ভুত হলেও ব্যাপারটা সত্যি, নির্মম সত্যি। তাদের অন্যদল জনতার প্রতিপালক হিসেবে গণ্য করা হয় এবং সংখ্যায় তারা মুষ্টিমেয় হলেও যাবতীয় ক্ষমতার কেন্দ্র।আর ওই অন্যদল জনতা যতই বিপুলায়তন হোক না কেন, খাদক সম্প্রদায়ের খাদ্য সবাই। তারা যেকোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হোক না কেন, পরাধীন। তাদের ওখানে থাকা-না থাকা, যাওয়া-আসা, কিছু করা-না করা, চলা-না চলা, খাওয়া-না খাওয়া, বলা-না বলা ইত্যাদি সমস্ত কিছুই খাদক সম্প্রদায়ের ইচ্ছে-অনিচ্ছের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। তারা কেউ সেখানে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না, গল্পগুজব করে না, হাঁটে না, ঘুমোয় না, থাকে কিম্ভুতকিমাকার হয়ে, বিষাদে বিকারগ্রস্ত অবস্থায়। তাদের স্বাধীনতা, কার্যকলাপ, বাঁচা-মরা, হাঁটাচলা, জন্মানো বা না-জন্মানো, ন্যায়াধিকার ইত্যাদি যাবতীয় জীবনযাপনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে বিজড়িত বিষয়গুলি সবই কুক্ষিগত খাদক সম্প্রদায়ের। এর জন্য কাউকে দোষ দেওয়ার কোন প্রশ্ন ওঠে না যেহেতু এটা কাঠামোগত বিবর্তনের এক অনিবার্য ফল, এখানে অন্যকিছু হওয়ার অন্য উপায় ছিল না। জগতে খাদ্য-খাদকের সহাবস্থান থাকতেই হবে, না থাকলে জগৎসৃষ্টির কারণটাই প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠুক সেটা নিশ্চয় সৃষ্টিকর্তার পছন্দসই হবে না, অবশ্য যদি তেমন কোন অস্তিত্ব অবস্থান করে। যাই হোক, গল্পটা হচ্ছে খাদ্য-খাদক ও তাদের বাসভূমি নিয়ে। বাসভুমি যেমনই হোক বা যেখানেই হোক, দু’দলের সহাবস্থান থাকতেই হবে, নাহলে তত্বটাই বেকার হয়ে যাবে। কে খাদ্য কে খাদক এবং আদৌ তারা খাদ্য-খাদক কিনা বোঝার কোন উপায়ই থাকবে না যদি তারা পরস্পর নিকটস্থ না হয়। তো ওই অদ্ভুত জগতে খাদ্য-খাদক দু’দলই থাকে, সমান্তরালভাবে, যদিও মানচিত্রে কোথায় তার অবস্থান বলা মুশকিল। বিশেষ করে, যারা খাদ্য হিসেবে বলিপ্রদত্ত তারা তো এ-বিষয়ে আপাদমস্তক ভীষণরকম অজ্ঞ এবং একেবারেই জানে না যে খাদকের নাগালের মধ্যেই তাদের বসবাস। নিজেরা কোথায় আছে তা তো তারা জানেই না, এমনকি খাদক কোথায় কিভাবে কী রূপে থাকছে সেটাও বোঝে না বা খুঁজতে চায় না। পরাধীনভাবে খাদ্যদ্রব্য হয়ে থাকতে তারা পছন্দ করে, জন্ম নেয় উদ্দেশ্যহীনভাবে এবং জীবন কাটে তাদের কিভাবে নিজেরাও জানে না।
খাদক কারা? কী তাদের পরিচিতি, স্বভাব-চরিত্র, আকার-আকৃতি বা কার্যকলাপ? তাদের বাসস্থানেরই বা কী স্বরূপ? খাদক সম্পর্কে এসব তথ্যগুলি জানাই বোধহয় বেশি দরকার, যেহেতু খাদ্য হিসেবে যারা বিবেচিত তারা তাদের দেখেও দেখতে পায় না, চিনেও চিনতে পারে না, বুঝেও বুঝতে অপারগ এবং এসব কারণে অনিচ্ছাসত্বেও শিকারে পরিণত হয়। খাদ্যদ্রব্য তো প্রায় সবাই, তাদের বিশেষ করে চিনিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজনই নেই। তবুও খাদকের পরিচিতি প্রদানকালে প্রয়োজোনবিশেষে খাদ্যের কথাও এসে যায় অনিবার্যভাবে। জগৎ এমনই আজব ধাঁধা যে এখানে খাদ্য হিসেবেই সবার আবির্ভাব ঘটে, তাদের মধ্যে কী কৌশলে একদল খাদকে নিজেদের উত্তরণ ঘটায় তা কেবল তারাই জানে আর এভাবেই সমগ্র প্রকল্পটি এক সরল সমীকরণে পরিণত হয় যদিও তার সমাধান কোনোদিনও পাওয়া যাবে না এমনই জটিল। সরল হওয়া সত্বেও সমীকরণটি অনির্ণেয় জটিল বলেই ধাঁধা হিসেবে পরিগণিত। সমস্তই জাগতিক নিয়ম।
ওই জগৎ বা ওই প্রদেশ সমান্তরাল, প্রথমেই বলা হয়েছে। সমকালীনও অবশ্যই। খাদক ও খাদ্যের পারস্পরিক অবস্থান অথবা তুলনায়। পরস্পর থাকে পরস্পরের নাগালে। এ বিষয়ে খাদক সম্যক ওয়াকিবহাল হলেও খাদ্যের তা ধারণায় নেই। খাদক যেসমস্ত প্রাণী তারা থাকে এমনই অধরা উচ্চতায় বা অবস্থানে যে নাগালের মধ্যে থাকলেও তাদের নাগাল পায় না খাদ্য হিসেবে বিবেচ্য প্রাণীকুল। খাদক প্রাণীরা কদাকার বা বিকটাকার, খাদ্যপ্রাণীরা কেবলই হাহাকার। খাদকরা অপরিমেয়, অদৃশ্য, অভাবনীয়, অজ্ঞাত ও অকল্পনীয়। খাদ্যরা দৃশ্যমান ও অনুমেয়, নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত, আয়ত্তাধীন বলিপ্রদত্ত। খাদকের বাসস্থানে খাদ্যের প্রবেশাধিকার নেই যদিও সেই বাসস্থান নির্মাণ করে যারা খাদ্য তারাই। খাদ্য হল তেমন জ্বালানি যা খাদকের সক্ষমতা ও ক্ষমতার উৎস, খাদক সেই সক্ষমতার বলে ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর খাদ্যকে বেছে নেয় প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে যা তার উত্তরোত্তর উচ্চতাবৃদ্ধি ঘটাতে থাকে গুণিতক হারে। খাদক কী কেউ বোঝে না, কেউ জানে না, কেউ চেনে না। হতে পারে সে একবচন বা বহুবচন, স্ত্রীলিঙ্গ বা পুংলিঙ্গ বা উভলিঙ্গ, হতে পারে সে বিশেষ্য বা বিশেষণ বা সমাপিকা-অসমাপিকা ক্রিয়া কিংবা অব্যয়। সে দুর্জ্ঞেয় যুক্তাক্ষর হলেও মুক্তাক্ষর নয়, সে এক বিষমকৌণিক বিসদৃশ বহুভুজ। তাকে বিধাতাপুরুষ সৃষ্টি করেছেন কেবলমাত্র খাদ্যগ্রহণের কারণে, নিজে সৃষ্টিকর্মের নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় স্বভাবের বিপরীত আচরণকারী হিসেবে। তাই খাদকের খাদ্য হয়ে যেতে থাকে সমগ্র জগৎ। এমনই তার খিদে বা আহারের নেশা যে খাদ্যগ্রহণকালে সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ভুলে যায় যে-জগৎটাকে সে খেয়ে ফেলছে সেই জগতের বাসিন্দা সে নিজেও, যদি জগৎটাকে খেয়ে খেয়ে সে নিঃশেষ করে দেয় তো নিজেরও অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে। অনিবার্যভাবে,খাদ্যখাদকের সম্পর্ক সবসময় শাসক-শাসিত বা শোষক-শোষিতের সম্পর্ক সৃষ্টি করে, যদিও প্রথম শব্দবন্ধযুগলের ক্রমাবস্থান পরবর্তী দু’টি শব্দবন্ধযুগলের ক্রমাবস্থানের সঙ্গে বিপরীত নিয়মে উপস্থাপিত। সমান্তরালভাবে খাদ্যখাদকের এমন সমকালীন সহাবস্থান জাগতিক বাসস্থানকে অবশ্যম্ভাবীরূপে এমন এক জটিল সমীকরণে পরিণত করেছে।
আমি জানতাম না জগৎ এতটাই জটিল, কোনদিনই জানতাম না। মা আমাকে জানাবার চেষ্টা করে গিয়েছিল আজীবন, বিশ্বাস করিনি। অস্বাভাবিক ও হিংস্র সমস্ত প্রাণীদের কাহিনী শোনাত মা। আমি ভাবতাম, রূপকথার জগতে তাদের বসবাস। সেইসব প্রাণীকুল কেউ মোটা, কেউ চ্যাপ্টা, কেউ লম্বা, কেউ বেঁটে। এরা সব নখ-দাঁতসম্পন্ন ও হিংস্র। তারা মানুষ ধরে ধরে খায়, ওটাই তাদের একমাত্র কাজ। তারা খায় মানুষের বিচারবুদ্ধি ও বিবেকবোধ, মানবিক সৎগুণাবলী তাদের দু’চক্ষের বিষ বলে তাকেও কুরে কুরে খায় সর্বাগ্রে এবং এভাবেই তারা প্রাণধারণ করে। এইসব প্রাণীকুল থাকে কোথায় ? যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, থাকে তারা আমারই সমান্তরাল পৃথিবীতে, আমারই চোখের সামনে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে। তাদের এই বাসস্থানের নাম মা বলেছিল খাইখানাখালি। নামটা এ কারণেই যে তাদের বাসভূমির সমস্তকিছু, মায় ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সবই তারা খেয়ে খেয়ে নিঃশেষ করে ফেলেছে। কিছু না খাবার পেলে তারা নিজেদেরই খায় আবার অন্যকিছু খাদ্যবস্তু হাজির দেখলে খেয়ে ফেলা নিজেদের উগরে দিয়ে স্বমূর্তি ধারণ করে ওই অন্য খাদ্য খেয়ে হজম করে ফেলে। তারা খাদ্যরসিক কিনা খোদায় মালুম, তবে সর্বার্থে যথার্থই সর্বভুক নিঃসন্দেহে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল এই যে তারা সবাই শাসক ও শোষক সম্প্রদায়ভুক্ত, দ্বিচারিতা তাদের ধর্ম এবং কূটনীতি অবলম্বন করে তাদের বেঁচে থাকা। তাছাড়া এদের অধিকাংশই পলিটিক্স করে, সবাই রাজনীতিসর্বস্ব জীব।
ঝুকনুডিম্ব শশকাঙ্গ তাদের আলেখ্য শুনিয়েছিল আমাকে আরও বিস্তারিতভাবে। বলেছিল যে তাদের নাম নাকি চাকুমচুকুম। দৈবাৎ ভদ্রলোকের তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল কোন এক দুষ্টগ্রহের চক্রান্তে। ভদ্রলোকের জাম্বোনাজেলির কারবার। সেই সূত্রে তাকে নানা স্থানে-অস্থানে যাতায়াত করতে হত। জাম্বোনাজেলিটা কী বস্তু তেমন খোলসা করে বলেনি আমাকে ঝুকনুডিম্ব শশকাঙ্গবাবু। তার তরফ থেকে যেটুকু চেষ্টা সে করেছিল, আমি তার মাথামুণ্ডু কিছুই হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। হতে পারে জাম-টাম বা জেলি-টেলি বিষয়ক কোন বস্তু, আবার জাম্বোজেট জাতীয় কোন পদার্থ হওয়াও বিচিত্র নয়। তবে বুঝেছি যে জিনিসটা খুব দুষ্প্রাপ্য এবং পৃথিবীতে একমাত্র তার কারখানাতেই সেটা প্রস্তুত হয়। একচেটিয়া কারবার। জিনিসটা তরল না গরল, গ্যাসীয় না রেশিও, কঠিন না প্রোটিন না কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন না সরেজমিন বা কী তার স্বরূপ জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। অবশ্য এটা সে জানিয়েছিল যে বস্তুটা কারখানাতে তৈরি হলে টিনে টিনে ভর্তি করা হয়। সেইসব টিন নিয়ে সে মাসে মাসে সাপ্লাই করতে নিয়ে যায় যত্রতত্র, যায় কিসে করে বা কিভাবে সেসব বৃত্তান্তও সে উহ্য রেখেছিল। যাক যেভাবে খুশি যাতে চেপে তাতে আমার বলার কিছু নেই, বলার বিষয় হল এই যে বস্তুটির নির্মাণকর্ম, যা সে খানিকটা আমাকে জানিয়েছিল। তার কারখানার শ্রমিক সম্প্রদায় এক বিচিত্র সমাহার। মানুষ, কীটপতঙ্গ, পাখপাখালি, জলচর প্রাণীরা পর্যন্ত মাস মাইনের ভিত্তিতে সেখানে কর্মরত এবং প্রত্যেকটি জীবেরই রয়েছে একেকটি নিজস্ব ইউনিয়ন। যেমন মাছেদের ইউনিয়ন, পাখিদের ইউনিয়ন, পিঁপড়েদের ইউনিয়ন, বাঘেদের ইউনিয়ন, ব্যাঙেদের ইউনিয়ন ইত্যাদি এবং মানুষের তো বটেই। এতসব ঝক্কি ঝুকনুডিম্ব শশকাঙ্গমশাই কিভাবে সামলায় আর ব্যবসা কিভাবে চালায় এবং খায়দায় ও রাতে ঘুমোয়, সেই জানে।
এবার আসল কেচ্ছা। কিভাবে শশকবাবু খাইখানাখালি দেশে গিয়ে চাকুমচুকুমদের দেখতে পেল এবং কী ঘটল তার অদৃষ্টে? যাচ্ছিল সে টিন টিন জাম্বোনাজেলি নিয়ে, যেতে যেতে হঠাৎ একসময় দেখতে পেল, সূর্যটা কেমন ফর্সা কাচের মত হয়ে গেল আর হয়ে যেতেই লাগল। হতে হতে একসময় সূর্যটা আর সূর্য থাকল না, কী যে তার চেহারা হল বোঝা গেল না। দিনটা হল ফ্যাকাসেমার্কা আঁধার-আঁধার প্রকাশ, রাত নয় দিনও নয়। ঘন ঘন রং পাল্টাতে লাগল চারপাশের। কখনো ঘোলাটে, কখনো কালচে, কখনো সবুজ, কখনো পিঙ্গল, কখনো ধূসর আর এমন চলতেই লাগল চলতেই লাগল, থামল না। হাওয়া থাকল কি থাকল না, শব্দটব্দ হচ্ছিল কি হচ্ছিল না বোঝা গেল না। তখনই দেখা হল তার সঙ্গে চাকুমচুকুমদের। তারা পুরুষ না মহিলা না উভলিঙ্গ না বহুবচন মালুম হল না, কেবল বোঝা গেল যে তারা সব কদাকার আকৃতির, বীভৎস তাদের চেহারা আর বিকট মুখে প্রকট হাঁ। ঝুকনুডিম্ব শশকাঙ্গ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাকে খাপুস করে খেয়ে ফেলল, অবশ্যই চাকুমচুকুম শব্দ সহকারে। খেল তো একেবারেই খেয়ে ফেলল, আর তাকে উগরে দিল না। পুরোপুরি হজম করে ফেলল। যদি তাই হয়ে থাকে তো তার দেখা পেলাম আমি কী করে এবং সে তার রোমহর্ষক এমন বৃত্তান্ত শোনাল আমাকে কিভাবে? এ প্রশ্ন খুবই সঙ্গত। আসলে শশকাঙ্গবাবুকে চাকুমচুকুমরা খেয়ে হজম করে ফেলল এবং উগরে দিল না সত্যি কিন্তু জীবকুলের স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী তাকে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে বর্জন করল। শশকবাবু এখন তাই চাকুমচুকুমদের বর্জ্যদ্রব্য হিসেবেই জীবনধারণ করছে। কিভাবে, সে এক বিচিত্র উপাখ্যান। তার যে দেহ ছিল সে দেহই আছে, তবে দেহে কখনো প্রাণ থাকে তো মন থাকে না, মন থাকে তো প্রাণ থাকে না। সে কখনো কঠিন পদার্থ, কখনো তরল, কখনো গ্যাসীয়, এমনকি সময়বিশেষে প্লাজমারূপেও বর্তমান। তার মধ্যে আবেগও নেই, উদ্বেগও নেই। তার স্বভাব-চরিত্র একেবারেই চাকুমচুকুমদের মত হয়ে গেছে। সে কেবলই খায় কেবলই খায়, ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান যা পায় হাতের কাছে, আর কেবলই রাজনীতিসর্বস্ব জীব। দ্বিচারিতা ও কূটনীতি জীবনধারণের উপায়, গোত্রে শোষক ও শাসক।
সমুদয় উপাখ্যান শুনিয়ে সে আমাকে জানিয়েছিল,
‘সবাইকে কোন না কোন দিন খাইখানাখালি দেশে যেতে হবে। এবং চাকুমচুকুমরা প্রত্যেককেই খেয়ে ফেলবে। এটাই মানবকুলের অনিবার্য পরিণতি।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমিও একদিন খাইখানাখালি দেশে যেতে বাধ্য হয়ে চাকুমচুকুমদের ভোজ্যদ্রব্যে পরিণত হব। যা চারপাশের পরিবেশ দেখছি, মনে হচ্ছে যে আমি নির্ঘাৎ খাইখানাখালি দেশে এসে গেছি এবং চাকুমচুকুমদের আহার্য হতে চলেছি অথবা ইতিমধ্যেই তারা আমাকে খেতেও শুরু করে দিয়েছে। চাকুমচুকুম শব্দ কি শুনতে পাচ্ছি ?
এখানে কিঞ্চিৎ সংশয়ের উল্লেখ করা উচিত। ওই জগৎ কি একমাত্র চাকুমচুকুমদেরই বাসভূমি? এমনও হতে পারে যে কেবল চাকুমচুকুমরা নয়, সেই অত্যাশ্চর্য দুনিয়ায় থাকে অন্য আরেক জাতীয় জীব, যাদের নাম বজ্রদানব। তারা কী বা কেমন শশকবাবু ঠিকঠাক বর্ণনা দিতে পারেনি এই কারণে যে তাদের দর্শন পাওয়ার আগেই চাকুমচুকুমরা তাকে গলাধঃকরণ করে ফেলেছিল। তার আগে অথবা পরে কখন কে জানে সে শুনেছিল এই দ্বিতীয় প্রজাতির জীব সংহারকদের কথা যার উল্লেখ বারেকমাত্র করেছিল সে আমাকে তার আখ্যান শোনাবার কালে। হলেও হতে পারে যে এই বজ্রদানব ও চাকুমচুকুমরা একই সম্প্রদায়ভুক্ত যেহেতু তাদের আচার-আচরণ ও স্বভাব অভিন্ন, আবার একটু আলাদা গোত্রের হওয়াও বিচিত্র নয়। যদিবা আলাদাও হয় সার্বিকভাবে তো কারা বেশি ভয়ানক সেটা গবেষণার বিষয়। মুশকিল হল এই যে এদের নিয়ে গবেষণা চালাবে কোন্ গবেষক? যারা তাদের নিয়ে গবেষণা চালাতে যাবে নিকটস্থ হওয়ামাত্রই তাদের তারা গিলে খেয়ে নেবে। এজন্যই চাকুমচুকুম বা বজ্রদানবদের বৃত্তান্ত অজানা জনগণের যদিও তাদের নাগালে থাকে সবাই।
খাইখানাখালি প্রদেশে যে যাবে, সবাইকে যেতে হবে যেহেতু বলেছিল শশকবাবু, তাকে কোন না কোন ভক্ষকের ভোজ্যদ্রব্যে পরিণত হতে হবে। কার কপালে কোন্ ভক্ষক জুটবে আগে থেকে জানার উপায় নেই। যার যেমন অদৃষ্ট তাকে তেমন ভক্ষকের কবলে পড়তে হবে। শশকাঙ্গবাবুর নিয়তি তাকে চাকুমচুকুমদের আহার্য হতে বাধ্য করেছিল বলে সে আমাকে কেবল তাদের কথাই জানাতে পেরেছিল। তাই সে বলেছিল যে খাইখানাখালিতে সবাই যাবে কোন না কোনদিন এবং সবাইকে কেবল চাকুমচুকুমরাই খেয়ে ফেলবে। তার বর্ণিত উপাখ্যানের প্রথমাংশ ধ্রুবসত্যি হলেও দ্বিতীয়াংশের কিঞ্চিৎ সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে হয়েছিল। পরে ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভাবনাচিন্তা করে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি। আমার মায়ের বলে যাওয়া বিবরণ এক্ষেত্রে আমাকে প্রভূত সহায়তা করেছে। প্রথমে আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম যেহেতু মা বিষয়টি সম্পর্কে আমাকে অবগত করেছিল বাল্যকালে এবং তারপর দীর্ঘকাল বিষয়টি নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাইনি। ভেবেছিলাম, মা রূপকথার কাহিনী শুনিয়েছিল। যৌবনকাল অতিবাহিত হওয়ার আগেই মা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শৈশবকালের পর মা আর গল্পকাহিনী শোনাবার সুযোগ পেত না যেহেতু আমি নিজেই তখন পৃথিবীর যাবতীয় সাহিত্যপাঠ করতে শিখে গেছি, মায়ের বলা ওইসব ছেলেভোলানো গল্পগাঁথার আর কোন দাম ছিল না আমার কাছে। ঝুকনুডিম্ব শশকাঙ্গ মশাইয়ের সাক্ষাৎ যখন পেলাম আমি তখন বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে। তার কাহিনীকীর্তন আমাকে যারপরনাই এতটাই বিহ্বল করে দিয়েছিল যে তৎক্ষণাৎ অন্য কিছু ভাবনার অবকাশই ছিল না। সৌভাগ্যক্রমে, অনতিবিলম্বে আমার স্মরণ হল বাল্যকালে মায়ের বলা কাহিনী। মা আর ঝুকনুডিম্ববাবু দু’জনেই রহস্যময় জগৎটির নাম জানিয়েছিল, খাইখানাখালি। ওই রহস্যপুরীর প্রাণীদের স্বভাব-চরিত্রের বিবরণ মা যেমন জানিয়েছিল শশকাঙ্গমশাইয়ের বিবরণও তদ্রূপ। মা কী নাম বলেছিল প্রাণীগুলির আমার তা বিস্মরণ হয়ে গিয়েছিল। মায়ের কাছে তা আর জানারও উপায় ছিল না। পরে অনেক চিন্তাভাবনার পর মনে পড়ল যে মা ওই জগতের ভক্ষক হিসেবে একাধিক জীবের কথা জানিয়েছিল। বার্ধক্যে উপনীত আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া সত্বেও শয়নে-স্বপনে-নিশি জাগরণে সর্বক্ষণ মা-বর্ণিত শৈশবের আখ্যানসমূহ স্মরণে আনার প্রবল প্রচেষ্টা সৌভাগ্যক্রমে একদিন সফল হল আর আমার মনে পড়ল যে মা অন্তত দু’টি প্রাণীর বিবরণ দিয়েছিল যাদের একটি চাকুমচুকুম ও অন্যটি বজ্রদানব। প্রথমটির নাম নতুন করে ঝুকনুডিম্ববাবু জানিয়েছিল বলেই চট করে মনে পড়েছিল যে মা-ও ঠিক এই নামটি শুনিয়েছিল। দ্বিতীয় নামটি নিয়ে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। শশকাঙ্গমশাই তাদের কথা বিশদে বলতে পারেনি, কিছুটা আভাস যদিও দিতে পেরেছিল নিম্নোক্ত উপায়ে,
‘ওই রহস্যপুরীতে অন্য আর কোন প্রাণীর বসবাস করার কথা নয়, যেহেতু চাকুমচুকুমরা সবাইকে খেয়ে ফেলে। তবে শুনেছি, এক ধরণের জীব বজ্রপাতজনিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত যারা ওখানে থাকলেও থাকতে পারে। তারা ক্রমান্বয়ে এমনই পরিমাণে বজ্রপাত ঘটাতে থাকে যে অন্য কারও সাধ্যি নেই তাদের ধারেকাছে যাওয়ার এবং এই বজ্রপাতজনিত বাধার কারণেই হয়তো চাকুমচুকুমরা তাদের আহার্যে পরিণত করার সুযোগ পায়নি। অবশ্য এটা শোনা কথা, ওদেশে আমি কেবল চাকুমচুকুমদেরই দেখেছি।’
তারপর আমার মনে পড়ল যে মা খাইখানাখালিতে যে প্রাণীটির বসবাসের কথা বলেছিল সেখানে বজ্রপাত ও দানব শব্দদু’টির উল্লেখ ছিল। তাহলে মা বজ্রদানব কথাটি যে অবশ্যই জানিয়েছিল তাতে আমার আর কোন সন্দেহ রইল না। বরং মা চাকুমচুকুম কথাটি উচ্চারণ করেছিল কিনা সেটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল। তবে খাইখানাখালি শব্দটি মা-ও বলেছিল ঝুকনুডিম্বমশাইয়ের মত। এসমস্ত তথ্য একত্রিত করে সর্বশেষে আমি এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হলাম যে চাকুমচুকুম ও বজ্রদানব এক ও অভিন্ন প্রাণী। এই সত্যের উদ্ঘাটন ঘটাতে ঘটাতে আমি বার্ধক্যে উপনীত হলাম এবং অচিরেই প্রবল হতাশায় আবিষ্কার করলাম যে আমাকেও আমার অজান্তে কোন একসময় উদরস্থ করে ফেলেছে চাকুমচুকুম অথবা বজ্রদানব।
এক বা একাধিক বজ্রদানব আমাকে উদারস্থ করে বসে আছে। আমার জন্মলগ্ন থেকে এবং অদ্যাবধি আমি সেই বিকটদর্শন উৎকট হিংস্র জীবটির খপ্পর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি। চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখিনি মুক্তিলাভের আতীব্র বাসনায়। ফল শূন্য। সেই বজ্রদানবের রাহুগ্রাস থেকে আমি না পারি স্বাধীনভাবে চলতে-ফিরতে, না জীবনযাপন করতে। আমার স্বাধীন ভাবনাচিন্তার অধিকারও বিসর্জিত। তাদের সুবিশাল হাঁ-মুখ, তারা উদারসর্বস্ব প্রাণী। যা পায় তাই উদরস্থ করে। আমার কোন দোষ ছিল না, তারা যে আমাকে গিলে খেয়ে রেখেছে তা আমার নিয়তি। তার অন্ধকার ও যন্ত্রণাদায়ক জঠরে থেকে আমার জীবন দুর্বিষহ। তাদের দেখলে আতঙ্ক জাগে, বেঁচে থাকা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাদের চোখ ভাঁটার মত, মুখে ধারালো দাঁতের সারি, লম্বা লকলকে জিহ্বা, লোমশ গা, গলায় জান্তব আওয়াজ। তারা জগৎটাকে একাই অধিকার করে রেখেছে। তাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় খুঁজে পাব না কোনজন্মে। এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি যে এটা নির্মম সত্য।
কিন্তু আমি ভয় পাব না। আশা হারাব না।
আমার চারপাশে যারা আছে যাদের সঙ্গে নিত্য আমার দেখাসাক্ষাৎ ও চলাফেরা তারা সবাই দেখি ওই বজ্রদানবের তুলনায় কিছুমাত্র কোমলস্বভাব ও সুদর্শন বা অহিংস নয়। তারা সবাই আজব আজব জীবসম্প্রদায়। বীভৎস তাদের চেহারা এবং আচরণ। তাদের কারও শ্বাপদসদৃশ দাঁত ও নখ, কারও মাথায় খড়্গাকৃতি জোড়া শিং, কারও সারা দেহ কন্টকাকীর্ণ, কেউ অবয়বে দৈত্যাকার, কেউ যথার্থই শ্বাপদ এবং জিঘাংসাযুক্ত। তারা সবাই হিংস্র এবং মাংসাশি, সর্বদাই আঘাতে উদ্যত। তারা আঁচড়ে দেয় কামড়ে দেয়, তাদের অকারণ আক্রমণে সদাসর্বদা ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হতে থাকি। বাঁচাতে পারি না নিজেকে। আমার আত্মরক্ষার সমস্ত চেষ্টা কেবলই ব্যর্থ হয়ে যায়। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে দিন কাটাই এবং জানি চিরজীবন এমনই দুর্ভোগ লেখা আছে আমার কপালে। নিজেকে রক্ষা করার কোন উপায় খুঁজে পাব না কোনদিন। এমনই অসহায় হয়ে থাকতে হবে আমাকে।
কিন্তু আমি ভয় পাব না। আশা হারাব না।
জন্ম নেওয়ার পর থেকে আমার সারাজীবন জুড়ে বাসা বেঁধেছে উদ্ভট সমস্ত যন্ত্রণাদায়ক অসুখবিসুখ। তাদের আক্রমণে ও উৎপীড়নে জীবনধারণ অসহ্য মনে হয় সবসময়। চেষ্টার পর চেষ্টা করতে থাকি, নিরাময় ঘটাতে পারি না। আমার অতীষ্ঠ লাগে, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে থাকে। এত এত রোগের কবলগ্রস্থ হয়ে থাকা যে কী যন্ত্রণাদায়ক তা হাড়ে হাড়ে টের পাই সর্বসময়। আমার জীবন থেকে তাই সব আনন্দ, সব স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেছে। এখন বুঝেছি, আমৃত্যু এই রোগযন্ত্রণা আমাকে ভোগ করে যেতে হবে। মুক্তি পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই এজন্মে।
কিন্তু আমি ভয় পাব না। আশা হারাব না।
আমার জীবনে কোন শান্তি নেই, যেহেতু জন্মসূত্রে অশান্তিকে পেয়েছি মূলধন হিসেবে। আমাকে চলতে-ফিরতে অন্যায় ও উৎপীড়নের শিকার হতে হয়। আমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও অনিবার্যতা আমার ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে, আমাকে নিরুপায় হয়ে কোন না কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে আপোষ করতে হয়। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেও নিজেকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারি না। সমাজ আমাকে অহরহ বিষপান করায়, না পান করে উপায় থাকে না। আমি অসহায় হয়ে দেখি কেবল দেখি, শাসনতন্ত্র কী কৌশলে শোষণযন্ত্র হয়ে যায়। আমার কিছুই করার থাকে না। কিছু করতে গেলে দেখি আমাকে কোন না কোন উপায়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। আমি ন্যায়ালয়ের দ্বারস্থ হতে পারি না, কারণ আমার জন্য বিচারব্যবস্থা অন্ধ অবস্থায় চিরকালীন নিদ্রামগ্ন, অন্যদিকে অন্যায়কারীদের পক্ষপাতে সদাজাগ্রত। প্রশাসনিক সুরক্ষা আমার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত, দুর্জনের সাহায্যকারী এবং আমি যদি অবিচারের প্রতিবাদে গলা তুলতে যাই তো আমাকে নীরব করে দিতে অতিসক্রিয়। আমি অর্ধমৃত হয়ে জীবন কাটাই। আমার বিশ্বাস, আমার সততা, আমার সদাচরণ, আমার জীবনবোধ সদাসর্বদা আমাকে বিসর্জন দিতে হয়। আমি দেখি, আমাকে ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ দানবিক হুংকার, অন্যায়-অবিচার, শোষণ, অত্যাচার, অযোগ্যের আস্ফালন ও বাগাড়ম্বর, কলুষিত আচার-অনাচার। আমি শিকার হয়ে যাই। বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বিধান দেখি আমার জন্য অনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে। অপসংস্কৃতির নিষ্পেষণে জর্জরিত হতে থাকি। আমাকে মেনে নিতে হয় অমর্যাদা, অসম্মান, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপশাসন ও ইতর প্রাণীকুলের আদেশ-নির্দেশ, আস্ফালন ও বাক্যজাল। আমার মূল্যবোধ ও বিবেকবুদ্ধি বর্জন করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আমার শ্বাসকষ্ট ঘটায়। বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য ও আনন্দ হারিয়ে যেতে থাকে। অন্তরে দহন চলতে থাকে সর্বক্ষণ। ক্লান্ত, বিষণ্ণ, বিপর্যস্ত ও ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত হয়ে যাই আমি। জানি, এমনই দুর্দশায় জীবন কাটবে আমার।
কিন্তু আমি ভয় পাব না। আশা হারাব না।
কেন ?
আমি এখন জেনেছি যে পৃথিবীতে যুগে যুগে ঠিক মানুষরা ছিলেন। আমি নতুন করে জেনেছি যে যিশুখ্রিস্ট, বুদ্ধদেব, সক্রেটিস, শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রমুখ মহামানবদের কথা যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন জগৎ ও সভ্যতার মঙ্গলাকাঙ্খী হয়ে। আমি জেনেছি বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, ভূ-পর্যটক, দার্শনিক এবং আরও আরও ব্যক্তিত্বের কথা যাঁরাও জীবন কাটিয়ে গেছেন ওই একই উদ্দেশ্য নিয়ে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ঠিক মানুষের কোনদিনও কোন অভাব ছিল না এবং আমি স্থিরনিশ্চিত যে বর্তমানেও তাঁরা আছেন আমার আশেপাশেই কোথাও না কোথাও, নীরবে মানুষ ও সভ্যতার মঙ্গলের জন্য জীবন উৎসর্গ করে কাজ করে চলেছেন। তাঁদের সামগ্রিক মূল্যায়ন ঘটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে এখনই হয়তো জানতে পারছি না, কিন্তু তাঁরা আছেন। তার প্রমাণ, অনেক কাছাকাছি বা প্রায় ঠিক মানুষদের আমি দেখতে পেয়েছি। এমন করে করে নিশ্চয় অনেকেই একশ শতাংশ ঠিক মানুষ হয়ে যাবেন। আর আমার বিশ্বাস, ঠিক মানুষদের ভবিষ্যতেও অবশ্যই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ঠিক মানুষরা ছিলেন, আছেন ও থাকবেন।তাঁরা কিয়দংশে বা সর্বাংশে আরোপিত হলেও হতে পারেন, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তাঁদের উপস্থিতিই আমার জন্য যথেষ্ট এবং এই আশ্বাসটুকুই আমার জীবনধারণের জ্বালানি ও মূলধন।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine
সমাপ্ত
![]()
