তপোপ্রিয়

অনাবিষ্কৃত অধ্যায়

প্রত্যেকটি জীবনই এক একটি উপন্যাস। কোন এক জীবনে কত হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করে যায় মানুষ তার হিসেব গুছিয়ে রাখতে পারে না কেউ। প্রত্যেকটি জীবনই হাসি-আনন্দ, দুঃখ-শোক, ভালোবাসা-বিদ্বেষ, রোদ-বৃষ্টির সমাহার। কিছু কিছু বিষয় অনেকের জোটে, অনেকের জোটে না। হ্যাপি আর সাফল্য তেমনই বিষয়। সফল বা বিখ্যাত জীবনগুলির কাহিনী আলোচনায় আসে, জানা হয় না সাধারণ জীবনের সমাচার। অথচ ফোকাসে না থাকা জীবন গুলির ঘাত-প্রতিঘাত বা অনুভূতির প্রকাশ জানা কেবল আকর্ষণীয় নয়, প্রয়োজনীয় অবশ্যই।

সুনাম বা সাফল্য সব ক্ষেত্রে থাকে না কিন্তু শোকদুঃখ প্রত্যেকটি জীবনে অপরিহার্য। আবার সুখ বা আনন্দও সবার জন্যই কিছু না কিছু থাকবেই। অজানা জীবনগুলিতে সুখ-দুঃখ নিশ্চয় এক ভাবে অনুভূত হয় না। নানান মাত্রাবিশিষ্ট সেই সব অনুভূতি অঞ্চল আমাকে লালায়িত করে।

তখন পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে। মাকে নিয়ে ভাড়া থাকি একটা তিনতলা বাড়িতে। সেই তিনতলা বাড়ির দোতলার ভাড়াটে আবার অন্য এক পরিবার। তাদের সঙ্গে মায়ের খুব ভাব হয়ে গেল। চারজনের ওই পরিবার ছিল দুটি ছোট মেয়ে পম্পা ও রুম্পা আর তাদের বাবা-মা তারাপদ বসু ও লক্ষ্মী বসু। পম্পা বড় রুম্পা ছোট, বয়স সাত থেকে বারোর মধ্যে। তারাপদ বসু কিছু একটা কাজ করতো হাইকোর্টে, সেই সূত্রে দাদার সঙ্গে তার চেনা ছিল। কিন্তু এই চেনাটা মায়ের সঙ্গে ভাব হওয়ার কারণ ছিল বলে মনে হয় না। লক্ষ্মী পশু চাকরি করতো সরকারের পেনশন অফিসে। বামপন্থী কর্মচারী আন্দোলনের সমর্থক ছিল দুজনেই। ওই সময়ে বাঙালি চাকুরীজীবী প্রায় সমস্ত পরিবারের এটা বোধহয় একটা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, সবাই কমবেশি বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত। 

মায়ের ভাব জমে গিয়েছিল লক্ষ্মীর সঙ্গে। স্বাস্থ্য একটু মোটার দিকে হলেও খুব মোটা নয়, শ্যামলা গায়ের রং আর গিন্নি গিন্নি চেহারার লক্ষ্মীর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। তারাপদ বসু বেশ রোগা, কাল আর গাল ভাঙ্গা, চোখে চশমা, খুব লম্বাও নয়, কিন্তু মাথা ভর্তি কালো চুল, মেসোমশাই ধরনের দেখতে। লক্ষ্মী অফিস থেকে ফিরতো সন্ধেবেলা বা সন্ধের একটু পর, দোতলায় ওঠার আগে রোজ আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে মায়ের খোঁজ করত, ‘কই মাসিমা, কী করেন?’

তারপর দু চার মিনিট দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলে দোতলায় যাওয়ার আগে মাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে যেতো, ‘উপরে যাই, আপনি চলে আসেন।’

লক্ষ্মীর মা থাকতো তার দাদার কাছে। আরে দিদি শোভার বিয়ে হয়েছিল নাকি বেশ বড় লোকের সঙ্গে, তাদের বাড়ি বালিগঞ্জে। মায়ের কাছেই শুনেছিলাম, বরের সঙ্গে সোভার নাকি সদ্ভাব ছিল না। ছেলেমেয়েও হয়নি তাদের।

কাকুরগাছিতে ভাড়া থাকতো লক্ষ্মীর দাদা, মাঝেমধ্যে আসতো বোনের বাড়ি। রোগাপাতলা আলাভোলা দেখতে অবিবাহিত লোক। লক্ষ্মীর ছোট এক বোনও ছিল, কোথায় যেন বিয়ে হয়েছিল তার। সেও আসতো দিদির বাড়ি আর এদের সবার সঙ্গেই মায়ের ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক আরো প্রবল হল লক্ষীর কাছে তার মা চলে আসার পর। কাকুরগাছিতে ছেলের কাছে থাকাটা বয়স বেড়ে যাওয়ার জন্য আর সম্ভব হচ্ছিল না ছেলের নিজেরই তো চালচুলো ছিল না, কিছু মাকে কে দেখে? এসব কথা লক্ষ্মী মায়ের সঙ্গে আলোচনা করতো। তার পারিবারিক ভালোমন্দের কথা জানা তোমাকে নানা ব্যাপারে পরামর্শও নিতো।

আমার মাকে লক্ষীর মা আরো কাছে টেনে নিয়েছিল। মাকে দেখিয়ে নিজের ছেলেমেয়েদের বলতো, ‘জানবি, এ আমার নিজের বোন।’

মায়ের বেশ ইচ্ছে ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার। মায়ের সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল লক্ষ্মীর মায়ের চেনাতেই। যোগোদ্যান মাঠে তখন মঠাধ্যক্ষ ছিলেন ভূতেশানন্দ মহারাজ। তার কাছেই মায়ের দীক্ষা নেওয়া। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই যে কেউ গিয়ে দীক্ষা নিতে পারে না। তার জন্য কিছু পরিচিত বা যোগাযোগ থাকা দরকার। এই রকম একজন লোকের সঙ্গে চেনা করিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছিল লক্ষ্মীর মা, তার ছেলের মাধ্যমে। তারপরও বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। দীক্ষা নিতে গেলে যে প্রস্তুতিপর্ব চলে তার জন্য কয়েকবার মাকে নিয়ে যোগোদ্যান মঠে গিয়েছিলাম। প্রস্তুতির অপেক্ষা এক সময় মাকে হতাশ করে দিয়েছিল। আমারও মনে হয়েছিল বোধহয় মায়ের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে। কেবল লক্ষ্মীর মা একনাগাড়ে উৎসাহ দিয়ে যেত। অনাত্মীয় প্রতিবেশীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী এইসব মানুষের কথা মনে হলে পৃথিবীর অন্য সব দুর্জন ও অমানবিক আচরণকে অনায়াসে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।

প্রায় রোজই বিকেলের দিকে বোনের বাড়িতে মাকে দেখতে আসতো লক্ষ্মীর দিদি শোভা। বেশ ফর্সা, গোলগাল চেহারা তার। পঞ্চাশের কাছাকাছি ছিল হয়তো বয়স, তখনো বেশ সুন্দর আর মার্জিত দেখতে। কোন একদিন মা বলেছিল মনে আছে,

‘শোভাকে দেখতে ঠিক লক্ষ্মী প্রতিমার মতো।’ সঙ্গে সঙ্গে মা আবার দুঃখও জানিয়েছিল, ‘অথচ ওর কপালটাই কেমন খারাপ দ্যাখ্।’

বরের সঙ্গে অজ্ঞাত কোনো কারণে শোভার সম্পর্ক ভালো ছিল না একদমই, মাঝখানে ছিল অন্য কোন মহিলা। শোভার বরের খুঁটি বাঁধা ছিল তার কাছে। এমনটাই হবে হয়তো কিছু। 

সারাজীবন দেখেছি পৃথিবীতে কোন কিছু সোজা পথে চলে না। এটাকে কি সভ্যতার গ্রহের ফের বলা যায়?

বিকেলে বোনের বাড়িতে মাকে দেখতে আসতো শোভা। যেতে যেতে তার রাত হয়ে যেত। আমার মায়ের সঙ্গে তারও বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। দেখে বোঝা যেত না মনে তার কোন দুঃখ আছে কিনা। সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকতো। হাসতে হাসতেই সে একদিন মাকে বলেছিল, ‘আমার মত ভাগ্য যেন কারোর না হয় মাসিমা।’ 

একদিন তারপর শুনতে পেলাম শোভা নাকি খুব অসুস্থ। এতটাই বাড়াবাড়ি হয়ে গেল যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল। একদিন-দুদিনের মধ্যেই ঘটে গিয়েছিল সমস্ত ব্যাপারটা। শোভা মারা গেল। সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল তার।

মেয়ের অসুস্থ হয়ে পড়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো ঘটনাই গোপন করা হয়নি লক্ষ্মীর মায়ের কাছে। তার শোকে স্বাভাবিক কারণেই আমার মাকেও ভাগীদার হতে হয়েছিল, আর এটাও সত্যিকথা যে আমার মাও আন্তরিকভাবেই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল।

আজ এতদিন পর আমার অতীত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিজেকে খুব একটা ভালো মনে হচ্ছে না। মা যত সহজে লক্ষ্মীদের পরিবারের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছিল, লক্ষ্মীরা যেভাবে আমাদের আপন করে নিয়েছিল আমি তেমন কোনদিনই পারিনি। চিরকাল আমার মধ্যে দম্ভ, জড়তা, উন্নাসিকতা কাজ করে এসেছে।। এসব জটিলতা আমাকে দিল খোলা হতে দেয়নি অনেক সময়। তার জন্য জীবনের অনেক সুষমা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। মা যতই ঘনিষ্ট হয়ে যাক না কেন আমি সব সময় নিজেকে একটা পাঁচিলের আড়ালে রাখতাম। শোভার মৃত্যু তাই আমাকে কেমন আচ্ছন্ন করেনি, যতটা আমার মাকে করেছিল। কেবল একটি রাতের এক উপলব্ধির কথা মনে পড়ে। 

একতলায় টানা বারান্দার সামনের দিকে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। শোভা মারা যাওয়ার একদিন কি দুদিন পরের কথা। তখন গভীর রাত। সবাই ঘুমিয়ে আছে। কেউ কোথাও জেগে নেই। নিস্তব্ধতায় নৈশ বিচরণ আমার প্রিয় অভ্যেস। সেদিনও সেই অভ্যেসের বশেই মাকে ঘরে ঘুমন্ত রেখে নৈশ কাজকর্মের অবকাশে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। ঠিক মাথার ওপরে দোতলার ঘরটিতে থাকতো লক্ষ্মীর মা। আমি হঠাৎ শুনতে পেলাম প্রায় অশ্রুত এক গুনগুন কান্নার আওয়াজ আর এক সকাতর আবেদনের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর,

‘শোভা রে, মা আমার! আমাকে তুই নিয়ে যা, নিয়ে যারে মা তোর কাছে।’

নিস্তরঙ্গ রাত্রি শোকাতুর একাকিত্বের জন্য কতটা বিভীষিকাময় সেই অভিজ্ঞতার শিকার আমাকে হতে হল তার অনেকদিন পর। মাকে হারিয়ে রাতগুলি যখন আমার কাছে নিদ্রাহীন হয়ে গেল তখন আলো নেভানো অন্ধকারে মনে হতো ঘরের দেয়ালগুলি যেন চারপাশ থেকে আমাকে পিষে দমবন্ধ করে ফেলতে চাইছে। সেই সময় অশক্ত-অক্ষম লোলচর্ম এক বৃদ্ধার শোকাতুর কাতর উক্তির মর্মার্থ আমার কাছে প্রাঞ্জল হয়ে গিয়েছিল, ‘শোভা রে, মা আমার! আমাকে তুই নিয়ে যা তোর কাছে।’

মৃত্যু এক নির্মম সত্যি। অপরাভূত। বিস্তৃতির মধ্যে তার বসবাস। প্রাণীকে বোকা বানায়। তার হাঁ করা মুখ দেখলে চেতনা অসাড় হয়ে পড়ে। কেবল ব্যক্তিগত জীবনগুলির সুখদুঃখের বর্ণচ্ছটা মৃত্যুর চেয়েও প্রবল হয়ে থেকে যায়। মৃত্যু সেখানেই ম্লান।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *