শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
হাওয়ার পালে লাগলো কি দোলা
ঘটনা ঘটে, যখন ঘটে চলে, তার অভিঘাতে এমন পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে, দিকভ্রান্ত হয়ে ভাবনায় ডোবে কী হবে তার পরিণাম, আরও ভয়াবহ হয় যখন অসীমান্তিক হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আনাচে কানাচে। এমন দ্বিধা দ্বন্দ্ব যে আমাকে কাবু করে ফেলবে আমার বোধে আসেনি। মানুষ জাগছে, চেতনার সূত্র ধরে অবিশ্বাসের বলয় এসে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ, ভাবছি এটা কী মুক্তির আভাস না শাসনের ঘেরাটোপ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আদপেই কি দেখাতে পারে কোনো দিশা। এমন আঁধার তো কখনও দেখিনি, কেবলমাত্র দগদগে ঘা পুঁজ হয়ে গলে গলে পড়ে। এমন অবস্থায় কথার বুদবুদ থেকে কখনও কি জন্ম নিতে পারে নিত্যনতুন কল্পনার বীজ। মিউটিনি কি নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়েছে ঘরে বাইরে অন্তরে অন্তরে, নাকি স্বপ্নের বীজ বপন হচ্ছে অন্য কোথাও, এমন চিন্তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে না, তা আবার হয় নাকি! ঘাতকের রোষে কান্না চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে, বেদিশা হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে – আমার আগমনের হেতু আসলে কী? শাসনের পদ্ধতি পাল্টে যায়, শাসকের রূপও পাল্টায়, মানুষের দৃষ্টির আড়ালে পুরাতন আর নতুনের বোঝাপড়া গোপনে বাসা বাঁধতে থাকে। এমন বিসদৃশ ছবি নজরে আসেনি একথা সত্য নয়, বিকল্পের সন্ধান যে দেবে সেই মানুষ আর মানুষের যাবতীয় আয়োজন কখন মূর্ত হবে কে জানে। রানী লর্ড ক্যানিং-এর মুখ দিয়ে দিকে দিকে বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন ধর্মীয় স্বাধীনতা আর নিজস্ব সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ আর করবে না সরকার, রাজা আর জমিদারদের স্বাধীনতা অটুট থাকবে। কোথাও কি কোনো বিশুদ্ধ বাতাস বয়ে গেল? হোক না শাসনের নয়া মোড়, উচ্চ শিক্ষিতরা বলে বেড়াচ্ছে যা হচ্ছে হোক না, মজবুত রানীর শাসন, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশ আর সকল কুসংস্কারকে শত যোজন দূরে সরিয়ে বিজ্ঞানের সূচনাতেই জাতির মুক্তি, এতে কোনো শঙ্কা নেই, মানুষের মনের মুক্তি ঘটবে, যুক্তির দামামা বেজে উঠবে, উন্নয়নের ছোঁয়া ছুঁয়ে ফেলবে ঘরে ঘরে, এমন আজব ভারতবর্ষ ভারতবাসী কবে আর দেখেছে।
পরিবর্তনের সাজপোশাক গায়ে জড়িয়ে কারো হচ্ছে উদ্গীরণ কেউবা দিশাহারা। জনমানসে ব্যাখ্যার অন্ত নেই। উদ্ভ্রান্তের মতো মানুষ দিন গুনছে। ভারতের পশ্চিমাংশে অসন্তোষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে কিংবা ছড়ায়নি, চোখ তুলে তাকাবার আগেই ভেবে নিয়েছে আর যা কিছু ঘটুক, গায়ে আঁচ না লাগলেই হলো। উত্তর ভারতের গাঢ় অন্ধকারে খড়গহস্তে আপাদমস্তক ভেঙে খান খান, মিরাট, কানপুর লখ্নউর অসন্তোষ ক্রমশ উর্দ্ধমুখী। নিজের কথা নিজে বলবো, না অন্যের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিজের মান রক্ষা করবো, বুঝতে অসুবিধাই হচ্ছিল। অফিসযাত্রীরা অফিস যায়, সওদাগরী অফিসে কোম্পানি শাসনের অবলুপ্তির আঁচ লেগেছে। লর্ড ক্যানিং ভাইসরয় হয়ে আস্বস্ত করছেন বটে, সন্দেহের বাতাবরণ মুছে যাওয়ার নয়, ভালোমন্দের খাতা খুলে কেউ তো আর মনের কথা লিখে জানাচ্ছে না ব্রিটিশ শাসন জনমোহিনী হতে চলেছে, নাকি গোটাটাই একটা ফাঁদ। কেউ কেউ শুনিয়ে যাচ্ছিল চুপিচুপি – যাজকদের জমানা শেষ হলো বলে, ধর্মান্তর করা আর চলবে না, এবার পাততাড়ি গুটিয়ে যায় যার দেশে ফিরে যান। কথাগুলো শুনে হজম করতে বেগ পেতে হলো। কেউ কেউ বিপরীত কথা শোনাচ্ছে বটে, তবে নিশ্চয়তা কিছুই নেই – রানীমা ভারতবাসীদের নিয়ে গোপনে কি ঘুঁটি সাজাচ্ছেন তিনিই জানেন – আরে না না, একই গাছের ফল, স্বাদের একটু আধটু তারতম্য হলেও আসলে তো তেতো। এইসবই পথচলতি মানুষের কথাবার্তা। পরিবর্তনের হাওয়ায় মন বুঝতে গিয়ে টের পেলাম মানুষ এখনও বুঝে উঠতে পারছে না, দেশের অবস্থা কোন দিকে গড়াবে। আশা জেগেছিল বটে পরাধীনতার জ্বালা জুড়োবে। ওরা বলে বেড়াতে লাগল পথেঘাটে হাটে-বাজারে – অশ্বডিম্ব।
যে চিন্তা শিয়রে শমন এনে হাজির করেছে, উত্তর মিলছে না কিছুতেই। আবার কি ধ্বসে পড়া ঘরবাড়িগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে হবে কোন খুঁটিটা নড়বড়ে হয়ে গেল, কোন ভিতে ফাটল ধরলো। সরকারি দপ্তরে কত রকমের কানাঘুষা – এবার বোধ হয় সব খোলনলচে পাল্টে দেবে এমন করে মানুষের যেন প্রতিবাদের ভাষা অবশিষ্ট না থাকে। একদল তো সোচ্চার হলো – ভারতীয়দের জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত করলে সমূহ বিপদ হবে, আরও কত যে বিদ্রোহের জন্ম নেবে, কে বলতে পারে। আবার একদল বলল, মূর্খ করে রাখলে ব্যবসা বাণিজ্য প্রশাসন তো তলানিতে ঠেকবে। আরে বাপু দেশীয়দের দূরে সরিয়ে রেখে শুধু ইউরোপীয়দের দিয়ে রাজত্ব চালানো হবে সোনার পাথরবাটি, ওরা এটা বোঝে না। কত তো যুক্তি স্বপক্ষে বিপক্ষে উঠে আসছে অগ্ৰিম অনুমান করা দুঃসাধ্য মনে হচ্ছে দিন দিন। সময়টা ঘুরে চলেছে দ্রুত। নতুন নতুন আইনের জাঁতাকলে পড়ে কে যে কার চক্ষুশূল হয়ে উঠছে, আন্দাজ করা কঠিন হচ্ছে। কেন জানি না এই রাজনীতির চক্রে নতুন নতুন পরিকল্পনাগুলো মাঠে মারা যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে মানুষ আর মানুষের ভাবনা অথচ মানুষের পাশে দাঁড়ানো যে জরুরি এই সংবাদ রানীকে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে কে পৌঁছে দেবে। ভুলের মাশুল কে গুণবে, কেন গুনবে এর উত্তর তো জানা নেই। এ-ও তো জানা নেই কেন একটি জাত অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা সমৃদ্ধ হবেই বা কোন নিয়মে, অথচ যাদের অর্থে ওরা বলিয়ান হচ্ছে, তাদের কপালে ছিঁটেফোঁটাও জুটবে না তা কেমন করে মেনে নেওয়া যায়। আমার নিশ্চুপ থাকা আর অস্থিরতা নিয়ে কত যে কথা ভেসে আসছে দিনরাত। বুঝলাম কলম ধরা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। এই সন্ধিক্ষণ এমন এক ক্ষণ, এতকাল যারা এমন ধারণা পোষণ করতো, স্থিতাবস্থাই যাবতীয় অন্ধকারকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে, তারাও যেন ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। মনে হচ্ছে যে পথটাকে মনে হচ্ছিল সোজা নির্ভেজাল তা হয়ে উঠছে পিচ্ছিল। এই উপলব্ধির সত্যতা আছে বই কি, আমি যে মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়াই, টের পাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে সব কিছু অচেনা লাগছে, লাটভবনের অন্দরে বসে মানুষের ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর কাটাছেঁড়া করা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা ছাড়া আর কি।
মানুষের চলাফেরা তো থেমে থাকবে না, সে তার মতো করে উচ্চারণ করবেই, কার সাধ্য তাকে থামায়। গুঞ্জন যখন শুরু হয়, মানুষের অন্তরে এমন অনেক গল্পের জন্ম হয়, এমন অনেক ভুবনের জন্ম হয়, বাহির থেকে আন্দাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো চিন্তার অভিঘাত মুহূর্তে নাড়িয়ে দেয়, কোনো কল্পনা সুদূরের অপেক্ষায় দিন গোনে সঠিক সময়ে বিস্ফোরণ ঘটাবে বলে। আমার মনে হচ্ছিল বিদ্রোহের আগের দেখা ভারতবর্ষ আর দমন পীড়নের পরের ভারতবর্ষ কিছুতেই একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা সম্ভব হচ্ছে না। এমনও তো হয়েছে যাদের সম্ভ্রমের স্বরে জিজ্ঞাসার অন্ত থাকতো না, তারা কাছে ঘেষে বসতে ইতস্তত করছে। দু-একজন সাহস করে বলছে না এমনও নয় – সাহেব বাবা আপনারা আমাদের সত্যিই কি আপনজন ভাবেন? আপনারা কি আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতিকে মুছে দিতে চান? ধর্মান্তর করে কী আসলে দেশটার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন? এইসব প্রশ্ন যে অবান্তর নয় আমি জানি, এ যেন আমি নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করছি, আবার নিজের কাছেই জবাব চাইছি। একান্তে বসে ঠাকুরপুকুরের মাটির ধুলো বাতাসে উড়িয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছি আমার কর্তব্য আর বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো সংঘাত ঘটছে না তো। লন্ডনে গিয়ে চার্চ মিশনারি সোসাইটির কাছে ফিরে গিয়ে এর উত্তর খুঁজবো নাকি আবার! কী জানি ওরা কী জবাব দেবে কিন্তু আমার লক্ষ্যে যে বিভ্রম ঘটছে এটা মিথ্যা নয়। তাহলে কী পথটাকেই পাল্টে ফেলব, একবার অন্তত সরকার বাহাদুরকে বলবো এটা ঠিক হচ্ছে না। এতে মানুষের মঙ্গল হবে না। হ্যাঁ আমি সাধারণের ভীড়ে গিয়ে বলতে পারছি না, খ্রীষ্টের বাণী একমাত্র মুক্তির পথ, এই পথে বাঁধার সৃষ্টি হলে আপনাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। ওরা আমাকে বিশ্বাস করবেই বা কেন? এই ধর্মে বিশ্বাসী মানুষগুলো যখন ভিন্ন পথে হাঁটে, কোন মুখে আমি বলবো ওরা এক মহান দেশের নাগরিক।
কিশোরী চাঁদ মিত্র মহাশয়ের কাছে এর কোনো সঠিক জবাব ছিল না বলেই জানি। আমি না হয় বিদেশি যাজক, এনাদের হলোটা কি, দেশীয় বিদ্বজ্জন বই তো নয়? এতটা আনুগত্য মানানসই নয় তো বটেই, বিসদৃশ লাগে। আমার ভাবতে ইচ্ছে করে দেশটাকে এরা কোন দৃষ্টিতে ভাবে। এনাদের ভাবনার মধ্যেই কোনো গলদ আছে। এই মাটি জলহাওয়াকে এরা হেলায় উপেক্ষা করেছে, না হয় এমনটা হয়! জানতে ইচ্ছে করে কেন এত উদাসীনতা। এক চাষী সেদিন আমার বিদ্যালয়ের বারান্দায় এসে বলে গেলেন – বলতে পারেন আমরা কেন এককোনে পড়ে থাকি? নির্দ্ধিধায় উত্তর দিয়েছিলাম, তুমি আমার স্মরণ নাও। কেন এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলাম জানি না। হয়তো ওর অসহায়তা আমাকে দিয়ে কথাগুলো বলিয়ে নিয়েছিল। ও কিন্তু এত সহজ করে সমাধানটা স্বীকার করেনি। উত্তরে বলেছিল, এই রাস্তা বের করে আনা আপনার কাজ নয়, পাপটা ওই শহুরে বাবুদের অন্দরমহলে বাসা বেঁধে আছে, এক দেশের মধ্যে যে কত দেশ, এই রহস্য বুঝতে হলে আরও সময় লাগবে, আপনাদের বিদ্যালয়ের বিদ্যার জ্ঞানে ধরা যাবে না। কিশোরী বাবুদের ভেতরের আঙ্গিনায় প্রবেশের সুযোগ আমার নেই। কিন্তু কেন যে এত সহজে যে এঁরা আমলাদের পক্ষ নেয় এটা বুঝতে পারা যায় না। সাহস করে আরও গভীরে গিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে পারলে ব্যাপারটা জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে যেতো, সমস্যার মূলে কুঠারাঘাত করলেন না। দেশটা যে অন্যের হাতে চলে গেল, এই মনোভাবই তার ঠিকুজি কুষ্ঠির জন্য বোধ হয় যথেষ্ট।
মহাবিদ্রোহের যন্ত্রণা ও কুফল নিয়ে নানা জনে নানা মন্তব্য করেছেন। সুচারুভাবে ছড়িয়েও পড়ছে দিকে দিকে, এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ভার আমি কেমন করে তুলে নিতে পারি, তবে উড়িয়েও তো দেওয়া যায় না। আমি সন্তোষজনক উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতেই থাকি, এই ছাড়া আমার কিই-বা করার ছিল, এই কি নিছক প্রতারণা না প্রত্যাঘাত এর সবটুকুর মূল্যায়ন না হলে ঘটনা কোনদিকে মোড় নেবে কে জানে। শোনা যাচ্ছে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ভোলানাথ চন্দ্রের ‘স্যাটারডে ইভিনিং ইংলিশম্যান’ পত্রিকার উল্লেখযোগ্য লেখাপত্র নিয়ে নানা আলোচনা। তাঁকেই বরঞ্চ আমার সংশয় নিঃরসনের উপায় নিয়ে জিজ্ঞেস করি যদি একটা দিশা মেলে। কথাটা শুনেই একটু বিব্রত হলেন। বললেন, এই বিষয়ে আমার মন্তব্য ইতিমধ্যেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এই বিষয়ে আমি অনেক ভেবেচিন্তেও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি। ভবিষ্যৎ এই বিদ্রোহের পরিণামকে কোথায় নিয়ে হাজির করবে এই মুহুর্তে বলা দুষ্কর তবে এই সময়ের প্রেক্ষিতে এই ঘটনা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়, দেশ আবার কুশাসনে না ফেরত চলে যায়, ভুল ও আত্মহত্যার সামিল, ভয় হয় দেশের স্বার্থ না বিপন্ন হয়। ভারতবর্ষে ধীরে ধীরে যে নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে ইংরেজ বিদায়ে তা না ব্যাঘাত ঘটে। সংকোচের সঙ্গেই বললাম, আপনি কি মনে করেন না ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রয়োজন। দেখুন রেভারেন্ড লঙ, আমার মত হলো যতদিন না ভারতবাসী শিক্ষাদীক্ষায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হচ্ছে, ততদিন ইংরেজ শাসনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তাতে যতই দূর্যোগ আসুক তো আসুক। বললাম, ব্রিটিশদের শাসন ভারতবাসীর পক্ষে আশীর্বাদ না অভিশাপ। এর উত্তর দেওয়ার সময় এখনও হয়নি, তবে এই বিষয়ে আমার লিখিত মতামত আমি জনসমক্ষে আনবো। আপনার কি মনে হয় না, হয় ইংলেণ্ডের রানী, না হয় এদেশীয়রা, কেউ না কেউ এতে রুষ্ট হতে পারে। শুনুন রেভারেন্ড লঙ, কারো মন যোগানো কথা বলা আমার ধাতে সয় না, জীবনে যা সত্য বলে মনে করেছি, তা আমি বলে যাবো, যদি ভুল হয় হবে, কিন্তু যাহাই বলবো তাই আমার দেশবাসীর মঙ্গল ও হিতসাধনের জন্যই বলবো। আমি বিশ্বাস করি আজ যা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা একদিন হয়তো থাকবে না। ভারতবাসী বিংশ ও একবিংশ শতকে কলকারখানা ও খনির মালিক হবে, কৃষি ও শিল্পের উন্নতি করবে, সমূদ্রপথে জাহাজে করে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করবে। শ্রী চন্দ্রের আত্মবিশ্বাসী উজ্জ্বল দুচোখে আমি প্রত্যক্ষ করলাম একজন স্বদেশপ্রেমী মানুষের স্বপ্নের আলো যা ছড়িয়ে গিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে আমার মনের যাবতীয় অন্ধকার ও দ্বিধা দ্বন্দ্ব, নিশ্চিত হলাম এই ভেবে মনের মাঝে আমি যে ধারণা লালন করছি এতদিন তা মোটেই মিথ্যা নয়।
এমন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার কথা আরও যে নানা ভাবনার অভিমুখ খুলে দিচ্ছিল ক্রমে ক্রমে। পৃথিবীতে শরীর সর্বস্ব মানুষ অনেক দেখেছি যারা জন্মেই হাঁড়গোড় সর্বস্ব কঙ্কালসার হয়ে যায়, মনন চর্চার নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ কয় জনের হয়, মানুষ যে মননশীল জীব কয়জনেই বা প্রমাণ করতে পেরেছেন। সমালোচনার কথা না হয় বাদই দিলাম, বক্তব্যের নির্যাসটাই আসল। তাঁর কথার উপর্যুপরি ব্যাখ্যায় অভিভূত হয়ে শোনার ইচ্ছাটাকে কিছুতেই দমন করতে পারলাম না। তিনিও যেন বলার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎই বলে বসলেন – বুঝলেন, আমি দুধরনের ইংরেজ দেখেছি। এই ধরুন না স্যার উইলিয়াম জোন্সের কথা, মিলের মতো গুণীজনকে বাদ দিই কেমন করে। ইউরোপীয় ও ভারতীয় ভাষায় মধ্যে সম্পর্ক নির্মাণে জোন্সের অবদান কী ভোলা যায়! ভারতীয় সংস্কৃতিকে এমন উঁচু আসনে কয়জন স্থান দিয়েছেন বলুন তো। আবার কেউ কেউ ঢেঁড়া পিটিয়ে বলে বেড়ান ভারতবাসীরা বর্বর ও নিরক্ষর, শাসিতের হেয় করে দেখানোর, শাসক ও শাসিতের ঘৃণার আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করেন কিন্তু জোন্স সাহেবকে দেখুন স্রোতের উল্টো দিকে গিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন সম্পূর্ণটাই এক অসম্পূর্ণ দৃষ্টি ও চিন্তার ফসল। তাহলে আপনি কেন মনে করেন বিপদের সম্মুখীন হওয়ার মতো সাহস বাঙালির নেই, নিরাপদ দূরত্বে থেকে যুদ্ধের বিভীষিকা লক্ষ্য করে, এই বচনে বিশ্বাস করে – আপনি বাঁচলে বাপের নাম। এমন ব্যঙ্গে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালিদের আপনি বিদ্ধ করেন। এমন বৈপরীত্য কীসের জন্য। বললেন, কেন বলবো না বলুন তো, বাঙালি জাতি কত সহজে বেমালুম তাঁর পুরনো ঐতিহ্য আর গৌরবের ইতিহাস ভুলে বসে আছে। না হয় বিদ্রোহের সময় বারানসীতে বাঙালি-টোলার দশ হাজার বাঙালিদের যে দুরবস্থা হয়েছিল সেই নিয়ে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুরা কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন? তাঁদের কলম তো বন্ধ হয়েই ছিল, ইংরেজদের দানবীয় প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়নি কোনো জোরালো প্রতিবাদ। তবে কি মহাবিদ্রোহই ভারতের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করে দেবে? রেভারেন্ড লঙ, কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা যতই তীব্র হোক, তা দিয়ে আগামী সময়কে ধরা যায় না, অনেক সংঘর্ষ, অস্তিত্ব সংকট আর ভাঙনের পরেই নতুন সমীকরণের জন্ম হয়, নচেৎ নয়, তাই এই পরাজয়ের পরে আর এক ঝড়ের ইঙ্গিত দিই কেমন করে।
সন্দেহ ক্রমশ ঘনিভূত হচ্ছে কোম্পানির শাসন তো অবলুপ্ত হলো, উপনিবেশিক মূল চরিত্রের কোনো পরিবর্তন আদৌ সম্ভব কী! এই আশঙ্কা নিয়ে আমাকেও দিনরাত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আমি মনেপ্রাণে চাইছিলাম এই দেশের মানুষরা অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পাক, জমিদারদের অত্যাচার বন্ধ হোক, ধনে জ্ঞানে ছাপোষা মানুষগুলো মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠুক, এদের স্বশিক্ষিত চেতনা বিশ্বের দরবারে উন্মোচিত হোক। পনেরো জন সদস্য নিয়ে ইন্ডিয়া কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বটে, ক্যাবিনেটের একজন সদস্যকে ‘ভারত সচিব’ প্রদান করা হয়েছে এ-ও সত্যি এবং অনেকেই রানীর ঘোষণাকে ‘ম্যাগনাকার্টা’ অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের দলিল হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে বটে, কিন্তু এটা বাস্তব রাতারাতি ইংরেজ সরকারের যে দূর্বলতা বিদ্রোহ দমনের সময় প্রকট হয়েছিল – সন্দেহভাজনের ওপর অত্যাচার, ফাঁসি ও গ্ৰামের পর গ্ৰাম পুড়িয়ে দেওয়া এসবের ফলাফল ও ব্যবধান আগামী সময়ে দূর করা যাবে তো নয়ই বরঞ্চ নানা আকৃতিতে প্রকৃতিতে প্রদর্শিত হবে যা এই মুহূর্তে আন্দাজ করা কঠিন। মিশনারীদের অনেকেই জানতে চাইছে, তাঁদের মধ্যে এডওয়ার্ড স্টুয়ার্টও ছিলেন – লঙ, আপনি কী মনে করেন ব্রিটিশ রাজের সরাসরি শাসনে মিশনারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও সুযোগ পাবে? পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার বন্ধ হয়ে যাবে না তো? এঁদের মতলব আপনি কী আন্দাজ করতে পারছেন? এডওয়ার্ডকে বললাম, তোমার জিজ্ঞাসাটা মোটেই উড়িয়ে দেবার মতো নয়। আমাদের শুধু ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে। এটা তো ঠিক শোষণ ও শিক্ষা দুটো পাশাপাশি চললে শাসকের বিপদ বাড়বে বই কমবে না, তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জনের বিদ্যা বিতরণ করা আর আমাদের লক্ষ্য হলো সমগ্ৰ মানবজাতির কল্যাণ, তেলে জলে মিশ খাবে কেমন করে! একমাত্র উপায় হলো যদি এদেশীয়রা নিজেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জ্ঞান লাভের তৃষ্ণা মেটাতে চায়। রেভারেন্ড লঙ শুনেছেন কি, প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্ৰন্থের প্রকাশ হয়েছে, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশ হচ্ছে, কী বলেন? সেই কবে, বছর ছয় আগে ম্যালেন্স হানা ক্যাথরিনি’র ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ খ্রিস্টান ট্র্যাক্ট অ্যান্ড বুক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। হ্যাঁ, তাঁর উদ্যোগেই তো জানানা মিশন স্থাপন হয়। উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের অন্দরমহলে গিয়ে মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বুঝলেন আপনারা, আমাদের শুধু ব্রিটিশ শাসকদের ভরসায় থাকলে চলবে না, নিজেদের উদ্যোগে লক্ষ্য স্থির রেখে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। আমি জানি আমাকে নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে, আমি হিন্দু মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করতে সফল হয়নি। আপনারা শুনুন, এটা আমাদের লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু একমাত্র লক্ষ্য নয়, এখনও অনেক কাজ বাকি। প্রাথমিকভাবে বিদ্রোহের ফলে মিশনারীদের প্রতি যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে এদেশীয়দের মনে, তাকে তাড়াতে হবে, বোঝাতে হবে, ব্রিটিশ শাসকদের অপকর্মের জন্য আমরা মোটেই দায়ী নই, আমাদের ওদের পাশে বন্ধু হয়ে দাঁড়াতে হবে, অত চিন্তিত হবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে, আত্মবিশ্বাস অনেক বিপদ থেকে পরিত্রাণ দেয়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
