অমিতাভ সরকার

‘তুম কাঁহা পে খো গ্যায়ে’

বেলা মুখোপাধ্যায়

মানুষের জীবন কখন কোন খাতে বয়ে চলে, সে নিজেও জানে না।

বুদ্ধির সঙ্গে পা মেপে চললেও অঙ্ক তার নিজস্ব অ্যালগোরিদম মেনেই এগোয়। শেষে কী হবে কে জানবে? সময় বড়ই অদ্ভুত বিচারক। কখন কী প্রশ্নোত্তর নিয়ে বসে, কার সঙ্গে কাকে মিলিয়ে দেয়, কাকেই বা পৃথক করে – চেনাজানার এই ভার্চুয়াল জগত থেকে সেটাই বোঝা যায় না। 

বেলা মুখোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে পড়ছিলাম। মানুষ যাঁকে চেনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী হিসাবে। হেমন্ত যাঁর নাম তার আর নতুন করে কী পরিচয় করাব? কিন্তু বেলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতশিল্পী পরিচয়ই আগে, যেটা মানুষ ভুলে গেছে। সহজ সাবলীল কণ্ঠমাধুর্যের জোরে চারের দশকে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছিলেন। সংসারজীবনে প্রবেশ করায় পাঁচ, ছয়ের দশকের গান গেয়েছেন সামান্যই। বেলা মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ডের মধ্যে একক কণ্ঠের তুলনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে কিংবা বিভিন্ন শিল্পীদের সঙ্গে সমবেত কণ্ঠে গানের সংখ্যাই অধিক। মেয়েদের সংসারে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। জীবন এগিয়ে চলে অনেক সম্ভাবনার না হওয়া নিয়ে। 

এখন সময় বদলালেও মানসিকতা কী খুব পাল্টেছে?

ছোটোবেলা থেকেই বেলা মুখোপাধ্যায়ের ওপর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে। অল্পবয়সে বাবা চলে যাওয়ায় তিনি এবং বোন আভাকে স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই অর্থ উপার্জনের চিন্তা করতে হয়েছিল। পারিবারিক সূত্রেই গানটাকে উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছিলেন। জন্ম ১৯৩০ সালের ২৯শে মে মুর্শিদাবাদে মামার বাড়িতে। সিউড়ির জমিদার পরিবারের মানুষ হলেও বাবার চাকরিস্থল ছিল ধানবাদে। তবে মধ্য কলকাতায় চলে আসায় ছোটোবেলা এখানেই অতিবাহিত হয়েছিল।   

মা অমিয়বালা, বাবা হরিশঙ্কর, মামা বালকনাথের সঙ্গীতানুরাগ ছোট্ট বেলা এবং আভার ওপরে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। তখন থেকেই প্রতিভার নিদর্শন রাখতে শুরু করেছিলেন। স্কুলের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বিদগ্ধজনের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। কৃষ্ণকমল দাশগুপ্তের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রশিক্ষণ নিতেন। এছাড়া বাসন্তী বিদ্যাবীথি স্কুলে গান শেখাকালীন ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মনোরঞ্জন সেন ছোট্ট বেলাকে রেডিওতে গান গাওয়াতে নিয়ে যান। শিশুমহল দিয়ে সেই ছিল শুরু। এরপর রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ ‘মহালয়া’-র সরাসরি সম্প্রচারেও গান গেয়েছেন। রাইচাঁদ বড়াল, রবীন চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক সেই আমলের সবার সুরেই কণ্ঠদান করা হয়ে গেছে প্রতিভাময়ী এই কিশোরীর। অনুষ্ঠানে গান গাওয়া থেকে শুরু করে রেডিও, রেকর্ডে, সিনেমায় প্লেব্যাক – বেলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। নিউ থিয়েটার্সের ‘কাশীনাথ’(১৯৪৩) সিনেমায় নায়িকার লিপে গান গেয়ে তখন ওঁর খুব নামডাক। গান গাইতে উঠলেই আসে ‘ও বনের পাখি’-র অনুরোধ। ‘কাশীনাথ’-য়ে নায়িকার ছোটোবেলার চরিত্রে বেলা অভিনয়ও করেছিলেন। ‘কাশীনাথ’ ছবির অন্য দুটি জনপ্রিয় গান ছিল-‘এবার তবে করব’, ’এল রে এল রে’ – যা নায়ক-গায়ক অসিতবরণ(কালোদা)-র সঙ্গে বেলার দ্বৈতকণ্ঠে। বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল গানগুলো।   

এই গানের সূত্র ধরেই হেমন্তের সঙ্গে আলাপ। হেমন্ত তখন ‘হেমন্ত’ হয়ে ওঠেননি। বেলার মাও হেমন্তকে স্নেহ করতেন। কলকাতায় ওঁর গান শুনে সেসময়ের বিখ্যাত সুরকার খেমচাঁদ প্রকাশ বোম্বে যেতে বলেন। কলকাতার বাইরে মেয়েকে একলা ছাড়তে বেলার মা হেমন্তর উপরই ভরসা রাখলেন। এভাবেই প্রেমের শুরু। খেমচাঁদ প্রকাশের পর বোম্বেতে সি রামচন্দ্রের মতো সুরকারের সুরে কাজ করেছিলেন। অন্যান্যরাও বেলাকে দিয়ে প্লেব্যাক করাতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু মা যে অসুস্থ। ফিরে আসতে হলো কলকাতায়। চিকিৎসা চলেছিল। কিন্তু উত্তরোত্তর শারীরিক অবনতি হয়। কয়েকমাসের মধ্যেই…। 

বাবা তো আগেই চলে গেছেন, এবার মাও চলে যাওয়ায় হেমন্তই পরিবারের হাল ধরলেন। ওঁদের প্রেম পরিণতি লাভ করলো পরিণয়ে।

তারিখটা ১৯৪৫ সালের ৭ ডিসেম্বর। সবার সুবিধার কথা ভেবে তিন বোন, দুই ভাইসহ- পুরো সংসারটার দায়িত্বই হেমন্ত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। নিজের মা-বাবার অনুমতি নিয়ে হেমন্ত ওদেরকে নিজের সংসারেই রাখতেন। হেমন্তের মা-বাবাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। পড়াশুনোর পাশাপাশি ওস্তাদদের কাছে গান শেখা, গানের ট্যুইশানি, অনুষ্ঠান -সবই চলেছিল। সময়ের নিয়মে হেমন্ত-বেলার সংসারে শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। হেমন্ত বাংলা গানে একটু নাম করছেন। এদিকে বোম্বে থেকেও ডাক পেয়ে ওখানে থিতু হওয়ায় অদম্য চেষ্টায়। ফলে বেনটোলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক হয়ে আশুতোষ কলেজে বিএ পড়াকালীন লেখাপড়া অসম্পূর্ণ রেখেই স্বামীর সুবিধার্থে ভাইবোনসহ পুত্র জয়ন্তকে নিয়ে বোম্বে চলে যেতে হয়েছিল। আবারও স্ট্রাগল- এবং তার জোরেই সাফল্য মুখ দেখা। ১৯৫২-য় বোম্বেতে বাড়ি ক্রয়, ১৯৫৪ সালে কন্যা রাণুর জন্ম, ১৯৫৫ সালে ‘নাগিন’-র সুরকার হিসাবে প্রভূত সাফল্য এবং ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারলাভ। হেমন্ত আর থেমে থাকেননি। এগিয়ে চলেছিল  বিজয়রথ। কিন্তু বেলা মুখোপাধ্যায়কে সংসারের অন্দরমহল সামলাতে হয়েছে।

সেই সংসারকে প্রাধান্য দিতেই হোক, বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, সঙ্গীত জীবন বেশি আর এগোয়নি। গান যে একেবারেই বন্ধ করেছিলেন- তা নয়। পরের দিকে স্বামী হেমন্তের সুরে বাংলা হিন্দি কিছু চলচ্চিত্রে গান গেয়েছিলেন। 

সঙ্গীত পরিচালনার কাজে হেমন্তের সহকারী হিসাবে সমরেশ রায়ের সঙ্গে স্ত্রী বেলাও যথাযথ ভূমিকা পালন করে গেছেন। উল্লেখ্য, যে, দিদির মতো বোন আভাও হেমন্তের সুরে কিছু গান রেকর্ড করেছিলেন। পরবর্তীকালে হেমন্ত অনেক স্ট্রাগল করে নিজে একজন সুরকার এবং গায়ক হিসাবে অনন্য নজির রেখেছিলেন যে কথা সবার জানা। কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন জিনগত প্রতিভার অধিকারী৷ শুনে শুনেই তাড়াতাড়ি গান তুলে নিতে পারতেন। ১৯৬০ সালে হেমন্তের সুরে ‘মাসুম’ ছবি দিয়েই গান গাওয়া শুরু। অনুরাধা, বন্ধন, বিশ সাল বাদ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসাবেও রাণুকে দেখা গেছিল। নায়িকার প্রস্তাবও পেয়েছিলেন, তবে সেদিকে আর এগোনো হয়নি।

পিতার সুরে ‘নানি তেরি মরনি কো’, ‘বুশিবল’ কিংবা ‘বাদশা’ চলচ্চিত্রে ‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া’, ‘প্যারিলালের খেলা দেখে যা’, ‘শোন শোন মজার কথা ভাই’ থেকে হিন্দি চলচ্চিত্রে বাচ্চাদের রাইমসের মতো অল্প কিছু গানে জনপ্রিয়তা পেলেও উনিও সঙ্গীতজীবন দীর্ঘায়িত করতে পারেননি। স্বামী গৌতম মুখোপাধ্যায় ছিলেন পিতা হেমন্তেরই সহকারী সংগীত পরিচালক। বাবা হেমন্তের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘অমল ধবল পালে’, এ পারে মুখর হলো কেকা’-র মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত, কিংবা শ্রেষ্ঠ গায়িকার বিএফজে পুরস্কার পাওয়া ‘আশীর্বাদ’(১৯৮৬) সিনেমায় ‘ফুলের গন্ধের মতো তোমায় জড়িয়ে’ -র মতো হাতেগোনা হিট গানই সম্বল। বেশি গাননি কেন সেটা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়ে যায়। কিছুকাল আগে এ আর রহমান রাণু মুখোপাধ্যায়কে ‘দাউদ’ সিনেমাতে প্লেব্যাক করিয়েছেন। 

বেলা মুখোপাধ্যায়ের বাংলা গানের মধ্যে দাবি(১৯৪২), পরিণীতা(১৯৪৩), কাশীনাথ(১৯৪৩) তো বটেই,  তাছাড়া হেমন্তের সুরে হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, সাথীহারা, বালিকা বধূ, সন্দীপন পাঠশালা-র মতো চলচ্চিত্রে একক কিংবা দ্বৈত কণ্ঠে গান গাওয়া ছাড়াও হেমন্তের সুরে বেলা মুখোপাধ্যায়ের বিভিন্ন আধুনিক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডও আছে। হিন্দিতে বন্ধন, সহরা, ফ্যাশন, ফরার প্রভৃতি সিনেমা ছাড়াও হেমন্তের সঙ্গে কিছু গীতের রেকর্ডও পাওয়া যায়। তবে স্বামী হেমন্ত খ্যাতির শীর্ষে চলে গেলেও যে কোনো কারণেই হোক, স্বাধীন ভাবে বেলা মুখোপাধ্যায় সঙ্গীতে আর উল্লেখযোগ্য কিছু দৃষ্টান্ত রাখতে পারেননি। হয়তো আর পাঁচটা বাঙালি মেয়েদের জীবনে যা হয়…, সেই একই গল্প। সবার পক্ষে তো ঘরেবাইরে একইরকম ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। ওঁরও কিছু…।

হেমন্তকে ঘিরেই ছিল তাঁর জীবন। স্বকীয়তা থাকলে হয়তো অন্যরকম কিছু হতো। ‘আমি গাঁথবো মালা’, ‘দূরে কেন এলেই’, ‘ফুলের কানে কানে’, ‘বলো কী চাও বা চাও গো’, ‘এই একটু হাসি’, ’হর দুঃখ সহনে ওয়ালি’, ‘দো দো পেট কো রোটি’, ‘দুলহা রাম শিয়া দুলহারি’ কিংবা ‘ও আমার চাঁদের আলো’, ‘এসো শ্যামলসুন্দর’,’ওহে সুন্দর মরি মরি’, ‘আষাঢ় কোথা হতে আজ’ বা মৃণাল সেন পরিচালিত ‘প্রতিনিধি’(১৯৬৪) ছবিতে বেলা মুখোপাধ্যায়ের খালি গলায় গাওয়া ‘মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ’ -র মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে বেলা মুখোপাধ্যায়ের গায়কী সত্ত্বা কতটুকুই বা অনুভব করা যায়?

পাঠকেরা ভাবুন, আমাদের সংসারেও কি পুরুষকে দাঁড় করাতে নারীদের নেপথ্য অবদান রয়ে যায় না! এ নিয়ে আমরা কতটা ভাবি? বিচলিত হই কতদূর?  

মানবিকতাও অভ্যাস করার জিনিস। মন থেকে সঠিকভাবে সঠিক সময়ে না অনুভব করলে বাকি সবই যে নিছক স্ততি, আড়ম্বর ছাড়া কিছু নয়। এখনকার যুগেই বা ক’জন ভাবে এসব?

তবে ১৯৮৯ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর হেমন্তের চলে যাওয়ার পর থেকে বেলা মুখোপাধ্যায় কার্যত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। পুত্র জয়ন্ত, পুত্রবধূ অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় বোম্বেতেই থেকেছেন। 

শেষজীবনে এসে গান থেকে বিরত থাকা নিয়ে হয়তো বেলা মুখোপাধ্যায়ের মনের কষ্ট, ক্ষোভ প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। শেষজীবনে লিখেছিলেন আত্মকথাও। 

২০০৯ সালের ২৫ শে জুন বেলা মুখোপাধ্যায়ের কলকাতাতেই মৃত্যু হয়। এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় একটা যুগ। মানুষ জানতেই পারে না, একজন সফল স্বামীর আড়ালে একজন প্রতিভাময়ী সঙ্গীতশিল্পীর জীবন আখ্যান। সম্ভাবনা থাকলেও যেখানে পূর্ণ প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। বেলা মুখোপাধ্যায়কে আজও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী পরিচয়েই বেশি পরিচিত। শিল্পী বেলা মুখোপাধ্যায় হারিয়ে গেছেন অনেক আগেই। যা হারিয়ে যায়, তাকে আঁকড়েই বা কতদিন আর…। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে না-

‘যদি হায় জীবনপূরণ নাই হলো মম তব অকৃপণ করে…।’

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *