রম্যরচনা
অধ্যায় : ১৮
সাত-আটখানা বাড়ির পর থাকে পুলকিত পলায়ন। সে একজন কবি। এমনই তার কাব্যপ্রতিভা যে এমনি এমনি কথা বললেও তা কবিতা হয়ে যায়। তাকে সবাই খুব একটা ঘাটায় না, কারণ লোককে গালাগাল দিতেও সে কবিতার ভাষা ব্যবহার করে আর সেসব এতই দুর্বোধ্য যে সাধারণ লোকেরা বুঝতে পারে না উত্তরে কী বলা উচিত।
হাচিয়া ফাল জীবনে কোনদিন কবিতা পড়েনি। কবিতা কী বস্তু সে জানত না, কারণ পুলকিত পলায়নকে চিনত না। আসলে কেউ তো আর জন্মের পরপরই সবাইকে চেনে না, সারা জীবন ধরে লোকজনকে চিনতে থাকে। কাউকে হাড়ে হাড়ে চেনে, কাউকে মুখে মুখে। এইরকম কোনভাবেই তার সঙ্গে পুলকিত পলায়নের পরিচয় ঘটেনি। ঘটেছিল এক অদ্ভুত উপায়ে।
তার পাড়া থেকে একটু দূরেই আছে একটা কমিউনিটি হল। সেখানে বছরভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। হাচিয়া ফাল প্রায়ই তার সামনে দিয়ে যাতায়াত করলেও হলে ঢোকে না কখনো, কারণ সে জানে যেকোন অনুষ্ঠানই হোক ভিতরে যেতে হলে পকেটের টাকা খরচ করে টিকিট কাটতে হয়। টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে গিয়ে কী দেখবে বা যারা ভিতরে থাকে তারা তার শত্রু হয়ে যায় কিনা এই ভয়ে ইচ্ছে থাকলেও হলে ঢোকে নি সে কোনদিন। তবে ভিতরে কী থাকে বা কী সব কর্মকান্ড হয় সেসব জানার আগ্রহও থাকে তার। সেদিন সেই হলের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখে প্রচুর লোক যাচ্ছে ভিতরে এবং বাইরে ব্যানারে বড় বড় করে লেখা,
‘বাৎসরিক সাহিত্যের আসর। প্রবেশ অবাধ। আসুন, সবাই বিনা ব্যয়ে সাহিত্য উপভোগ করে যান।’
দেখে সে থমকে দাঁড়ালো। প্রবেশ যখন অবাধ এবং বিনা ব্যয়ে প্রবেশ করা যাবে তখন ভিতরে যাওয়া যেতেই পারে। দেখা যাক হলের ভিতর কী হয়, মারামারি না কুস্তি। সে ভিতরে ঢুকে গেল।
ভিতরে গিয়ে সে দেখে এলাহি ব্যাপার। প্রচুর সুবেশ-সুবেশা নারী-পুরুষের সম্মেলন। হলে থৈথৈ ভিড়। প্রচুর বসার আসন। লোকজন বসে। সবার সামনে এক বিশাল উঁচু মঞ্চ আর সেখানে দাঁড়িয়ে মাইকের সামনে এক সমীহ জাগানো চেহারার ব্যক্তি কিছু একটা পাঠ করছে। পরে সে জেনেছিল যে লোকটা স্বরচিত গল্প শোনাচ্ছিল। তন্ময় হয়ে শুনছিল সবাই। তিল ধারণের জায়গা না থাকায় বসতে না পেরে অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। সেও তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়েই রইল এবং শুনতে লাগলো গল্পপাঠ। শুনতে খুব একটা মন্দ লাগছিল না যেহেতু জীবনে প্রথম তার এমন অভিজ্ঞতা। সেই ব্যক্তির গল্পপাঠ হয়ে গেলে সভ্যভব্য চেহারার একজন মঞ্চে উঠে পাঠ করা গল্পটি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করল। তারপর অন্য আর একজন গল্পলেখক স্বরচিত গল্প পাঠ করতে লাগলো। বেশ উৎসাহ পেয়ে গেল হাচিয়া ফাল। ইতিমধ্যে একটু পিছন দিকে হলেও সে একটা বসার জায়গাও পেয়ে গিয়েছিল।
বেশ কয়েকটি গল্প পাঠের পর শুরু হল কবিতা পাঠ। কবিরা সবাই একে একে মঞ্চে উঠে কবিতা পড়তে লাগলো। ভাষাটা নিজের মাতৃভাষা হলেও কী যে কবিতাগুলির বিষয়বস্তু বা মানে কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছিল না। তবুও তার অজ্ঞাত কারণেই শুনতে ভালো লাগছিল। তারপর মঞ্চে কবিতা পাঠ করতে উঠলো পুলকিত পলায়ন।
কবিতা পাঠ শুরু হতেই দেখা যাচ্ছিল হলঘরের আসনের লোক ক্রমশ কমে আসছে। পুলকিত পলায়ন যখন কবিতা শোনাতে মঞ্চে উঠল তখন ত্রিশ ভাগ লোক চলে গেছে, বাকি সত্তর ভাগ লোকের জন্য সে কবিতা পাঠ শুরু করল। সে এক অতি দীর্ঘ কবিতা, পাঠ করতে সময় লাগলো ছত্রিশ মিনিট সতেরো সেকেন্ড। পনেরো মিনিটের মধ্যেই হলঘর ফাঁকা করে শ্রোতারা সব কেটে পড়লো। পঁচিশ মিনিট পর দেখা গেল, মঞ্চে অন্যান্য যেসব কবিরা বসেছিল নিজেদের কবিতা শোনাবার আশায় তারাও সব হতাশ হয়ে চলে গেছে। ত্রিশ মিনিট পর কর্মকর্তা এবং আয়োজকরাও উধাও, কেবল বসে রইলো একা হাচিয়া ফাল। সে আরো ছ’ মিনিট সতেরো সেকেন্ড মনোযোগ দিয়ে কবিতা পাঠ শুনে গেল। কবিতা পাঠ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, সীমানায় আর কেউ নেই, কেবল হলঘরে দুটি মানুষ ছাড়া। কবি পুলকিত পলায়ণ মঞ্চ থেকে নেমে একা বসে থাকা হাচিয়া ফালের কাছে এসে আপ্লুত গলায় প্রশংসা করে বলল,
‘আপনি তো দেখছি কবিতার বেশ ভক্ত। আপনার মত কবিতার এমন একনিষ্ঠ শ্রোতা পাওয়া বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি সত্যি মুগ্ধ। ধন্য আপনার কবিতাপ্রীতি। আপনি আসুন আমার বাড়ি। সারাদিন কবিতা শোনাবো আর আপনার যথাযোগ্য সেবা করে জীবন সার্থক করব।’
সত্যি কথাটা হলো এই যে হাচিয়া ফাল ওই দীর্ঘ কবিতার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না। চেনা চেনা শব্দ দিয়ে বানানো লাইনগুলি লাইন হওয়ার পরই দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছিল। সে বসেছিল তার কোন কাজ ছিল না বলে। তারপর লোকজন চলে যেতে থাকলে তার আরো আনন্দ হল। অত বড় অডিটোরিয়ামে একা বসে থাকার মজাই আলাদা। না বুঝলেও সুর করে পড়তে থাকা কবিতা শুনতে তার ভালই লাগছিল এবং আরামে ঘুমিয়ে যাচ্ছিল মাঝেমধ্যে।
এখন পুলকিত পলায়নের সাদর আমন্ত্রণ পেয়ে সে নিজেও পুলকিত হয়ে গেল। ঠিক করল, পরদিন সকালে উঠে সে চলে যাবে কবির বাড়ি। সারাদিন আর রান্নাবান্নার হাঙ্গামা নেই। লোকটার বাড়িতে গিয়ে ভালো-মন্দ খাবে আর মজাসে বসে বসে কবিতা শুনতে শুনতে ঘুমোবে।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। পরদিনই সকালে জলখাবার পর্যন্ত না খেয়ে সে চলে গেল পুলকিত পলায়নের বাড়ি। লোকটা তাকে সাদর আপ্যায়ন করে ভিতরে এনে বসালো, তার কবিতা শোনার এত আগ্রহের উচ্চ প্রশংসা করলো বারবার। তারপর তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল পাশের ঘরে। হাচিয়া ফাল বেশ আহ্লাদিত হয়ে ভাবল যে তার জন্য নিশ্চয় জলখাবার আনতে গেছে লোকটা। সকাল সকাল বাড়ি থেকে কিছু না খেয়ে এসে বুদ্ধির কাজ করেছে। কী কী থাকবে জলখাবারে তার একটা সম্ভাব্য তালিকাও করতে লাগলো মনে মনে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পুলকিত পলায়ন এসে হাজির। জলখাবারের বদলে তার দুহাতে ভর্তি মোটা মোটা খান দশেক জাবদা খাতা। দেখে হাচিয়া ফাল একটু হতাশ হল। মোটা খাতাগুলি টেবিলে রাখতে রাখতে কবি বলল,
‘আজ সারাদিন আপনাকে প্রাণভরে কবিতা শোনাবো। আপনি এমন গুণমুগ্ধ শ্রোতা! আপনার মত কবিতা প্রেমিককে আমার সমুদয় শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠ করে শোনাবো। দেখবেন কী সব অপূর্ব কবিতা আমার। শুনতে শুনতে আপনি বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন, জগৎসংসার ভুলে যাবেন। আপনার মনে হবে, জীবনে কবিতাই একমাত্র সার সত্য।’
বলেই পুলকিত পলায়ন একটা খাতা টেনে নিয়ে সেটা খুলে প্রথম কবিতাটা পড়ে শোনাতে লাগল। এগারো মিনিট লম্বা সেটা। তারপর দ্বিতীয় কবিতা। তার দৈর্ঘ্য উনিশ মিনিট। এভাবে একের পর এক দেড় ঘন্টা ধরে কবিতা পাঠ চলল। জলখাবার তো দূরের কথা, এক গ্লাস জলেরও পাত্তা নেই। দেড় ঘন্টা পর হাচিয়া ফাল প্রায় মরিয়া হয়ে বলল,
‘আজ্ঞে, সকাল সকাল চলে এসেছি, কিছু না খেয়েই।’
‘তাই বলুন, তাই বলুন। দাঁড়ান, আসছি।’
বলেই ব্যস্তসমস্ত ভাবে উঠে পাশের ঘরে ছুটে চলে গেল পুলকিত পলায়ন। হাচিয়া ফাল আশান্বিত হয়ে ভাবল, তাকে যে খাওয়াতে হবে সেটা লোকটা ভুলে গিয়েছিল। কবি মানুষ তো, আত্মভোলা চরিত্র, সারাদিন কবিতা নিয়েই মত্ত থাকে। তারও উচিত ছিল প্রথমে কথাটা মনে করিয়ে দেওয়া। এসব ভেবে সে যখন পুলকিত হতে যাচ্ছে তখন সেই কবি মানুষের আগমন ঘটল। এবার তার হাতে একটি মাত্র খাতা, যার মেদবহুল দেহ। মহাভারতের চেয়েও মোটা সেই বিপুল আকার খাতা নিয়ে বসতে বসতে সে বলল,
‘এই যে কবিতা আছে এখানে, এটি রচনা করেছি আমি টানা বিয়াল্লিশ দিন ধরে। একটি মাত্র কবিতা রচনায় বিয়াল্লিশ দিন লেগেছে। ভাবা যায়? রোজ লিখতাম আঠেরো-উনিশ ঘন্টা, কোন কোন দিন টানা চব্বিশ ঘন্টা। সে এক অবিস্মরণীয় কাহিনী আমার জীবনে। এই মহাকবিতা রচনার সময় আমি ঘুম-খিদে-তৃষ্ণা সব ভুলে যেতাম। আপনাকে শোনাচ্ছি। শুনে দেখুন, কী অসম্ভব প্রতিভার সাক্ষর আছে এই মহাকাব্যে। শুনতে শুনতে আপনিও খিদে-তৃষ্ণা ভুলে যাবেন।’
এরপর হাচিয়া ফালকে আপত্তি বা প্রতিবাদ জানাবার কোন সুযোগ না দিয়ে কবিতা পাঠ শুরু হয়ে গেল। শুরু হলো তো শুরুই হলো, চলতে লাগলো বিরামহীন পাঠ। হাচিয়া ফাল উসখুস করতে লাগলো, কোন লাভ হচ্ছিল না। বিরক্তিসূচক নানা বাক্য উচ্চারণ করাও ফল দিচ্ছিল না, বরং পুলকিত পলায়ন সেসব প্রশংসাসূচক মন্তব্য হিসেবে ভাবতে লাগল। এভাবে কেটে গেল আরো ঘন্টা দুয়েক সময়। হাচিয়া ফাল ততক্ষণে খিদেতেষ্টা আর বিরক্তিতে অস্থির। কবিতা পাঠ চলছে ভ্রুক্ষেপহীন।
এ বাড়িতে ঢুকে সে পুলকিত হয়েছিল কবি পুলকিত পলায়নের কাছে আপ্যায়ন পেয়ে। এবার হাচিয়া ফাল পলায়নের কথা ভাবতে লাগল। সে দেখল, সদর দরজা খোলাই আছে। সে উঠে দাঁড়াল, গুটিগুটি কয়েক পা এগোতে এগোতে দেখল যে কবিতা পাঠে মগ্ন কবির তা নজরেই এলো না। তাই দেখে সে সবেগে ছুটে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে।
কবি পুলকিত পলায়নের বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচল হাচিয়া ফাল। এমন লোক যে কোন্ শ্রেণীভুক্ত হতে পারে সে কিছুতেই ঠিক করতে পারছিল না। পরে বুঝল, এমন লোক নিঃসন্দেহে শত্রু। যে কবিতা শুনিয়ে খিদেতেষ্টা ভুলিয়ে দিতে চায় সে শত্রু নয়তো কী? দিনের পর দিন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে টানা কবিতা শুনে কোন মানুষ বাঁচতে পারে? মেরে ফেলার এ এক অভিনব ফন্দি। লোকটা একশ শতাংশ শত্রু।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
