তাপস সরকার

লেখক পরিচিতি 

( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর  বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। ) 

অধ্যায়: চব্বিশ  

আমার মধ্যে কী যে অনুভব করছিলাম তা নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল না। কিছু একটা থাকলে খুব বেশি পরিমাণে আছে, না থাকলে খুব বেশি পরিমাণে নেই। আমি কী বা কে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গুলিয়ে গিয়েছিল। আমার অনুশোচনা, নাকি হাহাকার, নাকি উৎসব, নাকি আনন্দ কী করা উচিত বুঝতেই পারছিলাম না। হাঁটব না উড়ব, নাকি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকব ঠিক করা যাচ্ছিল না। একটা অস্থিরতা বা অস্বাভাবিকতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল আর আমি তারই তাড়নায় রিক্তর কাছে গিয়ে বললাম, 

‘আমার কী হবে রে? আমি একটা ডাক্তারকে গিলে খেয়ে ফেলেছি।’

রিক্ত অবাক হল না বিরক্ত হল বোঝা গেল না চট করে, তবে কথা শুনে আমার দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল খানিকটা সময়। তারপর বেশ শান্ত গলায় ধীরেসুস্থে জানতে চাইল,

‘ডাক্তারকে গিলে খেয়ে ফেলেছিস মানে? পেলি কোথায়?’

খুবই সংক্ষেপে তাকে কী ঘটেছে জানালাম, এই উদ্দেশ্যে যে যত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা তাকে বোঝানো যায় ততই মঙ্গল। একটু শুনেই সে সমস্তটা বুঝে গেল আর বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

‘গিলে খেয়ে ফেলেছিস তো উগরে দে। নোলার ধর্ম পালন কর্।’

আমি হাহাকার করে বললাম,

‘উগরাতে পারছি না তো। ডাক্তারকে তো নোলা হয়ে গিলে খাইনি, খেয়েছি একটা অজগর সাপ হয়ে।’

‘সাপ আর নোলাতে কী প্রভেদ ? অজগর সাপও সময়-সময় গেলা বস্তু উগরে দিতে পারে। তুই সেটাই ভাব্ । ডাক্তারটা বেঁচে যাবে আর তুইও রেহাই পাবি।’

আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম উগরে দেওয়ার। গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করারও চেষ্টা করলাম। কিছুতেই কিছু হল না। ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে হতাশ গলায় বললাম, 

‘পারছি না উগরে দিতে। বোধহয় হজম করে ফেলেছি।’

রিক্ত বিশেষ ব্যস্ততা না দেখিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বলল,

‘ছেড়ে দে। পৃথিবীতে অনেক ডাক্তার আছে। একটাকে যদি অজগর সাপ খেয়ে ফেলে থাকে তো কী করবি? তুই খেয়েছিস ভাববি না। ভাববি, সাপে গিলে খেয়েছে।’

‘কিন্তু ডাক্তার আমার অসুখ সারিয়ে দেবে বলেছিল। সে সত্যি আমার উপকার করতে চেয়েছিল। উপকারীকে বাঘে খায় শুনেছি, সাপে তো খায় না। আমি তাকে উপকার করার সুযোগ দিলাম না, নিজেও উপকার পেলাম না।’

অবুঝের মত ঘ্যানঘ্যান করতে লাগলাম। রিক্ত ধমক দিয়ে বলল, 

‘তো সেই ডাক্তার উপকারটা করতে দেরি করল কেন? তাড়াতাড়ি করে ফেললেই তো এমন অঘটন ঘটত না।’

‘আসলে বেচারা বুঝতে পারেনি আমার অসুখটা কী মারাত্মক হয়ে গেছে।’

‘বুঝতে না পারল তো কিসের ডাক্তার? টুকে পাস করেছে? ডাক্তার হিসেবে অসুখটা শনাক্ত করে যথাসময়ে তার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। সে সেটা করতে পারেনি। যেমন কর্ম তেমন ফল। তুই তো তার ক্ষতি করতে চাস নি। একটা অজগর সাপ করেছে। তোর অত হা-হুতাশ না করলেও চলবে।’

তবুও অন্তরে শান্তি বা সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছিল যে একটা গোটা ডাক্তারকে গিলে খেয়ে বসে আছি। সাপ হয়ে খাই বা অন্য কিছু হয়ে, খেয়েছি তো? একটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আমারই কারণে শেষ হয়ে গেছে। যদি ব্যাপারটা মাথায় না থাকত, যদি সর্পমূর্তি ধারণ করে আমি কে ভুলে যেতাম তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু সব যে আমার মনে টাটকা জেগে আছে। সাপ হই আর যা হই, অঘটনটা ঘটাবার সময় কেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না? সেই কথাটাই বলে যেতে লাগলাম। রিক্ত তখন বলল আমাকে, 

‘ডাক্তারকে সাপ হয়ে গিলে খেয়েছিস, এটা নিয়েই তুই পড়ে আছিস। কিন্তু বিপদের বড় একটা দিক দেখতেই পাচ্ছিস না।’

‘সেটা আবার কী?’

হকচকিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলাম। রিক্ত ব্যাখ্যা করতে লাগল, 

‘তুই বাড়িতে গিয়ে হনুমানাইটিস অসুখে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছিস। সেটা একটা সংকট হলেও খানিকটা স্বস্তি ছিল তাতে। প্রথমত, হনুমান ততটা ভয়ঙ্কর প্রাণী নয় এবং দ্বিতীয়ত, বাড়ির বাইরে বেরোলে তুই স্বাভাবিক থেকে যেতিস। কিন্তু এখন বিপদটা ভেবে দ্যাখ্। বাড়ির বাইরে গিয়েও তুই আর স্বাধীন-স্বাভাবিক থাকতে পারছিস না। অজগর সাপের মতো ভয়ংকর প্রাণীর আন্ডারে চলে যাচ্ছিস। তার চেয়েও বড় কথা, অজগর সাপ হয়ে লোক ধরে সজ্ঞানে গিলে খাচ্ছিস। বাড়িতে হনুমান হলে তুই কী হয়েছিস বুঝতে পারিস না। কিন্তু অজগর সাপ হয়ে তুই কী বুঝতে পেরেছিস এবং কী করতে যাচ্ছিস তাও তুই বুঝতে পেরেছিলিস। বিপদটা বুঝে দ্যাখ্। হিংস্র অজগর সাপ হয়ে বাড়ির বাইরে তুই সজ্ঞানে অন্যায় কাজ করতে পারছিস।’

আমি একেবারে থ’ মেরে গেলাম। তারপর আর্তনাদ করে উঠলাম,

‘কী বিপদ! কী সর্বনাশ! আমার কী হবে রে?’

রিক্ত আমাকে বোঝাতে লাগল, 

‘দাঁড়া, হইচই করিস না। মাথা ঠান্ডা রাখ। বিপদের চরিত্রটা বোঝার চেষ্টা কর্। মানুষ যখন প্রথম প্রথম অন্য প্রাণী হতে শুরু করে তখন সে নিজের পরিবর্তনটা বুঝতে পারে না, যেমন হনুমানের আন্ডারে গিয়ে তোর কিছু মনে থাকে না। তারপর অন্য প্রাণী হওয়াটা তার স্বভাবে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে আর নিজেকে ভুলে যেতে পারে না। অন্য জীব হয়েও নিজের পরিচয়টা সে বুঝতে পারে। সে সাপ, বাঘ, শেয়াল, হায়না হয়ে তাদের হিংস্রতা অনুযায়ী আচরণ করে সজ্ঞানে। খুন-জখম করে, অন্যায় করে এবং সব করে সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়। যেমন অজগর সাপ হয়ে তুই করেছিস। এভাবেই মানুষের সমাজে হিংস্র, অত্যাচারী মানুষদের কাজকর্ম ঘটে চলেছে। এই যে মানুষের স্বভাবগত এই পরিবর্তন এটা এখন তোর মধ্যেও দেখা দিয়েছে। তুই এখন পৃথিবীর সমস্ত বিপজ্জনক মানুষদের দলে ভিড়ে গেছিস। এটাই বড় চিন্তার কথা রে।’

আমার বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনক্রমে বললাম, 

‘আমার বাঁচার রাস্তাটা বলে দে।’

রিক্ত মেজাজ না হারিয়ে শান্তভাবে বলল,

‘তুই তোর কথাই ভেবে মরছিস, জগতের কথা ভাব্। বিপদটা তোর নয়, জগতের। সবাই যদি এভাবে হিংস্র জীব হয়ে সজ্ঞানে অন্যায় আর অনৈতিক কর্মকান্ড করতে থাকে তাহলে মানুষের সমাজটার কী দশা হবে? ঠিক মানুষ তুই ইহজন্মে আর খুঁজে পাবি তখন জগতে?’

বিপদটার এত যে দিক থাকতে পারে তা আমার মাথায় আসেনি। নিজের বিপদ আর অসুখের কথা ভেবেই আমি কাতর ছিলাম। এখনও পর্যন্ত তেমনই থেকে যাচ্ছি, কেবল নিজের অসুখের কথাই ভাবছি। কিন্তু আমার অসুখ যে আমার নয় সে কথা কি একবারও ভেবে দেখছি? আমার অসুখ কি এই সমাজের দেহে কোন প্রভাব ফেলে না, কারণ আমি আছি সমাজটাতেই? রিক্ত সেই উৎকট বিষয়টাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরল আমার সামনে। এবার বিপদটাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে পেলাম। কেবল আমি একা বিপদে পড়িনি, বিপদে পড়েছি সবাইকে নিয়ে। আমার অসুখ কেবল আমার নয়, সবাই এই অসুখের শিকার। 

‘এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী বল্?’

প্রশ্ন জানালাম সরল গলায়। এবার আর ততটা অস্থিরতা নেই আমার মধ্যে। রিক্ত ধীরেসুস্থে উত্তর দিল, 

‘জানলে তো বলব। আমি নিজে কি জানি মুক্তির উপায়? তবে বুঝতে পারছি, ঠিক মানুষ খুঁজে বার করতে হবে।’ 

‘খুঁজে খুঁজে তো হয়রান হয়ে গেলাম। পাচ্ছি কোথায়?’

কিছুটা অসহিষ্ণু শোনালো নিজের গলা নিজের কানেই। রিক্ত তাতে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 

‘পেতেই হবে। ঠিক মানুষ খুঁজে যাচ্ছে সবাই যুগের পর যুগ। বংশ পরম্পরায়। সেই সন্ধান অনাদি অতীত থেকে চলে আসছে। নানা পরিচয়ে, নানা অছিলায় খুঁজেই চলেছে সবাই। তাদের আমরা নানা চেহারায় দেখছি, তাদের নিয়ে আবার একেক মতাবলম্বী গড়ে উঠেছে, বই-পুঁথি লেখা হয়েছে। সেইসব ঠিক মানুষ খোঁজা মানুষদের ভক্ত বা অনুগামী তৈরি হয়েছে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি। সব কি এমনি এমনি? কিসের টানে মানুষ এমন মত্ত হয়ে যেতে পারে? আসলে নিজেকে দেখে কেউ সন্তুষ্ট হতে পারে না। মানুষের আর কিছু না থাক বিবেক বলে একটা বস্তু আছে। তার মুখোমুখি হতে হয় সবাইকে, কোন না কোন সময়। তার দংশনে কাতর হয়ে মানুষ ঠিক মানুষের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। যুগ যুগ ধরে কেন সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে মানুষ? মরীচিকার পিছনে? হতেই পারে না। তুই তো দু’দিন ধরে খুঁজতে শুরু করেছিস, তাও হোলটাইমার নোস, পার্ট-টাইমার হয়ে এক-আধটু খুঁজছিস ঠিক মানুষ। এত সহজে পেয়ে যাবি?’

আমি থম মেরে রইলাম। মর্মে মর্মে বুঝতে পারছিলাম যে কথাগুলি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ক্রমশ আমার চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে যেতে লাগল এবং আমি সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পেলাম। প্রশ্ন করলাম, 

‘তার মানে তুই বলতে চাইছিস যে অনাদিকাল থেকে পৃথিবীতে মানব সভ্যতায় যারা মহাপুরুষ হিসেবে অমর হয়ে আছেন তাঁরা সারা জীবন ধরে কেবল ঠিক মানুষ পাওয়ার সন্ধান চালিয়ে গেছেন?’

রিক্ত আত্মপ্রত্যয়ের গলায় জোর দিয়ে জানালো, 

‘নিঃসন্দেহে তাই। ঠিক মানুষের সন্ধানটাই জগতে মানুষের প্রধান কাজ।’

আমার তবুও সন্দেহ যায় না। দ্বিধাদ্বন্দ্ব জড়ানো ভঙ্গিতে জানতে চাইলাম,

‘ঈশ্বরের সন্ধানে জীবন কাটিয়ে গেছেন যেসব মহামানব সেটা তাহলে কী? সেটাও কি আসলে ঠিক মানুষের সন্ধান?’

‘একদম।’ রিক্ত বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে বলে গেল, ‘ঈশ্বর আসলে একটা ঢাকনা। সাধারণ লোকেরা যাতে সহজে বুঝতে পারে, কারণ ঈশ্বরের ধারণা ও বিশ্বাস মানবসভ্যতা ও মানুষের প্রায় জন্মগত অভ্যেস। ঈশ্বর কী বা কেন তা সবাই খুব সহজে বোঝে। সেই ঢাকনা বা আচ্ছাদনের আড়ালে যে রয়েছে ঠিক মানুষ সেটা মহাপুরুষরাই কেবল জানতেন, প্রথমেই এই গূঢ় তথ্যটা সাধারণ লোককে জানাতে চেষ্টা করতেন না। সাধারণ লোকরা সেসব বুঝতও না যতক্ষণ না তারা উপযুক্ত শিক্ষিত হয়। সাধারণ লোকেরা বোঝে কেবল ধর্ম আর ঈশ্বর। মহাপুরুষরা তাকেই আশ্রয় করে সাধারণ লোকের কাছে সহজে পৌঁছে যেতেন। ওটাই ছিল সহজ পন্থা। জটিল দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে সাংসারিক সাধারণ মানুষ একবিন্দু মাথা ঘামাতে প্রস্তুত নয়।’

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, আনন্দের না দুঃখের নিজেই জানিনা। নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, 

‘বুঝলাম। তবে কতটা কী বুঝলাম এখনও স্পষ্ট নয়। দুনিয়ার তাবৎ মহান পুরুষেরা সারাজীবন কেবল ঠিক মানুষ পাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন ঈশ্বরকে পাওয়ার প্রবল সাধনার আড়ালে ব্যাপারটা মানতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে। এযাবৎ দেখে এসেছি যেরকম, তুই বলছিস অন্যরকম। ব্যাপারটা মেলাতে গিয়ে মনে হচ্ছে পুরোপুরি যেন মিলতে চাইছে না।’

আমার কথা শুনে রিক্ত কিছুমাত্র বিরক্ত না হয়ে প্রত্যয়ী গলায় জানালো,

‘মিলবে না, চট করে মেলাতে পারবি না। তার জন্য বিশেষ শিক্ষা চাই। তোর চোখ যে সাধারণ মানুষের চোখ। তার জন্যই মহাপুরুষরা নিজস্ব ধর্মমত প্রচলন করে গেছেন, যার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা যায়, বংশ পরম্পরায়, যাতে সাধারণ মানুষের চোখ খুলে যায়, যাকে বলা যেতে পারে দিব্যদৃষ্টি, যাতে সাধারণ মানুষরা বুঝতে পারে ঈশ্বরের সন্ধান আসলে কী।’

আমার তবুও দ্বিধা যায় না। সন্দেহ গলায় রেখে জানতে চাইলাম, 

‘কিন্তু কোন মহাপুরুষের কথায় বা লেখায় কেন ব্যাপারটাকে আজ অব্দি দেখতে পাইনি? অন্তত একজনও তো উল্লেখ করতে পারতেন যে তাঁদের ঈশ্বরের সন্ধান আসলে ঠিক মানুষের সন্ধান?’

‘আচ্ছা বোকা তো! কোন মহাপুরুষ কি আড়েঠারে ব্যাপারটা বোঝাতে বা উল্লেখ করতে কিছু বাকি রেখেছেন?’ রিক্ত প্রায় ধমক দেওয়ার সুরে বলে চলল, ‘কাঁর কথা বলব? শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কথাই ভাব্। উনি কী বলেছেন? উনি বলেছেন, যত্র জীব তত্র শিব। এই মতাদর্শে শিষ্যদের তিনি শিখিয়ে গেছেন যে কেবল জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীব সেবা কর। তাঁর প্রধান ও উপযুক্ত শিষ্য বিবেকানন্দের কথা চিন্তা কর্। তাঁকে তাঁর গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ তো সব হাতে ধরে শিক্ষা দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ কি কোনদিন ঈশ্বরকে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন? বরং উনি কী বলে গেছেন? বলেছেন, বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কথা খুঁজিছ ঈশ্বর, জিবে প্রেম করে যেইজন,সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। তার মানেটা বুঝতে পারছিস? ঈশ্বরের আরাধনা একটা আচ্ছাদন, সেটা মোটেই মূল উদ্দেশ্য নয়। আসল উদ্দেশ্য মানুষ, সব সাধনা মানুষের জন্যই কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ ঠিক মানুষের সন্ধান। যত পারো ঠিক মানুষ খুঁজে বার করো এবং তাদের নিয়ে তোমার দল ভারী কর যাতে সবাই মিলে সভ্যতার বিপদ যা বা যারা তাদের দমন করা যায় সভ্যতাকে বাঁচাতে ও টিকিয়ে রাখতে। নিজের ধর্মমত এবং শিষ্যমন্ডলী গঠন করা সেই উদ্দেশ্যেই। যেহেতু উনি নিজেই ঠিক মানুষ ছিলেন তাই অন্য সব ঠিক মানুষদের সমাবেশই ছিল তাঁর কাম্য, আর তাই নিজের শিষ্যসম্প্রদায় তৈরি করা। সমস্ত মহাপুরুষদের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা সত্যি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মত ঠিক মানুষদের সঙ্গ পছন্দ করতেন বলেই শিষ্য সমাবেশ গঠন করে গেছেন। বাউল-ফকিরদের কথা মনে কর্, তাঁরা তো তাঁদের রচনায় বুঝিয়ে গেছেন স্পষ্টভাবে যে মানুষ, অর্থাৎ ঠিক মানুষ খোঁজাই একমাত্র লক্ষ্য জীবনের। স্বয়ং যিশুখ্রিস্টের কথা ধর্। তাঁর ক্ষুদ্র পরিসরের জীবনে কতবার ঈশ্বরকে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন? তাঁর সমস্ত কাজকর্ম তো মানুষকে নিয়েই ছিল, মানুষের কাছেই তিনি যেতে চাইতেন, মানুষরাও দলে দলে তাঁর কাছে আসত। ঈশ্বরকে কোথায় খুঁজেছেন তিনি? কেবল সারাজীবন ধরে মানুষের কথাই বলে গেছেন। তাঁর গোটা জীবনের কার্যকলাপ আর কথাবার্তা কী বলেছেন সেগুলি ভালমত যাচাই করে দেখলেই দেখতে পাবি, যিশুখ্রিস্ট ঠিক মানুষের সন্ধানেই ব্যস্ত ছিলেন। শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধদেব সবার কথাই ভাবলে দেখতে পাবি যে ঈশ্বরের কথা তাঁরা যা বলেছিলেন সব একটা আবরণ বা ভনিতামাত্র। দলে দলে তাঁদের কাছে আসা মানুষদের মধ্যে থেকে মনের মত ঠিক মানুষ খুঁজে নেওয়া বা বেছে নেওয়াই ছিল প্রত্যেকের মূল উদ্দেশ্য।’

দীর্ঘসময় কথা বলে রিক্ত থামল। আমার মাথার মধ্যে চক্কর লেগে গিয়েছিল, কারণ আজন্ম প্রচলিত ধারণার গোড়াতে নাড়া পড়েছিল। সর্প হয়ে ডাক্তারকে গিলে খেয়ে হজম করে ফেলেছিলাম হয়তো, সে অপকর্মটি মোটেই কিছু শক্ত মনে হয়নি। কিন্তু এইসব অপ্রত্যাশিত তত্ত্ব হজম করতে যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছিল। আবার ওর কথাগুলি ফুৎকারে উড়িয়ে দিতেও যে পারছিলাম এমন নয়। সমস্যাটা এখানেই, ওর তত্ত্ব বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আবার না বিশ্বাস করারও যুক্তি ছিল না। একটা বীভৎস দোটানা। ওর কথা বিশ্বাস করব কি করব না বেশ কিছুক্ষণ ভেবে ঠিক করলাম, যা থাক কপালে বিশ্বাস করেই ফেলি। তাতে শান্তি খুঁজে পাওয়া যাবে এবং পরিশ্রমও হবে না, কারণ অবিশ্বাস করলে তার সপক্ষে যুক্তি সাজানো বেশ চিন্তা-ভাবনার কাজ। এত অশান্তি সাধ করে কেন ঘাড়ে নিতে যাব? তার চেয়ে বিশ্বাস করে নেওয়া অনেক সহজ, বুদ্ধিমানের কাজ। বিতর্কে না জড়ানোই উচিত, নিজের যা অবস্থা বা দুরবস্থা হয়ে আছে! তাছাড়া ওর কথাগুলি বিশ্বাস করে কেবল যে শান্তি খুঁজে পেলাম তাই নয়, পছন্দসই একটা পথের অভাবনীয় দিশাও পেয়ে গেলাম। বললাম,

‘তাহলে তোর কথা অনুযায়ী, পৃথিবীতে ঠিক মানুষ ছিলেন অনেকেই?’

‘ছিলেন না, এখনও আছেন। কেবল তাদের দেখতে পাচ্ছি না। তারও কারণ আছে। কেউ যে মহাপুরুষ বহুক্ষেত্রেই তা সমকালে বোঝা যায় না, বুঝতে সময় লাগে। আজ যে মহাপুরুষ সুপ্ত হয়ে আছেন, কালক্রমে তিনি একদিন আলোকিত হবেন। পৃথিবী তখন তাঁকে সর্বাংশে চিনতে পারবে। কেউ মহাপুরুষ হতে গেলে তাঁকে কালোত্তীর্ণ হতে হয়। তাছাড়া অন্য একটা ব্যাপারও সত্যি। অনেক বা বলতে পারিস সমস্ত মহাপুরুষই কিছুটা বা সমস্তটাই আরোপিত মহাপুরুষ, পরবর্তীকালে মানুষ যাঁদের সাজায় নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী, কারণ সবাই চায় তাদের সামনে এমন কেউ থাকুক আদর্শ চরিত্র হিসেবে যাদের দেখে শান্তি ও মানসিক শক্তি পাওয়া যাবে। বেঁচে থাকা সহজ হবে। যাই হোক না কেন, তুই নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস একথা ভেবে যে তোর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেসব মানুষ তাদের মধ্যে অনেকেই ঠিক মানুষ। তুই খুঁজে পাচ্ছিস না বলে তারা নেই, এমনটা হতেই পারে না।’ 

রিক্ত জোর গলায় জানালো। আমি সহর্ষে নিজেকে ব্যক্ত করলাম, 

‘দ্যাখ্, এখন কাঁরা ঠিক মানুষ আছেন বা কোথায় আছেন সে পরের কথা। আমি যাই হোক না কেন আশার আলো দেখতে পেলাম। এতদিন ধরে আমি কেবল হতাশই হচ্ছিলাম তোর সঙ্গে ভিড়ে মানুষ দেখতে গিয়ে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে ঠিক মানুষ বলে কেউ কোনদিন ছিল না, নেই এবং থাকবেও না। তুই বলছিলি, ঠিক মানুষ অবশ্যই আছে। আমি বুঝতাম না তাঁরা কে। এখন তুই বলাতে বুঝে গেলাম কাঁরা ঠিক মানুষ, এবং আমার কাছে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল যে পৃথিবীতে ঠিক মানুষ থাকতে পারে। আমার সমস্ত সন্দেহ দূর হয়ে গেল। পৃথিবীতে ঠিক মানুষ থাকতে পারে এবং তাঁরা যে মহামানবরা এই ব্যাপারটা বুঝতে পারাটাই বিশাল ব্যাপার, বলতে পারিস, আমার জন্য বিশেষ প্রেরণা। এখন কেউ ঠিক মানুষ আছে কি নেই সেটা আর দুঃখের বা হতাশার কারণ নয়, ঠিক মানুষরা সত্যিই ছিলেন এটা বুঝতে পারাই যথেষ্ট আমার কাছে। অকূল সমুদ্রে কূলের সন্ধান পাওয়া। এবার আর আমার কোন দুশ্চিন্তা রইল না, কারণ আমি জানলাম যে পৃথিবীতে ঠিক মানুষ সত্যিই আছেন। তাঁদের চিনলাম। ছিলেন এখন নেই, সেটাও ভাবনার নয়, কারণ ঠিক মানুষরা অমর। এককালে ছিলেন যাঁরা তাঁরা এখনও আছেন। এতটুকু বুঝেই আমার বুকে সাহস বেড়ে গেল।’

কথাগুলি বলতে বলতে রীতিমত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার চোখের সামনে এত এত ঠিক মানুষের দৃষ্টান্ত আর আমি কিনা ঠিক মানুষ নেই ভেবে হাহাকার কছিলাম, ঠিক মানুষ খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম? আমার আর মনেই রইল না, কী ভীষণ-ভীষণ অসুখে আমি আক্রান্ত। ঠিক মানুষদের চিনতে পেরেছি এবং তাঁরা পৃথিবীতে আছেন এই সত্যিটা আমার জন্য অফুরন্ত ভরসা নিয়ে এল। যদি সত্যিই ঠিক মানুষ পৃথিবীতে থাকেন তাহলে আর কিসের ভয়? আমার এগিয়ে যাওয়ার পথে যতই বাধাবিঘ্ন আসুক না কেন আমি সব কাটিয়ে যেতে পারব। সহস্র প্রতিকূলতাও আমাকে আটকাতে সক্ষম হবে না। আমার মানসিক শক্তি প্রবল হয়ে উঠবে যার সামনে পৃথিবীর সমস্ত অশুভ শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। 

রিক্ত শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, 

‘তাহলে তুই বিশ্বাস করলি তো পৃথিবীতে ঠিক মানুষ সত্যিই থাকতে পারে?’

‘একশ’বার। আর আমার কোন সন্দেহ নেই।’

আমার গলায় এবার আত্মপ্রত্যয়। রিক্ত বলতে লাগল, 

‘দ্যাখ্, মানুষ দেখতে শিখে তুই এখনও পর্যন্ত দেখে আসছিস যে কোন মানুষই ঠিক মানুষ নয়, প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ঝামেলা আছে যা তাকে সার্বিকভাবে মানুষ হওয়া থেকে বিরত করছে। আমি বলেছি, ঠিক মানুষ সত্যিই আছে, খুঁজতে খুঁজতে তাকে একদিন পাবই পাব। তাকে না পেয়ে পেয়ে তোর সন্দেহ জেগেছিল, সত্যিই সে আছে কিনা। আমিও আসলে বুঝতে পারিনি যে কারা ঠিক মানুষ হতে পারে এই ধারণা তোর ছিল না। তাহলে আগেই তোকে বলে দিলে তোর এই দশা হত না। যাই হোক, এখন যদি বুঝতেই পারলি তো পূর্ণোদ্যমে বর্তমানে কারা ঠিক মানুষ খুঁজে বার কর্। তাকে পেতে হবে এই কারণে যে তাকে পেলেই তোর সব অসুখ-বিসুখ সেরে যাবে। শুধু কি তোর ? সেরে যাবে মানবসভ্যতার সমস্ত অসুখ-বিসুখও। ঠিক মানুষরা সাবানের সঙ্গে তুলনীয়। দিনের পর দিন সামাজিক দূষণ আর নোংরামি তোমার চরিত্র অপরিষ্কার করে দেয়। ঠিক মানুষ সাবানের সান্নিধ্য বা সংস্পর্শ এমনকি, স্মরণেও তোমার সেই চারিত্রিক মালিন্য ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। যে তুমি সামাজিক আবর্জনায় দিনরাত আকণ্ঠ ডুবে থেকে অমানুষ হয়ে যাচ্ছিলে, ঠিক মানুষ সাবান সেই অমানুষ হতে থাকা তোমার চরিত্র ঘষামাজা ও শোধন করে আবার তোমাকে নিষ্কলুষ চরিত্রসম্পন্ন করে দিতে পারবে। এই পবিত্র ও প্রয়োজনীয় কাজ ঠিক মানুষ ছাড়া আর কেউ করতে পারে না। তাকে তাই খুঁজে পাওয়া একান্ত দরকার। খুঁজে পেতেই হবে। কেবল নিজের জন্যই নয়, সমাজকে রক্ষা করার স্বার্থে।’

রিক্তর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে আমি বললাম, 

‘শোন্, সেই বর্তমান ঠিক মানুষকে খুঁজে না পেলেও কোন পরোয়া নেই। ঠিক মানুষরা ছিলেন, এটা বুঝতে পারাই যথেষ্ট।’

রিক্ত আমার পিঠ চাপড়ে বলল, 

‘বাপ্ রে বাপ্, তোর তো দেখছি মরা গাঙে বান ডেকেছে ! দ্যাখ্ তাহলে, ঠিক মানুষের কী মাহাত্ম্য। তাঁকে চিনতে পেরেই তোর মত নানাবিধ অসুখে-বিসুখে কাতর ব্যক্তিও চাঙ্গা হয়ে উঠেছিস। আর যদি সত্যিই তেমন ঠিক মানুষের সংস্পর্শে যেতে পারিস তো দেখবি কী কাণ্ড ঘটে যাবে। আসলে ঠিক মানুষের সামনে এইসব বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখ তো দূরের কথা, যাবতীয় দৈত্যদানব, রাক্ষসখোক্কসরা সব নিস্তেজ হয়ে যায়। অন্যায়-অত্যাচার মুখ থুবড়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব জেগে ওঠে, উৎসবের সূচনা ঘটে সভ্যতার বুক জুড়ে। যত হাহাকার আর হতাশা মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে যায়।’

‘তাই আমাদের বর্তমানে কাঁরা ঠিক মানুষ কোথায় লুকিয়ে আছেন তাঁদের যেকোন মূল্যে খুঁজে বার করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

রিক্তর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে গেলাম। শুনে রিক্ত বলল, 

‘ঠিক। শুধু আমরা দু’জন কেন, অসুখে-বিপদে কাতর বর্তমান পৃথিবীর সবাই মিলে আমরা সেই ঠিক মানুষকে খুঁজে তাঁর আসনে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করব। এটাই সভ্যতাকে বাঁচিয়ে নিজেদেরকে বাঁচাবার একমাত্র উপায়।’ 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *