কুন্তল দাশগুপ্ত

দ্বিতীয় পর্ব

৩. লুকোচুরি
– ও মা… কে বলে মলিন! নতমুখী কাজরী মাথা নামিয়ে রেখেই চোখ তুলল। প্রৌঢ়া। মাথায় নুন-মরিচ কদম-ছাঁট। পাকা চাঁপা কলার মত সোনালী-ফর্সা। মুখ তুলল কাজরী। ততক্ষণে প্রৌঢ়ার কথায় হাসির ঢেউ উঠেছে ঘরে। চোখাচোখি হতেই ‘মম’-এর ‘সালভাদর’-এ পড়া কেয়ারফ্রি-আইজ-এর খোঁজ এতদিনে পেয়ে গেল সে। মনে মনে বলল সুন্দরী।

ও ঠাগমা… চিকন স্বর, সুরেলা… গান শেখে? যদি শেখে তবে… মনের আন্দোলন চাপা পড়ে যায়… ডে লাইটের আলোয় তোমার চোকে ধাঁদা নেগেছে কাল দিনের আলোয় দেকো বুজতে পারবে… দপ করে নিভে গেল মগজে জ্বলে ওঠা ক্ষীণ শিখাটি… এ কী অমার্জিত ভাষা-ভঙ্গি! আবাল্য শহর-বাসে অভ্যস্ত শ্রবণ অযুত ঝিঁঝিঁ ডাকে রূদ্ধ হয়ে পড়ল কাজরীর, জলে ভরে এল চোখ

 কতবার বলেছি এগুলো পেট্রোম্যাক্স তাও সেই ডে-লাইট বললি? ভিড় থেকে ব্যারিটোন। কেমন শিহর জাগল। বুজে এল চোখ। মরা ক্যানভাসে ১৯৫০-এর আমহার্স্ট স্ট্রিট। বাদুর ঝোলা অন্ধকার ঘর ক্লান্ত ব্যারিটোন প্রত্যাশী। দাদা। অকূলের কূল। শরীরটা কেমন অস্থির লাগে কাজরীর। 

 তোরা থাম বাপু। এই মেয়ে জোরে জোরে হাওয়া কর। ভির পাতলা কর তো একটু… নতুন বৌ কেমন ঘামছে দেখেছিস। তোদের রঙ্গ পরে করিস বাপু। প্রৌঢ়ার অভিজ্ঞ অনুভূতির পায়ে অদৃশ্য প্রণাম জানিয়ে চোখে এক পৃথিবী কৃতজ্ঞতা ভরে মুখ তুলে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল কাজরী। হ্যাঁ চাইলই— বাৎসল্য। কেয়ার ফ্রি আই যুগলে ঝিকমিক করছে হাসি। পাশে রাখা রেকাবি থেকে ধান-দূর্বা নিয়ে আশির্বাদ করে কাজরির হাতে ছোট্ট একটা বাক্স দিয়ে বললেন— নাক বিঁধিয়ে নিও বৌমা। কাজরী জবাব লুকোলো শরীরী মুদ্রায়। সে বুঝে গেছে এমন লুকোচুরি খেলে যেতে হবে তাকে পরবর্তী কত বছর কে জানে।

প্রথার নির্মন গণ-মান্যতা থেকে রেহাই পেতে পেতে সাত-সন্ধে। ঘর পেল কাজরী, পেল পোশাক পাল্টানো পরিসর। দ্রুত দ্রষ্টব্যের কর্কশতা থেকে নিজেকে কেড়ে এনে নগ্ন তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে একটা পিতলের জগ, পাশে উপুর ক’রে রাখা কাঁসার গ্লাস। এই হ্যারিকেন আলো-ছায়াতেও ঝকঝক করছে। পরপর দু’গ্লাস জল মরুভূমির মত শুষে নিয়ে নিজেকে বিছিয়ে দিল সে তক্তপোষের বিছানায়। ঘাম প্রতিটি রোম-কূপ থেকে বার করে আনছিল দেহ-মনের তপ্ততার প্রতিষেধক। বেশ কিছুক্ষণ গলগল করে ঘামার পর কাজরীর শরীর ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে শুরু করল। গুরুজীর কণ্ঠস্বর অধিকার করে নিল শ্রবণ— শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই-ই সয়… 

  কাজু কী খেয়ে এসেছ? কী হল মুখে কথা নেই কেন? 

আর কেন! কাজু মানে কাজরী তখন মনে মনে বলছে— হে ধরণী দ্বিধা হও।

  স্কুলে টিফিন করোনি? দু’বিনুনীর কাজু আখড়া মুখর হাসির রোল শুনতে না পেয়ে এবার মুখ তুলল। গুরুজীর দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে না জানাল। 

  কেন? 

  মা-র শরীর খারাপ রান্না করতে পারেনি। 

  সে কী! তার মানে সকাল থেকে এই বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তুমি এম্টি স্টম্যাক! হাউ হরিবল! ঐ জন্যই তোমার পেটে চাপ পড়তে অমন সশব্দে উইন্ড পাস। বুঝেছি। অশেষ… প্র‍্যাকটিস পরে হবে আগে যাও রুটি-সবজি আর একটা করে ডিম সিদ্ধ ব্যবস্থা করো। রেজিস্টার কার কাছে? দাও তো। হুঁ। অশেষ তুমি একশোটা লাল আটার রুটি, পরিমান মতো সবজী আর তিরিশ টা ফুল বয়েল্ড ডিমের অর্ডার দিয়ে এসো গবার হোটেলে। আর কাজু তুমি ম্যাট পেতে পবনমুক্তাসন করো। খাবার খেয়ে আজ ছুটি করবে দাদাকে দেখা করতে বলবে। সকলে প্র‍্যাকটিসে শুরু করো… 

কাজরীর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। গুরুজী। আচার্য বিষ্ণু চরণ ঘোষ। আপনা-আপনি দু’হাতের ঝিনুক মুদ্রা চন্দন-আঁকা কপাল ছুঁল। তক্তোপোষ থেকে নেমে এতক্ষণে আড়ষ্ট শরীরটাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার জন্য কয়েকটা ফ্রি-হ্যান্ড করে আর্চ করতে দু’পায়ে ভর রেখে শরীরটা পিছনে বেঁকিয়ে মাটি ছোঁওয়ার আগেই স্প্রিং-এর মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কাজরী। বসে পড়ে তক্তপোষে। মাথা নীচু। প্রতিটি দেহ-রেখায় ফুটে উঠতে থাকে প্রার্থিত ক্ষমা।

 ও বৌদি… বৌদি…

ছোট ননদের গলা। বেশিক্ষণ এই ব্যস্ত-বাড়ি তাকে নিজের সঙ্গে থাকতে দেবে না জানে কাজরী। হ্যারিকেন-আঁধারির নম্রতা তাকে আরামে রেখেছিল। কৃষ্ণতা তাপশোষী। জেনেছে সে। স্কুলে পড়িয়েছিলেন শ্যামবাবু স্যার কিন্তু নাঃ অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, ডাক পড়েছে পেট্রোম্যাক্সের অবাঞ্ছিত ঔজ্জ্বল্যে লুকোচুরির বেলায়। শ্বশুর-বাড়ি বুঝি সেই ঝোপ-ঝাড় যেখানে নিজেকে লুকোতে লুকোতে কবে যেন চুরি হয়ে যায় মেয়ে-মানুষের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ। হ্যারিকেনের অকম্প অথচ ম্রিয়মান আলোর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ানো কাজরী দেওয়ালে গড়ে ওঠা নিজের বিপুল ছায়ার মুখোমুখি অবস্থান থেকে ক্লান্ত স্বরে সাড়া দিল— যাই। 

  তাড়াতাড়ি নাও। কতক্ষণ লাগে তোমার চেঞ্জ করতে?

স্পষ্ট বিরক্তি ছোট ননদের  গলায়। প্রতিটি মানুষই কি “আমাকে দেখুন” শ্রেণির? মাথায় এই চিন্তাটা ভর করতেই হেসে ফেলে কাজরী। সেও কি তাই-ই নয়। নিজের ক্লান্তি, অপরিচয়ের অস্বাচ্ছন্দ্য কে সে যেমন প্রাধান্য দিচ্ছে তেমন-ই ছোট ননদও তাকে ডাকতে আসার বিরক্তিকে…

সঙ্গে আসা ট্রাঙ্ক থেকে পছন্দ ক’রে আটপৌরের নরমে নিজেকে দ্রুত জড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে এল কাজরী। নাঃ, তার জন্য কেউ অপেক্ষা ক’রে নেই। দুহাতে তোয়ালের নরমটুকু আঁকড়ে অচেনা কাঠিন্যে আঁচড় কাটতে চাইছিল কাজরী। চন্দন চর্চা ঘোচাতে তার জল আর আড়াল চাই এখন কিন্তু…

এটা বাড়ির পিছন দিক। পশ্চিম মুখো বাড়ি। পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা ঢুকে তবে উঠোন। পালকি ক’রে বড়রাস্তা থেকে তাকে আনা হয়েছে। গ্রাম ঝেঁটিয়ে বউ-ঝিরা তাকে দেখতে কাঁচা রাস্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। পালকি থেকে নামতে নামতেই সে দেখেছিল ডুবন্ত সূর্যের মুখোমুখি বাড়ির সদর। এ তবে পূব, টানা বারান্দায় দুটো পেট্রোম্যাক্স একলা। তার জন্য বরাদ্দ ঘর বারান্দার উত্তর প্রান্তে। এই ঘরের দেয়াল সংলগ্ন আরেকটা ঘর রয়েছে কিন্তু বাড়ির মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। ভেতরে বোধয় কুপি জ্বলছে। কাঁপছে আলোটা জানলার ফাঁকে। বাড়ির এই অংশ নির্জন। সময় পেরচ্ছে নীরবে নাকি অরবে অনুভব করতে চেষ্টা করে কাজরী। পায়ে পায়ে এগোয় বারান্দা থেকে নীচু কেমন যেন দুঃখী মতোন টালি ছাওয়া ঘরটার ডাকে। দরজা জাত কাঠের নয়। দরজার প্রসাধন বাহারের সুর-সাধন থেকে বহু দূরে। ব্ল্যাকজাপান নাকি আলকাতরা বুঝতে পারল না সে তবে মনটা ভারি কেমন কেমন ক’রে উঠল যেমন ক’রে উঠত পথে পড়ে থাকা আহত কুকুর ছানা দেখে, উঁচু ভেন্টিলেটার থেকে ক্লাস রুমের মেঝেতে আছড়ে পড়া কাঠবিড়লীর ছানা দেখে… ভারি সন্তর্পণে বন্ধ কালো দরজার গায়ে গাল ঠেকিয়ে রাখল কাজরী। যেন অনুমতি চাইছিল প্রবেশের। তার বোধ ছুঁয়ে দিল ঘর। আলতো ভাবে চাপ দিল সে দরজায় যেভাবে সদ্যোজাত সন্তানকে বুকে জড়ান জননী। একটু খানি মুখ দেখাল ঘর তার কালো ঘোমটা সরিয়ে। এই এই-ই তার যৌবনের উপবন… বার্ধক্যের বারানসী… ঘোমটা ফেলে সেই যজ্ঞ-গৃহ বুকে জড়িয়ে নিল কাজরীকে। বেশ কিছুক্ষণ এই ঘরের সঙ্গে অরবে কথা বলে যেতে লাগল কাজরী।

  ও নতুন বৌ তুমি ভয় পাচ্ছ?

  না তো। 

  তবে চুপটি করে এক কোণে জড়োসড়ো কেন?

  কই, এই তো তোমার বুকের ওপর মুখ রেখেছি… পাশাপাশি দুটো উনুন। একটা কয়লার একটা কাঠের জ্বালের। সুন্দর ক’রে নিকোনো। উনুন দুটিকে কোনো ভরন্ত নারীর দুধে ভরা স্তনের মত মনে হয়েছে কাজরীর। চোখ বুজে এক উনুনের গায়ে গাল ঠেকিয়ে শিশু যেমন মায়ের অপর স্তনে হাত রাখে তেমন ক’রে হাত বোলাতে বোলাতে কাজরী বিড়বিড় করছিল মা… মা… মা… মাও যেন সন্তানের এই সমর্পণে ভারি খুশি হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে… 

কাজরীর একটু সময় লাগল বুঝতে যে এ হাসি  নিতান্তই পার্থিব সত্য। হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ভাসুরঝি কে দেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় কাজরী।

  ও কী কচ্ছিলে কাকিমণি? আমি তোমার ঘরে গিয়ে তোমায় না দেকতে পেয়ে সারা বাড়ি চক্কর কেটে এলুম। শেষে রান্নাঘরে তুমি!চল চল মা ডাকচে

  আমায় একটু বাথরুমে যেতে হবে— এই বলে নিজের মুখমণ্ডলের দিকে নির্দেশ ক’রে তর্জনী ঘোরাল কাজরী।

  হ্যাঁ তাই তো! ছোটোপিসিকে মা যে পাঠাল তোমাকে বাথরুম নিয়ে যেতে! আসেনি?

  এসেছিলেন… তবে দরজা খুলে তাঁকে দেখতে পাইনি

  রোসো হচ্ছে।

  না না কিছু বোলো না। অশান্তি কোরো না।

  সে দেখা যাবে। এখন চলো তো। ঐ দিকে কলপাড়ে বাথরুম।

যে দিক নির্দিষ্ট হল সে দিকে অন্ধকার। অন্ধকার তাপশোষী। 

কুপি হাতে পথ দেখানিয়ার পিছু পিছু যেতে যেতে অরবে সুর ভাঁজছিল কাজরী— ওগো পথ-দেখানিয়া তোমায় গান শোনাব…

মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে…

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *