প্রীতন্বিতা
ডিএনএ ডাবল হেলিক্স
সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের এক বড় আবিষ্কার। জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ব্রিক ১৯৫৩ সালে প্রথম এর বর্ণনা করেন। ডিএনএ প্রত্যেক জীবের শারীরিক বৈশিষ্ট্য স্থির করে। ২০০১ সালে প্রথম হিউম্যান জেনম প্রোজেক্ট আর সিলিয়ার জেনোমিক্স যুগ্মভাবে এর প্রকৃত চরিত্র এবং এর মধ্যস্থিত জটিলতা ও ডিজিটাল কোডের কথা বলেন। এখন আমরা জানি যে প্রত্যেক মানুষের ডি এন-এর অনুতে রাসায়নিক জিনিস আছে যা মোটামুটি তিন বিলিয়ন নির্দিষ্ট ঘটনাক্রমে সাজানো। এমনকি সিঙ্গেল সেল ব্যাকটেরিয়াম ই কলি-তেও প্রচুর তথ্য আছে যা পৃথিবীর যেকোনো বড় লাইব্রেরির সব বইয়ের মিলিত তথ্যের সমান।

ডি এন এ ডাবল হেলিক্স একটি দ্বিমুখী সুতোর অনু যা কুন্ডলীর আকারে প্যাঁচানো সিঁড়ির মত। প্রত্যেক সুতোর খেইয়ে সুগার ফসফেট ব্যাকবোন আর যুগ্মভাবে প্রচুর রাসায়নিক ভিত্তি জুড়ে থাকে। চারটে ভিত্তি বা মূল যেটা এরকম কুন্ডুলি পাকানো সিঁড়ি তৈরি করতে পারে তা হল এডেনাইন বা এ, থাইমাইন বা টি, সাইটোসাইন বা সি এবং গুয়ানাইন বা জি। প্রাণিবিদ্যার বর্ণমালায় এগুলো লেটার্স বা অক্ষরের কাজ করে— একসঙ্গে শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ তৈরির মাধ্যমে এই কোষ নির্মাণের গাইড হিসেবে কাজ করে থাকে। এমনকি এই এ, টি, সি ও জি এগুলোকে ডিএনএ মলিকিউলে শূন্য এবং এক হিসেবে ধরে তুলনা করা যেতে পারে, যেমন করা হয় কম্পিউটার সফটওয়্যার-এর বাইনারি কোডের ক্ষেত্রে। কম্পিউটার সফটওয়্যার-এর মত ডিএনএ কোড হচ্ছে সেই জেনেটিক ভাষা যা অর্গানিক সেলকে তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এই ডিএনএ কোড বাইনারি কোডের ফ্লপি ডিস্কের মতো, এর মূল গঠনের ক্ষেত্রে খুবই সোজাসাপ্টা। কিন্তু এর বিভিন্ন পর্যায় এবং কার্যপদ্ধতি ভীষণভাবেই জটিল। যদিও এর এক্সরে ক্রিস্টালোগ্রাফির মত নতুন টেকনোলজির মাধ্যমে আমরা এখন জানি যে কোষ মোটেই শুধু ব্লব অফ প্রোটোপ্লাজম নয় বরং একটি মাইক্রোস্কোপিক আশ্চর্য যা কিনা স্পেস শাটলের চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং তা নির্দিষ্ট ডিএনএ-র মাধ্যমে কার্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে। ডিএনএ কোড জটিল হলেও এর তথ্য সরবরাহ ও অনুবাদ পদ্ধতি মানুষের বিজ্ঞান ধারণাকে যেন হতবুদ্ধি করে দেয়। এক্ষেত্রে বাইনারি তথ্য সরবরাহ থিওরির সাধারণ উদাহরণ হচ্ছে মিডনাইট রাইড অফ পল রিভিয়ার— এই বিখ্যাত গল্পে শ্রীযুক্ত রিভিয়ার তার বন্ধুকে বলছে, যদি ব্রিটিশরা স্থলপথে আসে তাহলে নর্থ চারচের জানালায় একটা আলো রাখবে আর সমুদ্রপথে এলে দুটো আলো রাখবে। এক্ষেত্রে পল রিভিয়ার আর তার বন্ধুর মধ্যে ভাষার আদান-প্রদান খুবই সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ উদাহরণকে নিয়ে অনেক শূন্য দিয়ে গুণ করলে ফল আরো বেড়ে যায়। এখন আমরা জানি যে ডিএনএ অনু হচ্ছে একটি জটিল মেসেজ সিস্টেম। ডিএনএ-র উৎপত্তি প্রচুর বস্তুগত শক্তির মাধ্যমে হলেও তথ্যসমূহ এই ভাবেই বাহিত হয়। অনেক বৈজ্ঞানিক বলেন যে ডিএনএ-র কেমিক্যাল বিল্ডিং ব্লক মলিকিউল গুলিকে স্বাভাবিক বিবর্তন পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। যাই হোক, মেসেজের বাস্তব ভিত্তি হল সম্পূর্ণভাবে সেই তথ্য সরবরাহের থেকে স্বাধীন। তাই এই কেমিক্যাল বিল্ডিং ব্লক-এর সঙ্গে জটিল মেসেজের তেমন সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ, ‘নেচার ওয়াজ ডিজাইনড’ এই ক্লজ-এর সঙ্গে যেমন লেখার সরঞ্জাম কালি, পেন, চক বা ক্রেয়নের কোন সম্পর্ক নেই। বস্তুত এটা বাইনারি কোড, স্মোক সিগনাল যেভাবেই লেখা হোক না কেন মেসেজটা একই থাকবে। তথ্য আর তা সরবরাহ করার মাধ্যমের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কেউ কেউ বলেন যে মূল কেমিক্যাল-এর মধ্যে থাকা সেল্ফ অর্গানাইজিং প্রপার্টিগুলি নিজেরাই ডি এন এ-র মধ্যে তথ্য সৃষ্টি করে। আরেক দল বলেন যে এক্সটার্নাল সেলফ অর্গানাইজেশন ফোর্স এটা সৃষ্টি করে থাকে। যাই হোক, এসব থিওরির যুক্তিযুক্ত সমাপ্তি এটাই যে তথ্য সরবরাহ করার উপাদানই তথ্য উৎপাদন করে। এখনকার চলতি থিওরির বিরুদ্ধে মত দিয়েই বলা যায় যে জেনেটিক কোডের মধ্যে যে তথ্য নিহিত থাকে তা তার ডিএনএ মলিকিউল-এর কেমিক্যাল মেকআপ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
ডিএনএ ডাবল হেলিক্স-এর অস্তিত্বই অন্যান্য বিবর্তন মূলক থিওরিকে মোকাবিলা করতে পারে। যে থিওরি আগে ছিল তা হল, জীবনের অস্তিত্ব এসেছে অজৈব উপাদান থেকে, এটা যে সঠিক নয় তা এই থিওরি ভুল প্রতিপন্ন করেছে। এখন আমরা জানি যে অর্গানিক লাইভ হচ্ছে বৃহৎ জটিল তথ্য সরবরাহের ভিত্তির ওপর গঠিত এবং তা কোন কসমিক কিবোর্ড-এর মাস্টার ডিজাইনার ছাড়া সৃষ্টি করা যাবে না।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
