তপোপ্রিয়

অসম্ভবের খোঁজে

সেই ছোট্টবেলা থেকে ওর অভ্যেস ঘুমোতে যাওয়ার আগে গল্প শুনবে। আমার মেয়ের। বালিশে মাথা রেখেই বলবে, ‘বাবা, একটা হাতির গল্প বল।’

হাতির গল্প হাজার হাজার বলে ফেলেছি, তবুও ওই হাতির গল্পই শুনবে। হাতি ওর এত প্রিয় যে হাতির গল্প শুনতে ওর ক্লান্তি নেই। গল্পে আর যে কেউ থাকুক না থাকুক একটা অন্তত হাতির উল্লেখ না থাকলে ওর ঠিক শান্তি হবে না। 

গল্প ওকে টানে প্রচন্ড নেশায়। পড়ার চেয়েও বেশি আগ্রহ শোনায়। শুরু করেছিলাম রূপকথা-টুপকথা কিছু একটা দিয়ে, সেই যখন কথাও শেখেনি ঠিকমতো। তখন থেকেই আমার কোলে শুয়ে ঘুমানো অভ্যেস। প্রথমে কোলের চেয়েও লম্বা ছোট, তারপর কোলের সমান সমান, শেষে পা বেরিয়ে গেল কোল থেকে। এখন আমার কোল থেকে এতটাই বেড়ে গেছে যে ঘুমোবার সময় আর কোলে নিয়ে রাখার প্রশ্নই নেই। কিন্তু গল্প শোনার নেশাটা থেকেই গেছে, বিশেষ করে, হাতির গল্প। 

গল্পের চরিত্র হিসেবে হাতি প্রিয় ছিল না সব সময়। রূপকথা-টুপকথা কী বলেছি দু-চারটে খেয়াল নেই। একটু যখন বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই ওর প্রিয় চরিত্র ‘শিনে’। আধো আধো কথা বলতে শিখেছে তখন, সব সব দোষ স্পষ্ট বলতে পারেনা, শেয়াল কে বলতো শিনে। শিনের গল্প না শুনলে ঘুমই হতো না।

শেয়ালপন্ডিত আর কুমির ছানার গল্প দিয়েই বোধ হয় ওর সঙ্গে প্রথম পরিচয় শিনের। তখন সবে বইপত্র চিনতে শুরু করেছে। শিনের গল্প শোনার আবদার ওই থেকেই। শেয়ালের যে গল্পটা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটা আমারও জীবনে প্রথম শোনা মনে রাখা গল্প।

গল্পটা শুনেছিলাম বাবার কাছে। বাবা ওই একটা গল্পই শোনাতো আমাকে সব সময়। আমিও বোধহয় তখন কথা বলতে শিখেছি সত্য। বাবা তার কাজকর্ম শেরে রাতে এসে আমার সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে নানা রকম কথাবার্তা বলতো। বেশ হইচই আমোদ চলতো। সেসবের অঙ্গ হিসেবেই আসতো একসময় শেয়ালের গল্পটা। শেয়াল কাঁকড়া খেতে গিয়ে বসেছে জলের ধারে। জলে প্রচুর কাঁকড়া। শেয়াল ধরবে কী করে? ভেবে ভেবে একটা উপায় বার করলো সে। ডাঙ্গায় বসে লেজটা ডুবিয়ে দিল জলের মধ্যে। কাঁকড়াগুলি এসে কামড়ে ধরল লেজটাকে। শেয়াল তখন ঝট করে তার লেজ তুলে আনল ডাঙ্গায়। লেজের সঙ্গে উঠে এলো অনেক কাঁকড়া। মনের আনন্দে শেয়াল সেই সব কাঁকড়া খেতে লাগলো। 

এই একই গল্প একাধিকবার শুনেও পুরনো হতো না। শোনা গল্প শোনার কী আকর্ষণ! মা অভিযোগ জানিয়ে বলতো, ‘তোর বাবার এই এক গল্প।’ হোক, সেই এক গল্পই বাবা যখন শোনাতে থাকতো আমি অদ্ভুত শান্ত হয়ে যেতাম। 

সেই গল্প পরে আমি মেয়েকে শোনালাম। বাবা তখন কোথায়? হারিয়ে গিয়েছিল অনেক অনেক দিন আগে। কিন্তু তার সেই শেয়ালের গল্প মেয়ের কাছে তেমনি জনপ্রিয় হল যেমন হয়েছিল আমার কাছে। মানুষ হারিয়ে গেলেও গল্পরা থেকে যায়। গল্প শুনেই মানুষের বেড়ে ওঠা। জীবন জুড়ে গল্পের ঘনঘটা। 

মেয়ের খুব শখ হলো সে আমার বাবাকে দেখবে। মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলে আর কি দেখা পাওয়া যায়? আমরা তাই ছবি এঁকে ফটো তুলে মানুষের চেহারা বাঁচিয়ে রাখি। বাবার ছবি আঁকা হয়নি কোনদিন, কিন্তু দু-চারটে ফটো ছিল। একটা মায়ের সঙ্গে, মা বসে চেয়ারে আর বাবা চেয়ারে হেলান দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে। একটা গ্রুপ ফটোও ছিল, বাবা আইন পরীক্ষায় পাস করার পর সহপাঠী আর অধ্যাপকদের সঙ্গে তুলেছিল। সেই ফটোগুলি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হতো। তারপর কয়েকবার ঠাঁই নাড়া হল। সেইসব ফটো যে কোথায় গেল! বাবার সব ছবিই আমি হারিয়ে ফেলেছি। 

গল্পে মানুষ বেঁচে থাকে। বাবার গল্প শোনালে হয়না মেয়েটাকে, ছবি যখন দেখাতেই পারলাম না? কিন্তু পরিকল্পনা করে তেমন আর কিছু বলা হয়ে ওঠে না। ইচ্ছে থাকলে সুযোগ হয় না, সুযোগ হলে ইচ্ছে থাকে না। সময়ও একটা বড় ব্যাপার। সময়, সুযোগ আর ইচ্ছে, এই তিনের সমন্বয় না হলে কি প্রাণ ভরে গল্প করা যায়? আবার এটাও বুঝি যে এখনই তার গল্প শোনার ঠিকঠাক সময়। আমারও যে কত গল্প জমে আছে বলার মত। বলা হয়ে ওঠেনা। অন্তত আমি সেই ভাবে গল্প শোনাতে শিখিনি যেমন পারতো আমার মা। সারাদিন কত কাজ করত মা, কাজ কর্মের ফাঁকে ফাঁকে অনেক কথা শোনাতো। সেইসব কথা আসলেই রংবেরঙের গল্প। নানা চরিত্র, আচার-আচরণ, নানা ঘটনা বিকশিত হয়ে যেত অনায়াসে। 

মা যে ঠিক গল্প হিসেবে গল্প শোনাতো এমন নয়। দৈনন্দিন কথাবার্তা গল্প হয়ে যেত। এই যে অনায়াস গল্প, এমন গল্প শোনাতে শিখিনি আমি। তবুও আমার ইচ্ছে হয়েছিল গল্প শোনাবো, গল্প শোনাবো মানুষকে। তারপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে এখন সেই ইচ্ছে আর আমাকে অনুপ্রাণিত করে না। গল্প বলতে ভুলে থাকতাম চেষ্টা করে। তবুও কিছু বাসনা তো অবশিষ্ট ছিলই। শেষ পর্যন্ত তাকেও বিসর্জন দিয়েছিলাম মা হারিয়ে যাওয়ার পর। মেয়ে এসে জোর করে আমাকে দিয়ে গল্প বলাতে লাগলো। বাধ্য হয়ে ওকে গল্প শোনাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, পুরনো অভ্যেস চেষ্টা করলে পুনরুদ্ধার করা যায়। কিন্তু এখানেই এক নতুন বিপত্তি এসে গেল, মেয়ে যখন আমার বাবাকে দেখতে চাইল। 

যে মানুষ চলে গেছে তাকে আমি দেখাবো কী করে? মানুষ চলে গেলে তাকে কি পুনরুদ্ধার করা যায়? যাবেই বা না কেন? মায়ের মুখে শুনে শুনে আমার দাদু দিদিমা, ঠাকুরদা ঠাকুমা এবং আরো কত কত বিগত দিনের বিগত মানুষেরা আমার জগতে একেকটি নির্দিষ্ট চেহারা নিতে পেরেছিল। মায়ের সেই দক্ষতা ছিল, কোন মানুষের গল্প শুনিয়ে তাকে জীবন্ত করে তুলতে পারতো। আমিও তাহলে কেন পারবোনা বাবার গল্প শুনিয়ে বাবাকে ফিরিয়ে আনতে? যাতে মেয়ের মনে হবে এই তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। সেই চেষ্টাই করবো ভাবলাম। কিন্তু করতে গিয়ে দেখলাম সেভাবে কোন কথাই বলতে পারছি না যাতে মেয়ের সামনে বাবার একটা পুর্নাবয়ব তৈরি হতে পারে।

সেই ছবিগুলোও যে হারিয়ে ফেলেছি। কোনদিন ভাবিনি বাবার ছবি এত মূল্যবান হতে পারে। কোন জিনিসকেই আমি কখনো যত্ন করতে জানতাম না, অথচ আমার মা তুচ্ছ কিছুকেও বুকে আগলে রাখত। দেখেও শিখিনি। মা বলতো, ‘তৃণটিও লাগে কাজে রাখিলে যতনে।’ আমার স্বভাব ঠিক উল্টো। সব ফেলে দাও, সব ফেলে দাও। নিজের ওপর এখন এত হতাশ লাগছিল। পাবোনা জেনে ও ছবিগুলি পাওয়ার জন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। কোন জায়গাই বাদ রাখলাম না। ফল হলো না কিছুই। একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল যে ছবিগুলি আর খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বাবার চেহারা কেমন ছিল তা আর কোনদিনও মেয়েকে দেখাতে পারবো না। একটা ছবিও নেই বাবার, বেদনাদায়ক হয়ে উঠল ব্যাপারটা আমার কাছে।। এখনো চোখের সামনে ভাসে ওই একটা দুটো ছবি, এখানে সেখানে দেখতাম রাখা আছে কিন্তু গুরুত্ব দিতাম না। কিভাবে কখন যে হারিয়ে গেল ছবিগুলি! ছবি সব হারিয়ে গেছে, আর পাওয়া যাবে না জেনে মেয়ে খুব হতাশ হলো। আমার মর্মবেদনা দিয়ে ওর কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারছিলাম। আমিও তো আমার ঠাকুরদাকে দেখিনি কোনদিন। দাদুকেও নয়। যদি আজ তাদের ছবি হঠাৎ খুঁজে পেতাম তাহলে সত্যিই খুব আনন্দ হতো। এই আনন্দ কেন বাকি তার স্বর ূপ তা ঠিক ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবো না। 

বাড়িটা পুরনো হয়ে পড়েছিল অনেকদিন। সূচনা থেকেই অনেক কিছু করার ছিল, করা হয়নি। ঠিক করা হলো, বাড়িটাকে আগাপাতলাপ সংস্কার করা হবে। দোতলায় রয়েছে মায়ের ঘর, আমাদের থাকার ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর ছাড়াও আরো কিছু ফাঁকা জায়গা। মায়ের ঘর আর আমাদের থাকার ঘরের অবস্থান অক্ষুন্ন রেখে বাকি জায়গা ভেঙেচুরে ঠিক করা হলো একটা বড় ব্যালকনি, মেয়ের ঘর এবং রান্নাঘর কাম খাওয়ার ঘর। বাথরুমগুলিকেও আধুনিক চেহারা দেওয়ার পরিকল্পনা হলো। বসবাসের বাড়ি সংস্কার করা যে কী হয়রানি তা বলে বোঝানো যাবে না। মিস্ত্রিরা দিন-রাত দেয়াল মেঝে ভেঙেচুরে পাহাড় পাহাড় রাবিশ জমায় আর আমরা এখান থেকে ওখানে পালিয়ে বেড়াই। ঘরে কি কম জিনিস? গাদা গাদা বই, কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র, বাসন-কোসন— সব আপাতত এক তলার ঘরে জমিয়ে রাখা হলো। দোতলা ঠিকঠাক হওয়ার পর পরিকল্পনা ছিল একতলাকেও কলেবর দেওয়া হবে।

পুরো দোতলাকে নতুন করে সাজাতে এক বছর লেগে গেল। নতুন মেঝে হল, দেয়ালে লাগলো দৃষ্টিনন্দন রং। তাই দেখে মেয়ের তো আনন্দ হলোই না বরং তার দুঃখ সামলাতে আমাদের হিমশিম অবস্থা। যে ঘরটাকে সে জন্ম থেকে চেনে, যে বাড়িটাতে তার বেড়ে ওঠা কেন তার চেহারাটাকে এভাবে পাল্টে দেওয়া হল? প্রথম থেকেই তার আপত্তি ছিল, যেন অন্তত আমাদের থাকার ঘরটাকে আধুনিক না করা হয়। ওই খুবলে যাওয়া চলটা ওঠা মেঝে, ওই দাগ ছোপ ধরা বিবর্ণ দেওয়াল, ওই তার প্রিয়। এই হতশ্রী ঘরটাতে থাকতে থাকতেই সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, একেই সে ভালোবাসে। তার চির চেনা চেহারাটা পাল্টে এমন অপরিচিত হয়ে গেল সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। কথায় কথায় তার শোক আর অভিমান। আমার মনে পড়ছিল মায়ের কথা। মাও বোধহয় এই পরিবর্তনটা মানতে পারতো না। প্রথম যখন বাড়িটা তৈরি হয় তখন ঘরের মেঝে গুলি দেখে মায়ের সে কী আনন্দ! প্যারিস লাগিয়ে রং না চাপিয়েই রেখেছিলাম দেয়ালগুলি। তাতেই মা আত্মহারা। চির চেনা ভালোলাগা পরি মন্ডলের এমন নির্মম পরিবর্তন মা-ও কি নিশ্চুপে মেনে নিতে পারত? আজ কি ১০ বছরের মেয়ের কণ্ঠস্বরে আমার হারিয়ে যাওয়া মায়েরই প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে শুনছি? 

দোতলা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর একতলাতে যেমন তেমন করে ফেলে রাখা জিনিস গুলিকে আবার গোচ গাছ করে নিয়ে আসার প্রশ্ন দেখা দিল, এখন যেহেতু একতলা তে কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এতদিন এইসব ফেলে রাখা জিনিস গুলি যথেচ্ছ নাড়াঘাটা করেছে মিস্ত্রমজুরের দল, দেখেও দেখিনি উপায় ছিল না বলে। এখন সব আবার গোছাতে গিয়ে দেখা গেল ক্ষতি মন্দ হয়নি, কত জিনিস নিঃশব্দে হারিয়েও গেছে। লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া জিনিসগুলি এক এক করে গুছিয়ে রাখতে লাগলাম, ধুয়ে মুছে ধুলো ময়লা ঝেড়ে। 

একদিন এক ঝাঁক আবর্জনার স্তূপে দেখি একসঙ্গে বেঁধে রাখা রয়েছে কয়েকটি চতুর্ভূজাকার কাঠের কাঠামো। কী আছে ভালো করে দেখতে গিয়ে বাঁধন খুললাম। কাট কুটোর কাঠামো গুলো সরিয়ে দেখি প্রায় বর্গাকার এক ফটো ফ্রেম। উল্টে দেখি, অবাক বিস্ময়! বাবার সেই গ্রুপ ফটো, সদ্য আইন পাস করার পর বহুজনের সঙ্গে যেখানে রয়েছে বাবারও উপস্থিতি। 

আবিষ্কারের আনন্দ যে কী সেদিন আমরা সবাই তা পুরো মাত্রায় অনুভব করেছিলাম। দিনের পর দিন এই ছবিটাকেই কত খুঁজেও পাইনি। সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিল। কোনদিন আর খুঁজে পাবো ভাবতেই পারিনি। আজ এই অসম্ভব ব্যাপারটা সম্ভব হল কোন্ যাদু মন্ত্রে? কোন রহস্য এভাবে পাইয়ে দিল ছবিটাকে?

জীবনে অন্তত এই একটি জায়গায় সব যুক্তি তর্ক ভুলে যেতে চাই। মেয়ে দেখতে চাইছিল আমার বাবাকে। বাবার সব ছবি হারিয়ে ফেলেছিলাম। বড় যন্ত্রনাটির পেতাম বুকের মধ্যে। কেবল ভাবতাম, যদি বাবার একটা ছবিও খুঁজে পেতাম! জানতাম, ভাবনাটা বাতুলতা। কিন্তু সেই অসম্ভব ব্যাপারটাই কিনা শেষে সত্যি হলো! এই প্রাপ্তি জীবনের অনেক অপ্রাপ্তির অপূর্ণতাকে অনায়াসে ঢেকে দিতে পারে।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *