রম্যরচনা
অধ্যায় : ১৪
ঘরে বসে নিরিবিলি কোন কাজ করার উপায় নেই, বিশেষ করে মনঃসংযোগের কোন কাজ। সে শত্রুদের তালিকা তৈরি করে, তাতে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন। তাছাড়া মনের উদ্বেগ-উত্তেজনা কমাতে হাচিয়া ফাল ধ্যান করার প্রয়াস চালায় হামেশাই। শত্রুদের কথা ভেবে ভেবে তার মনে যে অশান্তি জমে তার কারণেই যত উদ্বেগ ও উত্তেজনা। সেই অস্থিরতা দমন করতেই ধ্যান করা প্রয়োজন। কিন্তু মনঃসংযোগের কি উপায় আছে? শত্রুর দল কিলবিল করে বেড়াচ্ছে সদাসর্বদা। তাকে তারা শান্তিতে থাকতে দেয় না। তাদের উৎপাতে মন বিক্ষিপ্ত হতেই থাকে।
হাচিয়া ফাল থাকে রাস্তার ধারে এক বাড়িতে। সেই রাস্তা দুদিকে গিয়ে মিলেছে দু’দুটি বড় রাস্তার সঙ্গে, আর ওই কারণেই তার বাড়ির পাশ দিয়ে গাড়ি, বাইক, রিক্সা চলাচল করে সর্বক্ষণ। ওইসব যানবাহন যাতায়াতের গর্জন চলতে থাকে অবিরাম আর চালকদের এমনই দুশ্চরিত্র যে তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অকারণে তারা হর্ন বাজায় উচ্চগ্রামে। চালিয়ে যাচ্ছিস যা, এত হর্ন বাজাবার কী আছে? লোকগুলি গাড়ি বা বাইক নিয়ে চলে যায় উল্কাবেগে হর্ন বাজাতে বাজাতে। তাদের নাগাল পাওয়ার উপায় থাকে না। তাছাড়া সবই অচেনা মুখ। তাদের বাড়িটাড়ি কোথায় কে জানে? চেনা লোক হলে বা কোথায় থাকে জানলে নাহয় তাদের বাড়িতে গিয়ে ঝগড়া করে আসা যেত।
যানবাহনের উৎপাত ছাড়াও রয়েছে রাস্তা ধরে দলবদ্ধ লোকজনের যাতায়াত। লোকগুলিরও এমন স্বভাব যে তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে যায়। অত চিৎকার করে কথা বলে কেন যে লোকেরা সে কোন কারণ পায় না। তার ইচ্ছে করে, রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং হৈ হৈ করে কথা বলতে বলতে যাওয়া লোকগুলিকে ধরে ধরে বলে যেন অত চেঁচামেচি না করে। কিন্তু মুশকিল হল, দলে দলে লোক যেতে থাকে সবসময়। কতজনকে সে নিষেধ করবে? তাকে তাহলে রোজ রোজ দশ-বারো ঘন্টা রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাছাড়া অন্য এক বিপদও আছে। চিৎকার করে কথা বলতে বলতে চলে যাওয়া লোকেরা দলে ভারি থাকে। সে একা নিষেধ করতে গেলে সবাই মিলে তাকে যদি উল্টো আক্রমণ করে?
সেদিন কী যেন কারণে বিকেল থেকে রাস্তায় যানবাহনের অত্যাচার ও লোকজনের হাহাকার বেশ কম ছিল। তাতে হাচিয়া ফাল মনে বেশ খুশির হাওয়া খুঁজে পেল। সে বসল হিসেবে নিয়ে। গত বছরে খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে মোট কী খরচ হয়েছে সেটা দেখা খুব দরকার। সে প্রত্যেক বছর চেষ্টা করে যাতে আগের বছরের চেয়ে এক টাকা হলেও কম খরচ হয়। জাবদা খাতা নিয়ে হিসেব করতে বসে সে দেখল, গত বছর তার মোট সাড়ে একুশ কিলো আটা আর তেত্রিশ কিলো চাল লেগেছে। পরিমাণটা তার আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম দেখে সে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। মহা উৎসাহে আরও অন্যান্য খরচের হিসেব করে আগের বছরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে বেশ দমে গেল সে। দেখল, গত বছরের মোট খরচ তার আগের বছরের তুলনায় সাড়ে তিন টাকা বেশি হয়ে গেছে। এমন কেন হবে? কোন জিনিসের পরিমাণ সে বাড়ায়নি। তাহলে মোট খরচ বাড়বে কেন? ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হওয়ার উপক্রম। তাহলে কি হিসেবে ভুল হয়েছে? খুব মনোযোগ দিয়ে সে সমস্ত হিসেব আবার নতুন করে মিলিয়ে দেখতে লাগল।
সবে একাগ্রচিত্তে হিসেব দেখতে বসেছে, অমনি রাস্তা দিয়ে সগর্জনে পাড়া কাঁপিয়ে চলে গেল একটা বাইক, তারস্বরে টানা হর্ন বাজিয়ে। সেই সম্মিলিত বিকট আওয়াজ শুনে তার পিলে পর্যন্ত চমকে গেল। একটু ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করার আগেই আবার আরেকটা চলমান বাইকের বীভৎস টানা হর্ন ও চলে যাওয়ার আওয়াজ। তার পরপরই তিন-তিনটে গাড়ি কর্কশ হর্ন বাজাতে বাজাতে চলে গেল। তারা যেতে না যেতেই আবার কয়েকটা বাইক ও রিক্সা। সেই যে শুরু হল, চলতেই লাগল। তার আর হিসেব মিলিয়ে দেখা হলো না।
দিনের পর দিন এমন উৎপীড়ণ কত সহ্য করা যায়? সে প্রতিজ্ঞা করল, এর একটা বিহিত করতেই হবে, যা থাকে কপালে। রাস্তা দিয়ে হর্ন বাজিয়ে যাবে যেসব গাড়ি বা বাইক তাদের দিকে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সে পচা ডিম ছুঁড়ে মারবে সন্ধের পর। অন্ধকারে কে ডিম ছুঁড়েছে বুঝতেই পারবে না কেউ। সাবধানতার জন্য একটা ডিম ছুঁড়েই সে পালিয়ে যাবে ছাদ থেকে ঘরে নেমে আসবে। দিনে একটার বেশি ডিম ছুঁড়বে না।
কিন্তু মুশকিলটা অন্য জায়গায়। এত এত পচা ডিম পাবে কোথায় সে? বাজারে কোন ডিম বিক্রেতাকে সে কখনো পচা ডিম বিক্রি করতে দেখেনি। আবার ভালো ডিম কিনে তাকে কিভাবে পচা ডিম বানানো যাবে তাও জানা নেই। খরচ করে ভালো ডিম কিনে তাকে পচা ডিম বানানো প্রাণে সহ্য হবে?
বাজারের ডিম বিক্রেতার নাম ঝাঁঝাঁ ঝোল। তার কাছে গেল হাচিয়া ফাল। তাকে দেখেই ঝাঁঝাঁ ঝোল দন্ত বিকশিত হাসি হেসে বলল,
‘আরে এসো এসো, কত জন্ম দেখিনি তোমাকে। ছিলে কোথায়? হনুলুলু না হন্ডুরাস? গত বছর গোটা পাঁচেক ডিম কিনেছিলে। মাত্র এক বছরেই খেয়ে শেষ করে দিলে? নাকি এখনো সবকটা খেয়ে উঠতে পারোনি?’
দেখে আর শুনে হাড়পিত্তি জ্বলে গেল। লোকটা শত্রুরও অধম। তবুও রাগ দমন করে হাচিয়া ফাল তাকে জিজ্ঞেস করল,
‘শোনো ঝাঁঝাঁ, তোমার কাছে পচা ডিম আছে? আমার কিছু পচা ডিম লাগবে।’
শুনে ঝাঁঝাঁ ঝোল কিছুক্ষণ তার দিকে নির্বাক তাকিয়ে মিচকে হাসি হেসে বলল,
‘পচা ডিম খাবে? ভালো ডিমে অরুচি ধরে গেছে? ঠিক আছে, কত চাই বল। হাজার-দু’হাজার? কিন্তু ভাই, পচা ডিমের দাম কিন্তু ভালো ডিমের চেয়ে বেশি হবে। রাজি যদি থাকো তো বলো।’
তর্কবিতর্ক হল কিছুক্ষণ। পচা ডিমের দাম ভালো ডিমের চেয়ে কেন বেশি হবে? বরং পচা ডিম কেনার জন্য ঝাঁঝাঁর উচিত হাচিয়া ফালকেই টাকা দেওয়া। এই নিয়ে অনেক তর্কাতর্কি করেও কোন মীমাংসা হলো না। রেগেমেগে হাচিয়া ফাল ঝাঁঝাঁকে দু’কথা শুনিয়ে বাড়ি চলে এলো।
কী সর্বনাশ হলো বোঝা গেল পরদিন। চেনা-পরিচিত যে লোকের সঙ্গে দেখা হয় সেই তাকে জিজ্ঞেস করে,
‘কী হে, তুমি নাকি আজকাল পচা ডিম খেতে শুরু করেছ?’
একদিনেই মোটামুটি পাগল হয়ে গেল সে লোকের কথা শুনে শুনে। ঝাঁঝাঁ ঝোল কী মারাত্মক শত্রু সে ধারণা করতে পারেনি। ব্যাপারটা একদিনের মধ্যেই লোকটা কিভাবে এমন রটিয়ে দিতে পারল ভেবে আশ্চর্য হয়ে গেল হাচিয়া ফাল। শত্রুতা কী ধরনের কী পরিমাণের হতে পারে তার আন্দাজ কে পাবে! প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
