শিশির আজম
রশোমন (১৯৫০)
‘রশোমন’ দেখতে বসে চলচ্চিত্রের ধারাবাহিক রুচি-চরিত্র-আচার নিয়ে কিছু প্রশ্ন দর্শকের মাথায় ভীড় করতে পারে। ‘রশোমন’ কি কেবলই সিনেমা? আর এই সাদা-কালো সিনেমায় এতো রং কেন? হ্যা, এই সিনেমায় কুরোসাওয়া সিনেমার ট্র্যাডিশানকে যেভাবে ধারণ করেছেন, আবার তাকে ভেঙেছেন, আর এই ভাঙচূরের ভিতর নিজের কথাগুলো বলতে চেয়েছেন, এই জারণ-বিজারণে ফরাসি পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমের পেইন্টিংয়ের হানা কি আমরা টের পাইনে? আব্বাস কিয়ারোস্তামির মৃত্যুপ্রত্যাশী নায়ক যেমন মৃত্যু নামক পরম কিছুর আকাঙ্ক্ষায় তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে, বার্গম্যানের মৃত্যুপথযাত্রী চরিত্র যেমন খোদ মৃত্যুদূতকে চ্যালেঞ্জ করে বসে মৃত্যুভীতি ছাড়াই, তেমনি আকিরা কুরোসাওয়া আমাদের জানান পরম বলে কিছু নেই। সত্য এক রকম না। জগতের প্রতিটি বস্তুই একেকটি সত্তার ধারক।
হ্যা, ক্ষমতা-পুঁজি-প্রতিষ্ঠান হয় তো সত্যটা জানার পরও এটা স্বীকার করে না। ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টরা বিশ্বাস করতেন পরম বলে কিছু নেই, সত্য একরকম না। ক্লদ মনের খড়ের গাদা, তা সকালে একরকম, দুপুরে একরকম, বিকালে আরেক রকম। মনের লিলিফুলও কতরকম। রেনোয়ার তুলিতে প্যারির রাস্তাগুলো কতভাবে যে সেজেছে। সেইসব রাস্তার শ্বাস এখনও টের পাই আমরা। ভ্যান গঘের গমক্ষেত বা সূর্যমুখী ফুল নিসর্গভেদে আমাদের সামনে কত রূপে উপস্থিত হয়। এই আলোছায়ার খেলার অজুহাতে ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টরা ‘পরম’ নামক যে দৈত্যকে বধ করেছিলেন সেই দৈত্যর ভয় থেকে তো আমরা মুক্তি পাইনি। কুরোসাওয়া আমাদেরকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন অথবা রেনেসাঁর চিরায়ত যুক্তিবোধ থেকে সংশয়বাদী হতে উশকেছেন। বলা বাহুল্য, ‘রশোমন’ কুরোসাওয়ার প্রথম দিককার ছবি। জাপানের সামাজিক মনস্ততত্ত্বের জটিল পরতগুলো উল্টেপাল্টে দেখা এই ছবিই জাপানি চলচ্চিত্রের গতিপথ পালটে দেয়। জাপানি চলচ্চিত্রের দিকে বিশ্বের তাবড় চলচ্চিত্রবোদ্ধারা তাকাতে বাধ্য হন। বলা যায়, কুরোসাওয়া তার এই সিনেমা দিয়ে কেবল জাপানি চলচিত্রে না বিশ্বচলচ্চিত্রে নিজের জায়গা করে নেন। সেইসঙ্গে জাপানি চলচ্চিত্র বিশ্বচলচ্চিত্রে মনযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। জাপানি চলচ্চিত্রে আকিরা কুরোসাওয়ার পাশাপাশি ইয়াসুজিরো ওজুর নামও করতে হয়। এর পাশাপাশি কেনজি মিজোগুচি, তাকাশি মাইকি, নাগাসি ওশিমা, হাইয়ায়ো মিয়াজাকিসহ এক দল জাপানি পরিচালক জাপানি সিনেমাকে ঋদ্ধ করেছেন, সম্মানের আসনে বসিয়েছেন। এরপর জাপানি সিনেমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি যখন প্রথম ‘রশোমন’ দেখি তখন সিনেমার শুরুতে যে একগুচ্ছ বৃষ্টির শট কুরোসাওয়া দেখান সেই বৃষ্টির দৃশ্য আমাকে অবাক করেছিল। এই বৃষ্টি যেন প্রথম দেখলাম। এই বৃষ্টি কুরোসাওয়ার বৃষ্টি, জাপানি বৃষ্টি। তারপর যখন চিত্রগ্রাহক কাজুও মিয়াগাওয়ার ক্যামেরা কাঠুরিয়ার পিছে পিছে ঘন জঙ্গলের ভিতর প্রথমে নিরাবেগভাবে পরে অস্থিরভাবে হাঁটতে থাকে ছুটতে থাকে চোখে লেগে যায় আলোছায়ার উদ্ভাবনী রূপবন্ধন।
এতো এতো ছায়ার ভিতর এতো আলো কোথা থেকে এলো! উল্লেখ্য, ঘন জঙ্গলে প্রচুর আলো পেতে কুরোসাওয়া পর্যাপ্ত সংখ্যক আয়না ব্যাবহার করেছিলেন। এতে কি আলোছায়ার অসংগতি তৈরি হয়েছিল? না। আলোছায়ার এই যে তাৎক্ষণিক উদ্ভাস এটা কি কুরোসাওয়া ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন? না কি রেমব্রাঁর প্রতিকৃতিগুচ্ছ থেকে এই আলো ঠিকরে এসেছিল! আরেকবার ‘রশোমন’ দেখতে গিয়ে আমি তো সফিউদ্দিনের দুমকা সিরিজের চিত্রমালায় ঢুকে পড়েছিলাম। সেই শালবন, লাল কাঁকরওঠা মাটি, সরল স্বাভাবিক সাঁওতাল জীবন। ‘রশোমনে’ একটা মৃত্যুকাহিনী ঘিরে চারজন মানুষের যে চাররকম সাক্ষ্য সেটা দেখাতে গিয়ে কাহিনীর বিভিন্ন পর্বে ক্যামেরাকে জঙ্গলের ভিতর ভ্রমণ করতে হয়েছে। তার তথ্য দরকার। কিন্তু এই ক্যামেরার চোখ তো একটা না, চারটে। চারটে চরিত্রের দেখা চাররকম। না কি চোখ পাঁচটা? কুরোসাওয়া কী দেখেন? না, কুরোসাওয়াকে আমরা কোন একটি চরিত্রের দেখার সঙ্গে পক্ষপাতিত্ব করতে দেখিনে।
সামুরাইয়ের খুনের বিচারপর্বে আমরা প্রথমে সাক্ষ্য দিতে দেকি কাঠুুরিয়াকে, তারপর একজন সন্ন্যাসীকে, তারপর নিহতের স্ত্রীকে। হ্যা, স্বয়ং মৃত সামুরাইকেও আমরা সাক্ষ্য দিতে দেখি! জঙ্গলে খুন হবার জায়গাটাতে পাওয়া আলামতের সঙ্গে এই সাক্ষীদের বিবরণের মিল আছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এরা সবাই সামুরাই খুনের দায়িত্ব নিজের নিজের কাঁধে নিতে চায়! যেটা বিচারকার্যে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আসলে এই বিচারকার্যে কে খুনী এটা বের করবার দায় থেকে তো কুরোসাওয়া এই কাহিনী ফাঁদেননি। তিনি ‘সত্য’ নিয়ে এক ভ্রমণে বেরিয়েছেন। আমরা দেখি সত্য আপেক্ষিক। এই বিচারকার্যে সবার বর্ণনাই ঠিক। কিন্তু দেখায়, অভিজ্ঞতায়, অনুভবে ভিন্নতা রয়েছে। আর এটাই সত্যের ‘অনড়’ অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উল্লেখ্য, এই সিনেমাই পাশ্চাত্য দর্শককে জাপানি সিনেমার সঙ্গে একাত্ম হতে অনুপ্রাণিত করেছে। ছবিটা নিছক যৌনসন্ত্রাসের থ্রিলার হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি জীবনকে বোঝার ক্ষেত্রে দার্শনিক প্রশ্ন দর্শকের সামনে এসে যাবার কারণে। অবশ্য এই দার্শনিক জিজ্ঞাসা কুরোসাওয়ার চলচ্চিত্রে নতুন না। তার ‘সেভেন সামুরাই’ (১৯৫৪), ‘রান’ (১৯৮৫), ‘ড্রাংকেন এ্যাঞ্জেল’ (১৯৪৮), ‘দারসু উজালা’ (১৯৭৫), ‘ড্রিম’, ‘কাগেমুশা’ (১৯৮০), এমন কি ‘রেড বেয়ারড’ও (১৯৬৫) জীবনের দার্শনিক প্রশ্নকে উশকে দেয় বারবার। আসলে জীবনকে অনুভব করবার ক্ষেত্রে এই যে দার্শনিক অন্বেষা এর শিকড় জাপানের সমাজজীবনেই রয়েছে। জাপানি সাহিত্য, চিত্রকলা, মিথ, পুরাণ জিজ্ঞাসায় ভরপুর। সম্ভবত জাপানি চিত্রকলা, বিশেষত জাপানি সমৃদ্ধ ছাপচিত্র তুলনামূলক নতুন শিল্পমাধ্যম হিসেবে জাপানের চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করে থাকবে।
বিশেষত দ্বিতীয় বিস্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানি সিনেমায় জাপানি ফিল্ম মায়েস্ত্রোদের হাতে যে সব সৃষ্টি আমরা দেখি তাতে জীবন, সৃষ্টি, সৃষ্টির উদ্দেশ্যসহ সার্বিক দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপিত হতে আমরা দেখি যেটা ধ্রুপদী জাপানি ছাপচিত্রের মূল স্পিরিট। আর একারণে জাপানি চিত্রকলা আর জাপানি চলচ্চিত্রের ভিতর যে প্রগাঢ় সম্পর্ক এটা সচেতন দর্শক খুব সহজে অনুভব করতে পারেন। ‘রশোমন’কে দেখা ও অনুভব করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টা সামনে না এসে পারে না। তবে এর জন্য দর্শকের আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয় না। সিনেমা নিজেই স্বয়ম্ভর। কুরোসাওয়ার কৃতিত্ব এখানেই। ১৯৯৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৩০ এর অধিক সিনেমা নির্মাণ করেছেন। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন গোটা পনেরো। আর এই সবকিছুর ভিতর তার যে ন্যারেটিভ স্ট্যাকচার সেটাতে তার স্বতন্ত্র সিগনেচার বরাবর রয়েই গেছে। কুরোসাওয়াকে চিনতে দর্শকের একদম বেগ পেতে হয় না। হ্যা, ‘রশোমন’ তো আর দশটা সানেমার মতো না। কিন্তু দর্শককে আগ্রহী করে তুলবার জন্য কুরোসাওয়াকে শৈল্পীক জোরাজুরিতে নামতে হয়নি। চিরায়ত জাপানি সমাজ থেকেও তাকে বিচ্যূত হতে হয়নি। কিন্তু ‘রশোমন’ তো আলাদাই! প্রতিটি মানুষের দেখা, বেড়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা আলাদা। এই যে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা বা বৈপরীত্ব, এটা কি সত্যের কাছে পৌছানোর অন্তরায়? আসলে কুরোসাওয়া এই সত্যের পেছনে দৌড়াননি। সত্য তার কাছে পরম কিছু না। কুরোসাওয়ার ‘সেভেন সামুরাই’ (১৯৫৪)-তেও এটা আমরা দেখি। না কি এ সেই চিরায়ত জীবন জিজ্ঞাসা? যেমনটা গগাঁ এঁকেছেন : ‘কোথা থেকে এসেছি আমরা? আমরা কে? আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ এখন কুরোসাওয়া সমসাময়িক আর কয়েকজন ফিল্মমাস্টারের কাজের কথা বলা যাক। যেমন রবার্তো রোসেলিনির ‘Journey to Italy’ (1954), সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫), ফ্রাঁসোয়া ক্রুফোর ‘The 400 Blows’ (1960), বুনুয়েলের ‘নাজারিন’ (১৯৫৮), ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০)। এইসব ফিল্মমায়েস্ত্রোর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভিতর আমি বাছাইকরা এই চলচ্চিত্রগুলোর নাম বললাম। কেন না এগুলো কোন না কোনভাবে কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ এর এ্যাটিচ্যুড, ন্যারেটিভ স্কিল আর টেক্সচারের কারিশমায় সঙ্গে আত্মীকভাবে সম্পৃক্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এরা কাজ করেছেন। আর বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্বাভাবিক মানবিক বোধের চ্যূতি ও ধ্বংসের ভিতর থেকে এরা এক হয়েছেন, এই গ্রহে জীবের বেঁচে থাকবার নিদারুণ আকুতি থেকে। এই আকুতিই উঁকি দেয় অসংখ্য প্রশ্নের সমন্বয়ে। ‘রশোমন’ তাই মানবিক বিপর্যয়ে দার্শনিক প্রত্যয়ের দলিল।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
