দীপান্বিতা

ইনিড ব্লাইটন

পরিণত বয়সে শিশু মনের প্রাণবন্ত আঙ্গিনায় প্রবেশ করে তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া সুললিত ভাষায় ঠিক শিশুদের মতো করে উপস্থাপন করা খুব কঠিন কাজ। যে সকল সাহিত্যিক এই কঠিন কাজকে সহজ করে বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম ইনিড ব্লাইটন। বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাইকেল উডস যথার্থই ইনিড ব্লাইটন সম্পর্কে মন্তব্য করে লিখেছিলেন, ‘তিনি শিশু হয়ে জন্মেছিলেন, সারা জীবন শিশুর মতোই সহজ সরল থেকেছেন, অবশেষে শিশুর মতই ছোটদের বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে তাঁর সাহিত্যসম্ভার গড়ে তুলেছিলেন।’

ইনিড ব্লাইটন দীর্ঘ ৪০ বছরের কর্মময় জীবনে শিশুদের নিয়ে ছশরও বেশি বই রচনা করেছিলেন। তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত রচনার নাম দা ফেমাস ফাইভ। জুলিয়ান, ডিক, অ্যানি, জর্জ এবং টিম নামে একটি কুকুর— এরাই হলো দ্য ফেমাস ফাইভের মূল চরিত্র। ১৯৮০ সালের মধ্যে ইনিডের লেখা এই রচনা বিশ্বের বাজারে ছ কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়। প্রায় ৭০ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল এই রচনা।

শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নগরী লন্ডন। এখানেই ইস্ট ডুলউইচ নামক স্থানে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে ১৮৯৭ সালে ইনিডের জন্ম হয়। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবা টমাস ক্যারিব্রাইটন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষার জন্য বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। মায়ের নাম থেরেসা মেরি হ্যামিল্টন। তিনি ছিলেন একটু ভিন্ন ধরনের আত্মকেন্দ্রিক মহিলা।

ছোটবেলায় সকলের ধারণা ছিল তিনি একজন উঁচু মাপের সঙ্গীতজ্ঞা হবেন। কিন্তু লেখার জন্য তীব্র আকর্ষণ তাঁকে সাহিত্যের দিকে নিয়ে যায়। ইনিডের বয়স যখন খুব কম তখন থেকেই তিনি তাঁর রচনাগুলি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাঠাতে থাকেন। ১৯১৭ সালে একটি ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রথম কবিতা হ্যাভ ইউ প্রকাশিত হয়। এরপর একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে চাইল্ড হুইসপার্স, রিয়েল ফেয়ারিস পোয়েমস, রেস্পন্সিভ সিঙ্গিং গেমস, দা ইনিড ব্লাইটন বুক অফ ফেয়ারিজ, সংস অফ গ্ল্যাডনেস, দা জু বুক ইত্যাদি। 

ইপসুইস হাই স্কুল থেকে কিন্ডারগার্ডেন স্কুলের শিক্ষিকা হওয়ার ট্রেনিং নিয়ে তিনি নিজেই ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল খোলেন। এরপরই তিনি তাঁর সমস্ত মন সাহিত্য রচনার মধ্যে নিয়োগ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি শিশুদের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন যার নাম ছিল সানি স্টোরিজ। 

১৯২৪ সালে হুগ পোলক নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। এই বিবাহিত জীবন দীর্ঘ ১৮ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৪২ সালে এই প্রথম বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৪৩ সালে কেনেথ ডারেল ওয়াটারস নামে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে আবার তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ভদ্রলোক যদিও কানে শুনতে পেতেন না কিন্তু ইনিড তাঁকে একজন মনের মানুষ হিসেবেই পেয়েছিলেন।

১৯৩০ সালে তাঁর মনে এক গভীর আধ্যাত্মিক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। কঠোর বাধা নিষেধ, গোঁড়ামিতে পরিপূর্ণ রোমান ক্যাথলিক ধর্মের উপর তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।

১৯৩৮ সালে শিশুদের অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে লেখা প্রথম বই দ্য সিক্রেট আইল্যান্ড প্রকাশিত হয়। এই বইটির সাফল্য তাঁকে পরবর্তীকালে দ্য ফেমাস ফাইভ, দ্য সিক্রেট সেভেন ইত্যাদি সাড়াজাগানো লেখা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন লেখার গতি কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তবুও এই সময়ে সানি স্টোরিজ,

টোয়েন্টি মিনিট টেলস এবং টেলস অফ বেটসি মে পত্রিকাগুলিতে ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। 

১৯৪৯ সালে আর একটি বিখ্যাত রচনা লিটল নডি গোজ টু টয়ল্যান্ড প্রকাশিত হয়। প্রত্যাশার সমস্ত গণ্ডি ছাপিয়ে বিশ্বের বাজারে লক্ষ লক্ষ কপি এই বই বিক্রি হয়েছিল। এই সাড়াজাগানো লেখনীর মূল চরিত্র নডির নাম তখন সবার মুখে মুখে। এই লেখার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে অনেক নাটক, এমনকি সিনেমাও তৈরি হয়েছিল। 

১৯৫০ থেকে ১৯৬০, এই সময়ে তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন তিনি। সমালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল নডি চরিত্র। অন্যের লেখা ধার করে নিজের নামে সেটা ছাপিয়ে ছিলেন এই ধরনের নোংরা সমালোচনাও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে এই অবান্তর সমালোচনা বেশি দিন টেকেনি। সমস্ত সমালোচনা ভেঙে গিয়ে আবার নতুন উদ্যমে বিক্রি হতে থাকে তাঁর রচনাবলী।

১৯৬৭ সালে দ্বিতীয় স্বামী মারা যান। বেশিদিন একা থাকতে হয়নি তাঁকে। ১৯৬৮ সালের নভেম্বরের এক হিমেল রাতে ঘুমের মধ্যে দিয়ে চিরনিদ্রায় চলে যান শিশুদের একান্ত মনের মানুষ ইনিড ব্লাইটন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *