তপোপ্রিয়
রূপকথার রাজ্যপাট
সেই পিঁপড়ের মত অবস্থা আমার। এক দানা চিনি যার কাছে অনেক তাকে যদি এক বস্তা চিনির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয় তো কী যে দুরবস্থা হবে তার !
মাকে নিয়ে কিছু লিখব ভাবলেই অজস্র স্মৃতি ভিড় করে এসে সমস্ত অস্পষ্ট করে দেয়। তখন কেমন বিহ্বল লাগে, যেন কিছুই মনে থাকে না। বড় বিষাদ ঘনিয়ে আসে আমার মধ্যে। আবার আতঙ্ক হয় এই ভেবে যে বুঝি মায়ের অস্তিত্ব ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় অবসাদ যদি সে আপন পরিবেশ হারিয়ে ফেলে। শৈশবে যে পরিবেশের সঙ্গে কারও আত্মীয়তা গড়ে ওঠে সে-ই তার আপন। অনাবিল মাঠ, জঙ্গলে যাওয়া টিলা, জলাজমি, বাঁশঝাড়ের ধারে জোনাকিখচিত অন্ধকার ঢাল, এরা আমার শৈশবের স্বজনসুখ। সেই আপন প্রদেশ থেকে বিচ্যুত হয়ে আমার মধ্যে অহরহ হাহাকার রাবণের চিতা। এদের প্রত্যেকের অভাব মাকে হারাবার মতোই বেদনাদায়ক। সময়কে যেমন শূন্যতল থেকে আলাদা ভাবা যায় না তেমনি মা আর শৈশবের ওই বান্ধব পরিবেশ কোনমতেই পরস্পরবিচ্ছিন্ন হতে পারে না।

আমাদের বাড়ির একেবারে শেষে ছিল ডাকমা জলা। সেই আশ্চর্য জলাভূমির নিবাস এখনও আমার মনে। উঁচু টিলা নেমে গেছে জলার দিকে, নেমেই আমাদের পুকুর। একধারে বেতঝোপ, পুকুরের মধ্যেই তার সবংশ-সংসার। পুকুরের অন্য পাশে গা এলিয়ে থাকা এক অলস আমগাছ, বর্ষায় পুকুরের জল ফুলে উঠলে ওই গাছের পাতা আর ডালপালাও ডুবে যেত। কোন এক ছাইরঙা ভোরে ওই আমগাছের পুকুরে ঝুলে থাকা এক ডালে গলায় দড়ি দিয়েছিল কানাই-বলাইদের এক ভাই ধীরা, তার আবার খানিকটা পাগলাটে হাবভাব।
ওই পুকুরের বাঁ ধার থেকে শুরু আমাদের ধানের জমি। আয়তনে সেই জমি বিঘা তিনের মত, স্থানীয় ভাষায় বলা হত তিন কানি। জমিটা ছিল আমাদের আয়ের প্রধান উৎস। বছরে জমি থেকে ধান পাওয়া যেত ৩০ মন বা তার একটু বেশি। ওই থেকে সারা বছরের খোরাক মিটিয়ে যেটুকু অতিরিক্ত থাকত বিক্রি করে দিত মা। নগদ টাকার বড়ই টানাটানি ছিল। দাদাকে পড়াতে হত হোস্টেলে রেখে। যতটা সম্ভব নগদ টাকা পাওয়ার জন্য মা কোন বছর জমিটাকে বর্গা দিত, কোন বছর নিজেই লোক দিয়ে চাষ করাত। বছরের পর বছর চলত মায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কিভাবে আয় বাড়ানো যায়।
আরও খানিকটা ধানের জমি ছিল আমাদের ওই জলাতেই। তা অবশ্য অনেকটা দূরে। সমস্ত জমিতেই ফসল পাওয়া যেত বছরে মাত্র একবার, শীতকালে। অন্যসময় জলা ডুবে থাকত জলে। বর্ষাকালে বৃষ্টির জল উঁচু টিলা থেকে গড়িয়ে জলায় এসে ঠাঁই নিত। তিনটি ধারই জলা থেকে অনেক উঁচু। আমাদের ধারটাই হবে কমবেশি চার-পাঁচতলা, কেবল উত্তর দিকে পুব ঘেঁষে প্রায় জলা সমতলে জনবসতি, ওখানকার জনপদের নাম কুশামারা। ওই গ্রামেরই পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আমার আরেক স্বজন, গোমতী নদী। বর্ষাকালে সেই নদীর জলে ভাসতো কুশামারা গ্রাম। হু হু করে জল ঢুকত ডাকমা জলাতেও।
আমাদের ছিল একদা নদীকেন্দ্রিক জীবন। নদীকে সঙ্গী করে, তার ছায়ায় খেলে-বেড়িয়ে মানুষ হতাম আমরা। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বিষয় অথবা কোন না কোন মানুষ প্রিয় থাকে। প্রিয় কবি, প্রিয় ফুল, প্রিয় গল্প, প্রিয় নেতা। তেমনি আমাদের জীবনে থাকত প্রিয় নদী। আর জীবনের এই বাঁকে এসে উপলব্ধি করতে পারছি, একেবারে সত্যি সত্যি, ওই গোমতী আমার প্রিয় নদী। আরেকটি নদীর নাম মনে হলেও আমি স্বপ্নাবিভূত হয়ে পড়ি, সে আমাজান। কিন্তু সে স্বপ্নেই থাকে, নাগালের বাইরে, তাকে ছোঁয়া যায় না। সে আমাকে মুগ্ধ করে, বিস্মিত করে কিন্তু বন্ধু হতে পারেনা। আমার আপন নদী ওই গোমতী, তার সঙ্গেই প্রাণ খুলে সুখ-দুঃখের গল্প করা যেত।
এ এক অবাক হিসেবে। সেই কুশামারা গ্রামে আমার যে কজন বন্ধু ছিল তাদের সবাইকে বছরে অন্তত একবার ঘরছাড়া হতে হত গোমতীর অত্যাচারে। তবু কোন আশ্চর্য রসায়নে তারাও ভালোবাসত গোমতীকে। তাদের কথাবার্তায় দেখতাম ওই নদী প্রাত্যহিক রুটিনে অঙ্গীভূত।
এমনি করে আমার মায়ের প্রিয় নদী হয়ে উঠেছিল বুড়িগঙ্গা। ঢাকা শহরে মায়ের শৈশব-কৈশোরের সঙ্গী ছিল ওই নদী। যখনই মা গল্প শোনাত তার ছোটবেলার, বুড়িগঙ্গা নদী প্রসঙ্গ হয়ে আসত প্রায় সময়ই অনিবার্যভাবে।
গোমতীর জলে বন্যা ডাকত প্রত্যেক বর্ষায়। কোন বার বেশি, কোন বার কম। যেমনই হোক বন্যার আকার ডাকমা জলা ডুবে যেত আকন্ঠ। জল উঠে আসত টিলার গায়ে অনেকটা উচ্চতা অব্দি। আমাদের পুকুরটার কোন আর অস্তিত্ব থাকত না। জল থৈথৈ ডাকমা জলা তখন আমার কাছে আলাদা একটা অনুভূতি, তাকে দেখে আমি আন্দাজ করতে চাইতাম অতলান্তিক মহাসাগর। কোন কোন বার বন্যা আয়তনে বড় হলে সত্যি সত্যিই ডাকমা জলার ও প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যেত না। জলকে দেখতাম আমাদের টিলার গা বেয়ে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে আসছে। মা আবার প্রহরে প্রহরে টিলার ধারে গিয়ে জলের ঊর্ধ্বগতি মেপে দেখত আর এসে আমাদের জানাত,
‘আর আটটা সিঁড়ি বাকি আছে।’
টিলার ডাল অনেকটাই খাড়াভাবে নেমে গিয়েছিল আমাদের পুকুর পাড়ের দিকে। নামার রাস্তাটা সুবিধেজনক করার জন্য মাটির গায়ে কেটে কেটে ধাপ ধাপ বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হয়তো কুড়ি-পঁচিশটা ধাপ ছিল সবমিলিয়ে। একটার সঙ্গে অন্যটার আকার বা উচ্চতা এক ছিল না কোথাও।
‘হায় হায়! যেভাবে জল বাড়ছে আমাদের বাড়িও না জলের তলায় চলে যায়।’
বন্যা যে বার বড় হত আর জল টিলার গা বেয়ে আটটা-নটা ধাপ পর্যন্ত উঠে আসত মা বলতো মুখেচোখে চিন্তার ছাপ এনে, তবে চিন্তাটা কৃত্রিম। বলত মা মজা করে। আসলে বন্যার এগিয়ে আসা আর টিলার গা বেয়ে উঠে আসতে থাকা জলকে দেখা ছিল এক দারুণ আকর্ষণ। সত্যি সত্যি দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না বলেই ব্যাপারটা উপভোগ করা যেত। মা আবার বলত পরক্ষণেই,
‘তবে আমাদের টিলা ডুবলে গোটা রাজ্যটাই ডুবে যাবে।’
ডাকমা জলা নামটা কিভাবে এসেছিল জানতাম না। শুনেছিলাম ডাকমা শব্দটা বাংলা নয়, উপজাতীয় ভাষার নাম। তার মানেটা কী কোনদিন জানতে ইচ্ছে হয়নি তখন। থৈথৈ জলে গোটা একটা আকাশ দেখা যেত। জলার তলাও মাথার ওপরের আকাশটার মতোই অন্তহীন ভাবতে ভাবতে বড়ই উদাসীন হয়ে পড়তাম।
বর্ষাকালে যেমনই হোক শীতের শুরুতে জল নেমে যেত জলা থেকে। কিছুটা জল থাকত যদিও, কোথাও এমনকি হাঁটু ডোবানো, চারা ধানের রোয়া দিতে সমস্যা হত না, মাথা ঠিক জেগে থাকত জলের ওপর। বসন্তে জলা শুকিয়ে যেত। দিগন্তজোড়া কেবলই সবুজ আনন্দ।
জলার দক্ষিণ আর পুব দিক দিয়ে বড় রাস্তা চলে গিয়েছিল। মহকুমা সদর শহর উদয়পুর তার লক্ষ্য। রাস্তা কেবল দক্ষিণে দেখা যেত এক ঝলক, গাছপালার সমারোহে তার আভাস ছিল না আর কোন অংশে। পুবদিকে এক জায়গায় গাছগাছালির ভিড় ঠেলে দু’-একটা ন্যাড়া জায়গা উঁকি মারত, অতদূরের পুকুরপাড় থেকেও দেখে বোঝা যেত ওখানে রয়েছে উঁচু টিলার ধনুকাকৃতি ঢাল। আর ওই ঢালের গায়ে বা ওপরে ছড়ানো-ছিটানো কয়েকটি ঘরবাড়ির ছোট ছোট পুতুল পুতুল আকার, যেমন ছিল সব বাড়িঘর ওখানকার। মাটির বা বেড়ার দেয়াল আর উলুখড়ের ছাউনি। বিক্ষিপ্ত কিছু উন্নতদেহী মহীরূহেরও অস্তিত্ব বোঝা যেত। ওই দিকটা ছিল আসলে পালাটানা নামের এক অঞ্চল, অধিকাংশই নবীন-প্রবীণ শাল গাছে ছাওয়া সুগভীর জঙ্গল। অবিরাম অরন্য ভূমির স্থানে স্থানে ফাঁক-ফোকর পেলে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি বাড়িঘর, যেমন ডাকমা জলার ওই ধারে।
সুযোগ পেলেই চলে যেতাম জলার ধারে। সকালে, দুপুরে, বিশেষ করে বিকেলে। সবুজ সম্ভারে গৌরবান্বিত ডাকমা জলাকে লাগত যেন স্বর্গীয় উপঢৌকন। পুকুর পাড়ের ঘাস বিছানো নিটোল কাব্যে বসে প্রাণের মধ্যে কী যেন আনচান করতে থাকত। কেবলই মনে হত রং-তুলি দিয়ে আঁকবোই জলাটাকে, আর নয়তো খাতায়-কলমে লিখব এর দেহসৌষ্ঠদের আনুপুঙ্খিক বিবরণ। তার পূর্ব প্রান্তে শাল অরণ্য সীমান্তের পুতুল পুতুল ঘরগুলি দেখে ভাবতাম ওটাকে রূপকথার রাজ্য হতেই হবে। আমার কেবলই ইচ্ছে হত, জলা পেরিয়ে যাবোই যাবো ওই জনপদটাতে। না জানি কী অনুত্তর রহস্য বা বিস্ময় রয়েছে ওইখানটাতে।
আমাকে পুকুরধারের দিকে যেতে দেখলেই মায়ের আতঙ্ক হত। বাধা দিত হরদম।
‘একা একা যাবি না রে বাবা, অন্তত দুপুরবেলা। কত আপদ-বিপদ থাকে।’
আমি সাঁতার জানতাম না। মায়ের ভয় ছিল যদি দৈবাৎ কখনও পুকুরে পড়ে যাই। দুপুরে-বিকেলে চারপাশে লোকজন প্রায় থাকতই না।
‘অসাবধানে যদি জলে পড়ে যাস রক্ষে আছে ? কেউ টেরও পাবে না।’
বর্ষার শেষে শরতে জলায় জল বেশ কমে আসত। শাপলা-শালুক, পানিফল আর জলঝাঝি উদ্ভিদের সমারোহ তখন চারপাশে। শালুক পাতায় বড় বড় পদক্ষেপ ফেলে দৌড়ে বেড়াত জলপিটি। মাকে লুকিয়ে দুপুরে-টুপুরে জলার জলে নেমে যেতাম কখনো-সখনো। শাপলা ফুল বা শালুক, পানিফল সংগ্রহ করার প্রবল আকর্ষণ। আবার জলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াত বালি হাঁসের দল। ওদের দেখে আমার রক্তে পূর্বপুরুষের আদিম অভ্যাসের স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। জলে নেমে সন্তর্পণে বালিহাঁসের পিছনে ঘুরে বেড়াতাম, খেয়াল থাকত না জল উঠে এসেছে কোমর পর্যন্ত।
একবার সত্যি সত্যি একটা শিকার করে ফেলেছিলাম। এক ছোট্ট বালিহাঁসের বাচ্চাকে যেভাবেই হোক ধরতে পেরেছিলাম। চেষ্টায় কী না হয় ? বাচ্চাটাকে নিয়ে রাজ্যজয়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাড়িতে আসার আগেই মায়ের মুখোমুখি। মায়ের চোখমুখের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি স্মৃতিতে। একটা বাঁশের সরু কঞ্চি নিয়ে মা আমাকে ধরে একের পর এক মেরে ছিল পিঠে-পায়ে।
মাকে আর খোঁজার চেষ্টা করি না। মা চলে যাওয়ার এত বছর পর বুঝেছি, মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও। আমি কেবল মাঝেমধ্যে খুঁজে দেখি আমার পা আর কোমর। কোথায় মেরেছিল মা আমাকে সেদিন, কঞ্চির সেই দাগগুলি খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। আর বলি আপনমনে, ‘কোথায় মেরেছিলে গো মা !’
মাকে আর খুঁজে পাবোনা জানি, যদি অন্তত মায়ের কঞ্চির দাগগুলিও আমার গায়ে খুঁজে পেতাম !
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
