রম্যরচনা

অধ্যায় : ১৩

কোথায় আগে থাকতো জানা নেই। বিগত মাস থেকে পাশের বাড়িতে থাকতে শুরু করেছে সে। তারপর থেকেই জীবনে শুরু হয়েছে এক নতুন উপদ্রব। অন্য কথায় বলা যায়, যমযন্ত্রণা। লোকটা দেখতে-শুনতে গোবেচারা ধরনের হলেও শত্রুতা করার জন্মগত প্রতিভাসম্পন্ন। নামটা জানা গেছে ইদানিং। আর তা হল মধুরেন সমাপয়েৎ। হাচিয়া ফাল গত এক মাসে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে লোকটার নাম আর চরিত্র কতটা পরস্পরবিরোধী। নামে মধু ঝরে পড়ছে, স্বভাবে কিন্তু মধুর বালাই নেই।

এখানে আসার পর প্রথম চার-পাঁচ দিন লোকটা কী জীব বোঝা যায়নি। বোঝা গেল হঠাৎই একদিন সন্ধের পর যখন পাশের বাড়িতে থাকা লোকটার ঘর থেকে সানাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগলো। গোড়ায় মিহি ছিল আওয়াজটা, ক্রমশ তার তীব্রতা বাড়তে শুরু করল এবং এক জায়গায় এসে স্থিত হল তারপর। ওই একই তীব্রতায় একই মাত্রায় বেজেই চলল। প্যাঁ-য়াঁ-য়াঁ-য়াঁ- একটানা ওই ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজ বা আর্তনাদ কান ঝালাপালা করে দিয়ে থামলো ঘন্টা দুয়েক পর। এই দু’ঘণ্টা হাচিয়া ফাল সুস্থির হয়ে না পারল বসে বা শুয়ে থাকতে না হাঁটাচলা করতে। দুর্ভাগ্যক্রমে, তার ঘরের জানালাটা আবার ওই লোকটা যে ঘরে বসে সানাই বাজাচ্ছিল সে ঘরের জানলার মুখোমুখি। নিজের ঘরের জানলা সে বন্ধ করে দিয়েছিল সানাইয়ের শব্দ থেকে রেহাই পেতে, কিন্তু ওই মধুরেন সমাপয়েৎ নামের বেয়াক্কেলে সানাইবাদক লোকটা তার ঘরের জানলা খোলা রেখেছিল। সানাই বাজাবার শখ তো নিজের ঘরের জানালা বন্ধ রেখে যত খুশি বাজাও বাপু, কিন্তু ঘরের জানলা-দরজা খুলে তারস্বরের সানাই বাজিয়ে পাশের বাড়ির লোককে অতীষ্ঠ করে মারা, এ আবার কী অসভ্যতা! 

ব্যাপারটা যে কী হতে যাচ্ছে সেটা সে ওই প্রথম দিনে কল্পনাও করতে পারেনি। বুঝতে পারল তারপরের কয়েকদিনে। রোজই সন্ধের পর থেকে শুরু হতে লাগলো সানাইয়ের হাহাকার এবং চলল কয়েক ঘন্টা। এই কয়েকদিনে হাচিয়া ফালের জীবন কালি হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তবুও সেটা ছিল মন্দের ভালো, রক্ষা ছিল অনেকটাই। কিন্তু তারপর থেকে ওই বিটকেলে সানাইবাদক মধুরেন সমাপয়েৎ যা করতে লাগলো তা রীতিমতো অত্যাচার। এতদিন সে সানাই বাজাচ্ছিল সন্ধে থেকে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। এবার সে দেখা গেল বাজাচ্ছে রাতে যখন-তখন। রাত বারোটা, একটা-দুটো, তিনটে এইরকম। আবার ভোর চারটে-পাঁচটা বা পাঁচটা-ছটা যখন খুশি। কেবল রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও সে বিভিন্ন সময়ে বাজাতে লাগলো সানাইয়ের হাহাকার। শুনতে শুনতে তার পাগল হওয়ার জোগাড়। কানে তুলো গুঁজে বা আরো নানা উপায়ে কান ঢাকাঢাকি করেও সে এই বীভৎস সানাইয়ের আওয়াজ থেকে বাঁচতে পারছিল না। তার ভেবে অবাক লাগছিল যে পাশাপাশি থাকা অন্য সব প্রতিবেশীরা কিভাবে দিনরাত সানাইয়ের এই বিকট আওয়াজ বরদাস্ত করছে। এই ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করতে নেমে সে হতভম্ব হয়ে গেল। পাশাপাশি বাড়ির দু-তিনজনের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে একজন বলল, 

‘কেন সানাই-এর আওয়াজ তো বেশ মিষ্টি। শুনতে তো ভালই লাগে।’

অন্য একজন বলল, 

‘তোমার অত আপত্তি কেন? গান-বাজনা পছন্দ করো না নাকি?’ 

আরেকজন বলল, 

‘এসব উচ্চমানের বাজনা। হলে টিকেট কেটে দেখতে হয়। বিনি পয়সায় শুনতে পাচ্ছ যে সেটা তো ভাগ্যের ব্যাপার।’

প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া দেখে ও শুনে হাচিয়া ফাল হতাশ হয়ে গেল। সানাইবাদকের কোন দোষ দেখতে পেল না কেউ, উল্টে তাকেই নিন্দেমন্দ করল সবাই। অবশ্য প্রথম প্রথম অবাক হলেও পরে সে বুঝলো যে তার প্রতিবেশীদের কাছে যাওয়াটাই বোকামি হয়ে গেছে। ওই লোকগুলি সবাই তার শত্রু। তারা তাকে সমর্থন করবে না, এ আর কী আশ্চর্যের কথা? 

কিন্তু সানাই-এর এমন উৎপাত সহ্য করা যাচ্ছে না। কী করা যায়? কিছুতো একটা করতেই হবে। ভাবতে ভাবতে কোন সমাধানই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে সানাই বেজেই চলেছে দিনের নানা সময়ে। শেষে মরিয়া হয়ে হাচিয়া ফাল একদিন দুপুর বেলায় সানাই বাজানোর জ্বালায় অস্থির হয়ে গিয়ে হাজির হলো সেই সানাইবাদকের বাড়ি। গিয়ে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই ইচ্ছেমতো ডোরবেল বাজাতে লাগলো। সানাই থেমে গেল। কী বলে লোকটাকে বকাবকি করবে যখন তার একটা মহড়া দিচ্ছিল সে তখনই দরজা খুলে গেল, দরজায় দাঁড়ালো এসে সেই মধুরেন সমাপয়েৎ। তাকে দেখেই লোকটা বিগলিতভাবে উচ্ছ্বাসের গলায় বলল, 

‘আরে, আপনি! কী সৌভাগ্য আমার! আসুন আসুন, ভিতরে আসুন।’

বলেই লোকটা তাকে হতবাক করে দিয়ে তার হাত ধরে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে জানাতে তাকে ঘরে ঢুকিয়ে বসালো আর বলল, 

‘বসুন বসুন। আমি ভাবতেই পারছিনা আপনি নিজে এসেছেন আমার বাড়ি। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে! একটু বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি।’

তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মধুরেন সমাপয়েৎ দ্রুতপায়ে ভিতরে চলে গিয়ে এলো অন্তত মিনিট দশের পর, দু’হাতে বড় দুই ট্রে-তে করে চা-স্ন্যাক্স-মিষ্টি ইত্যাদি পঞ্চাশরকম খাবারদাবার নিয়ে। সেসব সামনের টেবিলে রেখে তাকে বিনীত সুরে আপ্যায়ন করে বলল, 

‘এই সামান্য কিছু আয়োজন করলাম আপনার সম্মানে। যদি গ্রহণ করেন তো ধন্য হব। এত কষ্ট করে এলেন, সব খেতে হবে কিন্তু।’

খাবারগুলি এতই লোভনীয় যে হাচিয়া ফাল অভিযোগ ভুলে গিয়ে খেতে শুরু করল। এত সাধাসাধি করছে যখন লোকটা! সে যখন খাচ্ছিল তখন মধুরেন সমাপেৎ মোলায়েম গলায় বলছিল, 

‘আপনার মত গুণী ব্যক্তি প্রথমবার আমার বাড়ি এলেন। তেমন কিছু আয়োজন করতে পারলাম না, বড়ই দুঃখের কথা। আপনি আমার সানাই শুনে প্রশংসা করতে এসেছেন, জানি। আজকাল আপনার মত এমন মহান বোদ্ধা শ্রোতা ক’জন আর আছে বলুন? আমার বাজনা যে আপনাকে এত মুগ্ধ, এত সন্তুষ্ট করেছে তাতে আমি ধন্য।’

বলে কী রে লোকটা! হাচিয়া ফাল খাবার খেতে খেতে খাবিও খাচ্ছিল। এতটাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল এবং খাবার খেতে এমনই ব্যস্ত ছিল যে কিছু আর বলতেই পারল না। হঠাৎ ‘দাঁড়ান, আসছি’ বলে মধুরেন সমাপয়েৎ দৌড়ে ভিতরে চলে গিয়ে আবার দু’ মিনিটের মধ্যেই এসে হাজির হাতে সেই সানাই নিয়ে। বলল, 

‘আপনি আমার এত গুণমুগ্ধ শ্রোতা, এত কষ্ট করে সানাই শুনতে আমার বাড়ি এসেছেন আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করে, সানাই অবশ্যই শোনাবো। আপনাকে হতাশ করবো না।’

হাচিয়া ফাল প্রতিবাদ করা বা অভিযোগ জানানো দূরের কথা, মুখ খুলে খাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারল না। মধুরেন সমাপয়েৎ সানাই বাজাতে শুরু করল, একেবারে তার মুখের সামনে। ঘরে বসে সানাই শোনা তবুও ভালো ছিল, দূরত্ব ছিল অনেকটাই। এখন সানাই বাজছে তার কানের কাছে। সে নিরুপায় হয়ে শুনতে লাগল পাথরের মূর্তির মত। যে লোকটা সদ্য সদ্য অত আপ্যায়ন করে অত কিছু খাওয়ালো তাকে এক্ষুনি বকাবকি করা যায় কী করে? 

বাড়ি ফিরল হাচিয়া ফাল কোন অভিযোগ না জানিয়েই, উল্টে সানাই বাজনার প্রশংসা করে। চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে! জীবনে এমন বোকা হতে হয়েছে তাকে খুব কমই আর মধুরেন সমাপয়েৎ লোকটার মতো এমন চালাক শত্রু কটা দেখেছে তাও যথেষ্ট মনে করতে পারল না। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *