সুকান্ত পাল
পুত্র দুর্যোধন এবং শ্যালক শকুনির যুক্তিকে কিছুতেই এড়াইতে পারিলেন না ধৃতরাষ্ট্র। মনে মনে ভাবিলেন, ঠিকই তো প্রজারা পান্ডবদের শাসন মানিয়া লওয়ার অর্থই হইল তাহার পুত্রদের এবং প্রপৌত্রদের সিংহাসনে বসিবার আশা চিরকালের মতন শেষ হইয়া যাওয়া এবং নতশিরে পান্ডবদের অধীনস্থ হইয়া থাকা।
আবার অন্যদিকে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রদের বনবাসে পাঠাইতেও মন সায় দিতেছে না। নিজের সঙ্গে নিজের অন্তরের দ্বদ্বে তিনি একটু বিচলিত হইয়া পড়িলেন ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত শকুনির বাক্যজাল ও যুক্তিজালকে আর খন্ডন করিতে পারিলেন না। অবশেষে তিনি দুর্যোধন ও শকুনির প্রস্তাবে রাজি হইয়া গেলেন।
ভ্রাতৃবধূ কুন্তী সহ পঞ্চ পান্ডবদের বনবাসে পাঠাইবার সমস্ত আয়োজন হইল। দুর্যোধন কথা দিয়াছিল,অত্যন্ত মনোরম ও মনোমুগ্ধকর স্থান বারণাবতে পান্ডবদের বসবাসের জন্য একটি প্রাসাদ তিনি নির্মাণ করাইয়া দিবে। সে তাহার কথা মতো সেই স্থানে সত্যিই একটি সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করাইয়া দিয়াছিল। দুর্যোধনের নির্দেশে ধৃতরাষ্ট্রের নিজের লোকজন বারণাল্লবতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া চারিদিকে প্রচার করিতে শুরু করিল। অনেকে এমন কথাও বলিল,
— অনেক সৌভাগ্য করিয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিলে বারণাবতে বসবাসের সুযোগ ঘটে।
এই কথা শুনিয়া পঞ্চ পান্ডবের মনের মধ্যে এক সুপ্ত আনন্দের তরঙ্গ জাগিয়া উঠিল। যদিও তাহাদের মনে একটা শঙ্কা কাজ করিতেছিল কিন্তু এতো বিপুল প্রচারে তাহাদের সেই শঙ্কা দূরীভূত হইল এবং তাহারা রাজি হইয়া গেল। তখন বারণাবতে দেবাদিদেব মহাদেবের উৎসব উপলক্ষ্যে প্রচুর জনসমাগম হইয়াছে। চারদিকে এক মহা উৎসবের আয়োজন ও ধূমধাম চলিতেছে। খবর প্রচার হইয়া গেল যে ইহার মধ্যে হস্তিনাপুর হইতে স্বয়ং রাণীমাতা কুন্তী দেবী তাহার পাঁচজন সুযোগ্য পুত্রদের লইয়া বারণাবতে আসিতেছেন। তাহাদের বসবাস করিবার নিমিত্তে এক অপূর্ব ও অনিন্দ্য প্রাসাদ শিবভবন নির্মাণ করাইয়া দিয়াছেন তাহাদের জ্ঞাতি ভ্রাতা দুর্যোধন। সত্যিই এমন ভ্রাতৃ প্রেম দুর্লভ। ইহার ফলে তাহাদের এই উৎসবের আয়োজন দ্বিগুন হইয়া গেল। শুধু তাহাই নহে তাহাদের মনের আনন্দ যেন চতুর্গুন হইয়া উঠিল । তাহারা আত্মহারা হইয়া উৎসবের আয়োজন শুরু করিয়া দিল।
আসল সংবাদটি জানিতেন বুদ্ধিমান ও মহাজ্ঞানী বিদুর। তিনি জানিতেন, শুধু মাত্র হস্তিনাপুর হইতেই পান্ডবদের বিদায় করিবার উদ্দেশ্যে নয়, এই পৃথিবী হইতে পান্ডবদের অস্তিত্ব মুছিয়া ফেলিবার এক মহা চক্রান্ত ছিল এই বনবাসের মধ্যে। তিনি বনবাসে যাইবার পূর্বেই যুধিষ্ঠিরকে ইঙ্গিতে তাহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী যুধিষ্ঠির সেই ইঙ্গিত সম্যকভাবে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছিল।
বারণাবতের প্রাসাদ তখনও সম্পূর্ণরূপে নির্মিত হয় নাই। তাই অরণ্যের একস্থানে পর্ণ কুটির নির্মাণ করিয়া কুন্তীদেবী তাহার পুত্রদের লইয়া বাস করিতে লাগিলেন। কয়েকদিন পরই পুরোচন তাহার উপর ন্যস্ত কর্ম সমাধান করিল। প্রাসাদ সম্পূর্ণ রূপে নির্মাণ হইয়া যাওয়ার পর পুরোচন তাহাদের সেই অনুপম প্রাসাদে লইয়া গিয়া তুলিল।
বারণাবতের বিলাসবহুল শিবভবন নির্মাণের দায়িত্ব দুর্যোধন দিয়াছিল তাহার একান্ত ঘনিষ্ঠ ও সহযোগী পুরোচনের উপর। পুরোচন যখন পঞ্চ পান্ডব এবং তাহাদের মাতা কুন্তী দেবীকে সেই বিলাসবহুল প্রাসাদে আনিয়া তুলিল তখন সেই প্রাসাদে প্রবেশ করিয়াই ঘি,চর্বি ও গালার গন্ধ যুধিষ্ঠির পাইয়াছিল। কিন্তু কাহাকেও তাহা ঘুণাক্ষরে বুঝিতে দিল না এমনকি তাহার সন্দেহের কথাও বলিল না।
কিন্তু তাহার কুঞ্চিত কপাল এবং চক্ষের ভাষা কুন্তীদেবী বুঝিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে তাহার মনের কথা খুলিয়া বলিতেই যুধিষ্ঠির বলিল,
— এক্ষণে বিশ্রাম লওয়ার প্রয়োজন। আমরা আগে আহারাদি করিয়া বিশ্রাম লই। তাহার পর রাত্রিকালে সকলে মিলিয়া আলোচনা করিয়া সিদ্ধান্ত লওয়া যাইবে।
সেই মতো সবাই আহারাদি করিয়া বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হইল।
কিয়ৎকাল বিশ্রাম লইবার পর পাঁচ ভাই প্রাসাদের বাহিরে আসিয়া প্রাসাদের চারিদিক ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিল।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামিয়া আসাতে তাহারা সবাই গৃহে প্রবেশ করিল। তাহার পর তাহাদের মাতা কুন্তী দেবীকে সঙ্গে লইয়া আলোচনায় বসিল। যুধিষ্ঠির ধীর এবং শান্ত কন্ঠে বলিতে লাগিল,
— মহাজ্ঞানী বিদুর জানাইয়াছেন আমাদিগকে পুড়াইয়া মারিবার ছলে এই প্রাসাদ নির্মাণ করাইয়াছে দুর্যোধন। এই প্রসাদ সম্পূর্ণরূপে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ দিয়া নির্মাণ করা হইয়াছে।
যুধিষ্ঠিরের মুখে এই কথা শুনিয়া ভীমসেন ও অর্জুন ভীষণ রাগিয়া গেল। ভীম তৎক্ষণাৎ তাহাদের প্রাসাদে প্রহরী রূপে দন্ডায়মান পুরোচনকে আছাড় মারিয়া তাহার ভবলীলা সাঙ্গ করিতে উদ্যত হইল। যুধিষ্ঠির এবং মাতা কুন্তীদেবী তাহাদের সেই কার্য হইতে নিবৃত্ত করিলেন। তখন ভীমসেন বলিল,
— এই প্রাসাদে বসবাস যদি আমাদের বিপদের কারণ হয় তাহা হইলে এই বারণাবতে আসিয়া যেই গৃহে প্রথম উঠিয়াছিলাম সেইখানেই চলিয়া যাই।
— না ভীম, সেইটা হইবে মুর্খতার পরিচয়।
— কেন?
— আমরা এই প্রসাদ ত্যাগ করা মানেই পুরোচন বুঝিতে পারিবে যে আমরা সব কিছু টের পাইয়া গিয়াছি। তখন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করিয়া আমাদের এক্ষণেই পুড়াইয়া মারিবে। তখন আমাদের সমগ্র সাম্রাজ্য কৌরবদের দখল করিতে আর কোনো অসুবিধা হইবে না। তখন আমাদের দেহভষ্ম এই অরণ্যে চৈত্রের হাওয়ায় উড়িয়া বেড়াইতে বেড়াইতে ক্রন্দন করিবে শুধু।
এতক্ষণ কুন্তীদেবী চুপ করিয়া ছিলেন। দুই পুত্রের কথা শুনিয়া তিনি বলিলেন,
— তোমরা ধৈর্য্য সহকারে আমার কথা শোনো। আমিও মহাজ্ঞানী বিদুরের নিকট হইতে সব অবগত হইয়াছি।
— মাতা আপনি সব অবগত আছেন! তবুও আপনি এতো শান্ত হইয়া আছেন !
অর্জুন বিষ্ময় প্রকাশ করিল।
কুন্তীদেবী স্মিত হাস্যে কহিলেন,
— বিপদের কথা জানিয়া শান্ত থাকিয়া শত্রুর বিনাশের পন্থা খুঁজিতে হয়। কখনোই শত্রুকে তাহা বুঝিতে দেওয়া উচিত নয় যে তাহার অভিসন্ধি তোমরা বুঝিতে পারিয়াছ। ইহাই তো রাজনীতির এবং শত্রু জয়ের পন্থা।
— তাহা হইলে আপনি কী আদেশ করেন মাতা?
অর্জুন এবং ভীমসেন একযোগে প্রশ্ন করিল।
তাহাদের কথা শুনিয়া কুন্তীদেবী কহিলেন,
— তোমাদের জেষ্ঠ্য ভ্রাতার সঙ্গে আমার আলাপ আলোচনা হইয়াছে। যুধিষ্ঠির অত্যন্ত বিবেচকের ন্যায় সব পরিকল্পনা করিয়াছে।
— কী পরিকল্পনা?
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিল।
কুন্তীদেবী যুধিষ্ঠিরকে ইশারায় তাহার পরিকল্পনার কথা অন্যান্য ভ্রাতাদের নিকট সবিস্তারে ব্যাখ্যা করিবার জন্য বলিলেন। যুধিষ্ঠিরের মুখে সব পরিকল্পনার কথা শুনিয়া অন্যান্য ভ্রাতারা তাহাদের মাতা এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বুদ্ধির তারিফ না করিয়া পারিল না।
তাহাদের পুড়াইয়া মারিবার দিনক্ষণ স্থির হইয়াছিল আগেই। সেই খবর যুধিষ্ঠির জানিতে পারিয়া বুঝিল এখনো কয়েক মাস বাকি আছে সেই মহা ভয়ংকরের দিনটা। এই সুযোগে বিদুর প্রেরিত খনক তাহাদের জতু প্রাসাদের চারিদিকে পরিখার মাটি কাটিবার অছিলায় এক বিশালাকৃতির গর্ত খনন করিল। বিপরীত দিকে জতুগৃহের উঠানের দিকে সুড়ঙ্গ খুঁড়িয়া তাহার মুখগহ্বরটি আড়াল করিয়া রাখিল।
এই কয়েক মাস সময়ের মধ্যে পঞ্চ পান্ডবরা বারণাবতের এক অরণ্য হইতে অণ্য অরণ্যে মৃগয়া করিয়া বেড়াইত এবং সমগ্র এলাকার আনাচে কানাচে ঘুরিয়া ঘুরিয়া সেই এলাকার অরণ্যচারী মানুষদের সহিত ভাব ভালোবাসা জমাইয়া তুলিল। শুধু তাহাই নহে, এইভাবে ঘুরিয়া ফিরিয়া তাহারা এলাকার বিভিন্ন রাস্তাঘাট নিজেদের নখদর্পণে লইয়া আসিল। এইভাবে অরণ্যের প্রতিটি অঞ্চলে ভ্রমণের ফলে বেশ কিছু অরণ্যচারী মানুষ ও পরিবারে সহিত তাহাদের সখ্য গড়িয়া উঠিল। যুধিষ্ঠির একটি নিষাদ পরিবারের সন্ধান পাইল যেই পরিবারের এক মাতার পাঁচ পুত্র। তাহাদের সহিত পরিচিত হইয়া যুধিষ্ঠিরের মাথায় বিদ্যুতের ন্যায় একটা ঝলক খেলিয়া গেল।
(দুই)
কয়েক মাস পর খনকের মারফৎ বিদুর খবর পাঠাইলেন যে আগামী কৃষ্ণা চতুর্দশীর মধ্যযামে জতুগৃহে অগ্নিসংযোগ করিয়া তাহাদের ইহলীলা সাঙ্গ করা হইবে। ঐ গৃহে অগ্নিসংযোগ করিবে পুরোচন নিজে। পুরোচন সেইহেতু কয়েকদিন যাবৎ অস্ত্রাগারের কার্যে ভীষণভাবে মগ্ন রহিয়াছে। খবর পাওয়া মাত্র কুন্তীদেবী হিসাব করিয়া দেখিলেন আর মাত্র বারোদিন আছে। তিনি তাহার পুত্রদের ডাকিয়া মধ্যরাত্রে শলা করিতে বসিলেন। তিনিই প্রথম বলিলেন,
— আমার একটি ইচ্ছা আছে।
— কি ইচ্ছা মাতা?
সবাই প্রায় সমস্বরে জিজ্ঞাসা করিল।
— আগামী গুরুবারের রাত্রিতে এলাকার যত ব্রাহ্মণ ও অধিবাসী আছে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে দান ও ভোজন করাইতে চাই।
যুধিষ্ঠির বলিল,
— এই প্রস্তাব তো উত্তম।
তাহার কথায় অন্য ভ্রাতারাও নির্দ্ধিধায় সমর্থ জানাইল।
যুধিষ্ঠির একটু ইতস্তত করিয়া বলিল,
— কিন্তু আমার আরো একটা শর্ত আছে মাতা।
— কি শর্ত?
কুন্তীদেবী জানিতে চাহিলেন।
কিছুক্ষণ ভাবিয়া যুধিষ্ঠির বলিল,
— এই অরণ্যে আমাদের সহিত এক নিষাদ পরিবারের পরিচয় ঘটিয়াছে এবং তাহাদের সহিত বেশ বন্ধুত্বও স্থাপিত হইয়াছে। এক নিষাদ প্রৌঢ়া তাহার পাঁচ পুত্রকে লইয়া বসবাস করে। ঠিক আমাদের যতোই। এই কারণ বশতঃ তাহারা আমাদের ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে।
জেষ্ঠ্য পুত্রের মুখে এই কথা শুনিয়া কুন্তীদেবীর চক্ষুদ্বয় ঝিলিক মারিয়া উঠিল। একটু সময় লইয়া তিনি কহিলেন,
— বেশ তো তাহাদেরও নিমন্ত্রণ জানাইও । কিন্তু..
— কিন্তু কি মাতা?
অর্জুন প্রশ্ন করিল।
— ভুলিয়া যাইও না আমাদের পরিবার রাজপরিবার।
— জানি তো..
— আমাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিতে হইলে উপযুক্ত পোশাক পরিধান করিয়া আসিতে হইবে। তাহা না হইলে সকল নিষাদরাই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিতে চাহিবে।
— তাহা হইলে উপায় কী মাতা?
যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করিল।
— তুমি তাহাদের প্রত্যেকের জন্য উপযুক্ত পোশাক দিয়া আসিবে এবং বলিবে, ইহা রাণীমা তোমাদের জন্য উপহার স্বরূপ পাঠাইয়াছেন।
নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যা হইতেই বারণাবতের ব্রাহ্মণরা ভোজন উপলক্ষ্যে জতুপ্রাসাদে আসিতে শুরু করিল। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই রাজকীয় পান ও ভোজন শুরু হইল। চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল। প্রত্যেকের সঙ্গে নিষাদ মাতা ও তাহার পাঁচ পুত্র এবং পুরোচনও প্রভূত পরিমাণে মদ্য পান করিয়া বেহুঁশ হইয়া পড়িল।
পুরোচনের প্রচুর পরিমাণে মদ্যপানের কারণ হইল তাহার মনের গভীর আনন্দ। আনন্দ হইয়াছিল এই কারণেই যে আর পাঁচ দিন পর সে নিজের হস্তেই কুন্তীদেবী সহ পঞ্চ পান্ডবকে পুড়াইয়া মারিবার স্বর্গীয় সুখ অনুভব করিতে পারিবে এবং এই মহৎ কার্য সিদ্ধি করিবার ফলে দুর্যোধনের নিকট হইতে যথেষ্ট পরিমাণ উপহার পাইবে।
মাত্র তো আর কয়েকটা দিন বাকি!
পান ভোজন সমাপনান্তে সব অতিথিরা বিদায় নিল যথাসময়ে। কিন্তু নিষাদ মাতা ও তার পাঁচ পাঁচটি পুত্র এবং পুরোচন মদ্যের নেশায় একেবারে বেহুঁশ হইয়া মৃতবৎ পড়িয়া রহিল। তাহাদের শরীর একেবারে অসাড় হইয়া পড়িয়াছে। বিন্দুমাত্র জ্ঞান নাই।
ঠিক এই সময় যুধিষ্ঠিরের নির্দেশে মাতা কুন্তী ও অন্যান্য ভ্রাতাদের লইয়া অর্জুন মাটির নিচের সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করিল। অন্যদিকে যুধিষ্ঠিরের নির্দেশ মতো ভীমসেন সেই জতুগৃহের চারিদিকে অগ্নিসংযোগ করিয়া জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সহিত সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করিয়া একেবারে গঙ্গার তীরে গিয়া সকলে মিলিয়া উঠিল।
পিছনে মানুষের চিৎকার ও হাহাকার বাতাসের ডানায় ভর করিয়া ভাসিয়া আসিতেছিল।
সবাই ভাবিল রাণীমা কুন্তীদেবী তাহার পাঁচ পাঁচটি পুত্রকে লইয়া ঐ জতুগৃহে ভষ্মীভূত হইয়া গিয়াছে। এই খবর নিমিষেই প্রচার হইয়া গেল। এলাকার মানুষ রাণীমা এবং তাহার পাঁচ পুত্রের জন্য কাঁদিয়া বুক ভাসাইল। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই খবর গিয়া পৌঁছাইল হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে। এই সংবাদে দুর্যোধন আনন্দে অট্টহাসিতে ফাটিয়া পড়িল। তাহার অট্টহাসির গমকে গমকে সমগ্র রাজপ্রাসাদ কাঁপিয়া উঠিল।
সামনেই গঙ্গার তীরে নৌকা বাঁধা, মাঝি অপেক্ষারত। ধীরে ধীরে সবাই নৌকাতে উঠিবার পর নৌকা ছাড়িয়া দিল।
তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার দিকে তাকাইয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতা সহদেব খুবই নিম্নস্বরে বলিল,
— অপরাধ লইবেন না, নিষাদ জননী ও তাহার পুত্রদের এইভাবে অকারণে পুড়িয়া মরিবার কারণ কি?
কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রশ্নে যুধিষ্ঠির শুধুমাত্র বলিল,
— সাম্রাজ্য ও ক্ষমতা রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষের জীবনকে পাশার চাল হিসাবে ব্যবহার করাই তো রাজার নীতি!
কুন্তীদেবী তখনও নিরুত্তর।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
