অমিতাভ সরকার
এই তো ভালো লেগেছিল
অর্ঘ্য সেন
অর্ঘ্য সেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের উদাসী বাউল এই প্রচারবিমুখ শিল্পী তাঁর গভীর ভাব এবং চিরসবুজ কণ্ঠ দিয়ে ভরিয়ে রাখেন আপামর শ্রোতাদের মন। অনাড়ম্বরপ্রিয় দরাজ গলার এই মানুষটি নীরবে চলেও গেলেন। ওঁর কণ্ঠের গানগুলো সম্পদ হয়ে রইল চিরায়ত কালের তরে। ‘আমার শেষ পারানির কড়ি’,’প্রভু আমার, প্রিয় আমার’,’প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে’,’খোলো খোলো দ্বার’,’দ্বারে কেন দিলে নাড়া’- তো বটেই, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গানেও তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন নীরব আত্মনিবেদনের। ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া’, ‘যদি মরমে লুকায়ে রবে’(কান্ত গীতি), ’তুমি মধুর ছন্দে’(অতুলপ্রসাদী)- ইত্যাদি গানও ওঁর সুললিত কণ্ঠে কালোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
সন্তোষ সেনগুপ্ত, সুপ্রভা সরকার, কান্ত-কবির দৌহিত্র দিলীপকুমার রায়ের কাছে নজরুলসঙ্গীত, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গান শিখেছিলেন। বেতারে একটা সময় নিয়মিতভাবেই নজরুলসঙ্গীতও গেয়েছেন। তবে পরের দিকে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতই গাইতেন।
অর্ঘ্য সেনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১১ই নভেম্বর বাংলাদেশের খুলনা জেলার দৌলতপুরে সেনহাটি গ্রামে। মা বিন্দু দেবীই ছিলেন ওঁর গানের প্রেরণাদাত্রী। তবে অকালে গত হওয়ায় মাকে বেশিদিন পাননি। বাবা হেমেন্দ্রকুমার দৌলতপুর কৃষি কলেজের সহ-অধ্যক্ষ ছিলেন। এই কলেজেরই অধ্যক্ষের স্ত্রী হাসি বসু ছিলেন শান্তিনিকেতনের মানুষ। এই বোসদিদির কাছ থেকেই অর্ঘ্য সেনের রবীন্দ্রসঙ্গীতের আগ্রহ জন্মায়। বেতারে পঙ্কজকুমার মল্লিকের ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’ শুনতে খুব পছন্দ করতেন।

পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল। দেশভাগের কারণে দিনাজপুর, বেনারস হয়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়, এখানেই বালিগঞ্জ গভমেন্ট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটে’ চাকুরিলাভ, পরে যে দপ্তরের নাম হয়েছিল ’ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গেনাইজেশন’। দীর্ঘ চাকরিজীবন কাটিয়ে এখান থেকেই অবসর নিয়েছিলেন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি কিন্তু গান শেখাটাও চলেছে পুরোদমে। ১৯৫১ সাল থেকে টানা বারো বছর রবীন্দ্রগানের কিংবদন্তী দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে গানের তালিম নিয়েছেন (আর্থিক অনটনের কারণে মাসিক পাঁচ টাকা মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না, তবে গুরু জর্জ বিশ্বাস তা মুকুব করে দিয়েছিলেন। অর্ঘ্য সেন সারাজীবনে গুরুর অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে গেছেন, একটিবারের জন্যেও বিস্মৃত হননি।)। প্রথমে অর্ঘ্য সেনের গায়কিতে গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের প্রভাব থাকলেও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ওঁর নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি হয়- এতেই অর্ঘ্য সেনের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়তে থাকে (আশ্চর্যের কথা এটাই যে- এই ভবিষ্যৎবাণী তাঁর একান্ত অনুগত শিষ্য অর্ঘ্য সেনের সম্বন্ধে ভূয়োদর্শী জর্জ বিশ্বাসই করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে অবিশ্বাস্যভাবে খেটে যায়। ভাবলে বিস্ময় জাগে, এইরকম ‘দেবতা’-কেও খ্যাতির শীর্ষে থাকা সময়ে নানা অছিলায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড করা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।)
অর্ঘ্য সেন মানেই দেবব্রত বিশ্বাস পরম্পরার সার্থক উত্তরসূরী, তবে উনি নির্দিষ্ট কোনো নামের বৃত্তে আটকে থাকেননি কখনোই, নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন সময়ের সঙ্গে, আত্মস্থ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথের মধুর ভাবে। গুরু দেবব্রত বিশ্বাসও সেটাই চাইতেন। তাই অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাসের এই সুযোগ্য শিষ্যটি পরবর্তীকালে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজেশ্বরী সাচদেব(দত্ত), ঋতু গুহ, পূর্বা দাম, নীলিমা সেন, শুভ গুহঠাকুরতা প্রভৃতি রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীদের পাশাপাশি নিজেরও একটা শ্রদ্ধার স্থায়ী জায়গা গড়ে তুলতে পেরেছেন। অর্ঘ্য সেনের গান মানেই এক অতিন্দ্রিয় সুধারস ঢালা প্রাণের আকুল আকুতি- স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে তা যেন শান্তির জীবন বাণী হয়ে মরমে প্রবেশ করে। স্বরক্ষেপণ, ভাব, সুর -এসব তো আছেই – কোন ধরনের গানে গলার কীরকম ওঠানামা হবে (বিখ্যাত সুরকার কমল দাশগুপ্ত, ফিরোজা বেগমের কাছে শেখা ভয়েস মডুলেশনের ট্রেনিং তো ছিলই) -তার এক স্বার্থক দৃষ্টান্ত এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। ‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না’, ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’, ‘ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী’, ‘এই তো ভালো লেগেছিল’ কিংবা সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘নীল অঞ্জনঘনপুঞ্জছায়ায়’, ‘ওগো কিশোর আজি’, ঋতু গুহের সঙ্গে ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’,’আমরা সবাই রাজা’, -এ সবই অনুভবের মারের সাগর পাড়ি দিয়ে সুরের দিগন্তে মেঘ জমানোর মতো।
মঞ্জুশ্রী চাকি সরকার, শান্তি বসুর সঙ্গে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে অংশ নিয়েছিলেন। ‘বহুরূপী’-র সঙ্গেও দীর্ঘদিন সম্পর্ক ছিল তাঁর। ‘রক্তকরবী’,’চার অধ্যায়’, ‘দশচক্র’-য়ে অংশ নিয়েছিলেন। ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ গীতিনাট্যেও অংশ নিয়েছিলেন গানে। হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের একনিষ্ঠ একজন গুণী শিল্পী।
আচ্ছা, একজন সার্থক রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীর কী কী থাকা চাই? শুধুই কণ্ঠ, না সুর, ভাব, ভক্তি, অন্তর -সকলই দোসর…স্বরলিপির রক্ষণশীলতার প্রাধাণ্যই বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ – বর্তমান কালে এইসব প্রশ্নগুলোই যখন প্রাধান্য পাচ্ছে, অর্ঘ্য সেনের স্বতঃস্ফূর্ত গায়ন সেখানে আবেগের হৃদ-যন্ত্রকে মূর্ছনার এক সুরেলা দ্যোতনার মীড়ের আবছায়ায় শ্রোতাদের শান্তি দেয়, জন্ম লাভ হয় নতুন এক পরিমিত বোধের।
তবে রেকর্ড ছাড়াও গান শেখানো, অনুষ্ঠানে কিংবা শান্তিনিকেতনের খোলা মাঠে গান গাওয়া -অর্ঘ্য সেন যেন আরও অনবদ্য। আসলে অর্ঘ্য যাঁর নাম, তিনি সাধনা না করে থাকবেন কী করে!
ওঁর গানে যন্ত্রানুসঙ্গ ছিল সীমিত, যা কখনোই কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায়নি।
ফলাফল নিয়ে ভাবেননি। রবীন্দ্রসঙ্গীত বাণীপ্রধান, তাই সেই অমৃতমন্ত্রে পুজো করে গেছেন আজীবন। ১৯৯৭ সালে পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক আকাডেমী পুরস্কার। সুচিত্রা-কণিকার পরে এই দুর্লভ সম্মানের অধিকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
পেয়েছিলেন টেগোর ফেলো সম্মানও। তবে আসল পুরস্কার তো শ্রোতাদের অকুণ্ঠ প্রশংসা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।
গানের পাশাপাশি ভালোবাসতেন রান্না করতে, সূচিশিল্পের হাতও ছিল দারুণ। শিষ্য-শিক্ষার্থী, অনুরাগী-অনুরাগিনী সবাইকে নিয়ে হইহই করে থাকতেন। শান্তিনিকেতন নিজের বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘অর্ঘ্য সেনের খোঁয়াড়’। পুরোটাই কালো রঙের অন্য ধরনের বাড়ি। পরে অবশ্য সেটা ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হয়।
কলকাতায় সন্তোষপুরে বোনের সঙ্গে থাকতেন। শেষ জীবনে একাকিত্ব, হতাশা মনের মধ্যে এসে গিয়েছিল। গলা ভালো থাকলেও ফাংশন করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অভিমানও হয়তো হয়েছিল। স্বাভাবিক। বার্ধক্যজনিত কারণে শেষের দিকে কষ্ট বেড়েও গিয়েছিল। ২০২৬ সালের ১৪ই জানুয়ারি চলে গেলেন সুরলোকে, বুঝতেই পারল না কেউ।
শিল্পীরা প্রয়াত হলে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি অনুযায়ী রবীন্দ্রসদনে নিয়ে যাওয়াও হয়নি।
তবুও অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা তো কোথাও আর কম পড়ে যায় না।
চলে গিয়েও তাই রয়ে যান সুন্দরের পরম আরাধনা নিয়ে – ‘কবে তুমি আসবে বলে’,’ওহে সুন্দর মরি মরি’ কিংবা ‘আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান’ -এর আন্তরিক সাধনায়- ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে’…অনন্তের সঙ্গীতময় ওপারে। অনেক না-পাওয়ার মধ্যেও নব্বই বছরের দীর্ঘজীবনে রবীন্দ্রনাথের গানের সুধাভাণ্ডার কণ্ঠে যেভাবে ধারণ করেছেন -সেখানে দুনিয়ার সব অপ্রাপ্তি মিলিয়ে যায় অপার্থিব অনাস্বাদিত তুরীয় পরমানন্দে। অর্ঘ্য সেন তাই চিরবন্ধু চিরনির্ভরের নির্ভরতায় পরম সার্থক। সার্থক তাঁর গান।
‘ফল ফলাবার আশা’-ও তাই মনে রাখেননি। বিরাট বিরাট মহীরূহের মধ্যে কিছুটা আন্ডাররেটেড হলেও রাবীন্দ্রিক শ্রদ্ধার মায়াভরা গ্রামে এই প্রবীণ মানুষটি চিরদিনই রয়ে যাবেন -তাঁর মেঘমেদুর স্বরের আনন্দ জাদুতে – সে ‘আমায় সকল রকমে কাঙাল করেছো’, বা ‘আমার প্রিয়ার ছায়া’,’আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার’, ‘আমার হিয়ার মাঝে’ -যে গানেই হোক না কেন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
