তুষার বরণ হালদার
লেখক পরিচিতি
তুষার বরণ হালদার নদীয়ার আড়ংঘাটা গ্রাম থেকে স্কুল শিক্ষা শেষ করে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি পান নদীয়া জেলার অসংগঠিত শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর গবেষণা করে । গবেষণা কর্মের ওপর ভিত্তি করে দুটি বই এবং বিভিন্ন গ্রন্থ ও জার্নালে বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের জন্য তিন বার পুরস্কৃত হন। এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য। বর্তমানে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত দক্ষিণবঙ্গের একটি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক।
বিষয় পরিচিতি
(ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু বীর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাত্রিকার মুক্তির জন্য। তাদের মধ্যে অনেকের নাম আমরা জানি, তার থেকে বেশি না জানি আরও অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম। তাঁদের সংগ্রাম ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনে অমর হয়ে রয়েছে; অক্ষয় গাথা হয়ে বিরাজ করছে। অথচ তাঁদের সম্পর্কে সেভাবে কোন আলোচনা বা উল্লেখ চোখে পড়ে না। গান্ধী, নেতাজি, প্যাটেল, আজাদ বা ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, বিনয় – বাদল – দীনেশ এবং আরও বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পর্কে আমরা অবহিত। অথচ এর বাইরে যে বহু মানুষ ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছিলেন যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনে অসাধারন কৃতিত্ব, সাহস এবং আত্ম্যোৎসর্গের অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। কেতাবি অর্থে যাঁদের বলা হয় ‘Unsung Heroes’ তাঁদের কথাই আমরা অবজ্ঞাত স্বাধীনতা সংগ্রামী, এই নতুন ধারাবাহিকে নিয়মিত আলোচনা করব।)
বীর বিপ্লবী যতীন দাসের অনশনে আত্মত্যাগ
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অনেক বীর বিপ্লবী রয়েছেন যাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা অনেকেই জানিনা। এমনকি প্রচলিত ইতিহাস বইতে হয়তো তাদের নাম উল্লেখিত রয়েছে কিন্তু তাদের অবদান সেভাবে চর্চিত হয়নি। আমাদের এই পর্ব শুরু করব এমন একজন তরুণ বিপ্লবীর কাহিনী দিয়ে, যিনি মাত্র ২৪ বছর বয়সে অনশনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সহ্য করেছিলেন ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম শারীরিক যন্ত্রণা এবং মানসিক অত্যাচার। কিন্তু তিনি তাতে না দমে নিজের জেদ এবং দেশমাতার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবনত হয়ে ব্রিটিশের অত্যাচার, অবিচার এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন। তাই তিনি মরেও মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে রয়েছেন। প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ যতীন দাস নামক মেট্রো স্টেশন থেকে বিভিন্ন দিকে যাতায়াত করেন এবং হাজরা মোড় দিয়ে চলাচল করেন, সেখানে যতীন দাস এর নামাঙ্কিত একটি পার্কও আছে কিন্তু কজন জানেন এই সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ বীর সন্তানটির আত্মত্যাগের কাহিনী! যতীন দাস এর জন্ম ১৯০৪ সালে। পুরো নাম যতীন্দ্র নাথ দাস, ডাক নাম ‘ খেঁদু ‘, মাত্র চব্বিশ বছরের জীবন। লাহোর সেন্ট্রাল জেলের লকআপে ১৯২৯ সালের ১৩ ই জুলাই থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৬৩ দিন উপবাস করে ভারত মাতার পদতলে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।
এমন ঘটনা ভারতবর্ষের ইতিহাসের ইতিপূর্বে আর ঘটেনি, এমনকি বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল। যতীন দাস এর অনশনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করার ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বে ১৯২০ সালে ঢাকা জেলে তিনি একটানা ২৩ দিন অনশন করেছিলেন। তার প্রাথমিক কাজকর্ম শুরু হয় ‘ বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স ‘ বাহিনীর সাথে। ১৯১৮ সালে কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশন ‘ বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স ‘ বাহিনী গড়ে উঠলে সুভাষচন্দ্র তার জেনারেল কমান্ডিং অফিসার নিযুক্ত হন। দক্ষিণ কলকাতা থেকে বিশেষ করে যে স্বেচ্ছা সৈনিক বাহিনী সংগঠিত হয়েছিল তার নায়ক ছিলেন মেজর সত্য গুপ্ত। সত্য গুপ্তের প্রধান সহায়ক ছিলেন মেজর যতীন দাস। যতীন দাসের মন পড়েছিল বাংলার বাইরে গোপন কার্যকলাপে। কাজেই ভলেন্টিয়ার্স বাহিনীর দৈনন্দিন কর্মে নিযুক্ত হওয়ার অবকাশ তার কম ছিল বারে বারে তাকে বাইরের আহ্বানে সাড়া দিতে হতো। ওদিকে ভগৎ সিংদের নেতা ছিলেন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল; যতীন দাসের ও তিনি নেতা। ভবানীপুরে যতীন্দ্র তার সাথে যোগদান করেন। দক্ষিণেশ্বরের বিপ্লবী দলের সঙ্গেও যতীনের যোগাযোগ ছিল। ১৮২৪ সালে শচীন বাবুর নির্দেশ পালন করার ফাঁকে ফাঁকে কলকাতা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বা ‘ তরুণ সমিতি ‘ গড়ে তোলার ব্যাপারে যতীন দাসের অবদান প্রচুর। তার এই কার্যকলাপে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রমাদ গোনে, তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলে স্থানান্তরিত করে। সেখানে জেলবন্দীদের ওপর অমানবিক আচরণ এবং অত্যন্ত খারাপ পরিবেশে তাদের থাকার জন্য তিনি এর প্রতিবাদে ২৩ দিন অনশন করেছিলেন। তার দাবির অনেকটাই কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়েছিল।
বিপ্লবের আগুন বহ্নিশিখার মতন জ্বলেছিল ১৯২৯ সালের জুন মাসের দিকে। প্রথমে পুলিশ অফিসার সান্ডার্স কে হত্যা যার পেছনে বটুকেশ্বর দত্ত, ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরুদের হাত ছিল। আরেকটি ভয়ংকর আক্রমণ হয়েছিল দিল্লির সেন্ট্রাল এসেম্বলি হলে বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। সেই হলে জন সাইমন সাহেব বিশিষ্ট দর্শকদের স্থানে উপস্থিত। দর্শকদের গ্যালারিতে লোক ধরে না। কতগুলো জরুরী বিল নিয়ে আলোচনা হবে। স্পিকারের আসন অলংকৃত করেছেন বিঠল ভাই প্যাটেল। এমন সময় আচম্বিতে ঘটলো বিপ্লবী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের আবির্ভাব। তারা ছড়িয়ে দিলেন দর্শকদের গ্যালারি থেকে রেড প্যামফলেট তারপর গর্জে উঠলো বিপুল শব্দে জীবন্ত বম্ব। সে এক বিস্ময়কর বস্তু। তাদের ইস্তাহারে লেখা ছিল: ” বধির কে শোনানোর জন্য প্রচন্ড কণ্ঠস্বর প্রয়োজন – সরকারপক্ষ শুনে রাখুন যে তাদের ‘ পাবলিক সেফটি বিল ‘ বা ‘ ট্রেড ডিস্পিউট বিল ‘ কিংবা তাদের কৃত লালা লাজপত রায়ের হত্যার প্রচণ্ড প্রতিবাদ আমরা করে যাচ্ছি ভারতের অসহায় জনসাধারণের পক্ষ থেকে। “
তরুণ বিদ্রোহীদের রেড প্যামফ্লেট – র অগ্নিশ্রাবি ভাষায় ভারতবর্ষের মানুষ শৌর্যময় এক যুগে আবির্ভূত হল। পরাধীনতার অবসাদ, দৈন ও দুর্বলতা যেন নিমেষে ঘুচে গেল। প্রধান বিপ্লবীরা এবার মর্মে মর্মে অনুভব করলেন:
” বিদ্রোহী নবীন বীর স্থবিবের শাসন নাশন,
বারে বারে দেখা দিবে।”
কারণ, তাদেরই উদ্দেশ্যে জাতির যৌবন চিরকাল হৃদয় থেকে বলে এসেছে:
” আমি রুচি তারই সিংহাসন; তারই সম্ভাষণ।”
প্রবীণ নেতারা এবার হয়তো নতুন করে বুঝলেন যে ‘ সানডার্স হত্যা ‘, ‘ এসেম্বলিতে বোমা বিস্ফোরণ ‘, ‘ ডে ‘ নিধন – এসব কোন অ্যাকশনে সন্ত্রাসমূলক কাজ নয়। এসব জাতির উদাত্ত কণ্ঠ ধ্বনি, আত্ম প্রতিষ্ঠাকল্পের সবল হস্তের কৃপাণ ঝঞ্জনা। হাজার হাজার সত্যাগ্রহ, মিটিং, প্রশাসনের কাছে আবেদনে যা না হত, তার চেয়ে বহুগুণ কাজ হয় ভগত বটুকেশ্বরের নিক্ষিপ্ত বোমার গগনভেদী শব্দে। তাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সুযোগ্য ভ্রাতা ব্রিটিশ সরকারের প্রাক্তন ল মেম্বার এস. আর. দাসের মতো স্থিতপ্রাজ্ঞ ব্যক্তিও এ প্রসঙ্গে তার পুত্রকে এক পত্রে লিখেছিলেন ” That the boom was necessary to awaken England”. আর এই বোমার মূল কারিগর ছিলেন তরুণ বিপ্লবী যতীন দাস; তার হাতেই তৈরি হয়েছিল এই বোমা। ভগৎ সিং রা আগেই ধরা পড়েছিল। যতীন দাস কে ১৯২৯ সালের ১৪ই জুন তার কলকাতার ভবানীপুরের গৃহ থেকে লাহোর পুলিশের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। শৃঙ্খলিত যতীন দাস আনিত হলেন লাহোর সেন্ট্রাল জেলে। ১৬ই জুন শুরু হলো তাদের বিরুদ্ধে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা।
লাহোর জেলের অস্বস্তিকর পরিবেশ, বন্দীদের প্রতি অমানবিক আচরণ, নিকৃষ্টমানের খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য বৈষম্যমূলক নীতি এবং কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি আমরণ নিরম্বু অনশন শুরু করলেন ১৩ই জুলাই থেকে। ( এখনকার মত অনশন নয়, দিনে না খেয়ে রাত্রে চব্য- চোষ্য – লেহ্য – পেয় গ্রহণের ভন্ডামি) ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ তাকে কোনভাবেই খাওয়াতে রাজি করাতে পারেনি। তার উপর চলতো মানসিক নির্যাতন এবং দৈহিক অত্যাচার। এতদসত্বেও যতীন দাস একটি কণাও গলাধঃকরণ করেন নি বা এক ফোটা জলও কন্ঠনালীতে গ্রহণ করেননি। ব্রিটিশ পুলিশ নানান রকম ভাবে তাকে জোর করে নল ঢুকিয়ে খাদ্য প্রেরণে বাধ্য করেছিল। এই ঘটনা দিনের পর দিন চলেছিল কিন্তু যতীন দাসের তেজ, জিদ এবং প্রতিজ্ঞার কাছে ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচার, ভয়, প্রলোভন পরাস্ত হতে বাধ্য হয়েছিল। ইতি মধ্যে অবশ্য তাঁর সহ বন্দীরা সুখদেব, রাজগুরু, ভগৎ সিং অনশন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু যতীনের অনশন চলল টানা ৬৩ দিন। ১৩ ই সেপ্টেম্বর ১৯২৯ সাল শনিবার, এর আগের দিন তাকে জোর করে গলায় নল ঢুকিয়ে আবার খাবার দেওয়ার চেষ্টা করা হলে মাথা ঘাড় ঝাঁপিয়ে যতীন দাস খাদ্যনালী থেকে কণ্ঠনালীর দিকে নলের মুখকে সরিয়ে দিয়েছিল কিন্তু এতে তার শারীরিক অবক্ষয় শুরু হল। শরীরের একটা দিক পঙ্গু হয়ে গেল। কণ্ঠনালীতে খাদ্য কানা আটকে তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন। এই অবস্থায় ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ নির্মমতার পরিচয় দিয়ে তার সামনে তার পছন্দের বিভিন্ন রকমের খাবার সাজিয়ে তাকে গ্রহণ করতে বলে। যতীন দাস ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে। ইতিমধ্যে তার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেছে, জীবনদীপ প্রায় নির্বাপিত। শেষ ৪৮ ঘন্টা জমে – মানুষে টানাটানি, অসম্ভব বেদনা সয়ে শেষে ১৩ ই সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুর একটা পনেরোতে তার জীবনদীপ নির্বাপিত হল।
মৃত্যুঞ্জয়ী এই বীরের মৃতদেহ লাহোর এক্সপ্রেস করে দিল্লিতে আনিত হল; সেখান থেকে রাত্রি ২:৩০ এ কানপুরে পৌঁছলো। ওই রাত্রে কানপুর স্টেশনে লোকে লোকারণ্য; এরপর সেখান থেকে তার শবদেহ আনিত হয় হাওড়া স্টেশনে। হাওড়া স্টেশনে তিল ধরনের জায়গা নেই যতীন দাস কে শ্রদ্ধা জানাতে ইয়ার্ড লাইন পর্যন্ত জনতার ভিড় লক্ষ্য করা যায়। হাওড়া স্টেশন থেকে যতীন দাসের দেহ কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে আনার ব্যবস্থা হয় এবং সেই শোভাযাত্রায় ব্রিটিশ পুলিশের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছিল। যতীন দাসের খাটিয়ার একটা হাতল সুভাষচন্দ্রের এক কাঁধে তার সঙ্গে ছিলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। বেঙ্গলস ভলেন্টিয়ার্স বাহিনী মার্চ করে সেই মৌন মিছিল কে এগিয়ে নিয়ে আসছিল। সারা রাস্তা সুভাষচন্দ্র খালি পায়ে সেই শবাধার বহন করে এনেছিলেন। এত বড় শোক মিছিল ইতিপূর্বে ভারতবর্ষের কোথাও পরিলক্ষিত হয় নি। মহাশ্মশানে যতীন দাস এর চিতাশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে তার বৃদ্ধ পিতা বঙ্কিমচন্দ্র দাস মহাশয় অতুলনীয় গম্ভীর মন্ত্র উচ্চারণ করে বলেছিলেন ” ওম নারায়ন। যে দেশদ্রোহীরা মাতৃভূমিকে বিদেশীর হাতে সমর্পণ করেছিল তাদের সকলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আমার আদরের খুদুকে (যতীনের ঘরোয়া নাম) অশ্রু অর্ক সহ তোমার চরণে সমর্পণ করলাম। “
যতীন দাস এর মৃত্যুর খবর যখন সন্ধ্যেবেলা বেতার যোগে রবীন্দ্রনাথের কর্ণ গোচরিত হলো। তখন তিনি ‘তপতী’ নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছিলেন। এই সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে কবি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি রিহার্সাল বন্ধ করে দিলেন। এবং প্রচন্ড দ্রুত পাইচারি করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসে ওই রাতেই লিখে ফেললেন একটি গান:
“সর্বখর্ব তারে তহে তব ক্রোধদাহ –
হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত পানে চাহো ।।
দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র-
মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।।”
ওই রাতেই তিনি গানটির সুর দিলেন এবং গানটিকে ” নাটকের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। শোকাহত নেতাজি লিখলেন, “যেমন দধীচি নিজের অস্থিদান করেছিলেন, তেমনি যতীন দাস নিজের জীবন সমর্পণ করেছেন মাতৃভূমির জন্য।”কবি নজরুল লিখলেন বিদ্রোহী মুলক কবিতা ‘ অগ্নিবান ‘। পরে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই কবিতাটি কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সুদূর আয়ারল্যান্ড থেকে ম্যাকসুইনির পরিবার, এই ম্যাকসুইনি আইরিশ বিপ্লবের সময় ব্রিটিশ কারাগারে টানা সত্তর দিন অনশনরত অবস্থায় আত্মত্যাগ করেছিলেন, এক শোক বার্তা প্রেরণ করে লিখেছিলেন: ” টেরেন্স ম্যাকসুইনির পরিজন শোকে ও গর্বে যতীন দাসের মহাপ্রয়াণে দেশপ্রেমী ভারতবাসীদের সঙ্গে যুক্ত হলেন। স্বাধীনতার অভ্যুদয় সুনিশ্চিত…”। অথচ বড়ই আশ্চর্যের যে এই উথাল পাথাল ঘটনায় দেশব্যাপী যখন আলোড়ন চলছে, বিদেশ থেকে শোকবার্তা প্রেরিত হচ্ছে, জাতির পিতা গান্ধীজী তখন নিশ্চুপ, তিনি একটি কথাও এ প্রসঙ্গে ব্যয় করেননি। নেতাজি সুভাষ গান্ধীজিকে কিছু বলার জন্য বারবার অনুরোধ করলে গান্ধীজি বলেছিলেন, “It is a case of diabolical suicide. I have nothing to say.” এই হচ্ছে সেই সময় দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটির তার সহ স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতি আচরণ, যতই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আদর্শ আলাদা হোক না কেন! তাই এখনও তার কীর্তি যে আমরা অনেকেই এখনো জানি না, তাতে আর আশ্চর্যের কী! তাদের জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়েই আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
বিপ্লবের যজ্ঞশালায় চাপেকার ভাইদের আত্মাহুতি
মহারাষ্ট্র তথা ভারতের বৈপ্লবিক কর্মপ্রয়াস এ একই পরিবারের তিন ভাইয়ের অবদান সম্ভবত আর কোথাও নেই, এরা হলেন দামোদর চাপেকার, বালকৃষ্ণ চাপেকার এবং বাসুদেব ঘড়ি চাপেকার। সময়টা ২২ শে জুন ১৮৯৭ সাল মহারানি ভিক্টোরিয়ার জুবিলি সারা সাম্রাজ্যে পালিত হচ্ছে। পুনা শহরেও মহা ধুমধাম সহকারে এই উৎসব আয়োজিত হয়েছিল। ইংরেজ রাজপুরুষ ও ভারতীয়দের আনন্দ প্রকাশের নানা ব্যবস্থা, শহরের নানাস্থানে কাউন্সিল হলে বহু গণমান্য ব্যক্তির সমাবেশ। অত্যাচারী র্যান্ড সাহেব সর্বত্র টহল দিয়ে গভরমেন্ট হাউসে ফিরে গেছেন। তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাত টা, ইতিমধ্যে একটি বেনামী পত্রে তিনি জেনেছিলেন যে জুবিলি দিবসে তার নাকি ঘটবে অবধারিত মৃত্যু তার দুষ্কর্মের শাস্তি স্বরূপ। ওই রাতে র্যান্ড সাহেব এবং আয়ার্ড এরা দুজনেই এই চাপেকার ভ্রাতাদের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
দামোদর হরি চাপেকার ছিলেন পুনার অধিবাসী। শরীরচর্চায় তার দক্ষতা যুবক এবং ছাত্রদের কাছে বিস্ময়কর আকর্ষণ ছিল। সামরিক শিক্ষার প্রতি তার ছিল প্রচুর আসক্তি। ছাত্র ও যুবকদের নিয়ে তিনি দল গঠন করেছিলেন। শুধু বাহির নয় তার গৃহও ছিল তার দলভুক্ত। ছোট ভাইগুলি দলের একনিষ্ঠ সভ্য। দেশবাসীর দুঃখ দূর করার ব্রত গ্রহণ কালেই তার ধারণা হলো যে এই দেশকে দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে না পারলে কোন কল্যাণকর কার্য সফল হবে না। তিনি অধীর হয়ে উঠলেন। লোকমান্য তিলক ছিলেন তাদের আদর্শ। এমন সময় হঠাৎ পুণা শহরে ও তার চতুষ্পার্শে ঘটলো প্লেগের দুরন্ত আক্রমণ। তৎসঙ্গে দুষ্ট গ্রহের মত র্যান্ড সাহেবের পুনাতে আবির্ভাব। অত্যাচার ও অনাচার অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে। দামোদর একান্ত বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করল, র্যান্ডকে শাস্তি দিতে হবে। সেই দণ্ডের স্বরূপ নির্মিত হয়ে গেল।
লক্ষ্য স্থির হওয়া মাত্রই সংগঠন কার্য শুরু হয়ে গেল, জোগাড় করা হলো অস্ত্রশস্ত্র। ছোট ভাই বাসুদেব চাপেকারের উপর ভার দিলেন নেতা দামোদর র্যান্ড সাহেবকে ভালোমতো চিনে নেবার জন্য। বাসুদেবের মাস তিনেক সময় লাগলো র্যান্ডএর চেহারা, গতিবিধি ও আচরণের খুঁটিনাটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে। দামোদর ও তার অন্তরঙ্গ সাথীবৃন্দ চুপ করে বসে ছিলেন না। পূর্বেই বলা হয়েছে জুবিলি ডে এসে গেল। নানা উৎসব কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে সে দিন র্যান্ডকে একাধিকবার হাতের কাছে পেয়ে অ্যাকশনের সঠিক সুযোগ তারা পেলেন না, কাজেই অপেক্ষা করতে হবে। আরো কয়েক ঘন্টা, নয়তো কয়েকদিন বা মাস কিন্তু ধৈর্য হারালে চলবে না। গন্তব্যে তাকে পৌঁছতেই হবে।
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। গভর্ণমেন্ট হাউজের সিংহদ্বারের অনতিদূরে দামোদর চাপেকার লুকিয়ে আছেন। তার অপর ভ্রাতা বালকৃষ্ণ চাপেকার কিছু দূরে রাস্তার পাশে আত্মগোপন করে রয়েছেন। আরও কিছু পথ এগিয়ে ওই রাস্তারই ধারে সংগোপনে অপেক্ষমান মহাদেব বিনায়ক রানাডে। দামোদরের দলের সক্রিয় সদস্য।
সরকারি ভবন থেকে নৃত্যগীত ও খানাপিনা সাঙ্গ করে বেরিয়ে আসছেন অতিথি অভ্যাগতের দল। অন্তরাল থেকে দামোদর পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন বহিরাগত প্রত্যেকটি শ্বেতাঙ্গের মুখ। র্যান্ড যাতে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে না যান। বেরিয়ে এলেন লেফটেন্যান্ট আয়ার্স্ট ও তার পত্নী। একটি ঘোড়ার গাড়িতে তার কয়েক গজ দূরে দূরে আসছিল র্যান্ড সাহেবের গাড়ি। কিছুটা এগিয়ে যেতেই দামোদর একই দূরত্ব বজায় রেখেও গাড়ির পশ্চাতে দৌড়ে চললেন। দৌড়ে এক লাফে তিনি গাড়ির পেছনে উঠেই র্যান্ড সাহেবের প্রায় পিঠ ছুঁয়ে পিস্তলের নিশানা করলেন; গিরি প্রান্তর কাঁপিয়ে গর্জে উঠল বিপ্লবের আয়ুধ। দুর্দান্ত স্যাটানের সকল দম্ভ চূর্ণ করে রক্তাক্তদেহে লুটিয়ে পড়লেন ব্রিটিশ শক্তির প্রতীক র্যান্ড; অসহায়ের দৈন্যে গাড়ির মধ্যে। দশ দিন জমে মানুষের টানা হেঁচড়া করার পর মৃত্যু ঘটেছিল হাসপাতালে ৩ জুলাই ১৮৯৭ সালে।
ওদিকে আবার কিছুটা এগিয়ে এসেছে র্যান্ড এর গাড়ি থেকে আয়ার্স্ট এর গাড়ি। দূরের পিস্তলের গর্জনে আয়ার্স্ট দম্পতি চমকে উঠলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিনায়ক রানাডের পিস্তলের গুলি এসে সমান প্রচন্ডতায় বিদ্ধ করলো আয়ার্স্টকে।মুহূর্তেই পত্নির কোলে ঢলে পড়লেন, তার বক্ষ স্পন্দন আর ফিরে এলোনা। বিপ্লবীর ন্যায়দন্ড রুদ্রের বেশে দীপ্তিমান হয়ে নেমে এলো। দন্ড দান করে দন্ডদাতারা রাতের অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলেন।
ওদিকে কর্তৃপক্ষের মনোভাব ধারণ করা সহজ, প্রথমে বিস্ময় তারপর জিঘাংসা চরিতার্থতার জন্য যা যা করনীয় তাই তাই করেছিল। প্রলোভন ও নির্মম অত্যাচারের বিনিময়ে পুলিশ আততায়ীর সন্ধান পেতে চাইলো, শেষ পর্যন্ত পুলিশ সেই সন্ধান পেল। চাপেকারদের নাম পুলিশ সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল বিস্তর তল্লাশির পর। ৯ আগস্ট দামোদর গ্রেপ্তার হলেন। গ্রেপ্তার হবার পর তিনি যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হল: স্বাধীনতা আপোষরফা ও রিফর্মের পথে আসে না। আত্মসম্মান নতজানু হয়ে রক্ষা করা চলে না। তিনি র্যান্ড সাহেবকে হত্যা করে মহান কর্তব্য পালন করেছেন। এই কার্য দেশবাসীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার দুর্বার তাগিদে করেছেন।
বিচারের নামে প্রহসন হল, বিদ্রোহী দামোদর চাপেকার মৃত্যুদণ্ড লাভ করলেন। হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড স্বভাবতই বহাল রাখল। নির্দিষ্ট দিনে ১৮ই এপ্রিল ১৮৯৮ সাল; ঘড়িতে তখন সময় ৬:৪০ মিনিট, পুনার জারবেদা জেলে ফাসির মঞ্চে দামোদর চাপেকার আরোহন করলেন জীবনের জয়গান গাইবার আনন্দে। তার হাতে ছিল ভগবত গীতা। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন।
এর কিছু দিন বাদেই ধরা পড়লেন দামোদর এর এক ভাই বালকৃষ্ণ চাপেকার। বালকৃষ্ণ কে ধরার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। যার ফলে সুযোগ সন্ধানীদের কাছে লোভের দরজা খুলে গিয়েছিল। তাদেরই কেউ একজন বালকৃষ্ণের সন্ধান দিয়েছিল। ১৮৯৮ সালে হায়দ্রাবাদে তিনি ধরা পড়লেন। ১৮৯৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পুনা সিটি ম্যাজিস্ট্রেট এজলাশে বালকৃষ্ণ চাপেকারের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়। হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছিল প্রায় পৌনে দুই বছর আগে, ১৮৯৭ সালের ২২ শে জুন। ১৮৯৯ সালের ৮ই মার্চ জজ সাহেব সরাসরি সাক্ষী সাবুদের অভাব সত্ত্বেও বালকৃষ্ণ কে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দান করলেন। ইতিমধ্যে বালকৃষ্ণের ছোট ভাই বাসুদেব এবং বিনায়ক রানাডে হত্যার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিচারে তাদেরও ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। ১৮৯৯ সালের ১২ই মে ফাঁসির জন্য অপেক্ষিত লগ্ন সমাগত। চার দিনে ছোট ভাই বাসুদেব ও সতীর্থ বিনায়ক পরপর হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছেন ওই জেলেরই ফাঁসি মঞ্চে। তারও পূর্বে বড় ভাই ও নেতা দামোদরের মৃত্যুবরণ ঘটেছে একই জায়গাতে। দুই ভাই ও একটি বন্ধু তারই বাঞ্ছিত পথের পূরযায়ী। তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করবেন, আজ তিনিও পরম গৌরবে , প্রশান্ত মাধুর্যে। হয়তো এদের মত বীরের চরিত্র অনুধাবন করেই বিশ্বকবি অবাক হয়ে লিখেছিলেন:
“তরুণ হাসির আড়ালে
কোন আগুন ঢাকা রয়
একি গো বিস্ময়। ” প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
