পাঠক মিত্র
চুম্বন শব্দটির পরিচয় ভিন্ন
চুম্বন শব্দটির সম্পর্কিত শব্দগুলো ভাবনার স্তরভেদে সম্পর্কের স্তরভেদে ভিন্ন ভিন্ন । তবে চুম্বন শব্দের সাথে প্রেম শব্দের নিবিড় সম্পর্কটি গভীর । এই সম্পর্কের রসায়নে কবিদের বিচরণ তাকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিতে পারে । এমনকি কবিভেদে সেই মাত্রার স্তরও ভিন্ন । প্রেমের সম্পর্ক যখন নর-নারী’র তখন তার রূপরস মানুষ মানুষের প্রেম তুলনীয় নয়। সচরাচর নরনারীর ক্ষেত্রে প্রেমিক শব্দটির যে অর্থ তা মানবপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এক নয়। আবার দেশপ্রেমিক শব্দটি আর এক অর্থ বহন করে। তাহলে প্রেমিক শব্দটির অর্থ নরনারীর ক্ষেত্রে এককেন্দ্রিক বিষয়, দেশপ্রেমিক এক ভৌগোলিক সীমানায় বাঁধা পড়ে আবার মানবপ্রেমিক শব্দটি সব সীমানাকে ভেঙে ফেলে । কিন্তু পরবাসে থাকা মানুষের প্রেম শুধু কি সেই পরবাসে বিচরণ করে ? স্বদেশের টান কি সে এড়িয়ে যেতে পারে ? যখন দেশের মাটির প্রতি মানুষের প্রতি প্রেম নিবিড় হয়ে মিশে থাকে, তখন পরবাস থেকে সেই প্রেম বারেবারে ফিরে যেতে চায় স্বদেশে । কিন্তু পরবাস যখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা অস্থিরতায় তখন সেই প্রেমকে স্বদেশে পৌঁছে দেওয়ার আকুল বাসনা তৈরি করে । ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ এই শব্দবন্ধ সেই বাসনার অর্থই যেন বহন করে । কিন্তু কবি শহীদ কাদরী’র এই নামাঙ্কিত কাব্যগ্রন্থটি সেই বাসনার অর্থটিকে অন্য রূপে পরিবেশিত করেছে । নরনারী, মানুষ এবং দেশ সম্পর্কের রসায়ন কেবল নৈসর্গিক তা একেবারেই নয় । পরবাসে থেকে শুধু নৈসর্গিক প্রেমের টানে ছুটে যেতে মন চায় এমনও নয় । নদীর মত, পাখির মত কখনও ফিরে যেতে যদিও কবি চেয়েছেন, তবুও সেই ফিরে যাওয়ার পথে বাড়ি যাচ্ছি বললেও বাড়ি কি পৌঁছে যাওয়া যায় । ঘর ছেড়ে যে একবার বেরিয়ে যায় তার থাকে না ঘরবাড়ি । তবুও তাঁর প্রিয় কবির কথা উল্লেখ করে বলতে পেরেছেন, “সব পাখিরা ঘরে ফেরে, সব নদী । আমরা কেন দন্ডায়মান গাছতলাতে নিরবধি । কীর্তিনাশার কালস্রোতে নৌকো ভাসে সারি সারি/এবার আমি বলতে পারি–যাচ্ছি বাড়ি । যাচ্ছি বাড়ি।”
কীর্তিনাশার কালস্রোতে শ্বাপদসংকুল জীবনে দিগন্তের শান্ত দাওয়ায় স্থান হয়নি । বরং সরীসৃপের মতন বুকে হেঁটে নিরাপদ কুটির খুঁজতে হয়েছে । এই পরিস্থিতিতে দেশ ও দশের কাছে যে কথা বলার ছিল আর বলা হয়ে ওঠেনি । ‘তাই এই দীর্ঘ পরবাস’। কবির পরবাসের কারণ তাঁর এই কবিতার শেষ পঙতি যেন আরো কিছু বলে দেয় যা সময়ের স্রোতে যেন থেমে যায়নি । ‘যারা ধ’রে আছে ধর্মের ধ্বজা/তাদের শিকারি কুকুরগুলোর মুখে/ভোরের নদীর মতো সাদা আমাদের প্রিয় খরগোশগুলো/আহত-নিহত আজ এবং তারাই/প্রতিশ্রুত আজ বল্গাহীন বাণিজ্যে/তাই বিক্রি হয়ে গেছে আমাদের সমূহসম্ভ্রম, স্বাধীনতা, নিজস্ব আকাশ–তাই এই দীর্ঘ পরবাস ।’ সত্যিই নিজস্ব আকাশ যখন বিক্রি হয়ে যায় তখন স্বদেশ এমনিতেই হারিয়ে যায় । কিন্তু পরবাস থেকে স্বদেশের প্রতি টান থাকে চিরকাল । যখন হৃদয়ের তৃপ্তি বিনষ্ট হয়ে যায় প্রসারিত সভ্যতার শূন্যতায় । যেখানে হারিয়ে যায় জীবনের অফুরন্ত আনন্দের চেনা ছবি । ‘সেই এক সময় ছিল/বাংলার পথে পথে, রৌদ্রজলে সাঁঝে উষায়/অবিশ্বাস্য মৈত্রী আর ভ্রাতৃত্বের/অপার তৃপ্তি ছিল হৃদয়ে আমার/আর ছিল অফুরন্ত মিষ্টান্ন ভান্ডার আমাদের জীবনকে ঘিরে ।/তবুও দেখেছি আমি অকাল জরায় নুয়ে পড়া/সম্ভ্রান্ত কৃষকের হাত/প্রসারিত সভ্যতার শূন্যতার দিকে ।/বাংলার বিষণ্ণ মানচিত্র/দেখেছি বন্ধুর মুখে,/স্বাধীনতার সৈনিক ছিল যারা/আমি দেখেছি তাদের নিঃশব্দে নিহত হতে/তাই এই দীর্ঘ পরবাস,/চিরকাল পরবাসী আমি স্বদেশে-বিদেশে ।’
কবির কখনো মনে হয়েছে দীর্ঘ পরবাস যেন স্বেচ্ছায় । এ আর এক নির্বাসন । এমন স্বনির্বাচিত নির্বাসনে আর এক অস্থিরতা গ্রাস করে । যেমনভাবে তাঁর বাংলা বিব্রত হয়েছে । সেই বিব্রতরত অনুভূতির আগুন যেন পৌঁছে যেতে পারে সে ভাবনা তাঁকে গ্রাস করে যায় । তাই কবি বলেছেন,’স্বনির্বাচিত এই নির্বাসনে/নেকড়ের দঙ্গলের মতো আমাকে ছিঁড়ে খাক বরফে জ্বলতে থাকা ঋতু/শুধু তুমি,/আমার সংরক্ত চুম্বনের অন্তর্লীন আগুনগুলোকে/পৌঁছে দাও শ্রাবণে আষাড়ে রোরুদ্যমান/বিব্রত বাংলায়,/বজ্রে, বজ্রে, বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার।’
স্বদেশের প্রতি কবির চুম্বন অলীক, তবুও সেই অলীক চুম্বন তাঁকে আবৃত করে রাখে । ‘এখন শীত ঋতুতে একমাত্র সম্বল আমার/সেই অলীক চুম্বনের স্মৃতি যা আমাকে উষ্ণ পোশাকের মতো আবৃত/ক’রে রেখেছে সারাক্ষণ ।’ অলীক চুম্বনের স্পর্শ নিয়ে স্বদেশকে স্পর্শ করার আকুলতায় একাই হেঁটে চলে । আকুলতার সেই চলনের সীমাহীন সময় । সেই সময়কে তবু নির্দেশের ইঙ্গিত–‘পথে পথে আর পান্থশালায়/হয়ে গেল বড় দেরি/কাঁধে নিয়ে আমি মৃত হরিণের শব/ একা একা হাঁটি ।’ চলার পথে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন আর স্মৃতি ভিড় করে চলে । সে পথে যেন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না । স্মৃতির সরণী দিয়ে যেতে যেতে উপলব্ধ হয় । ‘আমার পিতা এই গ্রহের অরণ্যে এক দীর্ঘ দেবদারু/আমার মা কোনো এক উঠে যাওয়া বাগানের–/শান্ত চন্দ্রমল্লিকা/আর আমরা সবাই এখন শ্রাবণ রাত্রির হাওয়ার ।/আমরা কোথাও কেউ পৌঁছাব না।’
কবির যে আকাঙ্খা সেই আকাঙ্খা নিয়ে কবির মতে কেউই পৌঁছবে না । না-পৌঁছানোর কারণ তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ নৃশংস একনায়ক কিংবা স্বেচ্ছাচারী কোনো মূঢ়/জেনারেলের নির্দেশে/যদি আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে/আমি কি রজ্জু থেকে ঝুলে পড়ার আগে/চিৎকার করে উঠবো: ‘শ্রেণীসাম্য ছাড়া নিস্তার নেই নিরন্ন মানুষের!’ শ্রেণীসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জোর দিয়ে যে কথা বলতে চান, তা যেন আর হয়ে ওঠে না । তাই তো তাঁর সংশয় । সংশয় নিয়েও নিরন্ন মানুষের জন্য, বিপন্ন মানুষের জন্য নির্ভয়ে বলতে পারবে কিনা সঠিক পথ সে কথার স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে : ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক !’ এ কথায় নিরন্ন মানুষের, তৃতীয় বিশ্বের উদ্ধারের পথকে ইঙ্গিত করে বলেছেন,’সারা রাত জেগে বিপ্লবীদের (লেনিন, মাও, চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর) রচনাবলী/ পাঠ করার জন্যে যদি আমাকে কখনো/দাঁড়াতে হয় তোমাদের কাঠগড়ায়,/দন্ডপ্রাপ্তির ভয় উপেক্ষা করে আমি কি সেদিন/নির্ভয়ে বলতে পারবো:’মহামান্য আদালত, সুষম ধন-বন্টন ছাড়া উদ্ধার নেই তৃতীয় বিশ্বের!’
তৃতীয় বিশ্বের বাইরে কবির পরবাস । পরবাসে অনুকরণকারী স্বদেশীয়ের অবস্থার বর্ণনায় কবির উপমাযুক্ত ব্যঙ্গ ইঙ্গিত স্বদেশের প্রতি প্রেমের আকুলতাকে প্রকাশ করে । ‘..কি চমৎকার একটা চড়ুই/কী দারুণ কিচিরমিচির করছে আজ মার্কিনি ভাষায় এই/ মেঘভারানত /অন্তহীন দুপুরের ! হে চড়ুই / আদল-গঠনে অবিকল তুমি দেখতে বাঙালি চড়ুইদের মতন/তোমার মুখে কি মানায় বন্ধু শ্বেতাঙ্গের এই বিবর্ণ, বিদেশী/ভাষা ?’ আর এক উপমায়–‘হে কাক, হে কালো কাক ! হঠাৎ কোত্থেকে তুমি এলে/ এই বর্ণবাদী দেশে ? তুমি জানো, এ রাজ্যে অ-শ্বেতাঙ্গদের মূল্য/ নেই কোনো;/..যাও, যদি পারো, দাও উড়াল বাংলার দিকে/যেখানে মানাবে বেশ সিল্ক-মসৃণ-তোমার কালো ডানা ।…/এ কী শুরু করলে তুমি আমার কার্নিশে ।…./তা হলে মার্কিন নাগরিক তুমি ? হে কাক । তুমিও ?/ অথচ দেখতে শুনতে তুমি হুবহু বাঙালি/কৈ এবং মাগুর মাছের মত কালো।’
কবি স্বদেশীয়ের উপমায় চড়ুই, কাক বিদেশের মাটিতে বিদেশী বেশে দেখেও তাদের স্বদেশের মাটিতেই মানানসই বলে ফিরে যেতে যেমন বলেছেন । আবার শালিকের ভাষায় দার্শনিকের ভাষা খুঁজে পেয়েছেন । সেই ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে গ্রাম শহরের বিপন্নতা । ‘সেদিন দেখেছি তিনটে শালিক যথার্থ দার্শনিকের মত/ গভীর পরামর্শে বসেছে তোমাদের বাড়ির উঠোনে ।/ মনে হল নিরন্ন মানুষের চিৎকার ঐ পাখিদের শ্রুতিগোচর হয়েছে ।/ যেন ওরা টের পেয়ে গেছে কী বিপন্ন আজ/আমাদের গ্রাম ও নগরগুলো ! কী অক্লান্তভাবে বয়ে চলেছে/ স্বজনের রক্তধারা আমাদের চতুর্দিকে !’ চতুর্দিকে এই পরিবেশের যাত্রী হয়ে কারা চলেছে ? এই প্রশ্ন তুলে ধরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পেরেছে । ‘তা হলে যথার্থ যাত্রী কারা ? কপর্দকহীন, হতাশা-শাসিত/ স্বপ্নচ্যুত প্রাপ্ত অগ্রজেরা ?…./নাকি তুমি? আমি? আমাদের মুখর, বাঙালির নেতৃবর্গ? কিংবা/ আধুনিক রাষ্ট্রনায়কেরা, নির্দ্বিধায়, নিউক্লিয়ার রিএক্টরগুলো/রোপণ করছে দেশে-দেশে, এবং সমরাস্ত্রের কন্ট্রাক্টর যাদের/ ছায়াসহচর হয়ে ঘুরছে চতুর্দিকে?’ এমন পরিস্থিতির মাঝে কবির স্বপ্নগুলো প্রশ্নগুলো উত্তরহীন হয়ে পড়ে । উত্তরহীন পথ এগিয়ে চলে নতুন শতকের দিকে যেখানে সমাজব্যবস্থার স্বাস্থ্য ক্ষীয়মান । এই সমাজব্যবস্থায় কন্ঠে তাঁর আক্ষেপের সুর । ‘আমাদের অপব্যয়িত সোনালি যৌবন নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো/বলো আজ ! গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্যের ওপর আস্থা নেই আর ।/ এবং খুচরো পয়সার মতো পথে-বিপথে খরচ হয়ে গেছে/সমকালীন স্বপ্নগুলো আমার/ তাই বলি, বারবার বলি; না যেন পড়ে আমার রক্ত পদচ্ছাপ/তোমাদের স্বতন্ত্র শতকে ।’ এমন স্বতন্ত্র শতক যেন ধ্বংসের পথে, যেখানে আকাঙ্ক্ষাগুলো নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় প্রাণের স্পন্দন । পড়ে থাকতে হয় নির্জীব বস্তুর মতো । ‘নষ্ট আকাঙ্ক্ষাগুলোর রাঙা ধ্বংসাবশেষের পাশে আজ/দাঁড়িয়ে রয়েছি যারা, আমাদের ন্যুব্জপৃষ্ঠে মরা হরিণের মতো/পড়ে আছে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা ইতিহাসের।’
পরবাসে থেকে চুম্বন পৌঁছে দেওয়ার পথে যে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন কবি, সে পথে নিরুদ্দেশের যাত্রা নিরন্ন মানুষের । তবে সে যাত্রা থেকে উদ্ধার করার পথ দেখতে পেলেও সংশয় থেকে যায় । সেই সংশয় নিয়ে স্বদেশের প্রতি আকুলতার এক কাব্য যার প্রতিটি কবিতার লাইন চুম্বনের আক্ষরিক অর্থকে বদলে দিয়েছে । প্রেমিকার বিরহে নয় স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর বিরহে ফুটে উঠেছে ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থার ইতিহাস । শহীদ কাদরির কথায় বাংলাদেশের কথা থাকলেও সেই ইতিহাস বাংলা ও বাংলাদেশের হয়ে ওঠেনি । এখানেই কবির পরিচয় । কবির কোন দেশ হয় না । কবির পরিচয় তাঁর কাব্যে। সেই পরিচয়ের এমনই এক কাব্য ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও
-শহীদ কাদরী
-অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা-১১০০
