নীলাদ্রি পাল

বর্ধমান জেলাকে বাংলার শস্যভান্ডার বলা হলেও, বর্ধমান শহরটা কিন্তু বেশ ঝাঁ চকচকে। এখানে বর্ধমান রাজপ্রাসাদের মোটামুটি এক কিলোমিটার আগেই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের উপরে রয়েছে একটি বিরাট তোরণ। নাম বিজয়তোরণ। পরিচিত কার্জন গেট নামে। 

প্রায় ৬৫ ফুট উঁচু। ইঁটের তৈরি এই তোরণ সম্পূর্ণ ভাবে ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। তোরণটির দুই ধারে রয়েছে মোট আটটি থাম, যা এই তোরণকে ধরে রেখেছে। গেটের উপরে রয়েছে তিনটি নারীমূর্তি। যাদের হাতে রয়েছে নৌকা, তলোয়ার এবং কাস্তে। এছাড়াও উপরের দিকে রয়েছে একুশটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক সম্বলিত চক্র।

এবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক, এই তোরণ তৈরির ইতিহাসের দিকে। তোরণটির গায়ে লাগানো এক ফলক থেকে জানা যায়, ১৯০৪ সালের ৪ এপ্রিল, ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও বড়লাট মার্কুইস জর্জ ন্যাথানিয়ল কার্জন এই তোরণটি উদ্বোধন করেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের জন্য কার্জনের নাম সকলেরই জানা। তোরণটি তৈরির পরে এই তোরণের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘স্টার গেট অফ ইন্ডিয়া’। নির্মাণ কাজ চলেছিল প্রায় এক বছর ধরে। পুরোটাই বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের উদ্যোগে। ১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে এই তোরণের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয় এবং পুরো কাজ শেষ হয় ১৯০৪ সালের মার্চ মাসে।

তোরণ বানানোর দায়িত্বে ছিল ‘ম্যাকিনটশ বার্ন’ কোম্পানি। বার্ন কোম্পানিতে সেই সময় বহু বিদেশি স্থপতি ও প্রযুক্তিবিদ কর্মরত ছিলেন। তারাই তোরণটির সম্পূর্ণ ডিজাইন ও পরিকল্পনা করেন।একশো ফুট বাই একশো ফুট ব্যাসের প্রায় ত্রিশ ফুট গভীর খাদের মাটি খোঁড়ার পর মাটির ভিতর একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়। সেই ভিতের নিচে বালি, পাথর দিয়ে শক্ত গাঁথুনি গাঁথা হয়। সেই গাঁথুনি ধীরে ধীরে তোলা হয় মাটির ভিতর। প্ল্যাটফর্মের মত ধাপে ধাপে ওঠে তোরণ।

তোরণ তৈরির নেপথ্যে ঘটে যাওয়া বাপারগুলি কিন্তু বেশ উল্লেখযোগ্য। ১৯০৩ সালে ছোটলাট লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার বোর্ডিলিয়ন সাহেবের উপস্থিতিতে বিজয় চাঁদের রাজ্যাভিষেক ঘটে। সেই বছরই তোরণটি তৈরির পরিকল্পনা হয় এবং কাজ শুরু হয়। পরের বছর ১৯০৪ সালে বর্ধমানে পরিদর্শনে আসেন লর্ড কার্জন। স্টার গেট অফ ইন্ডিয়ার দ্বারোদঘাটন করেন এবং সেই পথ দিয়েই বর্ধমান শহরে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ প্রভুর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য বিজয়চাঁদ তোরণের নাম বদলে ‘কার্জন গেট’ রাখেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে পুরো পরিকল্পনার পিছনেই স্যার বোর্ডিলিয়ন এবং লর্ড কার্জনের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছিল।

তোরণ উদ্বোধনের পরে সেটি স্মরণীয় করে রাখার জন্য ডাক পড়েছিল ডেনমার্কের শিল্পী হুগো পেডারশনের। পুরো ঘটনাটি তিনি এঁকে রাখেন তেল রঙের ছবিতে। সেই ছবি আজ ব্রিটিশ ভারতীয় পাশ্চাত্য শিল্পের অমূল্য সম্পদ।

পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরে পালটে দেওয়া হয় ‘কার্জন’ গেটের নাম। বর্ধমানের মহারাজা বিজয় চাঁদের নামে তোরণের নাম রাখা হয় ‘বিজয় তোরণ’, আর এই শহরের প্রধান রাস্তার নাম হয় ‘বিজয় চাঁদ রোড’।

বর্ধমান শহরের নাম স্মরণ হতেই যেমন মনে এসে যায় সীতাভোগ আর মিহিদানার নাম, ঠিক তেমনি এই শহরের সিগনেচার হল ‘বিজয় তোরণ’। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগ এখন তোরণটি সংরক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করছে। তবে সময়ের ধারায় ও সংস্কারের সময় অপটু কাজের জন্য কিছুটা বদল ঘটেছে এই তোরণের। কিন্তু বর্ধমান শহরের হারানো অতীত আজও কথা বলে এই স্মৃতি চিহ্নেই।  প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *