সুতপন চট্টোপাধ্যায়

    অমিতেন্দু 

১  

অমিতেন্দুকে দেখলে কে বলবে সে একদিন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অচেনা এক দেশে পা রেখে ছিল একা। কেউ সঙ্গে ছিল না। পকেটে পয়সা ছিল না। দুটো জামা ছিল না। ছিল শুধু  মনের জোর। এই মনের জোরকে ভরসা করে সে গ্রামের বিশালাক্ষীর মন্দির স্মরণ করেই জাহাজে উঠে পড়েছিল এক বিকেলে। তখন তার বয়স পনেরো। গ্রাম থেকে এক সম্পর্কের কাকা তাকে কলকাতায় চাকরী দেবার নাম করে নিয়ে আসে। শিয়ালদার মেসে কিছুদিন রাখে।  তারপর বিক্রি করে দেয় এক জাহাজী ফোড়ের কাছে। সেই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল এই বালি তে। শ্রমিকের কাজের লোভ দেখিয়ে চালান হয়ে যায় অমিতেন্দু। সেটা প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। 

কথা হচ্ছিল অমিতেন্দুর সঙ্গে এক বিকেলে। টেলিফোনে বলেছিল, বিকেল চারটের মধ্যে চলে আসবেন। রাতে আপনারা আমার অতিথি। তাহলে ঘন্টাখানেক বসে গল্প করা যাবে। সন্ধ্যের পর আমি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ব। তখন সময় দিতে পারব না। ফুল বুকিং আছে।

 ছেলেকে নিয়ে আমরা দুজন এসেছি বালি বেড়াতে।  কোলকাতা থেকে অনেকেই বালি বেড়াতে যায় আজকাল। শুনেছি কলকাতার অনেক ট্রাভেল এজেন্সি ইন্দোনেশিয়ার বালি প্রায় ডেলি প্যাসেঞ্জারী করে। আমি তাদের পাল্লায় পড়িনি। নিজেই টিকিট কেটে ভ্রমণ পরিক্রমা বানিয়েছি। মনে মনে ঠিক করেছি যেখানেই যাব, সেখানে সস্তায় ভালো হোটেলে খাবো। খুব দামী হোটেলে খেলে রেস্তোয় টান পড়বে যে?   

তাই অমিতেন্দুর প্রস্তাবটা লুফে নিয়েছিলাম। বিনে পয়সায় একবেলা পেটপুজো হয়ে যাবে তিন জনের, বিদেশে এমন লটারি আর ক’জন পায়? 

নেট থেকে লিস্ট করেছিলাম ভারতীয় রেস্তরাঁর। তারই একটিতে ফোন করেছিলাম। উল্টো  দিকের ভদ্রলোক পরিচ্ছন্ন গলায় বললেন, আপনারা বাঙালি? 

আমি বল্লাম, হ্যাঁ, আপনি?  

আমি অমিতেন্দু। এটা আমার রেস্টোরেন্ট। 

সেই আলাপ।   

২  

দেখলে মনে হবে বর্ধমানে আমার ছোট পিসির বাড়ি। সামনে একটা ফটক। ফটকের দুপাশে বেশ বড় সাইজের চালের মড়াই। মড়াই-এর চার পাশে খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট ঘর। সেটা পেরিয়ে দেখি পোর্সিলিনের রাম, সীতা, লক্ষণ ও হমুমানের মূর্তি। দেশ থেকে অনেক  দূরে এসে রামায়নের কুশীলবদের  দেখে ধরে যেন প্রাণ ফিরে এলো। তার উপর ধানের মড়াই। মনে হল এবার ছোট পিসি পরিস্কার থান পড়ে বেরিয়ে এসে বলল, নতুন খোকা আয়, আয়, এতও দিনে মনে পড়ল। তোর বাপের সঙ্গে ছোটবেলায় কী মারামারিই না করেছি। খুব দুষ্টু ছিল তোর বাবা। এসেছিস যখন সপ্তাহ খানেক থেকে  যেতে হবে। 

এমনি আবদার ছিল ছোট পিসির। সে যাই হোক। সেই চত্তর পেরিয়ে দেখি এবার একটা  বাগান। বাগানের এক কোণে কিচেন। আর তার পাশে বৈঠকখানা। বৈঠকখানার এক দিকে  বইয়ের র‍্যাকে অনেকগুলো রামায়ন। তার মধ্যে জ্বল জ্বল করে তাকিয়ে আছে ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় লেখা প্রাম্বানান। মানে পূর্ণ রামায়ন। তার চার পাশে ধুপধূনোর উপস্থিতি চোখে পড়ল।  প্রতিদিন পুজা হয় তাহলে এই রামায়নকে ঘিরে।   

ইন্দোনেশিয়ার মেদাং রাজত্ব কালে যখন বৌদ্ধরা মধ্য জাভা, সুমাত্রা ও পশিমে প্রবল শক্তিশালি ছিল, সেই সময় মনে করা হয় রামায়ন প্রথম লেখা হয়। তাকে বলা হত কাকাডিন রামায়ন।  

আমার স্ত্রী যাবার আগে এই সব খবারাখবর করে গেছে।   

আমরা এক বৈঠকখানায় বসেছি। একটি মেয়ে আমাদের লেবুর জল দিয়ে আপ্যায়ন করল। মেয়েটির মুখ দেখে বাঙালি মনে হল না। আমি ঘরের চারদিক তাকিয়ে দেখছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বিশাল তলোয়ার। একটা দেওযাল জুড়ে সে বীরত্বের প্রতীক। আমি ছেলেকে বল্লাম, দেখেছিস কত বড় তলোয়ার। তুলতে পারবি?

ছেলে হেসে বলল, আমি কি যুদ্ধ করেতে যাচ্ছি? ওই তলোয়ার দিয়ে রাম জটাযুর পাখা কেটে  ছিল মনে নেই? 

আমি চুপ করে গেলাম। আর ঠিক সেই সময় বাইরের দিক থেকে ঘরে ঢুকল অমিতেন্দু। 

না দেখে ভেবেছিলাম বয়স ত্রিশ, পয়ত্রিশ হবে। এখন ভূল ভাঙল। তার গলা মিষ্টি, নীচু স্বর, শান্ত। প্রায় ষাটের কাছকাছি বয়স। না বললে বুঝতেই পারতাম না। তাকে দেখতেও এখন নবীন। মাথায় একটি চুলও পাকে নি। আমাদের দেখেই আনন্দে হেসে বলল, কি মনে হচ্ছে দেশের বাইরে এসেছেন? 

আমি না বলে পারলাম না। বললাম, একদমই মনে হচ্ছে না। আপনার বাড়ি তো আমাদের ওখানের গ্রামের বাড়ির মত। অমিতেন্দু বলল, মন্দির তো এখনও দেখেন নি। চলুন, আগে মন্দির দেখিয়ে আনি। বলে সে বৈঠকখানার পিছনে নিয়ে যেতে চোখে পড়ল, এক বিরাট মহল। একদিকে হিন্দু মন্দির। সেখানে অনেক দেবদেবীর সমারোহ। ঠিক কার পুজো করবেন যেমন ঠিক না করতে পেরে, বাঙালি যেখানেই গেছে নানান ঠাকুরের মুর্তি এনে জোরো করে, এখানেও অনেকটা তেমনি। তবে বিষ্ণুর মূর্তি সবার উপরে। অমিতেন্দু বলল, এ সবই আমার নিজের হাতে তৈরি। 

আমার ছেলে অবাক চোখে প্রশ্ন করল, আপনি মূর্তি  করতে কোথায় শিখলেন?

অমিতেন্দু হাসল। গ্রামের ইট ভাঁটায় নরম মাটি নিয়ে সেই যে ছোটবেলায় শিখেছিলাম, এখানে এসে কাজে লেগে গেছে। 

আমার স্ত্রী প্রশ্ন করল, দেশে যান প্রতি বছর? 

অমিতেন্দু বলল, না। ত্রিশ বছর যাই নি। বলে সে মন্দির ঘুরিয়ে দেখাল। তারপর সবাইকে আবার বসাল বৈঠকখানায়।  

গরম চা এল। অমিতেন্দু বলল, আপনারা কি পছন্দ করেন? মাছ, মাংস? যা বলবেন আধ ঘন্টা সময় লাগবে। 

রাস্তার উপর গেট থেকে অনেক ভিতরে অমিতেন্দুর বাড়ি। বাড়ি কাম রেস্তরাঁ। তার বৈঠকখানায় বসে সোজা রাস্তা দেখা যায়। আমি সেই দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করতে লাগলাম,  কতটা জায়গা নিয়ে এই বাড়ি? অমিতেন্দু যেন আমার মনের কথা জানতে পেরেছে। বলল, চা খেয়ে চলুন আমার রেস্তরাঁ ও বাড়ি দেখাব।  

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে অনেক বাঙালি টুরিস্ট আসে? 

অমিতেন্দু বলল, আসে। তবে তারা সোজা রেস্তরাঁয় চলে যায়। বৈঠকখানায় বসে না। তাদের সময় কম। তাই আপনাকে বলেছিলাম হাতে সময় নিয়ে আসবেন।  

আমি বললাম, সেটা জানি। তাই কোন কাজ রাখিনি। 

অমিতেন্দুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, আমাদের দেশের সঙ্গে এই দেশের তফাৎ অনেক। এখানে মানুষ খুব ধর্ম ভীরু। প্রতিহিংসা বলতে কিছু নেই। রাগ বলে কোন বস্তু নেই। সে আপনি যেই হোন। এই এক সুবিধা।

আমি বললাম, সে তো বেশ। 

অমিতেন্দু বলল, তাই তো আমি এত বছর এখানে থেকে গেলাম।

আমার স্ত্রী বলল, কি করে থেকে গেলেন এখানে? একা একা? বাড়ির কথা মনে হয়নি?   

অমিতেন্দু তাকালো আমাদের দিকে। তারপর বলল, চলুন খেতে খেতে শোনাবো।

আমি নিজেও আজ বিশ্বাস করিনা। 

 ৩

পাডাং বালি বাণিজ্য সমুদ্র বন্দরে এসে ভিড়ে ছিল জাহাজটি। সেদিন পোর্টে প্রবল জ্যাম। ছোট বন্দর, অনেক জাহাজ, তার মধ্যে আমাদের জাহাজটি কোনক্রমে গোঁতাগুতি করে জেটিতে নোঙর করেছে। আমি আর পারছিলাম না। হর হর করে বমি করে ফেললাম। জাহাজের যে ক্যাপ্টেন ছিল সে বালির অধিবাসী। আমাকে অসুস্থ দেখে নামিয়ে নিয়েছিল আমাকে। জাহাজের খালাসী তো, কি আর হবে দুদিন অসুস্থ থাকলে, তারপর ভাল হয়ে যাবে। এমনই  ভেবে তিনি আমাকে এখানের একটা হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। এতই অসুস্থ হয়েছিলাম যে হাসপাতালে  ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল, তখন পরের দিন। সেই আমার পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখা। ক্যাপ্টেন  আমাকে তার বাড়ি নিয়ে গেল। আমি এক খালাসী থেকে অন্য খালাসীতে পালটে গেলাম। ক্যাপ্টেনের বাড়িতে গিয়ে আমি তো অবাক। ক্যাপ্টেনের তিন স্ত্রী। বেশ অবস্থাপন্ন। তিনটি স্ত্রীর মধ্যে বড় স্ত্রী খুব মমতাময়ী। আমাকে সারা বাড়ির কাজ করতে হত। খুব ছোটোবেলায় মাকে হারিয়েছিলাম। বড় বউ আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমার জ্বর হলে কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।  

আমি বললাম, আর অন্য দুই বউ? 

তারা খুব খারাপ ছিল। বাদ দিন। সে কথা আর বলব না। এক বন্দি দশা থেকে অন্য বন্দি দশা। ক্যাপ্টেন চলে যেত। আমি থেকে গেলাম তাঁর সংসারে। বেশ কিছুটা সময় কেটে গেছে। একদিন কাপ্টেনের বড় বউ রাতের অন্ধকারে আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন। চলে এসেছিলাম বালির বন্দরের  অন্য দিকে, সমুদ্রের ধারে এই গ্রামে। এখানে এসে মনে হল, এক অজানা দেশে এসে পড়েছি।   

আমার ছেলে বলল, কেন তিনি আপনাকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন? 

অমিতেন্দু বলল, সে এক অনেক পুরোন ইতিহাস। এই ক্যাপ্টেন ছিল আরব ব্যাবসায়ী বংশের  বংশধর। কি ভাবে জানি না, জাহাজী ক্যাপ্টেন এখানে বসবাস করেছিলেন। একসময় তলে তলে তিনি সৌদি আরব দেশে চলে যাবার ফন্দি করেন। বড় বউ সেটা জানতে পারে। তিনি সেখানে যাবেন না, তাই।

আমি প্রশ্ন করলাম, তিনি আপনাদের খোঁজ করেন নি? 

অমিতেন্দু উত্তর দিল, না। কেন জানি না। সেই ভদ্রমহিলাকে মায়ের মত দেখেছিলাম।  আমরা  নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করছি। অমিতেন্দু বলল, আসুন আপনাদের আমার মিউজিয়ামটা  দেখাই। বলে সে আমাদের সঙ্গে একটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। দেখি এক মহিলারা স্ট্যাচু। অমিতেন্দু বলল, আমার ধাই-মা। সেই ক্যাপ্টেনের বড় বউ। রেশমা। নাম লেখা না থাকলে তিনি মুসলমান বোঝে কার সাধ্য? এক সময় অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন।

আমি বললাম, তিনি……। 

অমিতেন্দু বলল, প্রায় দশ বছর হল মারা গেছেন। আমার কাছেই থাকতেন। তার পায়ে প্রতিদিন ফুল দিই। আসলে মা তো, মায়ের তো আর জাত পাত থেকে না!  

অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি অমিতেন্দুকে। সে এবার তার সারা জীবনের স্ট্যাচু সংগ্রহ শালায় নিয়ে গেল। একটি ঘরের মধ্যে একটি মহাভারত রচনা করেছে স্ট্যাচু দিয়ে। মহাভারতের  নানান চরিত্ররা, যে যার যায়গায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধের পোজে একে অপরকে আক্রমন করছে। সেই  দিকে তাকিয়ে অমিতেন্দু বলল, মজার ব্যাপার হল কি জানেন, রামায়ন ও মহাভারতকে  আমাদের মহাকাব্য ভাবি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমরা হিন্দুরা কেউই যুদ্ধ পছন্দ করি না। আপনারা যুদ্ধ পছন্দ করেন? এই যে সারা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ হচ্ছে তা কি সমর্থন করেন? আপনার কি বিশ্বাস করেন, যুদ্ধ করে পৃথিবীর কোন উপকার হয়েছে কোনদিন?

আমি বললাম, না তা হয় নি।  কেবল দলে দলে মানুষ মরেছে। 

অমিতেন্দু বলল, ঠিক তাই। হয় নি, এক যুদ্ধ আর এক যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।    

আমার স্ত্রী চকিতে প্রশ্ন করল, তাহলে এত যুদ্ধের স্ট্যাচু সংগ্রহ করেছেন কেন?

এই কথাটা বলবার জন্য ম্যাডাম। আমি তো মেদিনীপুরের এক অনাথ মানুষ। সামান্য মানুষ। আমি তো বুদ্ধের মতো, মহম্মদের মতো, খৃস্টের মতো ধর্ম প্রচার করতে পারব না। যারা আমার রেস্তরাঁয় আসে তাদের দেখাই। আর বলি, এই দেখ, আমাদের মহাকাব্য। এই দুই মহাকাব্যে শুধুই যুদ্ধ হয়নি, যুদ্ধের ভয়াবহ দিকটাও দেখিয়েছে। 

বলে সে আমাদের ডাইনিং টেবিলে নিয়ে এল। এবার দেখলাম মধ্য বয়সী এক বালিনিজ মহিলা। আমাদের সামনে মাথা নিচু করে সম্ভাষন করলেন। এক মুখ হাসি ছড়িয়ে আমাদের বসতে বললেন। অমিতেন্দু বলল, আমার স্ত্রী। সেই আমার সব কিছু। ও বৌদ্ধ। আমি হিন্দু আর আমার মা? সে তো আপনারা দেখেই এলেন।  

অমলেন্দুর স্ত্রী জোর হাত করে মিষ্টি গলায় বলল, রতু রাস টিটিয়াং সারেং সামি সুক্সমা পিসান। 

অমিতেন্দু একগাল হেসে আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে বলল এর মানে, আপনারা এসেছেন, আমরা খুব আনন্দিত।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *