আশিস ভৌমিক
লেখক পরিচিতি
(জন্ম 5 ই এপ্রিল 1974, গ্রাম -বৃন্দাবনচক , পাঁশকুড়া , পূর্ব মেদিনীপুর ।প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামে ।উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় ।সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ।গৃহ শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য চর্চা । বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন । প্রথম কাব্যগ্রন্থ “”হিরণ্ময়ী ” । দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” কালবেলা “।
প্রথম পর্ব
বিখ্যাত হলিউড থ্রিলার মুভি 2012 -এর কথা মনে আছে নিশ্চয়। ২০০৯ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র, যেটি রচনা এবং পরিচালনা করেছিলেন রোলান্ড এমেরিখ। প্রযোজনা করেছেন হ্যারাল্ড ক্লোজার, মার্ক গর্ডন এবং ল্যারি জে. ফ্রাঙ্কো। চলচ্চিত্রে মায়াবাদ ও মেসোআমেরিকান লং কাউন্ট পঞ্জিকা থেকে সূত্র অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ২০১২ সালের রাহস্যিক বিষয়ের আকস্মিক ও প্রচণ্ড পরিবর্তনের ঘটনা বর্ণনাকারে উন্মোচিত হয়েছে। পৃথিবীর ভূত্বক অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার মুহূর্ত নিখুঁত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমায়। একদিকে প্রবল ভূ-আলোড়নে ধ্বসে পড়া বহুতল, রাস্তায় বড় বড় ফাটল আর আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা, প্রান বাঁচাতে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি আর অন্যদিকে উত্তাল সমুদ্র সুনামি।
মায়া সভ্যতা’- কথাটা শুনলেই কেমন একটা রহস্যের কুয়াশাঘেরা শিরশিরে অনুভূতি হয়। হ্যাঁ, আমি সেই মায়ান সভ্যতার নিদর্শন,পুরাণ তাদের বিশ্বাস লোকাচার, শিক্ষা আর অবশ্যই পুরাণের আড়ালে কিছু রহস্যময়তার শেকড় খুঁজতে চলেছি। তার আগে মায়ানদের সম্বন্ধে দুচার কথা বলে নিই।
রহস্যে ঘেরা মায়া সভ্যতার ইতিহাস!
চার হাজার বছর আগের কথা। সভ্য মানুষের জীবন যাপন কিংবা সভ্য সমাজের কথা ভাবাটা অন্তত সেই সময়কালে অবান্তর ছিল বটে! কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্য কথা। যে যুগে পৃথিবীর অনেক অংশের মানুষ ঘর তৈরি করতে শেখেনি মানুষ, সেই যুগেও এমন জাতি ছিল যারা নিজেদের সংস্কৃতি সভ্যতায় রীতিমত সচ্ছল জীবন যাপন করত সগৌরবে! প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মায়ারা চাষাবাদ করা শুরু করে এবং কৃষিজীবী গ্রামের উৎপত্তি ঘটে। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত গৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম মায়া জনবসতি নিঃসন্দেহে প্রশান্ত উপকূলের সোকোনুস্কো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বিশ পঁচিশ তলা পর্যন্ত ভবনও তৈরী করেছিল তারা। শুধু তা নয়, জ্যোতির্বিদ্যা আর ভাষা নিয়েও ছিল তাদের অভাবনীয় জ্ঞান! অবাক করার মত বিষয় বটে! এমনই হৈ চৈ ফেলে দেয়া ইতিহাস সৃষ্টিকারী জাতি ছিল মায়ানরা। যা বছরেরে পর বছর রয়েছে অন্যান্য জাতির কাছে একদমই অজানা। অদ্ভুত এক পান্ডুলিপি আবিষ্কার হলো হঠাত, যার কোনো অক্ষর নেই, বর্ণ নেই। ভাষা যায় না বোঝা। কিন্তু কিছু একটা বলা আছে তাতে, কিছু একটা যে বলা আছে সেটা ঠিকই বোঝা যায়। ছোট ছোট ছবি পাশাপাশি আঁকা। নৃতত্ববীদদের মনযোগ কাড়লো। ফলত ধীরে ধিরে আবিষ্কৃত হলো অনেক কিছুই। আলোয় আসলো মায়ান সভ্যতার সাতকাহন।
বিশেষজ্ঞদের মতে মায়ারা ছিল মেসো আমেরিকা, বা বর্তমান মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে পরাক্রমশালী প্রাচীনতম জাতি। মায়ারা অন্যান্য জাতির মত বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল না, তারা ভৌগলিক একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মাঝেই ছিল। মায়ারা প্রধানত গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভেদরের উত্তরাংশ, কেন্দ্রীয় মেক্সিকোর তাবাস্কো আর চিয়াপাস সহ আরো প্রায় এক হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসতি স্থাপন করেছিল। সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে থাকার কারণেই অন্য অনেক শক্তিশালী জাতি মায়াদের লোকালয়ে প্রবেশ করতে বা আক্রমণ করতে পারতো না।
মায়া সভ্যতার লোকেদের তৈরি করা পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে, তারা ভাবের আদান-প্রদান করার জন্যে একটি ভাষার ব্যবহার করত। অদ্ভুত এবং মজাদার ছিল মায়াদের সেই ভাষার লিখিত রূপটি। তাদের কোনো বর্ণমালা ছিল না, তারা লেখার জন্যে ছবি বা চিহ্ন ব্যবহার করত। খানিকটা হায়ারোগ্লিফিক লেখা। তাদের লেখায় প্রায় ৮০০টির বেশি ছবি তারা ব্যবহার করেছিল। মায়ানদের এইসব লেখা থেকে তাদের সভ্যতা আর সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারা যায়। এছাড়াও মায়ারা গাছের বাকল দিয়ে তৈরি করা কাগজ দিয়ে বই বানাতো, সেগুলোকে বলা হয় কোডেক্স। মায়ান সভ্যতার মাত্র ৪টি কোডেক্স উদ্ধার করা হয়েছে অক্ষতভাবে। মায়া জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে আমরা যা জানি তার বেশিরভাগই আমরা সংগ্রহ করি কোডেক্স নামক বার্ক-পেপার বইয়ের পাতায় তৈরি বিস্তারিত নথি থেকে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ফ্রান্সিসকান মিশনারিরা তাদের ধর্মকে নির্মূল করার প্রচেষ্টায় মায়াদের প্রায় সমস্ত লিখিত নথি পুড়িয়ে ফেলেন। আজ, মাত্র তিন বা চারটি মায়া কোডেক্স অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যে তিনটির নামকরণ করা হয়েছে ইউরোপীয় শহরগুলির নাম অনুসারে যেখানে এগুলি রাখা হয়েছে – ড্রেসডেন, প্যারিস এবং মাদ্রিদ। চতুর্থ বই গ্রোলিয়ার কোডেক্স, যা বর্তমানে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত, তার সত্যতা এখনও বিতর্কিত। কোডেক্সগুলি সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর আগে লেখা হয়নি , তবে মায়ারা অনেক আগে লেখা বইগুলি অনুলিপি করে থাকতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যান্থনি আভেনির মতে, কোডিসগুলি আচার-অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করা হত, প্রায়শই জ্যোতির্বিদ্যার ঘটনার সাথে সংযুক্ত করে।
কোডেক্সগুলির পৃষ্ঠাতে সাধারণত একজন দেবতাকে চিত্রিত করা হয় এবং দেবতা কী করছেন তা বর্ণনা করে এমন গ্লিফের একটি সিরিজ থাকে। এই বইগুলির অনেক পৃষ্ঠায় এমন সংখ্যার তালিকাও রয়েছে যা মায়াদের চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রের পর্যায় এবং মঙ্গল ও শুক্রের গতিবিধির ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহায্য করেছিল। এর একটি উদাহরণ ড্রেসডেন কোডেক্সের তিনটি পৃষ্ঠার একটি সিরিজ যা শুক্রের পর্যায়গুলি লিপিবদ্ধ করে এবং সেই সাথে অশুভ এবং শুভ গ্রহের সাথে সম্পর্কিত তিজোলকিন তারিখ এবং গ্লিফের একটি তালিকা। মায়ারা বিশ্বাস করত যে শুক্র বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সহিংসতা এবং দুর্ভাগ্যের সাথে জড়িত ছিল। সিরিজের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এই সম্পর্কটি স্পষ্ট, যেখানে শুক্রের প্রতিনিধিত্বকারী দেবতা কুকুলকানের একটি চিত্র দেখানো হয়েছে, যিনি শত্রুকে বর্শা দিয়ে মারার ভঙ্গিতে রয়েছেন। মায়ানরা আঠারোটি মাস নিয়ে বছর গননা করত আর প্রত্যেক মাস ছিল কুড়ি দিনের (১৮×২০=৩৬০) আর পাঁচ দিন অতিরিক্ত নির্দিষ্ট সময়ে যোগ করা হোত। এই পাঁচদিন তারা অনাগত দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার ভয়ে কালাতিপাত করত এবং দেবতাদের তুষ্ট করতে নানান আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকর্ম করতো।
পণ্ডিতরা মায়া সভ্যতার যুগের শুরু নিয়ে অবিরত আলোচনা করে যাচ্ছেন। বেলিজের কিউল্লোতে মায়া বসবাসের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কার্বন পরীক্ষা হতে পাওয়া তারিখ অনুযায়ী এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগের। তারা বিস্ময়কর কাঠামো নির্মাণ করে। মায়ার বর্ষপঞ্জিকা তথাকথিত মেসআমেরিকানর দীর্ঘ গণনীয় বর্ষপঞ্জিকার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১১ই আগস্ট, ৩১১৪ খ্রিস্টাব্দের সমতুল্য। আর এই বর্ষপঞ্জির শেষ ছিল ২০১২, ২৩ শে/ মতান্তরে ২১শে ডিসেম্বর। এটিই ছিল মায়ানদের এক যুগ। এর ওপরেই চলচ্চিত্রটি আখ্যায়িত। যদিও পৃথিবীর ধ্বংসের কথা উল্লেখ ছিলনা কিন্তু বানিজ্যিক চলচ্চিত্র সাফল্যের কথা মাথায় রেখে একটু আধটু ইতিহাস বিকৃতি বা গুজব ছড়ানো হয়েই থাকে!
যাইহোক আমার গন্তব্য পুরাণ। আর সব পুরাণের মতো এর সুচনা করবো সৃষ্টি তত্ত্ব দিয়ে। স্পেনীয় আক্রমণে বেশিরভাগ বিনষ্ট হলেও কিছু গোপন দলিল বা নিদর্শন রয়েই যায় আর কিছু জমা থাকে শ্রুতি হিসেবে লোকমুখে যা কৌতুহলীরা সংগ্রহ করে। আমি মায়ানদের পুরাণ “পপোল ভুহ” নিয়ে বলতে যাচ্ছি। যেখানে সৃষ্টি তত্ত্ব অর্থাৎ পৃথিবীর বাসযোগ্য হয়ে ওঠা এবং মানুষের সৃষ্টির পৌরাণিক কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
উপনিবেশ-পূর্ব মায়ারা দক্ষ শিল্পী ছিলেন, তারা চমৎকার মূর্তি, মৃৎশিল্প এবং অলংকার তৈরি করতেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো লেখক ছিলেন বলে জানা যায়। তারা হরিণের চামড়া এবং গাছের ছালের মতো পচনশীল উপাদান থেকে বই তৈরি করতেন এবং পাথরে স্থায়ী গ্লিফিক বিবরণও লিখতেন। তবে, মায়া সংস্কৃতি সম্পর্কে আধুনিক ধারণা সীমিত, মূলত কারণ বিজয়ী স্প্যানিশরা পরিকল্পিতভাবে মায়া বই ধ্বংস করেছিল এবং ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসকে দমন করেছিল, যা তারা শয়তান উপাসনা দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করত।
মায়া সাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে একটি হল এই পপোল ভুহ, যা প্রায়শই মায়া সৃষ্টির মিথ হিসেবে পরিচিত। পোপোল ভুহ, ‘কাউন্সিল বুক’ কিংবা ‘বুক অব দ্য কমিউনিটি’ হিসেবে পরিচিত এই বইটির আসল কপি কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, স্প্যানিশরা অন্য বইগুলোর মতো এটিও পুড়িয়ে ফেলে। তবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে এক কিশে মায়া রোমান হরফে নিজের ভাষায় এটি লিখে রাখে। পরবর্তীতে ফ্রান্সিসকো জিমেনেজ নামক এক পাদ্রীর কাছে পৌঁছালে তিনি তা স্প্যানিশে অনুবাদ করেন। এই ডকুমেন্ট নিয়ে গবেষণার কমতি নেই। ইতিহাসবিদ, জ্যোতির্বিদ থেকে শুরু করে দার্শনিকরাও এটি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছেন মায়া সভ্যতার রহস্য। আসলে স্প্যানিশ দমনের সময়কালে, পশ্চিম গুয়াতেমালার উচ্চভূমিতে বসবাসকারী কুইচে ব্যান্ডের অভিজাত সদস্যরা গোপনে ” পোপোল ভুহ” রচনা করেছিলেন , যার অর্থ “পরিষদ বই” বা “পরামর্শের বই”, অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে। এই বিশাল কাব্যিক রচনাটি মায়া জনগণের একটি আধা-ঐতিহাসিক বিবরণ। পোপোল ভুহ একটি জটিল পৌরাণিক ব্যবস্থা বর্ণনা করে যা আকাশ, পৃথিবীর দেবতা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সহ দেবতাদের পরিচয় বহন করে। যদিও এটি তারিখবিহীন, অভ্যন্তরীণ প্রমাণ থেকে জানা যায় যে এটি 1550-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লেখা হয়েছিল, স্প্যানিশ আক্রমণকারীরা মায়া মাতৃভূমি জয় শুরু করার তিন দশক পরে।
পোপোল ভু– এর লেখক দাবি করেন যে এই কাজের বিষয়বস্তু একটি পূর্ববর্তী বই মায়ান কোডেক্স থেকে এসেছে, যা লেখার সময় তখনও তার কাছে ছিল। স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের সমসাময়িক বিবরণ থেকে জানা যায়, যাদের অনেকেই এই ধরনের কোডেক্সগুলি ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে রেখেছিলেন যা পরে হাত বদল হয়। এগুলো বিশেষভাবে প্রস্তুত হরিণের চামড়া এবং ভাঁজ করা বাকল বইয়ের উপর প্রচুর পরিমাণে মায়া ধর্মীয় সাহিত্য (কোডেক্স) লেখা ছিল। কুইচে লেখকরা যে মূল উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন তা সম্ভবত এই ধরণের পচনশীল উপাদান দিয়ে তৈরি ছিল।
পোপোল ভুহ– এর পৌরাণিক কাহিনীগুলিকে প্রাচীন মায়া বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে কতটা গ্রহণ করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ সময়ের দাবি মেনে তাতে নতুন গৃহীত পৌরাণিক বিশ্বাসে কিছু পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
কিংবদন্তী আর উপকথায় ভরপুর পোপোল ভুহ-এ বৈজ্ঞানিক তথ্যও কম নয়, বিশেষ করে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে অনেক কিছুই লিপিবদ্ধ করা আছে এখানে। কোনো গ্রহ বা নক্ষত্র কখন দেখা যাবে, কখন আবার হারিয়ে যাবে, সবই হিসাব করে দেখানো হয়েছে এখানে। মায়াদের কাছে প্রতিটি নক্ষত্র ও প্রতিটি গ্রহই একেকটি দেবতার প্রতিরূপ। নক্ষত্রের উদয়াস্ত পর্যবেক্ষণ করে তারা বিভিন্ন উৎসব পালন করত, শিকারে যেত, যুদ্ধের মহড়া দিত কিংবা দুর্ভিক্ষের প্রস্তুতি নিত।
বিশ্বের প্রতিটি উপকথাতেই তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের ব্যাখ্যা, মহাজগৎ কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে কিংবা কীভাবে মানুষ সৃষ্টি করা হল। পোপোল ভুহতে লিপিবদ্ধ সে উপকথাগুলোই তুলে ধরা হল।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
দ্বিতীয় পর্ব
মায়ান পুরাণ অনুযায়ী স্বর্গ পাতাল
দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ-পূর্ব উপনিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে, মায়াদের একটি অত্যন্ত উন্নত পৌরাণিক কাহিনী ছিল। মায়া পুরাণে, পৃথিবীর সৃষ্টির সাথে অ্যাজটেক পুরাণে দেখা পৃথিবীর সৃষ্টির অনেক মিল রয়েছে । এটি ভৌগোলিক নৈকট্য (দুই জনগোষ্ঠী প্রতিবেশী ছিল) দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে অবশ্য তাদের উৎপত্তি দ্বারাও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে অ্যাজটেক এবং মায়াদের পূর্বপুরুষদের একই ছিল।
মায়া পুরাণে, আকাশ তথা স্বর্গের একক সত্তা ছিল না বরং ১৩টি স্তরে বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি স্তরের প্রতিটি স্তরে একজন দেবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোত। মুয়ান পাখি ছিল এক ধরণের শস্যাগার পেঁচা যা সর্বোচ্চ স্বর্গীয় স্তরে বাস করত। এই স্বর্গীয় স্তরগুলি সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবে, অ্যাজটেকদের মতো কিছু নির্দিষ্ট আত্মা কিছু কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে স্বর্গে বাস করতে পারত। মায়াদের মতে, স্বর্গের চার কোণে অপরিসীম শারীরিক শক্তিসম্পন্ন দেবতারা ছিলেন তাদের বলা হয় বাকাব।
পাতালের কথা বলতে গেলে, মায়ানদের পাতাল অ্যাজটেক পুরাণের খুব কাছাকাছি। মায়াদের জন্য, পাতাল ৯টি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত, প্রতিটি স্তর এক বা একাধিক দেবতা দ্বারা শাসিত হোত। বেশিরভাগ মায়াদের মৃত্যুর পর এই পাতিলের স্তরগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হোত, এমনকি যদি তারা “ভালো মানুষ”ও হয় (তাই একেশ্বরবাদী ধর্মের মতো মায়া পাতালপুরী নরকের সমতুল্য নয়)।
মৃতদের আত্মা ছাড়াও এই পাতালপুরীতে সূর্য (রাতে) এবং চাঁদের (দিনের বেলা) মতো স্বর্গীয় বস্তুও বাস করত।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে সেনোট (গুহার ছাদ ভেঙে পড়ার ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক খাদ) হল পাতালের প্রবেশদ্বার। মেক্সিকোর ইউকাটান প্রদেশে, এই ধরণের প্রায় ১০,০০০ সেনোট রয়েছে। এই স্থানগুলিতে, মায়ারা মন্দকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য অথবা পাতালের দেবতাদের সম্মান করার জন্য আচার-অনুষ্ঠান এবং বলিদান পালন করত।
পৃথিবীর সৃষ্টি
অ্যাজটেকদের মতো, মায়ারা সৃষ্টি ও ধ্বংসের চক্রের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। মায়ানদের মতে, প্রতিটি পৃথিবী ৫,২০০ বছর ধরে সমৃদ্ধ ছিল এবং ধ্বংস হওয়ার আগে এবং তার জায়গায় আরেকটি পৃথিবী এসে দাঁড়ায়। এর আগে দুইবার পৃথিবী ধ্বংস হয়েছিল। বর্তমান পৃথিবী হোল তৃতীয় পৃথিবী।
প্রথম পৃথিবী বামনদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল যারা শহর তৈরি করে। তারা সায়াম উইনিকোব (বিশেষজ্ঞ পুরুষ) নামে পরিচিত। এই বামনরা অন্ধকারে তাদের শহর তৈরি করে কারণ সূর্য তখনও বিদ্যমান ছিল না অর্থাৎ বায়ুমন্ডল বিষাক্ত গ্যাসে ঢাকা। এই প্রজাতির ধ্বংস হয় সূর্যের প্রথম রশ্মি থেকে উদ্ভূত তেজে যা বামনদের পাথরে পরিণত করে। এরপর এই পৃথিবী একটি মহাপ্লাবনের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপর দ্বিতীয় পৃথিবীর জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে একটি নতুন প্রজাতি বাস করে ‘জোলোব’। আমরা এই প্রজাতি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না, কেবল এর প্রতিনিধিরা “সীমালঙ্ঘনকারী” হিসেবে গন্য। তাই আমরা কল্পনা করতে পারি যে এই প্রজাতি দেবতাদের দ্বারা নির্ধারিত এক বা একাধিক নিয়ম মেনে চলেনি। এই পৃথিবী মহান স্বর্গীয় সর্পের মুখ থেকে আসা বন্যার দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়।
তৃতীয় এবং শেষ পৃথিবী হল সেই পৃথিবী যেখানে মায়ানদের জন্ম হয়েছিল এবং আজও তা বিদ্যমান।
এই পৃথিবী সৃষ্টির জন্য, ৪ জন বাকাব এবং অন্য ৩ জন দেবতা (কর্মী টেপু, সবুজ পালকের আবরণধারী প্রভু সমুদ্রের দেবতা গুকুমাটজ এবং স্বর্গের দেবতা হুরাকান) মিলিত হন। তাঁরাই এই পৃথিবীতে প্রাণের সূত্রপাত করেন। পুরাণে হুরাকানকেই সৃষ্টির দেবতা হিসেবে দেখা হয়।
মায়া পুরাণে পৃথিবী ও জীবের উৎপত্তি
বাইবেলে যেমন ঐতিহাসিক বিবরণ এবং পৌরাণিক কাহিনীর মিশ্রণ রয়েছে, তেমনি পবিত্র গ্রন্থ পপোল ভুহ্ তে মায়ার ইতিহাস এবং পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা পাওয়া যায়। বইটিকে যদি আমরা চারটি পর্বে ভাগ করতে পারি। এর প্রথম ও চতুর্থ পর্বে মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে পৃথিবী সমতল, এর উপরে ১৩টি স্বর্গ এবং নীচে নয়টি পাতাল। সময়ের অস্তিত্বের আগে, শূন্য আকাশের নীচে অসীমভাবে প্রবাহিত জল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। জলে বাস করতেন সমুদ্র দেবতা গুকুমাটজ। আকাশে, দেবতা হুরাকান।
দুই দেবতা এবং কর্মী টেম্পু আব স্বর্গের চার কোনে বসবাসকারী ৪ জন বাকাব মিলিত হন এবং পৃথিবীতে জীবন কেমন হওয়া উচিত (গাছ কীভাবে বৃদ্ধি পাবে, মানুষের কীভাবে হাঁটা উচিত ইত্যাদি) তা নিয়ে আলোচনা এবং কথোপকথন শুরু করেন। তারা আরও আলোচনা করেন যে জল পরিষ্কার করা উচিত যাতে পৃথিবী বেরিয়ে আসতে পারে। তাদের কথাই জীবনের উৎপত্তি। তারা বলে উঠলো, “সৃষ্টি শুরু হোক! এই পরিত্যক্ত স্থান ভরে উঠুক প্রানে! সাগর নিচে নেমে যাক, উঠে আসুক মাটি! মাটি উঠে আসো!” তারা একটি বজ্রপাত নিক্ষেপ করে, যার ফলে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসল পাহাড়-পর্বত, হ্রদ, জলপ্রপাত, গাছপালা। প্রথমে, দেবতারা তাদের সৃষ্টি দেখে খুশি হলেন। উঁচু পাহাড়, দুরন্ত গতিতে বয়ে চলা ঝর্ণা, আর সবুজ সাইপ্রেস গাছ দেখে তারা উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। কিন্তু এ পৃথিবী যেন বড্ড নীরব। তাই দেবতারা আবার তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন, সৃষ্টি হলো হরিণ, সাপ আর কিছু পাখি।
তারপর দেবতারা আদেশ করল, “তোমরা, হরিণ, নদীর পাড়ে গিয়ে ঘুমাও, গিরিখাতের মধ্যে যাও, বনের মধ্যে থাকো। নিজেদের সংখ্যা বাড়াও। তুমি চার পায়ে দাঁড়িয়ে চলবে।। আর তোমরা, পাখিরা তোমাদের জায়গা হলো গাছে, ঝোপে, সেখানে তোমরা বাসা বানিয়ে থাকবে। সেখানে নিজেদের সংখ্যা বাড়াও। আর সাপ, তোমরা ছড়িয়ে পড় জলে স্থলে গিরি-কন্দরে। এইভাবে আরও অনেক পশু সৃষ্টি হলো। পৃথিবী মুখরিত হলো তাদের কলকাকলিতে।
দেবতারা পশুপাখিদের নিয়ে সন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু তখনো একটা সমস্যা রয়ে গেল। প্রাণীরা কথা বলতে পারছিল না,সামান্য কিছু শব্দ করতে পারে, যার কোনো মানেই নেই। তাই তারা হতাশ হয়ে পড়ল কারণ তারা এমন একটি প্রাণীর জন্য অপেক্ষা করছিল যা দিন গণনা করতে পারে এবং তাদের প্রশংসা করতে পারে এবং তাদের জন্য বলিদান করতে পারে। তাই তারা মানুষ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা অন্য পশুপাখিদের আদেশ করলেন, “আমরা তোমাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেব না, যা আমরা তোমাদেরকে দিয়েছি। বরং আমরা এমন কাউকে সৃষ্টি করবো যারা আমাদেরকে ভালোবাসবে এবং আমাদের শ্রদ্ধা করবে। এই নতুন সৃষ্টিগুলো তোমাদের চেয়ে সেরা হবে এবং তোমাদের শাসন করবে। এটা তোমাদের চূড়ান্ত ভাগ্য যে, তারা তোমাদের দেহ ছিঁড়ে ফেলে মাংস আলাদা করবে, তারপর তোমাদের খেয়ে ফেলবে। এটাই তোমাদের নিয়তি তোমাদের আয়ু জীবন।”
এরপর দেবতারা পশুপাখির চেয়েও ভালো কিছু বানানোর চেষ্টা করলেন। এরা হলো মায়া। এরা কথা বলতে পারবে, দেবতার প্রশংসা করতে পারবে। কিন্তু এদেরকে বানানো মোটেই সহজ কাজ নয়।
প্রথমে দেবতারা মাটি দিয়ে মানুষ তৈরি করলো। কিন্তু মাটি দিয়ে তৈরি এই মানুষরা ঠিক সেরকম না, যা দেবতারা চাইছিলেন। তারা খুবই নরম আর ভঙ্গুর, সোজা হয়ে দাঁড়াতেও এদের সমস্যা হচ্ছিল। আর বৃষ্টি হওয়ার পর তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো দেহ থেকে ধুয়ে চলে যাচ্ছিল। এর চেয়েও বড় কথা হলো, তাদের দেখার মতো চোখ কিংবা কাজ করার জন্য কোনো মস্তিষ্ক ছিল না। শুধু কথা বলার জন্য মুখ দেওয়া হয়েছে। মস্তিষ্কবিহীন এই মানুষরা ঠিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে না পারায় অর্থহীন কথা বলে বেড়াচ্ছিল। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে দেবতারা এই মাটির মানুষগুলোকে ধ্বংস করে দিলেন।
কাদা দিয়ে ব্যর্থ চেষ্টার পর, দেবতারা এক দেবতা দম্পতি, এক্সপিয়াকোক এবং এক্সমুকানের সাথে পরামর্শ করেন এবং তাদের জিজ্ঞাসা করেন যে কাঠ কি মানুষ তৈরির জন্য উপযুক্ত উপাদান হবে কিনা। দেবতাদের এই জুটি ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়, তাই গুকুমাটজ এবং হুরাকান পৃথিবীকে কাঠের মানুষ দিয়ে ভরে দেয়।
যদিও কাঠের মানুষ কাদামাটির মানুষের তুলনায় উন্নত ছিল, কিন্তু কিছুদিন পরেই দেবতারা বুঝতে পারলো, মাটির মানুষদের মতোই, কাঠের মানুষগুলোরও কোনো মস্তিষ্ক নেই, তারা অর্থহীন কথা বলে সময় নষ্ট করছে। তাদের দেহে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মতো কোনো শিরা নেই, তাই তাদের চামড়া সতেজ আর সজীব হওয়ার বদলে শুকিয়ে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে। তাদের কোনো হৃদয় নেই, এমনকি চেহারাও নেই যে তারা কোনোরকম মুখভঙ্গি করতে পারবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা ছিল বোকা, অনুভূতিহীন। তারা কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা আলাদা করতে পারছে না। এই নির্বোধ মানুষগুলো নিজেদের খাবার তৈরি করার পাত্রগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কুকুরগুলোকে খেতে না দিয়ে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া তারা দেবতাদের উপেক্ষা করছিল। তারা তাদের স্রষ্টাদের স্মরণ করত না, তাদের সম্মান করা তো দূরের কথা। শেষমেশ দেবতারা বুঝতে পারলেন, এই কাঠের মানুষগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলতে হবে এবং তৃতীয়বারের মতো আরও সম্পূর্ণ কোনো মানুষ তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে।
তবে দেবতারা কাঠের মানুষগুলোকে সহজে ছেড়ে দিলেন না। প্রথমে দেবতারা একধরনের আঠালো রজন পদার্থের বন্যা হওয়ার আদেশ দিলেন। ফলে মানুষগুলো মাটির সাথে আটকে গেল। পুড়িয়ে দেওয়া পাত্রগুলো তাদের পুড়ে যাওয়া অংশ দিয়ে কাঠের মানুষদের কাঠের উপর চেপে ধরে আগুন ধরিয়ে দিল। মার খাওয়া কুকুরগুলো তাদের দাঁত দিয়ে কাঠ কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। কয়েকজন পালিয়ে গাছে ওঠার চেষ্টা করল, কেউ কেউ বাড়ির ছাদে গিয়ে লুকাল। কিন্তু গাছ আর বাড়িও প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। গাছগুলো তাদের ডালপালা ঝাঁকিয়ে মানুষগুলোকে ফেলে দিল, বাড়িগুলো কাঠের মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার চেয়ে নিজেরাই ভেঙে পড়ল। আশ্রয়বিহীন কাঠের মানুষগুলো এবার পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু গুহাও পাথর ফেলে নিজেদের মুখ বন্ধ করে দিল। বেশিরভাগ মানুষই বন্যায় ডুবে গেল, যারা বেঁচে ছিল তাদের চেহারা দেখেও আর মানুষ বলে চেনার উপায় নেই। তারা পরিবর্তিত হলো এক নতুন ধরনের প্রাণীতে, বানর হিসেবে। তারা এরপর বেশ কিছু সময় মানুষ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকে।
পপোল ভুহ্ বইটিতে এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব জুড়ে আছে এক রোমাঞ্চকর অভিযানের বর্ননা। যেখানে ” হিরো টুইনস্” অর্থাৎ বীর যমজ ভাই পাতালে গিয়ে তাদের বাবা কাকাকে (এনারাও যমজ) মৃত্যুর পর আবার জীবিত করে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। আমি বইটির শেষ পর্বে চলে যাব যেখানে মানুষ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস
পাতাল হতে আকাশে যাওয়ার আগে, হিরো টুইনস তাদের পিতা, হুন -হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপুর দেহ পুনরায় একত্রিত করেছিলেন এবং জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের কাকা ভুকুব হুনাহপু পাতালেই রয়ে যান এবং তিনি দেবতা হিসেবে সকল মানুষের দ্বারা সম্মানিত হন। অপরদিকে হুন -হুনাহপু ভুট্টার দেবতা (বা প্রথম পিতা) হয়ে ওঠেন এবং তিনি বর্তমান বিশ্ব যুগের স্রষ্টা। প্রসঙ্গত উল্লেখ যোগ্য হুন -হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু ছিল এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের পুত্র ছিলেন, যারা কাঠের মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। হুন -হুনাহপুর প্রথম কাজগুলির মধ্যে একটি ছিল তিনি একটি বিশাল বিশ্ববৃক্ষ (একটি ভুট্টা গাছ) গড়ে তোলেন যা পৃথিবীর কেন্দ্রকে ধরে রেখেছিল এবং তিনটি রাজ্যকে সংযুক্ত করেছিল এগুলি হল পৃথিবী, স্বর্গ এবং পাতাল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত প্রশংসা করার মতো মানুষ তৈরির বিষয়টি ছিল অধরা। যা সমুদ্র ও আকাশের দেবতা গুকুমাটজ এবং হুরাকানের মূল কাজ ছিল। ইতিমধ্যে তারা চারটি প্রাণীর কাছ থেকে খবর পেয়েছিল (একটি কাক, একটি তোতাপাখি, একটি পাহাড়ি বিড়াল এবং একটি কোয়েট) পাহাড়ে ভুট্টা এবং অন্যান্য ভোজ্য জিনিসের উপস্থিতি সম্পর্কে। প্রাণীরা দেবতাদের ভুট্টার শীষের নমুনা দিল যা দেখে দেবতারা বুঝতে পারলেন, মানুষ তৈরির জন্য যা দরকার তা তারা পেয়ে গেছেন। দেবতারা ভুট্টো গুড়ো করে এই গুড়ো দিয়ে চারজন মানুষ বানালেন। এই চারজন হলো ‘ফোর ফাদার্স’। তারপর দেবতারা ভুট্টো আরও গুড়ো করে তরল বানিয়ে এই চারজনকে খেতে দিলেন। এটি খাওয়ার পর চার পিতার দেহে পেশি আর শক্তি তৈরি হলো। এই চারজন ঘুমিয়ে গেলে দেবতারা তাদের চারজনের জন্য চারজন সুন্দরী সঙ্গী বানিয়ে দিলেন। চার পিতা দেবতাদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানাল। তাদেরকে এই জগৎ সম্পর্কে সব জ্ঞান দেওয়া হলো। চার পিতা দেবতাদেরকে বলল, “আমরা দেখতে পারি, শুনতে পারি, কথা বলতে পারি, চলতে পারি, চিন্তা করতে পারি। আমরা অনুভব করতে পারি সবকিছু, আমরা সবকিছু জানি, আমরা এই পৃথিবী দেখতে পারি, দেখতে পারি ওই আকাশ। ধন্যবাদ আমাদেরকে বানানোর জন্য…”
তারপর হঠাৎ করেই আবার নতুন একটা সমস্যার সৃষ্টি হলো। দেবতারা বুঝতে পারলেন, মানুষদেরকে বেশি নিখুঁতভাবে তৈরি করে ফেলা হয়েছে। এতটাই নিখুঁত যে, তারা দেবতাদের মতোই জানে এবং দেখতে পারে! অর্থাৎ তারা নিজেদের সমান সৃষ্টি তৈরি করে ফেলেছে! তাই তারা জ্ঞান সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, সাথে তাদের অন্যান্য ক্ষমতাও।
দেবতারা চার পিতার চোখে কুয়াশার ঝাপটা মারলেন। ফলে তারা আর আগের মতো অনেক দূর পর্যন্ত দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো। জ্ঞানও কমিয়ে দেওয়া হলো, যতটুকু তাদের প্রয়োজন ততোটাই রাখা হোল। বেঁধে দেওয়া হলো তদের আয়ূ। দ্রুতই চার পিতা আর তাদের স্ত্রীদের সন্তান-সন্ততি হলো। এখন তারা বেশী কিছু জানতে চায়না, দেখতে চায়না কেবল নিজের স্ত্রী পুত্র সংসার নিয়ে আবদ্ধ থেকে কাটিয়ে দেয় আয়ু জীবন।
এবং এভাবেই পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল মায়ারা।
প্রসঙ্গত মায়া নামটি ফরাসি ভাষায় “মাইস” হিসাবে অনুবাদ করা হয়েছিল। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
তৃতীয় পর্ব
এবার আমরা প্রবেশ করব ‘পপোল ভুহ্’ বইটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে যেখানে হিরো টুইন্স অর্থাৎ যমজ ভাতৃদ্বয় তাদের বাবা কাকার প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল পাতালে, তার প্রতিশোধ নিতে তারা পাতাল রাজ্যে যাবে এবং মৃত্যুপুরী থেকে তাদের বাবা কাকাকে পুনরায় জীবিত করবে যা এই কাহিনীটি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড জুড়ে আছে। আমি ঘটনা পরম্পরা বজায় রাখতে আগে তাদের বাবা কাকার কাহিনী আগে শোনাবো পরে যমজ ভাইদের কাহিনীতে আসবো যদিও আসল বইটির শুরু হিরো টুইন্সের পাতাল গমন দিয়ে।
তবে সবার আগে মায়ানদের প্রিয় একটি খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) সম্বন্ধে কিছু না বললেই নয়, যা এই কাহিনীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
মায়ানদের প্রিয় খেলা “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok)
হ্যারি পটার এবং চেম্বার অফ সিক্রেটস মুভির কুইডিচ ম্যাচ এর কথা মনে আছে? সেই উত্তেজনাপূর্ণ খেলাটা ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। কিন্তু মায়া সভ্যতার পোক-তা-পোক খেলার সঙ্গে এর অনেক মিল আছে! যদিও এখানে জাদুর ঝাড়ু ছিল না, তবুও খেলাটি ছিল ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং আর রোমাঞ্চকর। এই খেলা হয়ে উঠেছিল একটি পুরো সভ্যতার জয় পরাজয়ের রাজনৈতিক নির্ধারক।
পোক-তা-পোক খেলার উৎপত্তি
পোক-তা-পোক (Pok-Ta-Pok) ছিল মেসোআমেরিকার অন্যতম প্রাচীন বল খেলা। এই খেলার শিকড় প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ওলমেক সভ্যতার সময়ে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেখানেই প্রথম এই ধরনের বল খেলার উদ্ভূত হয়েছিল। যদিও ওলমেকরা এই খেলার সূচনা করেছিল, তবে এটি মায়া সভ্যতায় সর্বাধিক বিকাশ লাভ করে। মূলত, সেই সময়েই এই খেলা বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অর্জন করে।
খেলোয়াড়দের সংখ্যা ও দল
পোক-তা-পোক খেলা সাধারণত দু’টি দলের মধ্যে খেলা হত। প্রতিটি দলে থাকত ২ থেকে ৫ জন। তবে কখনো কখনো আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়েও খেলা হতো।
বল ও খেলার কোর্ট
এই খেলাটি মূলত বিশেষভাবে নির্মিত “বল কোর্ট” বা পেলোটে ড্রোম (Pelote Drome)-এ খেলা হত। কোর্টগুলো ছিল আয়তাকার আকৃতির এবং এর দুপাশে ছিল উঁচু দেওয়াল, যা বলকে মাঠের বাইরে যাওয়া থেকে রোধ করত। অন্য দুই দিকে উঁচু প্রাচীরের ওপর থাকতো মন্দির। কিছু কোর্টে পাথরের গায়ে ধাতুর তৈরি রিং (হুপ) থাকত। যেটার মধ্যে দিয়ে বল ফেলা হতো। চিচেন ইৎজা, কোপান, টিকালসহ অনেক মায়া নগরে বিশাল আকারের বল কোর্ট পাওয়া গেছে, যা মায়াদের স্থাপত্যশৈলী আর নগর পরিকল্পনার নৈপূন্যতা প্রদর্শন করে। এই কোর্টগুলো শুধু খেলার জন্যই ছিল না, বরং এক ধরনের সামাজিক আর ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত।
খেলায় ব্যবহৃত বলটি ছিল রাবারের তৈরি, যার ওজন ছিল প্রায় ৩-৪ কেজি। বুঝাই যাচ্ছে, বলটি বেশ ভারী ও শক্ত হত। তাই খেলোয়াড়দের জন্য এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না।
খেলার নিয়ম
এই বল খেলার নিয়মগুলিকে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে, চিত্রিত উপস্থাপনা এবং পাথরের স্মৃতিস্তম্ভের জন্য। খেলার শুরুতে বলটি হাতে কোর্টে ছুঁড়ে ফেলা হত এবং সেই মুহূর্ত কাঁধ, কোমর, হাঁটু আর কনুই দিয়ে বলটিকে আঘাত করতে হতো। ভাবতে পারছেন, কতটা কঠিন? তার ওপর, বলটির ওজনের কারণে এটিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করাও বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। খেলার মূল ব্যাপার ছিল বলটাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা আর প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো। কেউ যদি বল মাটিতে ফেলে দিত, তাহলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পেত। অর্থাৎ পয়েন্ট কাটা যেত। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল বলটাকে দেয়ালের পাথরের রিংয়ের ভেতর দিয়ে পাঠানো। যেটা করতে পারলেই, খেলা শেষ—সরাসরি জয়! তবে পয়েন্টের ভিত্তিতে সাধারণত নিষ্পত্তি ঘটতো। তবে স্কোরিং সিস্টেম বা বিজয়ী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ঠিক জানা যায় না। Popol Vuh-এর তথ্য অনুসারে আমরা অনুমান করতে পারি যে খেলাটি একের পর এক, জোড়ায় বা দলে খেলা যেতে পারে। চিত্রগুলিতে, খেলোয়াড়রা বিভিন্ন মনোভাব নিয়ে উপস্থিত হয়।
মজার ব্যাপার হলো, খেলাটি সাধারণত রাজা পুরোহিত এদের সঙ্গে বন্দী বা কয়েদির খেলা হোত। সেখানে নানান ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাকে হারানো হোত এবং খেলা শেষে তাকে বলি দেওয়া হোত। যদি কোনক্রমে সে রিং এর ভেতর বল গলিয়ে জিতে যায় তাহলে রাজা পুরোহিতের মাথাকাটা পড়ত। আসলে এই খেলার সঙ্গে পোপোল ভুহের যমজ ভাইদের কাহিনি জড়িত, যেখানে তারা ভূগর্ভস্থ দেবতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। মায়ারা বিশ্বাস করতেন যে, এই খেলার মাধ্যমে আলো এবং অন্ধকারের শক্তির লড়াই প্রকাশ পায় এবং এটি জীবনের চক্র—যেমন জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের প্রতীকও বটে!
একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মায়া সভ্যতা ছিল মধ্য আমেরিকায় রাবার ব্যবহার করা প্রথম জাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পোক-তা-পোক খেলার বল ছিল রাবার দিয়ে তৈরি। আর এই রাবার ছিল মায়া সভ্যতার একটি বড় আবিষ্কার। মায়ারা এক ধরনের বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে রাবার তৈরি করত।
-: হিরো টুইন্স’- এর গল্প :-
পাতাল লোকে ফুটবল ম্যাচ
তখনও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়নি। সবুজ পালকের আবরণধারী প্রভু সমুদ্রের দেবতা গুকুমাটজ এবং স্বর্গের দেবতা হুরাকান সৃষ্টির নেশায় সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাহাড় পর্বত নদী ঝর্না তথা স্থলভাগককে ওপরে আনেন এবং সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলেন। পশু পাখি সাপ ইত্যাদিতে ভরে দিলেন চারণভূমি। তবে প্রত্যেকের জন্য ছিল নির্দিষ্ট নিজস্ব চারণভূমি। কিন্তু তারা এতে সন্তুষ্ট থাকলেন না। তারা চাইলেন আরও উন্নত প্রানী। যারা তাদের সৃষ্টিকর্তাদের স্মরণ করবে, তাদের মহান কীর্তি প্রচার করবে। আচার অনুষ্ঠান বলিদানের মাধ্যমে পূজার্চনা করবে। তাই বানাল মাটির মানুষ পরে আরও উন্নত মানুষ বানানোর অভিপ্রায়ে বানানো হলো কাঠের মানুষ। এরজন্য ডাক পড়েছিল দুই দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের। কিন্তু এই মানুষগুলো ছিল নৃশংস। তাই তাদেরও ধ্বংস করা হয়। কিছু কাঠ মানুষকে বাঁদরে পরিনত করা হলো। এই মর্তভূমিতে দেবতারা প্রায়ই আমোদ প্রমোদের জন্য আসতেন। মর্তভূমি তখন ছিল দেবভূমি।
দেব-দম্পতি এক্সপিয়াকক এবং এক্সমুকেনের দুই যমজ পুত্র ছিল। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপু। এরা ছিল দুর্ধর্ষ “পোক-তা-পোক” (Pok-Ta-Pok) যা একপ্রকার মেসোআমেরিকান ফুটবল – এই খেলায় পারদর্শী। তারা দিনরাত এই খেলায় মেতে থাকতো। এই খেলায় মুখরিত হোত পৃথিবী।
তারা খুব প্রতিভাবান ছিল, সবসময়েই এই খেলায় তারাই জিতত। জিতলে কী হয়, তারা খেলবার সময়ে বড্ড জোরে জোরে চিৎকার করত। পাথরের বল কোর্টটি জিবালবার প্রবেশপথের ঠিক উপরে অবস্থিত ছিল। তাদের ক্রমাগত চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তথাকথিত মায়া নরক দেবতা এক্সিবালবার। এইরকম চিৎকারে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে তিনি নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে যমজ দেবতাকে সমন দিলেন। এই এক্সিবালবা অত্যন্ত বদরাগী এবং নিষ্ঠুর চরিত্রের দেবতা ছিলেন।আকাশের দেবতারাও তাদের এড়িয়ে চলতো। মায়ারা সচরাচর এর নাম মুখে আনতে চাইত না। কেননা মায়াদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি ভুল করেও এর নাম মুখে আনে তবে তার আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।
সে যাই হোক,স্বর্গের দেবতাদের বারন সত্ত্বেও খেলার প্রতি ভালোবাসা আর আত্মসম্মান রক্ষার্থে তারা পাতালে যায়। হুন হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু দেবতাদের প্রায় ঠেলে দিয়ে অনায়াসে পাতালের নয়টি স্তরই অতিক্রম করতে পেরেছিল। এরপর তারা পাতালে প্রবেশ করলে হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে জিবালবার প্রভুরা(১২ জন দেবতা) তাদের ব্যবহারিক রসিকতার মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানালেন। তখন নরক দেবতা তাদের বেশ কয়েকটা কঠিন পরীক্ষার সামনে ফেললেন। প্রথমে তাদের বলা হল যে তারা যেন যেভাবেই হোক কাঁটার সেতু পেরোয়। এই সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নদী। তারা সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে নরকের দেবতার কাছে পৌঁছালেন। সেখানে নরক দেবতা একটা কাঠের ছড়ি কাঁধে ঠেকিয়ে অভিবাদন করলেন। তারপর দুজনকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে এই দেবতাদ্বয়কে কি তারা চিনতে পারেন! দেবতাদ্বয়কে তারা চিনতেন না। ফলে এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলেন। তখন এক্সিবালবা তাদের শয়তানি করে একটা নিরীহ কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। দুই ভাই তার চক্রান্ত ধরতে না পেরে সরল বিশ্বাসে সেই বেঞ্চিতে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন সে বেঞ্চিতে আগুন ধরে গেল। তারা আগুনে বেঞ্চি থেকে বেরুতে না পেরে পুড়ে মারা গেলেন। হুন-হুনাহপু এবং ভুকুব-হুনাহপুকে মারার পর হুন-হুনাহপুর মাথা পাতালের একটি ক্যালাবাস নামের গাছে কাঁটার সাহায্যে স্থাপন করা হয়। আর তার দেহ তার ভাইয়ের সাথে গাছের পাদদেশে সমাহিত করা হয়।
শিবালবার রাজাদের অবাক করে দিয়ে, গাছটি সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে এবং তারপর থেকে এই গাছটি পবিত্র হয়ে ওঠে।একদিন জিবালবার রাজকুমারী এক্সকুইক, (যাকে ব্লাড মুন দেবীও বলা হয়), যখন বাগানে বেড়াচ্ছিল তখন সে এই মাথাটি দ্বারা আকৃষ্ট হন, যদিও তাকে এটি থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। তিনি গাছের আসেন এবং একটি ফল কুড়োতে গেলে মাথাটি তার হাতে থুতু দেয়। এরফলে সে অলৌকিকভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এরপর তাকে পাতাল থেকে বহিস্কার করা হয়। সে তখন পাতাল ছেড়ে পৃথিবীর উপরের রাজ্যে তার শাশুড়ি এক্সমুকেনের(জুমুকেন) সাথে দেখা করেন এবং ঘটে যাওয়া সমস্ত কাহিনী বিবৃত করেন।
এক্সমুকেন তার ছেলেদের উপর ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির কারণে, এক্সকুইককে অবিশ্বাস করে এবং নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তাকে বেশ কয়েকটি কাজ দেয়। এক্সকুইক একে একে পরীক্ষাগুলি উত্তীর্ণ হন এবং কিছুটা বিশ্বাস অর্জন করে। এদিকে নির্ধারিত সময়ে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। অথচ তাদের দিদার মনে তাদের প্রতি অবিশ্বাস রয়েই যায়। তখন তাদেরও দেখাতে হয় যে তারা যোগ্য পিতার সন্তান। তারপর সে তাদের কাছে টেনে নেয়। দুই যমজ নাতি বড় হয়ে ওঠে।
জুমুকেন বা এক্সমুকেন তার ছেলেদের খেলার বল ও সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখত কারণ সে চায় না যে তার নাতিরা তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছে তা জানুক এবং তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করুক। কিন্তু ভবিতব্য খন্ডাবে কে? যমজরা সরঞ্জামটি খুঁজে পায় এবং তারা দুর্ধর্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া তারা দুর্দান্ত শিকারী এবং জাদুকরী ক্ষমতাও অর্জন করে। একদিন শিকার করতে গিয়ে তারা একটি ইঁদুর ধরে এবং ইঁদুরটি তাদের বলে, পাতালে তাদের বাবা এবং কাকার সাথে কী ঘটেছিল। তারা তখন মনেমনে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করে।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
চতুর্থ পর্ব
হিরো টুইন্সের পাতাল অভিযান
এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু দুই যমজ ভাই তাদের বাবা কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পাতাল-লোকে যাওয়ার জন্য তারা তাদের বাবা কাকার পথ অনুসরণ করল অর্থাৎ পাতাল-লোকের প্রবেশ দ্বারের মুখে খেলার মাঠে জোরে জোরে চিৎকারপুর্বক খেলতে লাগল। তাদের একটানা জোরে জোরে চিৎকার শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন নরকদেব এক্সিবালবা। আগের বারের মতই এবারেও তিনি দুটি দূত পাঠালেন সমন পাঠিয়ে যে, তারা যেন এক্সিবালবার সাথে দেখা করে এবং সেখানে এসে খেলে এক্সিবালবাকে যেন হারিয়ে দেয়।
যমজ দেবতার নরকে অভিযান
অতঃপর দুই ভাই নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তারা মার কাছ থেকে আগেই জেনে মিয়েছিল যে, তারা বাবা ও কাকা কি কি ভুল করেছিল। সেই মতন জেনে তারা নরকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল তারা নরকের দেবতার পাতা ফাঁদে পা দিল না।
ভুকুব ক্যাকিক্সের পরাজয়
জিবালবায় অবতরণের আগে, যমজ ভাইবোন ভুকুব ক্যাকিক্সকে পরাজিত করে, সে মিথ্যাভাবে নিজেকে সূর্য ও চাঁদ বলে দাবি করে। ধূর্ততা এবং বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে, তারা ভুকুব ক্যাকিক্সকে একটি পাথর দিয়ে আঘাত করে, যার ফলে সে তার শক্তিশালী রত্নখচিত দাঁত, যা তার শক্তির উৎস, হারিয়ে ফেলে। দুই ভাই ক্যাকিক্সের মিথ্যাচার এভাবেই প্রমাণ করে। এরপর তারা পাতালে প্রবেশ করে। সেখানে যাওয়ার পথে তার বাবা কাকার ন্যায় প্রত্যেক স্তরে নানান পরিক্ষার সন্মুখীন হন। কিন্তু এক্সিবালবা যতগুলি পরীক্ষায় বসতে দিল ততগুলিই পরীক্ষায় তারা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হল। অনেক নৃশংস পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার পর, তারা তাদের শেষ রাতটি বাদুড়ের ঘরে কাটায়, যেখানে একটি ভয়ঙ্কর বাদুড় হুনাহপুর মাথা কামড়ে ধরে। দেবতারা তখন এক্সবালাংখুয়েকে তার ভাইয়ের মাথাকে বল হিসেবে ব্যবহার করে বল খেলা খেলতে বাধ্য করে! এক্সিবালবা চালাকির সাথে তার ভাইয়ের মাথাটি খরগোশের মাথার সাথে পরিবর্তন করে, হুনাহপুর মাথাটি তার শরীরে পুনরায় সংযুক্ত করে। আসলে পাতালের প্রভুরা যমজদের মৃত দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু সক্ষম হচ্ছিল না। তখন ক্ষিপ্ত এক্সিবালবা প্রতারণার আশ্রয় নিল। তিনি একটি বড় মশার রূপ নিয়ে কামড়ালেন দুই ভাইকে। কিন্তু কিছুই হল না তারা আগে থেকেই এরজন্য প্রস্তুত ছিল। তারা মশা মারার জন্য খন্তির মতন একরকম কাঠের টুকরো নিয়ে সে মশাকে তাড়া করতেই মশা জীবন বাঁচাবার জন্য পালাতে বাধ্য হল। তারপর এক্সিবালবা তাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে আদেশ দিলে তারা সুকৌশলে সে আদেশ অমান্য করল। হুনাহপু এবং এক্সিবালেংখুয়ে নরকদেবকে বলল তারা খেলতে এসছে, বসতে আসে নি। নরক দেবতা কি ওদের সাথে হেরে যাবার ভয়েই খেলতে চাইছেন না? তাই কি এমন করে সময় নষ্ট করছেন?
এক্সিবালবা বলাই বাহুল্য দুই ভাইয়ের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তার ধারণা হল যে, নরকে অবস্থিত সব নরকের দূতদের সামনে এমন কথা বলে দুই ভাই তাকে অপমান করছে। সে রেগে গিয়ে দুই ভাইকে বলল না, তিনি ভয় পান নি। এবার খেলতে বসা যাক। এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু এমন কথা শুনে হাসল। এটাই তো তারা চেয়েছিল।
এক্সিবালবা জানত সঠিক ভাবে খেললে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে তিনি জিততে পারবেন না। কারণ তার বয়স হয়েছে; ওদিকে দুই ভাইয়ের বয়স কম, ক্ষিপ্রতা বেশি তাই ওদের জেতার সম্ভাবনা বেশি। তাই তিনি কাঁটাওয়ালা বলের সাহায্যে খেলা শুরু করলেন। তার দুই হাত ছিল মোটা কাপড়ে মোড়া। ফলে তার হাত কাটবার ভয় ছিল না। কিন্তু দুই ভাইয়ের তো তা ছিল না। তারা রেগে গেল এক্সিবালবার ওপরে এমন অন্যায় খেলার অপচেষ্টার কারণে। তারা পরিষ্কার বলল তারা এক্সিবালবা ন্যায্যভাবে না খেললে খেলতেই রাজি নয়। তখন বাধ্য হয়ে ভাল ও কাঁটা মুক্ত বলের সাহায্যে খেলতে শুরু করল।
দুই ভাইয়ের এটা ভালই জানা ছিল যে, তারা জিতলে নরক থেকে জীবন্ত বেঁচে ফিরবে না। তাই চালাকি করে তারা প্রথমে হারবার জন্য খেলতে শুরু করল। অহেতুক পয়েন্ট নষ্ট করতে থাকল। তাতে ফল হল। এক্সিবালবা সহজেই জিতলেন। তারপর বরফের খেলা আগুনের ওপরে ঝাঁপ দেবার খেলা শুরু করলেন। প্রতিবারই ইচ্ছা করে হারলেন দুই ভাই।
অবশেষে দুই ভাইয়ের সাথে নরকদেবের শেষ খেলায় সত্যকারের খেলা শুরু হল। প্রত্যেকটা ম্যাচে হারতে আর ভাল লাগছিল না দুই ভাইয়ের। আর তাই তারা শেষ ম্যাচে সত্য সত্যই জিতলেন। সরাসরি আংটার মধ্যে বল গলিয়ে পিছিয়ে থেকেও নিয়মের সুযোগ নিয়ে জয়লাভ করে।
তাতেই এক্সিবালবা বুঝলেন, দুই ভাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন। তারা সব ম্যাচেই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরেছেন তাও বুঝতে পারলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুই ভাইকে এক বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিতে বললেন। দুই ভাই তাতে ঝাঁপ দিতে সম্মত হলেন। তাতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল। তারপর নরকদেব তাদের ছাইকে রক্তের নদীতে ফেলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে, এটাই ছিল দুই ভাইয়ের গোপন খেলা। দুই ভাইয়ের জানা ছিল যে, ঐ নদীতে তাদের ছাই ফেললেই তারা আবার বেঁচে উঠবেন। তবে মনুষ্যরূপে নয়, কাটলফিশ মাছের রূপে। সেই জন্যই তারা ঝাঁপ দিতে রাজি হয়েছিলেন। এর জন্য একটা গোপন মন্ত্র বলতে হত। ঝাঁপ দেবার পূর্বে দুই ভাই মনে মনে এই মন্ত্র বলে নিয়েছিলেন। ফলে কাটলফিশের রূপে জীবন নিয়ে ফিরতে অসুবিধা হল না।
তাদের এমন চমকপ্রদ যাদু দেখে এক্সিবালবা চমকে গেলেন। তিনি দুই ভাইকে কাটলফিশের রুপ থেকে মনুষ্য রূপে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবার গোপন রহস্য কি তা জানতে চাইলেন। দুই ভাই তাকে জানাল কীভাবে তারা এই ব্যাপারটা সম্ভব করেছে। শুধু জানাল না যা, তা হল আসল মন্ত্রের পংক্তিটা। তারা একটা মন্ত্র মিথ্যা মিথ্যা বানিয়ে বলল যে এই মন্ত্র বলে ঝাঁপ দিলেই হবে। তারা যেভাবে বেঁচে ফিরেছে, নরকের রাজাও সেভাবেই ফিরে আসবেন। নির্বোধ এক্সিবালবা সে কথা বিশ্বাস করে ঐ বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিলেন। এর ফলে তিনি মারা গেলেন। তার ছাইকে মাটিতে পুঁতে দিলেন। এর ফলে এক্সিবালবার ফিরে আসবার কোনও সম্ভাবনা রইল না। এই ভাবে এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু জিতে গেলেন!
বিজয়ী যমজ পাতালের বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করে তাদের সমস্ত মন্দ কাজ করার অন্ধকার শক্তি কেড়ে নেওয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের শ্রদ্ধা এবং শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতি দেয়।
শুধু তাই নয়, এরপর তারা তাদের বাবার ধড় আর মুন্ডু একত্র করে তাকে জীবিত করেন। কবর থেকে কাকার মৃতদেহ তুলে এনে তাঁকেও জীবিত করেন। তাদের কাকা ভুকুব হুনাহপু পাতালেই রয়ে যান এবং তিনি দেবতা হিসেবে সকল মানুষের দ্বারা সম্মানিত হন। অপরদিকে হুন -হুনাহপু ভুট্টার দেবতা বা প্রথম পিতা হয়ে ওঠেন এবং তিনি বর্তমান বিশ্ব যুগের স্রষ্টা।
হিরো টুইনস জিবালবা ছেড়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরে আসে। তারা আকাশে উঠতে থাকে, সূর্য এবং চাঁদে পরিণত হয়। এখন যেহেতু সূর্য এবং চাঁদ আকাশে ছিল এবং পৃথিবীকে আলোকিত করেছিল, স্রষ্টা দেবতারা সাদা এবং হলুদ ভুট্টা ব্যবহার করে মানুষের চূড়ান্ত রূপ তৈরি করেছিলেন। ভুট্টা হল সেই মূল্যবান পদার্থ যা শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের এবং স্থায়ী মানুষ তৈরি করতে সফল হয়।
এক্সিবালেংখুয়ে আর হুনাহপু সমপর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
অন্যান্য মেসো আমেরিকান সভ্যতাতেও অনেকটা এই যমজ নায়কের সমতুল্য কাহিনী পাওয়া যায়।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে, এক্সিবালেংখুয়ে এবং হুনাহপু ছিলেন যথাক্রমে পৃথিবীর শাসক এবং আকাশের দেবতা। পরে দুজন যথাক্রমে চন্দ্রদেব এবং সূর্যদেবে রূপান্তরিত হন।
পুরাণ অনুযায়ী দুই ভাই পরে তার বাবা ও কাকাকে নরক থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
মায়ারা বিশ্বাস করত যে, মায়া সম্রাট আসলে হয় এক্সিবালেংখুয়ে কিংবা হুনাহপু দেবের পুত্র। এই কারণেই মায়ারা আহাওকে এত মান্য করত।
মায়াদের বহু সাহিত্যে এই দুই ভাইয়ের সম্পর্কে অনেক ছড়া আছে। এবং অনেক পিরামিডে দুজনের অনেক চিত্র অঙ্কিত আছে।
মায়া দেবতাদের মধ্যে, ইক্সকুইক অপরিহার্য কারণ পোপোল ভুহের ইতিহাসে তিনি নারী বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে , তার নামের অর্থ নারীর রক্ত, শক্তি, প্রাণশক্তি, বা প্রাণবন্ত রক্ত। তিনি মায়া সংস্কৃতিতে নারীর পবিত্রতা, সৌন্দর্য, শক্তি, মূল্য এবং বিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার লক্ষ্য ছিল দুই যমজ বীরের জন্ম দেওয়া এবং জিবালবার একমাত্র নারী হিসেবে তিনি পাতালের সাথে পৃথিবীর মিলনের প্রতিনিধিত্ব করেন।
বানর জমজের কাহিনী
মায়া সংস্কৃতিতে যমজ সন্তানের জন্ম খুবই বিরল এবং তাই যাদুকরী। মায়া দেবতা এক্সপিয়াকোক এবং এক্সমুকেনের দুটি যমজ সন্তান ছিল, হুন হুনাহপু এবং ভুকুব হুনাহপু (“প্রথম যমজ” নামে পরিচিত)। তাদের মধ্যে মায়া দেবী এক্সবাকিয়ালোর আরও দুটি যমজ পুত্রও রয়েছে, এই যমজদের নাম হুন বাটজ এবং হুন চৌয়েন, তারা “বানর যমজ” নামে পরিচিত ছিল। এরপর আসে হিরো টুইন্স যা দ্বিতীয় যমজ।
‘পোপোল ভু’ গ্রন্থ অনুযায়ী এই বানর জমজ ছিল খুব হিংসুটে এবং অত্যাচারী। তারা তাদের ছোট সৎ-ভাই হুনাহপু ও এক্সবালাংখুয়েকে ঈর্ষা করতেন এবং প্রায়শই হেনস্তা করতেন। এজন্য তারা বিতাড়িত হন। দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়, লক্ষ্যহীনভাবে এবং তাদের মা এবং পরিবারের দ্বারা পরিত্যক্ত অবস্থায়, যতক্ষণ না তাদের সৎ ভাইয়েরা বড় হয়ে তাদের দাস হিসেবে ধরে আনে। তারা তাদের শিকার করতে এবং তাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য করাত যখন তারা খেলাধুলা এবং নাচ করত। কিছুদিন পরে, “দ্বিতীয় যমজ” আবিষ্কার করে যে উত্তরাধিকারসূত্রে তাদের সৎ ভাইদেরও জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। তারা এর বিকাশ এবং বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। একদিন, তাদের বড় ভাইদের দুর্ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে, হুনাহপু এবং ইক্সবালাঙ্ক তাদের দুষ্ট সৎ ভাইদের একটি গাছে উঠতে বাধ্য করে, যে গাছটি তারা তাদের জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে খুব লম্বা করে তোলে। যদিও দুষ্ট সৎ ভাইরা করুণা ভিক্ষা করেছিল। অবশেষে তারা নামতে না পেরে বানরের লেজসহ বানরে পরিণত হয়। এইভাবে ভাই হুন বাটজ এবং হুন চৌয়েন বানর হয়ে ওঠে এবং তাদের “বানর যমজ” বলা হত ।
তারা যখন ঠাকুমার কাছে ফিরে আসেন, তাদের হাস্যকর ও বীভৎস রূপ দেখে দাদি হেসে ফেলেন। লজ্জায় ও অপমানে তারা বনে পালিয়ে যান এবং পরে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক বানর দেবতা হিসেবে পূজা পেতে থাকেন। তারা শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী ও পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরাও মানব সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন।
এই কাহিনীর মাধ্যমে মায়া পৌরাণিক কাহিনীতে অহংকার ও হিংসার পরিণাম এবং শিল্পের শক্তির প্রতীক হিসেবে বানর যমজদের উপস্থাপন করা হয়েছে।
মায়ার লুকানো ধন
পবিত্র সেনোটগুলি, যাকে জিবালবার প্রবেশদ্বারও বলা হয়, সম্প্রতি তাদের সমস্ত প্রাচীন, লুকানো সম্পদের সন্ধান শুরু হয়েছে! সমস্ত মহান মায়া শহরগুলি সিঙ্কহোলের পাশে অবস্থিত ছিল, যা তাদের প্রয়োজনীয় মিষ্টি জল সরবরাহ করত। ইউকাটান উপদ্বীপ অঞ্চলে মাটির উপরে কোনও হ্রদ বা নদী নেই। অন্ধকার পথ এবং একসময় লুকানো গুহাগুলি এখন সাহসী অভিযাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান।
বৃষ্টির দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন
প্রত্নতাত্ত্বিকরা সম্প্রতি বেলিজের কারা ব্লাঙ্কার একটি সিনোটে মায়া বৃষ্টির দেবতার উদ্দেশ্যে পাথরের হাতিয়ার এবং সিরামিকের নৈবেদ্য আবিষ্কার করেছেন। পবিত্র পুকুরটি ঘন বনে ঘেরা এবং এটি মায়া জল মন্দিরের স্থানও। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন যে এই নৈবেদ্যগুলি সেই সময়ের ছিল যখন ব্যাপক খরা সমগ্র মায়া সভ্যতা ধ্বংস করতে শুরু করেছিল।
বেলিজের কারাকোলের কাছে, একটি বৃহৎ মায়া শহর, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অভিযাত্রীরা লাস কুয়েভাসের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধান করে এবং সেই স্থানের বৃহত্তম পিরামিডগুলির একটির নীচে একটি বিশাল গুহা খুঁজে পান। তারা একটি সিঙ্কহোল এবং একটি ভূগর্ভস্থ নদীও খুঁজে পান যা সম্ভবত এটি একটি আনুষ্ঠানিক স্থান ছিল, যা সিঙ্কহোল বা সেনোট এবং মায়ার পবিত্র বিশ্বাসের মধ্যে যোগসূত্রকে পুনরায় নিশ্চিত করে।
মোহিত সেনোট
মায়াপান ছিল একটি প্রাচীন প্রাচীর ঘেরা মায়া শহর যা চিচেন ইৎজার পতনের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শহরের প্রাচীরের ভিতরে, বেশ কয়েকটি সেনোট রয়েছে, তবে একটি সেনোট – স্যাক উয়ায়ুম – সীমানা প্রাচীরের ঠিক বাইরে অবস্থিত। স্থানীয় গ্রামবাসীরা স্যাক উয়ায়ুম সেনোট থেকে জল পান করে না এমনকি তাদের বাচ্চাদেরও এর কাছে খেলতে দেয় না! সম্ভবত এর দুটি গুহায় মানুষের হাড়ের চিহ্ন ছড়িয়ে থাকার সাম্প্রতিক আবিষ্কার তাদের আতঙ্কের ব্যাখ্যা দেয়!
প্রত্নতাত্ত্বিকরা, সিনোটের অবস্থান দেখে কৌতূহলী হয়ে, এর লুকানো গভীরতা অন্বেষণ করার লোভ রোধ করতে পারেননি। এর জন্য তাদের প্রথমে জলের পৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য ৪০ ফুট নীচে নেমে যেতে হয়েছিল! তারা বিশ্বাস করেন যে সিনোটটি একটি সমাধিস্থল ছিল কারণ তারা এর গভীরতায় মনুষ এবং প্রাণী উভয়ের কঙ্কালের অবশেষ আবিষ্কার করেছিল। গবেষকরা ধারণা করেছিলেন যে মায়াপানের দক্ষিণে সিনোটের অবস্থানটি পাতালের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। যদি তারা কোনও রোগে(প্লেগ) মারা যেত তবে ভুক্তভোগীদের সেখানে সমাহিত করা হতো। তবুও সিনোটটি এখন একটি ঘোড়ার মাথাওয়ালা সর্পের স্থানীয় কিংবদন্তি দ্বারা সুরক্ষিত রয়েছে যা পবিত্র সিঙ্কহোলের রহস্য রক্ষা করে।
সেনোটের পবিত্র আলো
প্রত্নতাত্ত্বিক, গিলারমো ডি আন্দা, চিচেন ইটজার কাছে একটি সেনোটে একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন। সিঙ্কহোলের নীচের জল বছরের দুটি দিন একটি পবিত্র সূর্যঘড়ি হিসেবে কাজ করত: ২৩শে মে এবং ১৯শে জুলাই – যখন সূর্য তার শীর্ষে পৌঁছায় শীর্ষ আলো শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট দিনগুলিতে কোনও ছায়া ফেলে না। সূর্যের আলো সেনোটের ছোট খোলা অংশ দ্বারা নিবদ্ধ হয় এবং নীচের জলে উল্লম্বভাবে নেমে আসে। শীর্ষবিন্দুতে, সূর্য চিচেন ইটজার এল ক্যাস্টিলো পিরামিডের উত্তর-পূর্ব কোণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে উদিত হয় এবং পরে পিরামিডের পশ্চিম সিঁড়ির সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে অস্ত যায়। সেনোটটি লুকানো মায়া সূর্যঘড়ির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রত্নতাত্ত্বিক এবং অন্যান্য সাহসী অভিযাত্রীরা যারা মায়া পাতালের রাজ্যে আগ্রহের সাথে প্রবেশ করে, তাদের মনে ভয় নেই। কিন্তু তাদের কি জিবালবার নির্মম দেবতাদেরও হারিয়ে যাওয়ার মতো বুদ্ধি আছে? অন্তত মায়ার পবিত্র রহস্য আমাদের কাছে আনার জন্য তাদের নরকের নয়টি স্তর অতিক্রম করতে হবে না!
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
পঞ্চম পর্ব
দ্য লিজেন্ড অফ দ্য অ্যালাক্সেস (মায়ান উপদেবতা)
প্রতিটি স্থানের নিজস্ব কিংবদন্তি আছে। কিছু কিছু অন্যদের কাছাকাছি হলেও একটা নিজস্বতা বহন করে। বিশ্বজুড়ে, অনেক কিংবদন্তি খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে ছোট ছোট মানুষ-সদৃশ প্রাণীরা হঠাৎ হঠাৎ উদয় হয়ে নানান মজার কান্ড ঘটান যার কিছু উপকারি আবার করো কাছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ডেকে আনে। এই প্রাণীদেরকে গবলিন বলে কয়েক জায়গায় উল্লেখ আছে। মেক্সিকোতে এই ধরণের কিংবদন্তির ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে মেক্সিকোতে, ” ছোট মানুষ ” সম্পর্কে এই মায়া কিংবদন্তি রয়েছে যা শতাব্দী ধরে চলে আসছে। এই কিংবদন্তিটি অ্যালাক্সের, এক ধরণের আধ্যাত্মিক ক্ষুদ্র ব্যক্তি যিনি যেখানেই যায় সেখানেই বিশৃঙ্খলা, দুষ্টামি এবং ধ্বংসের কারণ হয়। এই কারণেই তাদের ‘মিসচিফ’স মাস্টার’ বলা হয়। তাই তাকে নানান উপঢৌকনে তুষ্ট রাখতে হয়।
অ্যালাক্স ইউকাটান উপদ্বীপের আশেপাশে কোথাও বাস করে বলে গুজব রয়েছে। এরা সাধারণত মানুষের কাছে অদৃশ্য, যদিও কিংবদন্তি অনুসারে এরা দুষ্টুমি করতে চাইলে বা খেলাধুলা করতে চাইলে যখন-তখন দৃশ্যমান হতে পারে। এরা সাধারণত জঙ্গল, বন, মাঠ, গুহা এবং এমনকি গভীর পাথর সহ প্রাকৃতিক অঞ্চলে থাকে। তবে, এরা যেখানে ইচ্ছা বাসা তৈরি করতে সক্ষম, যদি তাদের খাবার, জল এবং আশ্রয়ের অভাব না থাকে।
এই অ্যালাক্সেস (অথবা মায়ান ভাষায় অ্যালাক্সব ) কেবল হাঁটু পর্যন্ত উঁচু এবং তাদের চোখ চওড়া, পেঁচার মতো। তারা দ্রুত নড়াচড়া করে, এবং কিছু প্রাণীর দেহের অংশ ইগুয়ানা, হরিণ, ম্যাকাও বা অন্যান্য প্রাণীর বলে জানা গেছে। অন্যান্য শারীরিক বর্ণনা পরীর মতো আধ্যাত্মিক প্রাণী বিশেষ। কিছু অঞ্চলে, ইউকাটানের স্থানীয়রা বলে যে অ্যালাক্সেস আরও ভয়ঙ্কর আকারে দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে ছায়াময় অন্ধকার বা উজ্জ্বল লাল চোখ সহ আকৃতি।
স্থানীয়দের মতে, তারা জঙ্গলে বাস করে কিন্তু যদি তারা মনে করে যে কারো থেকে তারা উপকৃত হবে, তাহলে তারা জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। যদি কোনও সম্প্রদায় তাদের নৈবেদ্য প্রদান করে, তবে এই ক্ষেত্রে তারা এই সম্পদের সুবিধা নিতে সেই অঞ্চলে যায় এবং ততক্ষণ থাকবে যতক্ষণ নৈবেদ্য অব্যাহত থাকবে।
অ্যালাক্সরা যেমন সহজেই খুশি হয়, তেমনি তারা সহজেই রেগে যায়। যদি অ্যালাক্সদের কেউ অসম্মান বা অবহেলা করে, তাহলে তারা স্থানীয়দের ভয় দেখানোর জন্য ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। এছাড়াও, তারা সেই অঞ্চলের জিনিসপত্র ধ্বংস করতে পারে বা নানান রকম জঙ্গলের রসিকতা করতে পারে। যদি কোনও স্থানীয় ব্যক্তির ভাগ্যে দুর্ভাগ্য থাকে তাহলে বিশ্বাস করা হয় যে সে অবশ্যই কোনও অ্যালাক্সকে অসন্তুষ্ট করার মতো কিছু করেছে। প্রায়শই এই লোকেরা যারা অ্যালাক্সকে অসম্মান করেছে তারা কোনওভাবে নতুন উপহার প্রদান করে বা এমনকি তাদের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে অ্যালাক্সের কাছে ক্ষতিপূরণ দেয় এবং নিষ্কৃতি লাভ করে।
যদি কোন মায়া জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে, তাহলে একজন অ্যালাক্স তাকে থামিয়ে দিতে পারে উপহার চাইতে। যদি ভ্রমণকারী অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে অ্যালাক্স অন্যান্য অ্যালাক্সদের জড়ো করে ভ্রমণকারীর বাকি যাত্রায় তাণ্ডব চালাবে এবং নাকানিচুবানি করে ছাড়বে। স্থানীয়দের মতে, অ্যালাক্সরা আঁচড়ানো, কামড়ানো বা লাথি মারার মতো শারীরিক ক্ষতি করতে পারে না, তবে তারা অভিশাপের আকারে অসুস্থতার মন্ত্র ডেকে আনতে পারে।
অ্যালাক্স এবং কৃষক: বন্ধু না শত্রু?
যদিও অ্যালাক্স ভীতিকর শোনাতে পারে, তবুও তাদের খলনায়ক হিসেবে খুব একটা দেখা হয় না কারণ তারা ছোট এবং শিশুসুলভ। শিশুদের মতো, অ্যালাক্সদের ভোগের মাধ্যমে শান্তি আনতে হয়, কিন্তু বিরক্ত হলে তারা রাগ প্রকাশ করবে। প্রকৃতপক্ষে, অ্যালাক্স কেবল তাদের বিশৃঙ্খলার জন্যই পরিচিত নয় – তারা আসলে অনেক মায়া কৃষক এবং সম্প্রদায়ের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। অনেক কৃষক কয়েক দশক ধরে গর্বের সাথে তাদের খামারগুলিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অ্যালাক্সদের দিকে ঝুঁকে। এর কারণ হল তাদের বিশ্বাস যে অ্যালাক্সরা ভুট্টার প্রভুর কাছ থেকে একটি উপহার যাদের মেক্সিকো জুড়ে ভুট্টার ক্ষেতকে আশীর্বাদ করার জন্য পাঠানো হয়েছে ।
স্থানীয় কিংবদন্তিরা দাবি করেন যে, আপনি যদি অ্যালাক্সদের জন্য একটি ছোট ঘর তৈরি করেন, তাহলে তারা আপনার জমিতে ফসল ফলাতে, আপনার জমি পাহারা দিতে এবং এমনকি শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের জন্য সাহায্য করবে। অ্যালাক্সকে আকৃষ্ট করার জন্য, কৃষকরা প্রথমে একজন এক্স’মেন (শামান) এর কাছে যান, যিনি কাদা এবং কৃষকের রক্ত ব্যবহার করে একটি ছোট অ্যালাক্স মূর্তি তৈরি করেন। সৃষ্টির সাত সপ্তাহ পর, শামানদের প্রার্থনা এবং নৈবেদ্য দ্বারা অ্যালাক্সের আত্মা “জীবিত” হয়। এরপর অ্যালাক্সকে তার নতুন বাড়িতে স্থাপন করা হয় এবং জমির অভিভাবক হিসেবে তার অবস্থান গ্রহণ করে। তবে, অ্যালাক্স কেবল তখনই গর্বের সাথে তাদের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা গ্রহণ করবে যদি তারা কৃষককে সৎ বলে মনে করে।
অ্যালাক্স দ্বারা সুরক্ষিত একটি খামার কিনলে কৃষকরা আগে অ্যালাক্সের অনুমতি নেয় নৈবেদ্য দিয়ে নাহলে অ্যালাক্স খামারে দুর্ভাগ্য নিয়ে আসতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে আক্রমণকারী, চোর এবং শুষ্ক মন্ত্র। নতুন মালিক যতক্ষণ না অ্যালাক্সকে প্রার্থনা এবং খাবারের মতো নৈবেদ্য প্রদান করেন, জমির মূল রক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং সম্মান জানান, ততক্ষণ তারা নতুন মালিককে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। যদি কৃষকরা অ্যালাক্সকে উপেক্ষা করেন বা দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে তাদের কপালে অশেষ দুর্গতি।
ইউকাটান উপদ্বীপ জুড়ে ছোট ছোট গ্রাম এবং সম্প্রদায়গুলিতে এই ক্ষুদ্র অ্যালাক্স বাড়িগুলির অনেকগুলি পাওয়া যায়। অনেক কৃষক এখনও তাদের খামারে সৌভাগ্য বয়ে আনার জন্য এই কিংবদন্তিগুলি মেনে চলেন । তবে, নিয়মগুলি এখানেই থেমে থাকে না। অ্যালাক্স কৃষককে তার কাজে বিরক্ত হওয়ার আগে প্রায় সাত বছর ধরে সহায়তা করে। সাত বছর পরে, কৃষককে ছোট্ট অ্যালাক্স বাড়ির দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে তাকে ভেতরে আটকে রাখা যায়। যদি দরজাটি সিল না করা হয়, তাহলে অ্যালাক্স খামারে দুষ্টুমি শুরু করবে এবং এমনকি দুর্ভাগ্যও ডেকে আনবে, যা পূর্ববর্তী সাত বছরে প্রদত্ত সাহায্যের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
কিংবদন্তিরা কখনও মরে না – অ্যালাক্স বেঁচে থাকে!
কিছু আধুনিক মায়া এখনও অ্যালাক্সের চেতনায় বিশ্বাস করে। বিশেষ করে কৃষকরা, সাত বছর ধরে তাদের জমির আরোগ্য ও সুরক্ষার জন্য অ্যালাক্সদের আমন্ত্রণ জানানোর কিছু আচার-অনুষ্ঠানে এখনও লিপ্ত থাকেন। অন্যান্য কুসংস্কারের মতো, এই কৃষকরা অ্যালাক্সকে সত্যিকারের আত্মা হিসেবে বিশ্বাস করে এবং খামারে কিছু ভাগ্য বয়ে আনার জন্য তারা এইসব আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।
কৃষকদের বাইরেও অন্যান্য সম্প্রদায়গুলি অ্যালাক্স ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছে। এই গল্পগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত গল্পটি ১৯৯০-এর দশকে কানকুন এবং প্লায়া দেল কারমেনের মধ্যে নির্মিত একটি সেতুর বিষয়ে ঘটেছিল যার নাম ক্যানকুন-নিজুক সেতু। পরিস্থিতি অনুসারে, স্থানীয় মায়া শ্রমিকদের কথা অগ্রাহ্য করে অ্যালাক্সের অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ শুরু করেন, এতে সাইটটির নির্মাণ কাজ তিনবার ব্যর্থ হয়েছিল। শুধুমাত্র অ্যালাক্সদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল তৈরি করেই তারা নির্মাণকাজে সফলতা পান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে অ্যালাক্স বাড়ি তৈরিতে সাহায্য পাওয়ার পরামর্শ পাওয়ার পর নির্মাণ শ্রমিকরা একজন মায়া শামানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও এটি একটি কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে, স্থানীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করার পরেও চতুর্থবারের মতো নির্মাণ ব্যর্থ হয়নি।
অনেক রেস্তোরাঁ, হোটেল এমনকি দোকানেও এখনও পৌরাণিক প্রাণীদের সন্তুষ্ট করার জন্য অ্যালাক্স বাড়ি রয়েছে । সাত বছর পর কিছু বাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়, ভবিষ্যতের অ্যালাক্স অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করার জন্য আরও বাড়ি তৈরি করা হয়। যদিও অ্যালাক্সদের কারও কারও কাছে কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী হতে পারে, তবে এটা স্পষ্ট যে মায়া সংস্কৃতির সঙ্গে অ্যালাক্স ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
উক্সমালের বামন
উক্সমালের বামনের কিংবদন্তিটি উক্সমাল শহরে প্রচলিত একটি গল্প। উক্সমাল শহরে সুদৃশ্য যে পিরামিড আছে এটি তার সৃষ্টির গল্প। ,
গল্প অনুসারে, উক্সমাল শহরটি “নারীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেনি” এমন একটি ছেলের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, শহরের নির্দিষ্ট স্থানে রাখা একটি বড় ড্রাম সে নিজে এসে বাজিয়ে তার আগমন বার্তা প্রকাশ করবে।
একদিন, একটি বামন ড্রামটি আঘাত করে , যার কোনও মা ছিল না, বরং একটি নিঃসন্তান বৃদ্ধ মহিলার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেছিল অনেকের মতে, এই ডিমটি ছিল একটি ইগুয়ানার ডিম, এবং মহিলাটি ছিল ডাইনি। ড্রামের শব্দ শহরের শাসকের মধ্যে ভয় জাগিয়ে তোলে এবং বামনটিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। শাসক মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনা করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনটি অসম্ভব আপাতদৃষ্টিতে কাজ করতে পারলে বামনটির জীবন রক্ষা করা হবে। কাজগুলির মধ্যে একটি ছিল এক রাতে শহরের যেকোনো ভবনের চেয়ে উঁচু একটি বিশাল পিরামিড তৈরি করা। বামনটি শেষ পর্যন্ত পিরামিড নির্মাণ সহ সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে। বামনটিকে উক্সমালের নতুন শাসক হিসেবে প্রশংসা করা হয় এবং কাঠামোটি তাকে উৎসর্গ করা হয়।
এই গল্পের একটু ভিন্ন রূপ টিকে থাকা সংস্করণগুলিতে, বৃদ্ধা মহিলাকে ডাইনি বা যাদুকর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং বামনটি হল একটি ছেলে যে জাদুকরীভাবে রাতারাতি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। গল্পটি নিম্নরূপ:-
একজন বৃদ্ধা মহিলা একটি কুঁড়েঘরে থাকতেন, যেটি এখন যেখানে সমাপ্ত পিরামিডটি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই স্থানেই অবস্থিত ছিল। এই বৃদ্ধা মহিলা ছিলেন একজন ডাইনি যিনি একদিন তার কোন সন্তান না থাকার জন্য শোকাতুর ছিলেন। একদিন, তিনি একটি ডিম নিয়ে কাপড়ে মুড়িয়ে তার ছোট কুঁড়েঘরের এক কোণে রেখেছিলেন। প্রতিদিন তিনি ডিমটি দেখতে যেতেন যতক্ষণ না একদিন ডিমটি ফুটে ওঠে এবং মন্ত্রমুগ্ধ ডিম থেকে একটি ছোট প্রাণী বেরিয়ে আসে, যা দেখতে অনেকটা শিশুর মতো। বৃদ্ধা মহিলাটি খুব খুশি হয়ে শিশুটিকে তার ছেলে বলে মেনে নিলেন। তিনি শিশুটিকে তার যত্ন ও মাতৃত্ব দিয়েছিলেন যাতে এক বছরের মধ্যে এটি পুরুষের মতো হাঁটতে এবং কথা বলতে শুরু করে। এক বছর পর এটির বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় এবং বৃদ্ধা মহিলা তার ছেলের উপর খুব গর্বিত হয়ে তাকে বলেছিলেন যে একদিন সে একজন মহান প্রভু বা রাজা হবে। একদিন, সে তার ছেলেকে রাজার বাড়িতে গিয়ে রাজার শক্তি পরীক্ষা করার জন্য চ্যালেঞ্জ জানাতে বলল। বামন প্রথমে যেতে চাইল না কিন্তু বৃদ্ধা মহিলা জোর করে রাজার সাথে দেখা করতে গেল। রক্ষীরা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিল এবং সে রাজার কাছে তার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল। রাজা হেসে বামনকে তিন অ্যারোবা ৩৪ কেজি (৭৫ পাউন্ড) ওজনের একটি পাথর তুলতে বলল। এতে বামনটি কেঁদে ফেলল এবং তার মায়ের কাছে দৌড়ে গেল। ডাইনি বুদ্ধিমান ছিল এবং তার ছেলেকে রাজাকে বলতে বলল যে রাজা যদি প্রথমে পাথরটি তুলেন, তাহলে সেও এটি তুলবে। বামন ফিরে এসে রাজাকে তার মা তাকে যা বলতে বলেছিলেন তা বলল। রাজা পাথরটি তুলে নিলেন এবং বামনটিও তাই করল। রাজা মুগ্ধ হয়েছিলেন, এবং কিছুটা নার্ভাসও হয়েছিলেন, এবং দিনের বাকি সময় ধরে শক্তির অন্যান্য কীর্তি দিয়ে বামনকে পরীক্ষা করেছিলেন। প্রতিবার রাজা যখনই কোনও কাজ করতেন, বামনটি তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারত। রাজা রেগে গেলেন যে তার সাথে একজন বামনের মিল হচ্ছে, এবং বামনকে বললেন যে এক রাতেই তাকে শহরের অন্য যেকোনো বাড়ির চেয়ে উঁচু একটি বাড়ি তৈরি করতে হবে, নাহলে তাকে হত্যা করা হবে। বামনটি আবার কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে এলো, যিনি তাকে আশা হারাতে বললেন না এবং সরাসরি ঘুমাতে যেতে বললেন। পরের দিন সকালে শহর জেগে উঠল এবং বামনের পিরামিডটিকে তার সমাপ্ত অবস্থায় দেখতে পেল, যা শহরের অন্য যেকোনো ভবনের চেয়ে উঁচু। রাজা তার প্রাসাদ থেকে এই ভবনটি দেখে আবার রেগে গেলেন। তিনি বামনকে ডেকে পাঠালেন এবং শেষবারের মতো শক্তি পরীক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। বামনকে কোগোয়েল কাঠের দুটি বান্ডিল সংগ্রহ করতে বলল, যা ছিল খুব শক্তিশালী এবং ভারী কাঠ, এবং রাজা বামনের মাথার উপর কাঠ ভাঙবেন, এবং তারপরে বামনের রাজার মাথার উপর কাঠ ভাঙার পালা আসবে। বামনটি আবার সাহায্যের জন্য তার মায়ের কাছে ছুটে গেল। মা তাকে চিন্তা না করতে বললেন এবং সুরক্ষার জন্য তার মাথায় একটি মন্ত্রমুগ্ধ টরটিলা (শক্ত খোলক) রাখলেন। শহরের সমস্ত মহাপুরুষের সামনে বিচারটি সম্পন্ন করার কথা ছিল। রাজা বামনের মাথার উপর দিয়ে তার পুরো বান্ডিলটি ভেঙে ফেললেন, একের পর এক লাঠি দিয়ে। রাজা বামনকে আঘাত করতে ব্যর্থ হন এবং তারপর তার চ্যালেঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। যদিও শহরের মহাপুরুষদের সামনে, তিনি জানতেন যে তার আর কোন উপায় নেই বামনকে তার পালা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া। বামনের বান্ডিলের দ্বিতীয় লাঠিটি রাজার খুলি ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় এবং সে বামনের পায়ের কাছে পড়ে মারা যায়, যাকে নতুন রাজা হিসেবে অভিহিত করা হয় ।
এইভাবে জাদুকরী ক্ষমতা এবং প্রজ্ঞার সাহায্যে, বামন এই কাজগুলি সম্পন্ন করে, শেষ পর্যন্ত রাজাকে উৎখাত করে এবং উক্সমালের সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
এই কিংবদন্তিটি মায়াদের নিয়তির প্রতি বিশ্বাস, নিষ্ঠুর শক্তির উপর বুদ্ধির শক্তি এবং তাদের লোককাহিনীতে পরিব্যাপ্ত জাদুকরী উপাদানের কথা বলে।
জাদুকরের পিরামিডের ইতিহাস
এর নামটি এসেছে উনিশ শতকের একটি মায়া কাহিনী থেকে, যার নাম ছিল লেয়েন্ডা দেল এনানো দে উক্সমাল (উক্সমালের বামনের কিংবদন্তি)। এই কিংবদন্তি অনুসারে, একজন বামন তার মা, একজন ডাইনির সাহায্যে এক রাতে পিরামিডটি তৈরি করেছিলেন। এই ভবনটি উক্সমালের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ভবনগুলির মধ্যে একটি, যার উচ্চতা প্রায় ১১৫ ফুট। এটি ৬০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, শেষ এবং শেষ ধ্রুপদী যুগে নির্মিত হয়েছিল এবং পাঁচটি গঠনমূলক পর্যায় সনাক্ত করা হয়েছে। আজ দৃশ্যমান একটি হল সর্বশেষটি, যা ৯০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়েছিল।
যে পিরামিডের উপরে আসল মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটির আকৃতি এক অদ্ভুত উপবৃত্তাকার। পিরামিডের শীর্ষে ওঠার জন্য দুটি সিঁড়ি রয়েছে। পূর্ব দিকের সিঁড়িটি, যা চওড়া, তার পাশে একটি ছোট মন্দির রয়েছে যা সিঁড়িটিকে অর্ধেক করে কেটে ফেলেছে। দ্বিতীয় প্রবেশপথের সিঁড়িটি, পশ্চিম দিকের, নানারি চতুর্ভুজের দিকে মুখ করে এবং বৃষ্টির দেবতা চাকের মূর্তি দিয়ে সজ্জিত।
জাদুকরের পিরামিড হল প্রথম ভবন যেখানে দর্শনার্থীরা উক্সমালের আনুষ্ঠানিক এলাকায় প্রবেশ করতে করে, বল গেম কোর্ট এবং গভর্নরের প্রাসাদের ঠিক উত্তরে এবং নানারি কোয়াড্র্যাঙ্গেলের পূর্বে।
পিরামিডের উপর নির্মিত মন্দিরের বেশ কয়েকটি ধাপ পিরামিডের ভিত্তি থেকে উপরে ওঠার সময় দৃশ্যমান হয়। পাঁচটি নির্মাণ পর্যায় সনাক্ত করা হয়েছে (মন্দির I, II, III, IV, V)। বিভিন্ন ধাপের সম্মুখভাগ বৃষ্টির দেবতা চাকের পাথরের মুখোশ দিয়ে সজ্জিত ছিল, যা এই অঞ্চলের পুউক স্থাপত্য শৈলীর বৈশিষ্ট্য।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
ষষ্ঠ পর্ব
মায়া আন্ডারওয়ার্ল্ড
প্রাচীন মায়ারা তাদের পৃথিবীকে তিন স্তর বিশিষ্ট মহাবিশ্ব হিসেবে কল্পনা করত, যার মধ্যে ছিল আকাশের গম্বুজ তৈরি করা, চার পার্শ্বযুক্ত পৃথিবী যা মানুষের আবাসস্থল এবং পৃথিবীর নীচের পৃথিবী অর্থাৎ পাতাল। পৃথিবী নিজেই একটি জলাবদ্ধ ভিত্তির উপর ভাসমান, যা প্রায়শই পাতালের সাথে যুক্ত। তিনটি স্তরের সংযোগকারী হল অক্ষ মুন্ডি, বিশ্ববৃক্ষ, বা মহাবিশ্বের কেন্দ্র, সাধারণত একটি গাছ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করা হয় যার শাখা আকাশে থাকে, যার কাণ্ড পৃথিবীর মধ্য দিয়ে উঠে আসে এবং যার শিকড় পাতালের দিকে প্রসারিত হয়। অতএব, পাতালকে পৃথিবীর নীচে একটি জলাবদ্ধ স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয় যা কেবল ভয় এবং মৃত্যুর সাথেই নয়, বরং পৃথিবী থেকে উদ্ভূত উদ্ভিদের জীবনদায়ক বৈশিষ্ট্যের সাথেও সম্পর্কিত, যেমন বিশ্ববৃক্ষ (ভুট্টা)।
পাতালের পাঁচটি (অথবা নয়টি) স্তর এবং উচ্চ জগতের তেরোটি স্তর চিত্রিত করা হয়েছে। মায়া মহাবিশ্বের চারটি দিকনির্দেশক রঙের উপর দিবালোক এবং রাতের সূর্যের (দ্বি-মাথাওয়ালা সর্প) পথগুলি আরোপ করা হয়েছে।
মায়া আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্কে ইতিমধ্যে যা জানা গেছে তার কিছু সংক্ষেপে বলা যাক। মেক্সিকোর ইউকাটানে, আন্ডারওয়ার্ল্ড মেটনাল নামে পরিচিত ছিল এবং এটি মৃতদের আবাসস্থল ছিল। মায়া নিম্নভূমির অন্যান্য অংশে এবং পোপোল ভুতে, এটিকে জিবালবা বলা হত।
স্যার জন এরিক সিডনি থম্পসন (1898-1975) ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় ইংরেজ মেসোআমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসবিদ এবং লিপিকার যিনি 1960 এর দশক পর্যন্ত মায়া অধ্যয়নের উপর অনুসন্ধান করেছিলেন। থম্পসনের মতে মায়া আন্ডারওয়ার্ল্ড পৃথিবীর পৃষ্ঠের নীচে পাঁচটি স্তরের সর্বনিম্ন স্থান দখল করে। তিনি দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেন যে বিখ্যাত নয়টি স্তর আসলে চারটি ধাপ বা স্তরকে নির্দেশ করে যা পঞ্চম স্তরে নেমে আসে যেখানে জিবালবা বা মেটনাল বা পাতাল অবস্থিত ছিল, এবং আরও চারটি ধাপ উপরে উঠে আসে।
সূর্যাস্তের পর পাতাল জগতের মধ্য দিয়ে যাত্রা করার সময় সূর্য এই নয়টি ধাপ অনুসরণ করে পূর্ব দিগন্তে পৌঁছে। যেখানে ভোরবেলায় এটি পুনরায় উদিত হয়। মৃতরাও এই পথটি অনুসরণ করে, অন্তত এর প্রথম অংশ। এই ভূমিতে প্রবেশের রাস্তাটি দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক ছিল। মায়ানরা তাদের মৃতদের কবরে বা পিরামিডে এক জোড়া নতুন জুতা রাখে যা যাত্রার কঠোরতা সহ্য করে। একটি কুকুর সঙ্গে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হত যে কুকুর জলাশয় পার হতে সাহায্য করে। তাই পোষা কুকুরকেও সমাধীস্থ করা হতো। যাত্রার জন্য খাবার এবং বিপজ্জনক প্রাণী ও পাখির বিরুদ্ধে জাদুকরী প্রতিরক্ষাও মৃতদের সাথে রাখা হতো।
পাতাল জগতটি কেমন ছিল? লুইস ক্যারলের ভূগর্ভস্থ আশ্চর্যভূমির মতো , মায়া পাতাল হল একটি অদ্ভুত জায়গা যেখানে ভৌত আইন জীবিতদের জগতের থেকে আলাদা। মজার বিষয় হল, অনেক গুহার দেয়ালে মায়া হায়ারোগ্লিফে লেখা তারিখগুলি অর্থহীন। এগুলি (মানুষের জন্য) অসঙ্গত। পাতালে সময় এবং স্থান বিকৃত হয় যা জীবিতদের জগতের প্রতিফলন ঘটায়, কিন্তু জিনিসগুলি (এবং আচরণ) উল্টানো, বিকৃত এবং উদ্ভট। পাতালে, গাছগুলি মাটির উপরে বেড়ে ওঠা গাছের শিকড়। ল্যাকান্ডন মায়া এখনও এমন গাছের প্রতিনিধিত্ব করে যার শিকড় শাখাগুলিকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, পাতালে জীবিতদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিয়মগুলি উল্টানো হয়।
গুয়াতেমালার উচ্চভূমির কিচে’ মায়ারা বিশ্বাস করত,, জিবালবা ছিল মানুষের শত্রুদের দ্বারা অধ্যুষিত একটি ভূগর্ভস্থ অঞ্চল। পোপোল ভু’তে পাতাল জগতের প্রভুদেরকে অত্যাচারী, কপট, ঈর্ষান্বিত এবং নিষ্ঠুর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তারা অমর ছিলেন না, এবং তাই তারা হয়তো শব্দের স্বাভাবিক অর্থে দেবতাও ছিলেন না। এই পৃথিবীর নীচে বাস করা সত্ত্বেও, তাদের জমি অপ্রীতিকর এবং অন্ধকার ছিল না; তাদের রাত এবং দিন ছিল; তাদের জমিতে গাছ এবং প্রাণী ছিল; তারা ভুট্টা চাষ করত, খেত, ঘুমাত, প্রেম করত এবং আপাতদৃষ্টিতে এই পৃথিবীর নশ্বরদের মতো মারাও যেত।
পোপোল ভু ছাড়া অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক উৎসগুলি প্রায়শই জিবালবাকে কম আকাঙ্ক্ষিত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে।
পোপোল ভু অনুযায়ী আকাশ, পৃথিবী এবং পাতাল সবই দেবতাদের আবাসস্থল ছিল। পূর্বপুরুষরা আকাশে বাস করতেন। কিছু কল্যাণকর দেবতা, দুষ্টু বা বিপজ্জনক আত্মারা ফাটল এবং গিরিখাতে বাস করত এবং পাতাল ছিল পাতালজগতের ভয়ঙ্কর প্রভুদের আবাসস্থল যারা প্রাচীন মায়া সৃষ্টি পুরাণ, পোপোল ভু- তে বর্ণিত মৃত্যু এবং রোগের বাহক ছিলেন ।
মায়ানদের কাছে প্রাকৃতিক গুলাগুলির উৎসমুখ ছিল পাতালের সঙ্গে সংযুক্ত। এটি জীবিতদের জগৎ (অর্থাৎ পৃথিবী) এবং মৃতদের জগৎ, পূর্বপুরুষ এবং দেবতাদের জগৎ (অর্থাৎ পাতাল)। তাই, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য এগুলি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এবং এখনও রয়েছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম গুহা ব্যবস্থা ইউকাটান উপদ্বীপে পাওয়া যায় এবং এই ধরণের ভূ-প্রকৃতির সবচেয়ে নাটকীয় বৈশিষ্ট্য হলসেনোট। সেনোট হল প্রাকৃতিক গর্ত, বা সিঙ্কহোল, যা চুনাপাথরের স্তম্ভের ধসের ফলে তৈরি হয় যা ভূগর্ভস্থ জলকে উন্মুক্ত করে দেয়।
মায়াদের কাছে, জলকে মাটির নীচের অংশ হিসাবে দেখা যায় এবং সম্ভবত এই অঞ্চলের অনেক গুহার প্রবেশপথে প্রায়শই কুয়াশার কারণে, এটি বিশ্বাস করা হয় যে মেঘ এবং বৃষ্টি পাতাল থেকে আসে।
১৯৫৯ সালে বালানকাঞ্চে একটি গুহা অনুষ্ঠানের আয়োজনে, জকালাকূপের রোমায়ালদো হোইল, তাঁর একজন কর্মীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে নৈবেদ্যের দিকে মুখ করে পাথরের উপর বসে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যখন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা অন্য সকলকে গুহার অন্য অংশে স্থানান্তরিত করেছিলেন। আলফ্রেডো ব্যারেরা-ভাস্কুয়েজ (১৯৭০: ৭৫) লিখেছেন যে পরে যখন তারা ফিরে আসেন, তখন তারা সহকারীকে একই জায়গায় বসে থাকতে দেখেন যেখানে তাকে রেখে যাওয়া হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সে কী শুনেছে। সে উত্তর দেয় যে সে ঠান্ডা অনুভব করেছে, এবং চারবার জল থেকে শব্দ হচ্ছে, যেন জলের পৃষ্ঠে কিছু নড়ছে এরকম শব্দ শুনেছে। ব্যারেরা মন্তব্য করে, ‘তুমি বালামেসের কথা শুনছিলে।'”
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন যে মায়ারা বিশ্বাস করত যে জলে ভরা গুহাগুলির ভূগর্ভস্থ শুষ্ক কক্ষগুলিতে নিয়ে যায় – যার মধ্যে প্রায় ৩৩০ ফুট দীর্ঘ একটি ভূগর্ভস্থ রাস্তাও রয়েছে – এটি একটি পৌরাণিক পাতাল জগতের পথ, যা জিবালবা নামে পরিচিত। মৃত পুন্য আত্মা এই পথেই বহু যুদ্ধের শেষে আকাঙ্খিত স্বর্গে আরোহণ করতে পারে।
এইভাবে, নৃ-ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং মূর্তিবিদ্যার সাহায্যে, গুহাগুলি আমাদের প্রাচীন মায়া আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
পাতালের দেবতা
মৃত্যু এবং মায়া পাতালের সাথে সম্পর্কিত অনেক অতিপ্রাকৃত প্রাণী রয়েছে। মৃত্যু দেবতারা মারাত্মক রোগ, দুর্গন্ধ এবং ক্ষয় ছড়িয়ে দেন। মায়া মৃত্যু দেবতা (আহ পুকুহ, আহ সিমিহ, আহ সিজিন, হুনহাউ, কিমি, অথবা ইয়ুম কিমিল), যা বিভিন্ন নামে পরিচিত, হল দুটি মৌলিক ধরণের মৃত্যু দেবতা যাদের যথাক্রমে ১৬ শতকের ইউকাটেক দেবতা হুনহাউ এবং উয়াকমিটুন আহাউ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করা হয়। হুনহাউ হলেন পাতালের অধিপতি। প্রতীকীভাবে, হুনহাউ (আহ পুকুহ) এবং উয়াকমিটুন আহাউ দেবতা A এবং A’ (“A prime”) এর সাথে মিলে যায়। সাম্প্রতিক আখ্যানগুলিতে, বিশেষ করে ল্যাকান্ডন জনগণের মৌখিক ঐতিহ্যে, কেবলমাত্র একজন মৃত্যু দেবতা (লাকান্ডনে “কিসিন” নামে পরিচিত), যিনি পৃথিবী এবং মানব দেহ ও আত্মার সৃষ্টিতে উচ্চ ঈশ্বরের প্রতিরূপ হিসেবে কাজ করেন। এই মৃত্যু দেবতা একটি পাতালে বাস করেন যা মৃতদেরও জগৎ। মৃতদের জগতের ( মেটনাল বা জিবালবা ) শাসক হিসেবে, প্রধান মৃত্যু দেবতা অ্যাজটেক দেবতা মিক্টলান্টেকুটলির সাথে মিলে যায়। পোপোল ভু-এর দুটি প্রধান মৃত্যু দেবতা আছে। হিরো টুইনস তাদের পরাজিত করেছিল। দুই প্রধান মৃত্যু দেবতা হুন-কাম (এক-মৃত্যু) এবং ইউকাউব-কাম (সাত-মৃত্যু) হল সবচেয়ে শক্তিশালী।
পাতাল জগতে বসবাসকারী অনেক প্রাণী এবং ভূত ( ওয়েওব ) এর মধ্যে গণ্য হয়, বিশেষ করে দেবতা A নিজেকে একজন প্রধান শিকারী এবং একজন হরিণ শিকারী হিসেবে প্রকাশ করেন।
• আহ পুকুহ (হুনহাউ, ঈশ্বর A) : তিনি একজন অদ্ভুত, কিন্তু হাস্যকর ব্যক্তিত্ব। তিনি মাকড়সা, শতপদী, বিচ্ছু এবং পেঁচাদের সাথে আড্ডা দেন – এগুলি সবই অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর একটি লেখায় অনুলিপি করার ত্রুটির কারণে, তাকে কখনও কখনও আহ পুচ বলা হয়।
• বালহাম (বালাম) : পাতালের জাগুয়ার দেবতা। এছাড়াও জাগুয়ার দেবতাদের একটি দলের যে কেউ যারা মানুষ এবং সম্প্রদায়কে রক্ষা করেছিলেন।
• বোলন ইয়োকতে’ কুহ : বণিক, যুদ্ধ এবং পাতালের দেবতা। যদিও এই দেবতা প্রায়শই কোডিস এবং মায়া শিল্পে দেখা যায়, তবুও তার নাম এখনও অনিশ্চিত। তাকে প্রায়শই মায়া পাতালের দৃশ্যে দেখানো হয় এবং তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় একত্রিত দেবতাদের কমিটির সভাপতিত্ব করেন। তার জাগুয়ার এবং পেঁচার বৈশিষ্ট্যগুলি জাদুবিদ্যা, হিংস্রতা এবং যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। তিনি একজন কুঁচকানো, বয়স্ক দেবতা যার বিশাল নাক, বড় “ঈশ্বরের চোখ”, একটি প্রশস্ত কাঁটাযুক্ত টুপি যার উপরে কালো ডগাযুক্ত পেঁচার পালক (অথবা পুরো পাখি) এবং একটি ঝালরযুক্ত কেপ রয়েছে। তিনি প্রায়শই একটি বড় সিগার ধূমপান করেন।
• চাক বোলে : চাক বোলে সূর্যের পাতালের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সাথে এবং মৃত্যুর প্রভু আহ পুকুহ (সিজিন) এর সাথে যুক্ত। চাক বোলে বা চাক বালামকে জাগুয়ার মাথা, প্রসারিত ছিদ্র এবং বিনুনি করা চুলের একটি স্ট্র্যান্ড দিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে। জাগুয়ারের মতো দাগযুক্ত এর ত্বক রাত এবং তারায় ভরা স্বর্গীয় ভল্টের প্রতীক। তিনি শক্তি এবং শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন।
• কিসিন (সিজিন) : কিসিন হল ল্যাকান্ডনদের পাশাপাশি প্রাথমিক ঔপনিবেশিক চোলদের মধ্যে মৃত্যু দেবতার নাম, কিস হল “পেট ফাটা” এবং “দুর্গন্ধ” এর মতো অর্থ সহ একটি মূল। লান্ডা আরেকটি নাম ব্যবহার করে এবং পাতালের প্রভু এবং “শয়তানদের রাজপুত্র” হুনহাউকে ডাকে , একটি নাম যা প্রাথমিক ইউকেটেক অভিধানে হুমহাউ এবং কামহাউ হিসাবে পুনরাবৃত্তি হয় , যা আহ পুকুহের সাথে সম্পর্কিত।
• উয়াকমিতুন আহাউ (ঈশ্বর ‘ক’) : ধ্রুপদী যুগে, তার পেটের স্থান কখনও কখনও রক্ত বা পচনশীল পদার্থের ঘূর্ণায়মান স্রোত দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। তার সাথে সাধারণত মাকড়সা, শতপদী, বিচ্ছু, শকুন, পেঁচা এবং বাদুড় থাকে। তার কব্জি এবং গোড়ালিতে সাধারণত অলংকার পরে তাকে চিত্রিত করা হয়। তার নীচের অংশে, তার একটি গোলাকার ” মোলো ” চিহ্ন রয়েছে যা মৃত্যুর দুর্গন্ধযুক্ত গন্ধযুক্ত। তার মাথার উপরে “S” আকৃতির একটি ভাসমান বস্তু রয়েছে যা সম্ভবত মশাল বহনকারী একটি পোকামাকড়। পাতালের অন্যান্য দেবতাদের মতো তার কপালে তিনি ” আকাবাল ” পরেন যা “অন্ধকারের প্রতীক” নামেও পরিচিত। মায়া সংস্কৃতিতে তার মাথা 10 সংখ্যাটি প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যবহৃত হত, নীচের চোয়ালের হাড়টি দশ সংখ্যাটিকে বোঝাত যা তেরো থেকে উনিশ সংখ্যার অন্যান্য সমস্ত মাথার রূপের মধ্যে খোদাই করা ছিল। তাকে প্রায়শই নৃত্যরত এবং ধূমপানকারী সিগারেট ধরে থাকা অবস্থায় চিত্রিত করা হত। তার গলায় একটি মৃত্যুর কলার রয়েছে যা স্নায়ু দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত মূর্ত চোখ দিয়ে গঠিত। তার শরীরের কালো দাগগুলি মাংসের ক্ষয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু কিছু ছবিতে তিনি একটি পচা মৃতদেহ, তাই তাকে পেট ফুলে থাকতে দেখানো হয়েছে। উপরোক্ত সত্ত্বেও, এটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে ঈশ্বর ‘ক’-এর হায়ারোগ্লিফিক নামটি ‘ আকান ‘ হিসাবে পড়া উচিত , অন্যথায় এটি কেবল ষোড়শ শতাব্দীর মদ্যপ পানীয়ের দেবতার নামে পরিচিত।
পোপোল ভু’তে জিবালবা হল বারোজন মায়া মৃত্যুর দেবতাদের ভূগর্ভস্থ দরবার। হুন-কাম (এক-মৃত্যু) এবং ইউকাউব-কাম (সাত-মৃত্যু) হল সবচেয়ে শক্তিশালী।
• হুন-কাম এবং ভুকুব-কাম : পোপোল ভু-তে , হিরো যমজরা “ভয়ের স্থান” ( জিবালবা ) তে নেমে আসে যেখানে মৃত্যু দেবতাদের এক জোড়া, হুন-কাম (“এক-মৃত্যু”) এবং ভুকুব-কাম (“সাত-মৃত্যু”), রোগ-বাহক দেবতাদের একটি সভা পারিষদ রাজত্ব করে। যমজরা মৃত্যু দেবতাদের পরাজিত করে এবং তাদের ধর্মের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
বাকি দশজন মৃত্যুর দেবতা জোড়ায় জোড়ায় কাজ করে এবং বিভিন্ন ধরণের মানুষের কষ্ট, রোগ এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী দানব সমুহ হলো :-
• স্ক্যাব স্ট্রিপার এবং রক্ত সংগ্রহকারী মানুষের রক্তকে অসুস্থ করে।
• পুসের দানব এবং জন্ডিসের দানব মানুষকে ফুলে ওঠে।
• হাড়ের রাজদণ্ড এবং খুলির রাজদণ্ড মৃতদেহকে কঙ্কালে পরিণত করে।
• নোংরামির দানব এবং দুঃখের দানব মানুষের ঘরের নোংরা কোণে লুকিয়ে থাকে এবং তাদের ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে।
• উইং এবং প্যাকস্ট্র্যাপ রাস্তায় রক্ত কাশতে কাশতে মানুষ মারা যায়।
মেসোআমেরিকান পুরাণে, রাতের প্রভু (ধ্রুপদী নাহুয়াতল: Yohualtecuhtin ) হল নয়টি দেবতার একটি সমষ্টি যারা প্রত্যেকে প্রতি নবম রাতে রাজত্ব করতেন এবং একটি ক্যালেন্ডারিক চক্র তৈরি করতেন। প্রতিটি দেবতা একটি নির্দিষ্ট ভাগ্যের সাথে যুক্ত ছিলেন, ভালো বা খারাপ, যা তাদের রাজত্ব করা রাতের জন্য একটি অশুভ লক্ষণ ছিল।
অ্যাজটেক এবং মায়া ক্যালেন্ডার উভয়েই রাতের প্রভুদের পরিচিত, যদিও মায়া রাতের প্রভুদের নির্দিষ্ট নাম অজানা।
রাতের দেবতাদের সাথে সম্পর্কিত গ্লিফগুলি জানা যায় এবং মায়ানবাদীরা তাদের “G” সিরিজের G1 থেকে G9 লেবেল দিয়ে চিহ্নিত করে। সাধারণত, এই গ্লিফগুলি প্রায়শই “F” তৈরি একটি নির্দিষ্ট গ্লিফের সাথে ব্যবহৃত হয়। একমাত্র মায়া রাতের প্রভু যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে তিনি হলেন ঈশ্বর G9, পাউআহতুন, বয়স্ক চতুর্ভুজ ঈশ্বর।
১৯০৪ সালে এডুয়ার্ড সেলার মেসোআমেরিকান ক্যালেন্ড্রিক্সে নয় রাত্রি চক্রের অস্তিত্ব প্রথম আবিষ্কার করেন। দেবতাদের অ্যাজটেক নামগুলি পরিচিত কারণ তাদের নাম কোডেক্স টেলেরিয়ানো-রেমেনসিস এবং কোডেক্স টুডেলাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেলার যুক্তি দিয়েছিলেন যে ৯ জন প্রভু প্রত্যেকেই পাতালের নয়টি স্তরের একটির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং রাতের সময়কালকে একইভাবে শাসন করেন। এই যুক্তিটি সাধারণত গৃহীত হয়নি, কারণ প্রমাণ থেকে জানা যায় যে একটি নির্দিষ্ট রাতের প্রভু সেই পুরো রাত্রির উপর রাজত্ব করেন। জেলিয়া নাটাল যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাতের নয়জন প্রভু চন্দ্র বছরের নয়টি চাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন। রাতের নয়জন প্রভুর চক্র মেসোআমেরিকান ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখে যার মধ্যে ৯টি রাতের ঠিক ২৯টি দল এবং ২৯টি অস্পষ্ট চাঁদ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অবশেষে, মায়াদের একটি জীবন্ত উত্তরাধিকারও রয়েছে। মায়াদের বংশধরদের সংখ্যা আজ প্রায় ৬০ লক্ষ। তাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত, তারা এখনও উৎসব এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পুরাতন পৌরাণিক কাহিনী বলে, যদিও আগের তুলনায় সম্ভবত কম। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরাতন দেবতাদের কথা মনে রাখে, চাককে বৃষ্টির জন্য অনুরোধ করে, হুন-হুনাহপুকে ভালো ফসলের জন্য ধন্যবাদ জানায় এবং আহ পুকুহ শিকারের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই আশঙ্কা করে। ইউকাটানে, ” লেট আস রিটার্ন টু আওয়ার মায়া রুটস” নামে একটি টেলিভিশন সিরিজ ঐতিহ্যবাহী ভাষা এবং রীতিনীতি প্রচার করে। একসময় মেসোআমেরিকার বেশিরভাগ অঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বাস প্রকাশকারী পৌরাণিক কাহিনী আজও জীবিত সংস্কৃতির অংশ।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
সপ্তম পর্ব
মায়া ক্যালেন্ডার ও রাশিচক্র:-
সেই প্রাচীনকাল থেকেই রাতের আকাশ মানবজাতিকে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করে রেখেছে৷ এমনকি আজও আমরা আকাশ পানে চেয়ে থাকি পৃথিবীর অতীত এবং ভবিষ্যত বুঝতে৷ আকাশ আমাদের পথ দেখায়। মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতাও উপরের দিকে তাকিয়ে মহাকাশীয় ঘটনাবলী বোঝার চেষ্টা করেছে৷ মায়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক রহস্যময় নথিতে তাদের আহরিত জ্ঞান রেখে গেছেন৷
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বর্তমানে আমাদের তা বুঝতে সহায়তা করছে৷ আকাশ তাই এখন আর অজানা জগত নয়৷ এখনো আমরা প্রাচীন সভ্যতার আবিষ্কার দিয়ে প্রভাবিত৷ এই পরিশীলিত হায়রোগ্লিফিকস মায়ার সঞ্চিত জ্ঞান বহন করছে৷ সূর্যগ্রহণ কখন হবে? শুক্রগ্রহ কখন আবার শুকতারার রূপে দেখা দেবে? বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা এখনো মায়ার সূক্ষ্ম গণনা সমীহ করে চলেন৷
হুলিয়েটা বলেন, ‘‘এটা বিস্ময়কর যে, তারা কয়েক হাজার বছর আগে এরকম হিসেব তৈরি করতে পেরেছিলেন৷‘তারা পৃথিবীতে এটা কীভাবে করেছিলেন? তাদের যদি কম্পিউটার এবং টেলিস্কোপ না থেকে থাকে, তাহলে তারা এটা কীভাবে করেছেন?”
আন্তিয়ে মনে করেন, ‘‘তাদের দিনে, মানে ১৪৯২ এর আগে অবধি, মায়া গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় ইউরোপীয়দের তুলনায় এগিয়ে ছিল৷”
এই নথি ইউরোপে উপনিবেশবাদীরা লুট করে এনেছিল, নাকি উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল তা আজও অজানা৷ তবে এটি এখনো গবেষণার বিষয়৷ নথিটি রয়েছে জার্মানির ড্রেসডেনে৷ স্যাক্সনি স্টেট অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে নথিটি রাখা হয়েছে৷ এটি পৃথিবীতে থাকা চারটি মায়ান কোডিসিসের একটি৷
কার্লোস পাজন গাজলের মতো গবেষকরা ‘ড্রেসডেন কোডেক্স’ নামের নথিটি বুঝতে আমাদের সহায়তা করেছেন৷ এই পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে মায়ান সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারনা বদলে গেছে৷
কার্লোস বলেন, ‘‘ড্রেসডেন কোডেক্স মায়ান পুরাণ, ধর্ম, জ্যোতির্বিদ্যা এবং হায়রোগ্লিফিকস সম্পর্কে আমাদেরকে আরো সমৃদ্ধ করেছে৷”
দুই পাশেই লেখা ৩৯ পাতার নথি ড্রেসডেন কোডেক্স৷ সাড়ে তিন মিটার লম্বা মুগ্ধ করা নথিটি ধর্মীয় আচারের ‘পকেট বুক’ ছিল৷
কার্লোস বলেন, ‘‘ টেবিলগুলো সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে আগাম ধারণা দিত৷ মানুষ এসব নিয়ে ভীত ছিল৷”
অ্যান্টনির মতে, ‘‘এটা সত্যিই ধর্ম সম্পর্কিত৷ সৃষ্টিকর্তাদের কাছে কিছু চাওয়ার উপযুক্ত সময় বলে মনে করা হতো ৷ সম্ভবত রোগ নিরাময়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল৷ নিরাপদ সন্তান জন্মদান৷ ভালো শস্য ইত্যাদি।”
কোনোকিছু করার জন্য উপযুক্ত সময় হিসেব করতে চাইতো মায়ারা৷ তার কোনো একটি ঘটনার সম্ভাব্য তারিখ আগাম ধারণা করতে পারতেন৷
আন্তিয়ে বলেন, ‘‘তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা যেটা ছিল, তা হচ্ছে, তারা একটি শূন্যর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন… কারণ, শূন্যটি আমরা এই সংকেতে সুন্দরভাবে দেখা যায় ৷ কোডেক্সে কালো সংখ্যাগুলোর মাঝখানে লাল আমাদের লম্বা সময় গণনায় সক্ষম করেছে৷”
খুব লম্বা সময় – এমনকি আমাদের আধুনিক দিন অবধি৷ যেমন: ২০২৪ সালের এপ্রিলের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের ব্যাপারটিও ড্রেসডেন কোডেক্স দেখে বোঝা সম্ভব৷
অ্যান্টনি বলেন, ‘‘তারা অবশ্য কোথা থেকে পূর্ণ গ্রহণ দেখা যাবে বা গ্রহণের জ্যামিতি নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না৷”
হুলিয়েটা মনে করেন, ‘‘মেসোআমেরিকান সংস্কৃতির কোনো বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য ছিল না৷ নির্ভরযোগ্য ক্যালেন্ডার পেতে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন তারা৷”
মুগ্ধ করা ড্রেসডেন কোডেক্স ক্যালেন্ডার দেখাচ্ছে কীভাবে বিজ্ঞান এবং ধর্ম হাতে হাত রেখে এগিয়েছিল, যা এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না৷ তবে আশেপাশে কী ঘটছে, তা বোঝার আগ্রহ আমাদের মতো আগেও ছিল৷
মায়ানদের সংখ্যা পদ্ধতি
মায়াদের সংখ্যা আমাদের মতো ছিল না, তাদের কেবল তিনটি অঙ্ক ছিল; ‘এক’-এর জন্য একটি বিন্দু, ‘পাঁচ’-এর জন্য একটি দণ্ড এবং ‘শূন্য’-এর জন্য একটি লাল শঙ্খ।
উদাহরণস্বরূপ: ৪ হবে ৪টি ডট, ৫ হবে ১টি বার, ১০ হবে ২টি বার এবং ১৩ হবে ২টি বার ও ৩টি ডট।
মায়া বর্ষপঞ্জি কীভাবে কাজ করে?
মায়াদের কাছে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তারা বিশদ ও নির্ভুল পঞ্জিকা তৈরি করেছিল এবং সেগুলো ব্যবহার করে সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র এমনকি গ্রহের গতিবিধিও লিপিবদ্ধ করত।
এই পঞ্জিকাগুলো ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো । এগুলো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা , ভবিষ্যৎবাণী এবং শাসকদের রাজত্বকাল ও তাদের বিজয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লিপিবদ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হত ।
উনিশ শতকের শেষের দিকে আর্নস্ট ফোরস্টেম্যান আবিষ্কার করেন মায়ারা কীভাবে সময় গণনা করত। মায়ারা এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত যা এখন ক্যালেন্ডার রাউন্ড নামে পরিচিত এবং এটি তিনটি পরস্পর সংযুক্ত চক্র দ্বারা গঠিত। ২০টি নামের একটি চক্র, ১৩টি সংখ্যার একটি চক্র (যা ২৬০ দিনের পবিত্র ক্যালেন্ডার গঠন করে) এবং একটি ৩৬৫ দিনের সৌর বছর। এই তিনটি চক্র পুনরায় এক সারিতে আসতে ৫২ বছর(১৮,৯৮০ দিন) সময় লাগে।
জোলকিন: ২৬০ দিনের গণনা
২৬০ দিনের এই গণনা, যা মানুষের গর্ভধারণের সময়কাল এবং একটি ভুট্টা গাছের ফল ধরতে যে সময় লাগে তার আনুমানিক হিসাব, আজও কিছু মায়া সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত হয়, প্রধানত গুয়াতেমালার পার্বত্য অঞ্চলে । ২৬০ দিনের ক্যালেন্ডারের উদ্দেশ্য হল কৃষি সময়সূচীকে দৃশ্যমান করা। ক্যালেন্ডারটি ফেব্রুয়ারির শুরুতে শুরু হয়; ফেব্রুয়ারির শুরুতে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অমাবস্যার এক বা দুই দিন পরে প্রথম দৃশ্যমান চাঁদ হল ক্যালেন্ডারের শুরুর বিন্দু। চন্দ্রকলা দ্বারা সময় নির্ধারিত এই ব্যবস্থাটি মায়া জনগণকে সূর্যগ্রহণ সহ চন্দ্র সংক্রান্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণে আগ্রহী করে তুলেছিল।ফসল তোলার পর অক্টোবরে ২৬০ দিন শেষ হয়।
এটি একটি পবিত্র পঞ্জিকা, যা মায়া সভ্যতার আনুষ্ঠানিক জীবনের জন্য একটি কালানুক্রমিক কাঠামো এবং ভবিষ্যদ্বাণীর ভিত্তি প্রদান করে।
এই পঞ্জিকায় জন্মতারিখ লিপিবদ্ধ করা হতো এবং কোনো নির্দিষ্ট দিনের অধিষ্ঠাতা দেবতা সেই দিনে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের ভাগ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়তেন।
জোলকিন হলো ২৬০ দিনের একটি ধারাবাহিকতা , যা ১৩টি সংখ্যা ও ২০টি নামের বিন্যাস দ্বারা গঠিত (১৩ x ২০ = ২৬০)।
প্রতিটি দিনকে “সহগ/দিনের নাম” এই সংমিশ্রণ দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা হয়, এবং ১ থেকে ১৩ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যা ২০টি দিনের নামের প্রত্যেকটির সাথে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত চক্রটি সম্পূর্ণ হতো না। এটি সম্পূর্ণ হতে ২৬০টি সৌর দিন সময় লাগত।
জোলকিনদের নাম ও প্রতীকচিহ্ন
জোলকিনের প্রথম দিন হলো “১ ইমিক্স”, দ্বিতীয় দিন “২ ইক’”, তৃতীয় দিন “৩ আক’বাল”, তেরোতম দিন “১৩ বেন”, চৌদ্দতম দিন “১ ইক্স”, একুশতম দিন “৮ ইমিক্স”, এবং এভাবেই চলতে থাকে।
২৬০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সংমিশ্রণ পুনরায় ঘটবে না।
দিন রাখা
এই পবিত্র পঞ্জিকাটি আজও পার্বত্য অঞ্চলের মায়া জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের একজন দিনরক্ষক থাকেন, যিনি সাধারণত একজন শামান হন এবং এই পঞ্জিকার নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করেন । লোকেরা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে বা কোনো রোগ নিরাময়ে সাহায্যের জন্য দিনরক্ষকদের কাছে যান। এরপর দিনরক্ষকরা আত্মাদের কাছে পথনির্দেশনা চান।
প্রাচীন এবং পার্বত্য অঞ্চলের আধুনিক উভয় মায়া জাতিই বিশ্বাস করে যে তাদের একটি আত্মিক/পশু সঙ্গী আছে । প্রাচীন মায়ারা একে ‘ ওয়ে’ (উচ্চারণ ‘ওয়াই’) বলত এবং বর্তমান মায়ারা একে তাদের ‘নাহুয়াল/নাওয়ালে’ বলে। আপনার জন্মতারিখ নির্ধারণ করে দেয় আপনার কোন পশু/আত্মিক সঙ্গী আছে এবং এটি আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও বলে দেয়।
নিম্নে ২০টি নাহালে এবং তাদের নিজ নিজ পঞ্জিকার নামের তালিকা দেওয়া হলো, যা ইউকাটেকান মায়ান ভাষায় (ইটালিক হরফে) এবং পার্বত্য মায়ান ভাষা কাকচিকেল-এ (বোল্ড হরফে) উভয় ভাষাতেই রয়েছে।
কুমির – ইমিক্স – ইমক্স
Wind – Ik – Iq
রাত – আকবাল – আকাবাল
স্কাই – কান – ক্যাট
সাপ – চিকচান – কান
মৃত্যু – কিমি – কামে
Deer – Manik – Kiej
ভেনাস – লামাত – কানিয়েল
চাঁদ – মুলুক – তোজ
কুকুর – ওকে – ত্জি
হাউলার বানর, পূর্বপুরুষ – চুয়েন – বাতজ
দাঁত/চোয়াল – Eb – E
Maize – Ben – Aaj
Jaguar – Ix – Ix-balaam
ঈগল – জিকিন – মানুষ
মোমবাতি – কিব – আজমাক
পৃথিবী – কাবান – ন’জ
ফ্লিন্ট, অবসিডিয়ান – টিজ্যাক্স
ঝড় – কাওয়াক – কাওক
লর্ড – আজাও – আজপু
হাব: ৩৬৫ দিনের গণনা
এটি ২০ দিনের ১৮টি মাস এবং বছরের শেষে ওয়ায়েব নামক মাত্র ৫ দিনের একটি অতিরিক্ত মাস নিয়ে গঠিত, যা মোট ৩৬৫ দিন হয়। ঐ ৫টি অতিরিক্ত দিনকে সাধারণত বিশেষ দিন হিসেবে গণ্য করা হতো। কখনো কখনো একে “অস্পষ্ট বছর” বলা হয়, কারণ অধিবর্ষের সমন্বয় কখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
মাসগুলোর নাম সবই ষোড়শ শতকে বিশপ দিয়েগো দে লান্ডা কর্তৃক প্রদত্ত মায়া ইউকাটেক তালিকা থেকে নেওয়া হয়েছে: Pop, Wo, Sip, Sots’, Sek, Xul, Yaxk’in, Mol, Ch’en, Yax, Sak, Keh, Mak, K’ank’in, Muwan, Pax, K’ayab, Kumk’u এবং Wayeb( অধিবর্ষ) ।
৩৬৫ দিনের গণনাটি অনেকটাই আমাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডারের মতো কাজ করে: প্রথম মাসটি হলো “পপ”, এবং বছরের প্রথম দিনটি হলো “১ পপ”, এরপর “২ পপ”, “৩ পপ”, এবং এভাবেই “১৯ পপ” পর্যন্ত চলতে থাকে। পরের দিনটিকে পরবর্তী মাসের (ও) “স্থাপন” বা “স্থানে স্থাপন” হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং এটিকে “০ ” হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয় (মায়ারা “শূন্য”-এর ধারণাটি আয়ত্ত করেছিল )।
এই ক্যালেন্ডারের একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, কোনো নির্দিষ্ট মাসের শুরু সেই মাসের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য করা হয় না, বরং তার আগের মাসের শেষ দিন হিসেবে ধরা হয়। এটি অনেকটা ৩১শে ডিসেম্বরকে ‘নববর্ষের আগের রাত’ বলার ঐতিহ্যের মতো।
হাবের নাম ও প্রতীকচিহ্ন
মায়া ক্যালেন্ডারের গোলক
ক্যালেন্ডার রাউন্ডের একটি তারিখ কোনো নির্দিষ্ট দিনের অবস্থানকে ২৬০-দিনের গণনা ( জোলকিন ) এবং ৩৬৫-দিনের গণনা ( হাব ) উভয় ক্ষেত্রেই নির্দেশ করে।
এটি সর্বদা একই ক্রমে লেখা হয়: (1) জোলকিনে দিনের সহগ + দিনের নাম , এবং (2) হাবে দিনের সংখ্যা + মাসের নাম ।
যেহেতু ২৬০ এবং ৩৬৫-এর লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক ৫, তাই ক্যালেন্ডার রাউন্ডের একটি নির্দিষ্ট তারিখের পুনরাবৃত্তি হতে ১৮,৯৮০ দিন (২৬০ x ৩৬৫/৫), অর্থাৎ প্রায় ৫২ বছর সময় লাগবে।
মেসোআমেরিকা জুড়ে ৫২-বছরব্যাপী গণনা পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো।
উদাহরণস্বরূপ, মেক্সিকানরা (আজটেকরা) এই সময়কালগুলোকে ‘শিউহমলপিলি’ বলত , যার অর্থ ‘বছরের গুচ্ছ’। একটি নতুন শিউহমলপিলির শুরু ছিল ব্যাপক উদযাপনের কারণ। এই ৫২-বছরের সময়কালগুলোর মায়ান নামটি জানা যায়নি।
জোলকিন- এর ২০-দিনের চক্র এবং হাব- এর ২০-দিনের মাসগুলোর সংযোগ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার জন্ম দেয়: যেকোনো নির্দিষ্ট বছরে, হাব- এর সমস্ত মাসের প্রথম দিন একই জোলকিন দিন দিয়ে শুরু হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি বছরের প্রথম দিন (১ পপ) জোলকিন- এর কোনো বেন দিনে পড়ে , তাহলে সেই বছরের প্রতিটি মাসের প্রথম দিনও একটি বেন দিনে পড়বে। এই দিনগুলোকে “বর্ষবাহক” বলা হয়।
হাব মাসের শেষে পাঁচ দিনের ছোট মাস ( ওয়ায়েব ) হওয়ায়, ত্জোলকিন অনুযায়ী পরবর্তী বছরের প্রথম দিনটি পাঁচ দিন পরে হতে হবে ।
মায়া লং কাউন্ট
এর পরবর্তী ধাপ ছিল তাদের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ পদ্ধতি, যাকে আমরা ‘ লং কাউন্ট’ বলি । আমাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডারের মতোই মায়ারা একটি নির্দিষ্ট সূচনা বিন্দু থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য তারিখ চিহ্নিত করত। আমাদের ক্যালেন্ডারে সেই নির্দিষ্ট তারিখটি হলো যিশু খ্রিস্টের জন্মতারিখ , আর ক্লাসিক মায়াদের জন্য বর্তমান সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১১৪ সালের ১৩ই আগস্ট। প্রতিটি মহাচক্র ৫১২৮ বছর স্থায়ী হতো এবং এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য পুনরাবৃত্ত হতো।
প্রতিটি শিলালিপি তারিখ দিয়ে শুরু হতো, সাধারণত দীর্ঘ গণনার তারিখ এবং তারপরে পঞ্জিকার চক্র ( জোলকিন তারিখ + হাব তারিখ) উল্লেখ থাকতো।
লং কাউন্ট পদ্ধতির মূল একক ছিল দিন ( কিন )। যেহেতু মায়ারা বিংশভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করত (অর্থাৎ আমাদের দশমিক পদ্ধতির মতো ২০-এর উপর ভিত্তি করে), তারা ২০ দিনের একটি সময়কাল ( উইনাল ) ব্যবহার করত, যাকে আবার ১৮ দিনের (২০ নয়, সম্ভবত সৌর বছরের কাছাকাছি রাখার জন্য) গুচ্ছে ভাগ করা হতো, যার নাম ছিল তুন ; এরপর কাতুন , যা ২০টি তুন- এর সমান ; এবং বাকতুন , যা ২০টি কাতুন-এর সমান , এবং এভাবেই চলত।
দীর্ঘ গণনা
তাহলে দীর্ঘ গণনা হলো শেষ সৃষ্টির পর থেকে দিন গণনা এবং এটিকে বিভক্ত করা হয়েছিল:
কিন = ১ দিন
উইনাল = ২০ দিন (২০ ক’ইনস )
Tun = 360 দিন/ K’ins (18 Winals )
কাতুন = 7,200 দিন (20 টন )
বাকতুন = 144,000 দিন (20 কাতুন )
যেমন দীর্ঘ গণনার তারিখ ১৩.০.১৩.৮.২ অর্থাৎ
১৩ ব’আক্তুন
১৩ × ১,৪৪,০০০ দিন = ১৮,৭২,০০০ দিন
০ কাতুন
০ × ৭,২০০ দিন = ০ দিন
১৩ তুন
১৩ × ৩৬০ দিন = ৪,৬৮০ দিন
৮ উইনাল
৮ × ২০ দিন = ১৬০ দিন
২ কিন
২ × ১ দিন = ২ দিন
চান্দ্রমাস গ্রহণ এবং জোলকিন ক্যালেন্ডার
মায়া সংস্কৃতিতে গ্রহণের মতো জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত ঘটনাগুলি ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে, যা প্রতিফলিত হয় মায়ারা স্বর্গীয় ভবিষ্যদ্বাণীতে সহায়তা করার জন্য সঠিক ক্যালেন্ডার রাখার জন্য যে যত্ন নিয়েছিল তার মধ্যে। বেঁচে থাকা কয়েকটি মায়া গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তথাকথিত ড্রেসডেন কোডেক্স, যার মধ্যে গ্রহণের একটি সারণী রয়েছে। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুসারে , গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এই সারণীটি কেবল গ্রহনের পূর্বাভাসের জন্য তৈরি না করে পূর্ববর্তী চন্দ্র মাসের সারণী থেকে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। তারা সেই প্রক্রিয়াটিও বের করেছিলেন যার মাধ্যমে মায়ারা নিশ্চিত করেছিল যে দীর্ঘ সময় ধরে এই সারণীটি সঠিক হবে।
পণ্ডিতরা অনুমান করেছেন যে মায়াদের কাছে সৌর বা চন্দ্রগ্রহণ কতটা বিস্ময়কর মনে হত, কিন্তু তাদের জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের বোধগম্যতা সীমিত। বেশিরভাগ মায়া বই স্প্যানিশ বিজয়ী এবং ক্যাথলিক পুরোহিতরা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। মাত্র চারটি হায়েরোগ্লিফিক কোডেস টিকে আছে: ড্রেসডেন কোডেক্স, মাদ্রিদ কোডেক্স, প্যারিস কোডেক্স এবং গ্রোলিয়ার কোডেক্স।
ড্রেসডেন কোডেক্সটি একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীর এবং সম্ভবত চিচেন ইৎজার কাছে এর উৎপত্তি। এটি অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা যেতে পারে এবং খোলা অবস্থায় ১২ ফুট লম্বা। এই লেখাটি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পাঠোদ্ধার করা হয়েছিল এবং এতে স্থানীয় ইতিহাসের পাশাপাশি জ্যোতির্বিদ্যার চন্দ্র এবং শুক্র গ্রহের টেবিলের বর্ণনা রয়েছে।
তাদের গবেষণার জন্য, সহ-লেখক আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন জাস্টেসন এবং SUNY-প্ল্যাটসবার্গের জাস্টিন লোরি বিশেষ করে ৫১ এবং ৫৮ পৃষ্ঠার উপর তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন, যেখানে সমস্ত সৌর এবং বেশিরভাগ চন্দ্রগ্রহণের সারণী রয়েছে। এটি অষ্টম শতাব্দীতে শুরু হওয়ার তারিখ থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত চলার জন্য যথেষ্ট নির্ভুল। (মাদ্রিদ কোডেক্সে একটি গ্রহণ পঞ্জিকাও রয়েছে, তবে এটি মূলত কৃষিচক্র গ্রহণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। লোরি এবং জাস্টেসনের বিশ্লেষণে ড্রেসডেন কোডেক্স টেবিলে প্রাপ্ত গ্রহনের ভবিষ্যদ্বাণীগুলি ৩৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মায়া ভৌগোলিক অঞ্চলে দৃশ্যমান ১৪৫টি সূর্যগ্রহণের নির্ভুল গননা দেখান।
তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে কোডেক্সের গ্রহণের সারণীগুলি ধারাবাহিক চন্দ্র মাসের একটি সাধারণ সারণী থেকে বিকশিত হয়েছে। ৪০৫ মাসের চন্দ্রচক্রের (১১,৯৬০ দিন) দৈর্ঘ্য সৌর বা চন্দ্রগ্রহণের চক্রের তুলনায় ২৬০ দিনের ক্যালেন্ডারের (৪৬ x ২৬০ = ১১,৯৬০) সাথে অনেক ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে মায়া দিবা-রক্ষকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে ৪০৫টি নতুন চাঁদ প্রায় সর্বদা ৪৬টি ২৬০ দিনের সময়ের সমতুল্য বেরিয়ে আসে, এই জ্ঞান মায়ারা ৪০৫টি ধারাবাহিক চন্দ্র তারিখের উপর পূর্ণিমা এবং নতুন চাঁদের তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে ব্যবহার করত। প্রসঙ্গত ১১৯৬০/৪০৫=২৯.৫৩ দিন অর্থাৎ এক চান্দ্রমাস।(বর্তমান যুগের চান্দ্র সিনোডিক পিরিয়ড হলো প্রায় ২৯.৫৩০৫৮৭৭ গড় সৌর দিন বা প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট এবং ২+ ৭ / ৯ সেকেন্ড।)
ডে-কিপাররা আরও বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের ২৬০ দিনের ক্যালেন্ডারে একই দিনে বা তার কাছাকাছি সময়ে সূর্যগ্রহণ পুনরাবৃত্তি হয় এবং সময়ের সাথে সাথে তারা স্থানীয়ভাবে কোন কোন দিনগুলিতে সূর্যগ্রহণ ঘটতে পারে তার পূর্বাভাস কীভাবে দেওয়া যায় তা খুঁজে বের করতে পারেন।”
মায়ারা এটাও বুঝতে পেরেছিল যে সময়ের সাথে সাথে পিছলে যাওয়ার হিসাব রাখার জন্য তাদের মাঝে মাঝে তাদের টেবিলগুলি সামঞ্জস্য করতে হয়। “যখন আমরা নির্ভুলতার কথা বলি, তখন মাঝে মাঝে আমরা মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হওয়ার কথা ভাবি,” লোরি নাসার রেকর্ডের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন। “মায়াদের একটি খুব নির্ভুল ক্যালেন্ডার আছে, কিন্তু তারা দিনের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করে, সেকেন্ড পর্যন্ত নয়।”
কিন্তু লেখকদের মতে, মায়ারা তাদের টেবিলগুলিকে কোনও একক অবস্থান থেকে পুনরায় চালু করেনি, লোরি এবং জাস্টেসন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে পূর্ববর্তী টেবিলটি শেষ হওয়ার আগে দুটি নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী বিন্দুর একটিতে টেবিলগুলি পুনরায় চালু করা হয়েছিল: ৩৫৮তম অমাবস্যা (অর্থাৎ, গ্রহণের সামগ্রিক দৈর্ঘ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অতিমূল্যায়ন) এবং ২২৩তম অমাবস্যা (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবমূল্যায়ন)।
1,000 বছর ধরে – যুদ্ধের মাধ্যমে, পতনের মাধ্যমে, দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে, বহিরাগত বিজয়ের মাধ্যমে – এই জাতি প্রতি পাঁচ বা ছয় মাসে গ্রহনের পর্যবেক্ষণমূলক রেকর্ড বজায় রেখেছিল। মায়ারা তাদের ক্যালেন্ডারকে আরও নির্ভুল করে তুলেছে যা খুবই চমৎকার।”
৮১৯ দিনের গণনা
কিছু মায়া স্মৃতিস্তম্ভে তাদের প্রাথমিক সিরিজে ৮১৯ দিনের গণনা রেকর্ড করে এমন গ্লিফ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলি ড্রেসডেন কোডেক্সেও পাওয়া যায়। ৮১৯ দিনের প্রতিটি গোষ্ঠীকে চারটি রঙের একটি এবং এর সাথে সম্পর্কিত প্রধান দিকের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল – কালো পশ্চিমের, লাল পূর্বের, সাদা উত্তরের এবং হলুদ দক্ষিণের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
৮১৯-দিনের গণনা বিভিন্ন উপায়ে বর্ণনা করা যেতে পারে: এর বেশিরভাগই একটি “Y” গ্লিফ এবং একটি সংখ্যা ব্যবহার করে উল্লেখ করা হয়। অনেকের কাছে Kʼawill-এর জন্য একটি গ্লিফও রয়েছে – যার মাথায় একটি ধোঁয়া ওঠা আয়না রয়েছে। Kʼawill-এর সাথে বৃহস্পতির একটি সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
![]()
