শরদিন্দু সাহা
লেখক পরিচিতি
বাংলা কথা সাহিত্যের সুপরিচিত লেখক শরদিন্দু সাহা। লেখক সত্তা ও জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। নিছক লেখক হওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সৃষ্টিকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। শৈশব থেকে সৃষ্টিশীল মন লালন করে প্রস্তুতি পর্ব সারলেও নয়ের দশকের গোড়া থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। এ-পর্যন্ত শতাধিক গল্প, গোটা কয়েক উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্য মুদ্রিত হয়েছে। দশটি উপন্যাস আর সাতটি গল্পগ্রন্থ সহ মোট গ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। ১৯৯৮ সালে ‘কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার পুরস্কার’ পান। ২০০৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত সোমেন চন্দ পুরস্কার’ পান। ওই বছরেই কাটোয়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা কর্তৃক সংবর্ধিত হন। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘হল্ অব্ ফেম’-এ সম্মানিত করেন। ২০০৫ সালে ‘ভাষা শহিদ বরকত স্মরণ পুরস্কার’ পান। ২০০৭ সালে সাহিত্য আকাদেমি’র আমন্ত্রণে গৌহাটিতে বাংলা-অসমীয়া গল্পকার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে ‘আমি’ পত্রিকা তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য বিশেষ সম্মান দেন। প্রসার ভারতী’র আমন্ত্রণে নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিলিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রে ও ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। ইতিমধ্যেই নিজস্ব এক ঘরানা সৃষ্টি করে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন।সম্প্রতি লেখক ‘দীপ্তি রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৪’-এ সম্মানিত হয়েছেন।
বিষয় পরিচিতি
(রেভারেন্ড জেমস্ লঙ যে লক্ষ্য স্থির রেখে জীবনকে চালনা করেছেন তা শুধুমাত্র ঘটনাক্রম দিয়ে ধরা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের পরিক্রমায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রভাব রয়েছে তাকে কোনও এক শিল্প মাধ্যম দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। কারণ কোনো সরলরেখায় তিনি তাঁর কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নানা উত্থান পতন ঘাত প্রতিঘাত তাকে পীড়িত করেছিল, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি প্রবল আত্মশক্তিতে তার মোকাবেলা করেছিলেন এবং কর্তব্যকর্মে অটুট ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি ও ব্যাপ্তি একজন শিক্ষকের, সমাজসেবকের, মানবপ্রেমির যা মূলত শাসক ও শোষিতর মাঝখানে একজন প্রতিবাদীর, সত্যবাদীর, বলা যায় একজন দ্বান্দ্বিক ব্যক্তিত্বের। যার না-বলা কথা, জানা-অজানার কল্পনা ও বাস্তবের মিলন নিয়ে উপন্যাস লেখা সম্ভব অসম্ভবের দোলাচল মাত্র, তবুও শব্দের মায়ায় ধরার সামান্য প্রচেষ্টা। কোথায় তার অন্ত হবে প্রকৃত অর্থে বলা খুব কঠিন। এই মহান মানুষটির শৈল্পিক জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া আর কি।)
চেতন মনে ঘুমিয়ে আছে চিন্তামণি
দ্বন্দ্বটা আমাকে কেন যে তাড়িয়ে বেড়ায়, আমার জানা নেই, তবে এক অন্তহীন উপলব্ধি আমার চিন্তা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে, আমি ঠিক কোন পথ দিয়ে হেঁটে চলে বেড়ালে স্বদেশ বিদেশের সীমানাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারবো, কে বলে দেবে। অচিরেই বুঝলাম, এ বড় কঠিন কাজ, তেমন মুক্ত ভাবনার সন্ধান আমি এখনও পাইনি আর কবে যে শিখরে পৌঁছে যেতে পারবো সেও জানি না। এমন অনেক প্রশ্ন আমার চারপাশে এসে আমাকে ঘিরে ধরে, আমি না পারি আলগা হতে, না পারি তাকে আঁকড়ে ধরতে। কেবলই মনে হয় আমার বিমূর্ত বোধ ও চেতনা মূর্ত হয়ে আমাকে ইশারা করে ডাকছে। তার রঙ রূপ কোনো কিছুরই সন্ধান মিলছে না কিছুতেই। কী করা উচিত হবে, ঠিক এমনি সময় মনে পড়ে গেল বীটন সাহেবের কথা। যতই মনের মধ্যে ইংরেজ রাজত্বের কল্যাণ চিন্তা জাঁকিয়ে বসুক, সভ্যতায় পাঠের গুরুত্ব অস্বীকার করি কেমন করে। বীটন সাহেবের ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা পর্বে এদেশীয় সম্ভ্রান্ত হিন্দুদের মধ্যে হৈ হৈ রবে শুরু হয়ে গেল, ঘরের মেয়েদের বাইরে যেতে তাঁদের তীব্র আপত্তি অথচ নিম্ন জাতির মেয়েদের আগে থেকেই ওদের বাপমায়েরা মিশনারী পরিচালিত বালিকা বিদ্যালয়ে স্বচ্ছন্দে পাঠাতো। ‘সংবাদ ভাস্কর’ পত্রিকায় এই নিয়ে তো কম লেখালেখি হয় নি, এই তো আমি স্বচক্ষে দেখেছি। গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ মহাশয় তো উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন স্ত্রীশিক্ষার আয়োজন তো নতুন কিছু নয়, মেয়েদের অনেকের পাণ্ডিত্য সকলেরই নজর কেড়েছিল। এমন গোঁড়ামি কবে থেকে সমাজের বুকে চেপে বসলো, আর কেনইবা চেপে বসলো কে তার উত্তর দেবে। তবে অভিসন্ধি যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ আজকের এই প্রকাশ্য গুঞ্জন। না হয় ‘রূপ গঙ্গোপাধ্যায়’ ‘রূপন্যায়ালঙ্কার’ হয়েছিলেন কেমন করে আর শ্রীমতী দ্রবময়ী দেবী ব্রাক্ষ্মণ পন্ডিতগণদের সম্মুখে বসে মাথা ও মুখ উন্মুক্ত রেখে সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতেনই বা কীভাবে, বিচারকালীন সংস্কৃত ভাষায় ব্যক্ত করছেন কেমন করে! অর্থাৎ এ কথা ধ্রুব সত্যি তাঁর কাব্যালঙ্কার, ন্যায়শাস্ত্র ও মহাভাগবতে গভীর জ্ঞান ছিল, না হলে ছাত্রদের টোলে ব্যাকরণ শাস্ত্র শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হতো না। তাহলে এই প্রশ্ন জাগে বই কি, কবে থেকে মেয়েরা পর্দানশীন হলো? বহির্বিশ্বে মেয়েরা যখন অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরছে, মুক্তির স্বাদে উৎফুল্ল হচ্ছে, তখন ইংরেজ শাসনের এই দেশের মেয়েদের এত দুর্গতি হবে কেন, এমনটা চলতে পারে না, এর একটা বিহিত হওয়া জরুরি।
নিজের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে গিয়ে যে পূর্বসুরীদের অপূর্ণতা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে তাকে অস্বীকার করবো এমন বুকের পাটা আমার নেই। মালদহের জন্ এলার্টন, চুঁচুড়ায় রেভারেন্ড রবার্ট মে, বর্ধমানের ক্যাপ্টেন জেম্স স্টিওয়ার্ট, কালনা ও চন্দননগরের জন্ পীয়ার্সন ও জে হার্লিদের কল্পনা আর বাস্তবের মেলবন্ধন চাক্ষুষ করিনি বটে কিন্তু উপলব্ধিতে বার বার ঘুরে ফিরে আসে যা এই দেশটাকে নিজের করে নিতে যেন প্রলুব্ধ করে দেয়। মিস কুক তো চেষ্টার কসুর করেননি, আট আটটি স্কুল স্থাপন করেছেন। বোঝাতে চেয়েছিলেন মেয়েরা শুধুমাত্র ভোগের বস্তু নয়, সন্তান জন্মদানের যন্ত্র নয়, সূচিকর্ম আর গার্হস্থ্য বিদ্যার বাইরের জগৎটাকে উন্মুক্ত করে না দিলে স্বাস্থ্য আর মনের বিকাশ ঘটবে না, পথের জঞ্জাল পরিস্কার করে ফেলতে হবে, যত কাঁটা আছে খুঁজে খুঁজে সরাতে হবে, তবে যদি মেয়েরা সমানতালে চলতে পারে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এটা তো বাস্তব এই বাংলার মেয়েরাই একসময় জমিদারি চালিয়েছে, পরিবারের পুরুষদের শারীরিক ও মানসিক প্রয়োজন মেটানোর ওদের একমাত্র কাজ নয়, একথা প্রমাণ করে দিয়েছে, তবে এত ঘুটঘুটে অন্ধকার কেন? নাটোরের জমিদার রানি ভবানী, রানি সূর্যমণি, কমলমতিরা প্রমাণ করে দিয়েছেন তাঁরা হিসাবশাস্ত্র, বাংলাভাষা ইত্যাদি বিষয়ে ছিলেন কতটা সুদক্ষ। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ প্রচলিত উক্তিকে কতটা ভুল প্রমাণ করেছিলেন। একবার কৃষ্ণনগরের এক গ্ৰামের গন্ধবণিকের ঘরে গিয়ে দেখেছিলাম মেয়েরা কাপড়ের উপরে সূচির ফোঁড়ে লিখে আয়নায় ঝুলিয়ে ঘরে টাঙিয়ে রেখেছে। অক্ষরগুলো জ্বলজ্বল করছে – ‘ সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। হস্তশিল্পের প্রশংসা না করে উপায় ছিল না কিন্তু বুঝেছিলাম মেয়েদের ব্রতকথা, লক্ষ্মীর পাঁচালির গূঢ় ভাবার্থ – আদর্শ রমণীর সংজ্ঞাটা পুরুষরা কেমন সুচারুভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, দাসী বৃত্তি ছাড়া এর অন্য কোনও অর্থ থাকতেই পারে না, অথচ অন্তঃপুরে থেকে মা বোনেরা কেমন নির্বিবাদে পুরুষদের এই ছকটাকে পবিত্র কর্ম ভেবে দিব্যি জীবনযাপনের লক্ষ্য হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং ধর্মীয় অনুশীলনের অঙ্গ করে নিয়েছে, মেয়েদের সমান অধিকারের তত্ত্বটাকে কেউ এঁদের মনে করায় নি। এও দেখেছি এক অশীতিপর বৃদ্ধা রোগের যন্ত্রণায় কীরকম কাঁতরাচ্ছিল, কেমন করে উপশম হবে কারোই কিছু জানা ছিল না, গালে হাত দিয়ে বসে চোখে জল নিয়ে তাকিয়েছিল ওই মৃত্যু পথযাত্রী রোগগ্ৰস্থ মুখের দিকে। আশার কথা ক্যালকাটা ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেটাও তো কম বড় কথা নয়, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তো বটেই, হয়তো আরও অনেক দূর যেতে হবে, বুঝে ফেলতে হবে এই সমাজের ছাল বাকলটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখতে হবে এই গড়নের পেছনে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে। এঁদের শিক্ষার জগৎটা কুক্ষিগত করে রেখেছে এক শ্রণী, সাধারণের মুক্তমন তৈরি করার ছিঁটেফোঁটাও তো নেই। শ্রীরামপুরের ত্রয়ীর কথা ভোলা তো যায় না – উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডরা তো নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন, না হলে গাঢ় অন্ধকারে তো আলোর ছটা পড়তো না, বোঝা যেত না এঁদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাঁধনটা কতটা নড়বড়ে।
চিন্তাটা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। যাজকদের ধর্মীয় শিক্ষা তো সমাজের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে না, যতক্ষণ না এঁদের দীর্ঘ লালিত মনোজগতের অন্ধিসন্ধি না ধরাছোঁয়া যায়, এই প্রশ্ন জাগছে, দূরে, আরও দূরে যেতে হবে, যেখানে পথ হয়েছে রূদ্ধ, জলা-জঙ্গলের ছায়ায় আঁটকা পড়ে আছে অভাবী অনামী জীবন, এঁদের চোখের জল মুছে দিতে হবে, অচেনা জীবনের ছন্দ আর নাড়ীর চলাচল কান পেতে শুনতে হবে শল্য চিকিৎসকের মতো, হয়তো তাতেই হতে পারে নিরাময়। হালহেড সাহেব, কেরী সাহেব ও বাবু রামমোহন রায়ের ব্যাকরণ সহায়ক এবং কৃত্তিবাসী, কালীদাসী, কবিকঙ্কণ ও ভারতচন্দ্রকে অস্বীকার করবে কে, ইংল্যান্ডের সাহেবরাও মনে করেন না স্বজাতীয়দের স্বজাতীয় ভাষায় উপকার হবে এই বিশ্বাস বিজাতীয় নয়। চতুষ্পাঠী শিক্ষা নিশ্চয়ই চিন্তায় ও মননে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল কিন্তু যুক্তিবাদী মানুষ তৈরিতে কতটা অংশ নিয়েছিল, সেই ধারণা আমার স্বল্পজ্ঞানে কতটাই বা বিচার করব কিন্তু আমার ভাষা শিক্ষা আমাকে আরও যে পথের সন্ধান দেয়, এটা হলফ করে বলতে পারি যদি এই কৃতবিদ্যার বীজ কোনভাবে রোপণ করা যায়, তাতে যে ফসল ফলবে না এটাই বা কেমন করে বলি, হয়তো আর এক আশ্চর্যজনক অবস্থার সূচনা হতে পারে, যা ইংলেন্ডীয়ও নয় আবার বঙ্গদেশীয়ও নয়, নতুন এক সমাজ, অভিনব এক পরিবেশের সূচনা, অন্য কারোর চেয়ে কম তো নয়ই বরঞ্চ খানিকটা বেশিই হবে।
সময়কে ইচ্ছে করলেই তো মুছে ফেলা যায় না, পুনর্মূল্যায়ন করে যোগ বিয়োগ করা যায় বটে, সময়ের অভিঘাত তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রভাবিত করবেই নিজস্ব নিয়মে, এই কথা কে আর কবে মানে নি। আমি নিজেই তো চলমান সমাজের ক্রীড়নক তাই তো আমি অতীতকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখি আর অবাক হয়ে যাই, যখন দেখি এই সময়ই কখনও কত রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে রামধনুর সপ্তরঙের মতো, কখনও দূর থেকে দেখলে মনে হয় কখনও উজ্জ্বল, কখনও বিবর্ণ, পূর্বজরা তার রঙে নিজেদেরকে মুড়িয়ে নিয়েছে, চেনা গিয়েছে, আবার যায়ও নি, কল্পনার ছবিতে আজ তারা কেমন যেন মানানসই হয়ে গেছে, আত্মীয় হয়েও মনে হয় কত দূরের মানুষ, তাঁদের বিদ্যা অবিদ্যার অনুশীলন আমাদের চেয়ে কতটাই ভিন্ন সুরে বাঁধা, তাঁদের সপ্তস্বর সন্ধান দেয় অচেনা পৃথিবীর। স্বর হয়তো আছে, প্রকৃতি তৈরি করে দিচ্ছে ব্যবধান। এমন দিন ছিল হাতিবাগানের চতুষ্পাঠীতে হরচন্দ্র তর্কভূষণ ন্যায়শাস্ত্র পড়াতেন, শাস্ত্রবিচারে মত প্রকাশ করতেন, শ্যামবাজারের সভায় বেদের চতুষ্পাঠীর প্রস্তাব গৃহীত হয়, পরমার্থচর্চালয় স্থাপনা হয়, হরিনাভির রামগোপাল ন্যায়ালঙ্কার ভট্টাচার্য মহাশয় কলিকাতার আড়পুলিতে চতুষ্পাঠীতে অধ্যাপনা করেছিলেন, নবদ্বীপের শিবনাথ বিদ্যাবাচস্পতির তর্কশাস্ত্রের পান্ডিত্যর কথা কে না জানে। এনাদের মননে ও চিন্তায় এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যা হয়তো সমাজজীবনকে পুষ্ট করেছে, সেই গড়নই আজকের চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। আমার মধ্যে যে সকল প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে তার উত্তর তো আমাকে খুঁজে বের করতে হবে, বীজ ছড়াতে হবে এমন করে যাতে আলোকিত বিশ্বের উত্তাপ এই সিলেবাসে জায়গা করে নিতে পারে। কাজটা যে বড় কঠিন, অনেক গ্ৰহণ বর্জনের পালা সাঙ্গ করে তবেই না শুভ যাত্রার পালা শুরু হবে কিন্তু কোনমতেই এই দেশের মাধ্যমগুলোকে সরানো যাবে না তাহলে পুরো কাঠামোটাই ধসে যাবে, এটাই হলো ধ্রুব সত্য। কর্নেল উইলফোর্দ সাহেব এমন এক বিদ্বান ছিলেন, এদেশীয় বিদ্যা ও প্রাচীন ইতিহাসের পাঠ নিয়েছিলেন সহজে, স্যার উইলিয়াম জোন্স সাহেব আর বাঙলার বড় সাহেব ওয়ারেন হেস্টিংসের সহায়তায় এশিয়াটিক সোসাইটির লক্ষ্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে বাস্তবায়িত করেছিলেন। আমার ধারণা পূর্বসুরীদের কর্মকান্ডে আরও অধিক শক্তপোক্ত হলো যে প্রকৃত শিক্ষাকে কোনো সমাজ ও দেশের সীমারেখা দিয়ে বাঁধা যায় না, মিলিয়ে দেওয়াই এর আসল কাজ। এমন কাজে আমাকে ব্রতী হতেই হবে।
সমাচার আর সাহিত্য নিয়ে এইদেশে তো কম কাজ হয় নি। হরকরা, সম্বাদ কৌমুদী, সমাচার দর্পণ, সমাচার চন্দ্রিকা ইত্যাদি পত্রপত্রিকা মানুষের খবরের স্পৃহাকে যেমন বাড়িয়ে দিয়েছিল তেমন নিজেদের অবস্থানকে চিনিয়ে দিয়েছিল – কোন পথ দিয়ে হাঁটতে হবে, কেমন করে হাঁটতে হবে আর কতটা পথ পার হলে ক্রমশ পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে পা মেলাতে পারবে। আমার কর্মের ধারাকে কোন খাতে বইয়ে দিলে আমি সেই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে যেতে পারবো, যাদের জীবন নিয়ে ভাববার কেউ একটুও প্রয়োজন বোধ করেনি অথচ ধাক্কাটা কেউ না কেউ মারতে পারতো, সলতেটা উস্কে দিতে পারতো। যদি হতো এমন করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়তো হতো না, ভেতরের কথাগুলো বেরিয়ে আসতো সহজে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি তো এত সহজে ওদের মনের ঘরে বাসা বাঁধতে পারি না। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি ওদের ভোর কেমন করে হয়, দিন কেমন করে গড়ায়, গোধূলির আলো কেমন করে জড়িয়ে ধরে, আঁধার চেনা পথকে ঢেকে দিলে ওরা নিজেদের শরীরকে কতভাবেই না গুটিয়ে নেয়। আমি শুনতে পাই না কোন কথা, নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি এমন বোবা হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে নতুন কোনো উচ্চারণের জন্ম নেওয়া আদৌ সম্ভব! ওদের এলোমেলো চুলগুলো যখন বাতাসে উড়ে উড়ে বেড়ায়, ওরা যখন চোখ পিটপিট করে, পিচুটি নিয়ে গায়ে গতরে খেটে গায়ে ধুলো মাখে, আমার চোখে ভাসে পতপত করে উড়ে বেড়ানো পাখির ডানার ছায়া, ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের দোলায় বিন্দু বিন্দু ছড়ানো আলো যেন আপন ছন্দে ঢেউগুলো গিলে নিচ্ছে। ওদের অন্দরমহলে তখন হরেক রকমের গল্পকথা রূপকথা হয়ে স্বপ্নের জাল বোনে। যেই স্বপ্নগুলো বাস্তবের মুখোমুখি হতে কত সময়ের মোড়কে মুড়িয়ে যাবে। ওরা তবুও হাসে, হাসিতে ফেটে পড়ে বলতে চায় ওদের যন্ত্রণাটা আসলে মনের কত গভীরে ডুব সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে সেই কবে থেকে। ওদের জীবন ওদেরকে চেনানোর জন্যই আরও কাছে যাওয়া প্রয়োজন, ওদের বইয়ের পাতাগুলো একে একে মেলে ধরলে যদি কিছুটা মুক্তি মেলে।
‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’র কাব্য প্রতিভায় বঙ্গদেশ তখন আলোড়িত। এমন প্রতিভাধর মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার লোভ কার না হয়। এমন দ্রুত চলন যেন চারপাশটাকে কেমন সহজে নিজের করে নিচ্ছেন। মনে হচ্ছে এইমাত্র বুঝি কলমটা থামিয়ে রেখে জগৎ দেখার জন্য আঁকুপাঁকু হয়ে মানুষের সমুদ্রে সাঁতার কাটছেন। মানুষের ঢল নেমেছে তাঁর এই অকুতোভয় মনোভাবের পরিচয় পাবে বলে। সাময়িক পত্র পত্রিকায় তাঁর হাস্য পরিহাস মিশ্রিত ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কবিতার রসে ভিজে রয়েছেন যে পাঠকরা। তাঁকে একবার চোখের দেখা দেখবে বলেই না এত মানুষের আনাগোনা। ছাতা মাথায় পাঞ্জাবি গায়ে চাদর জড়িয়ে মানুষটা আপনমনে কী যেন আওড়াতে আওড়াতে এই কাঠফাটা রোদ্দুরে ইট-সুরকির রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। ভক্তদের আবদার কী না মিটিয়ে চলে যাওয়া যায়! দু-চারটে লাইন যেন তুবড়ির রশ্মির মতো ছড়িয়ে গিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে দেয়। ইতঃস্তত করেই কিছুটা নতমস্তকে জানতে চায়, ‘কবিবর এই দেশের দরিদ্র মানুষের হালহকিকত আপনার চেয়ে ভালো আর কে জানে। এই নিয়ে যদি দু’চারটে লাইন আমরা শুনতে পেতাম।’ হাসি হাসি মুখ করে বললো, ‘তোমরা তো বাপু আমায় ফ্যাসাদে ফেললে। কবিতা কি চাইলেই ফরফরিয়ে বেরিয়ে আসে? তবে কাল রাতে এই দেশের গাঁয়ের মানুষদের দুঃখের কথা ভাবতে গিয়ে ভারী মনঃকষ্ট হলো, দোয়াত কলম নিয়ে বসেই পড়লাম। পঙক্তিগুলো সরস্বতী মা এসে আমার কানে এসে যেন বলে গেল। ভাবলাম একেবারে ছাপার অক্ষরেই পাঠকরা পড়বে, তোমরা যখন এতটাই নাছোড়বান্দা তবে শোনো দু’চারটে লাইন। মন্দ লাগলে কিন্তু দোষ দিও না – ঘরে হাঁড়ি ধনধনান্তি মশা মাছি ভন-ভনান্তি, শীতের শরীর কনকনান্তি, একটু কাপড় নাইকো পিঠে। আচ্ছা তবে এত করে যখন বলছ, স্বদেশের কবিতা শোনাই – মিহি মণিমুক্তা যেন স্বদেশের প্রিয় প্রেম তার চেয়ে রত্ন নেই আর। সুধাকরের কত সুধা দূর করে তৃষ্ণা ক্ষুধা স্বদেশের শুভ সমাচার। কবিতা আবৃত্তিতে ওর প্রাণকাড়া উচ্চারণ আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলাম। বাঙালিদের চেয়ে আমি উচ্চতায় লম্বা কিনা জানিনা ওনার নজর এড়ায় নি। নিজেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ আরে লঙ সাহেব আমি যাহা খুঁজে বেড়াই, আপনিও কি তাই খোঁজেন।’ বললাম, আপনার মতো করে আমি পরদেশী হয়ে এই দেশের মানুষের মনের কথা টের পাবো কেমন করে। তবে কিনা এটা বুঝতে পারি, ছাপোষা মানুষগুলোর কথা তুলে ধরতে না পারলে আমার নিস্তার নেই। ‘গাঁ-গঞ্জের মানুষ তো দূরের কথা, কলকাতা শহরের অবস্থাখানা দেখছেন না, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবরা কেমন চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।’ আপনার কবিতার লাইন তো আমি শুনেছি – রেতে মশা দিনে মাছি এই নিয়ে কলকাতায় আছি। খুব সুন্দর বলেছেন। এমন করে আপনি ভাবেন কেমন করে?
সূর্যের রশ্মি যেন মাথার উপর সরাসরি এসে পড়েছে। ভরদুপুর কিনা। শহরের পথে এগিয়ে গেলেই গায়ে ছেঁকা লাগে। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে পাথুরিয়াঘাটা এসে পৌঁছে গেছি, বুঝতেই পারলাম না। দু’জনের মধ্যে কত কথা আদান প্রদান হলো সে আর বলে শেষ করা যাবে না। মনের কথা খুলে বলতে ঈশ্বর গুপ্ত মহাশয়ের জুড়ি মেলা ভার। এমন মজার মানুষ এই কলিকাতা শহরে কমই দেখেছি। কথা যখন বলেন প্রাণ খুলে বলেন, কোনো রাখঢাক করেন না। এমন লোক যে দেশে জন্মায়, সেই দেশের ভাগ্য বটে। কেন বলছি একথা, সেকথা এই দেশের মানুষ সময় পার হলেই বুঝবে। এটা বুঝলাম মানুষটা যেন যুগ সন্ধিক্ষণের কবি। ভাবনাচিন্তা আর চেতনায় মধ্যযুগ আর আধুনিকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। বললেন কি জানেন – ‘ গোলদীঘির উত্তরাংশে সংস্কৃত কলেজটি প্রতিষ্ঠা না হলে ব্যকরণ, কাব্য বা সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি ও ন্যায়শাস্ত্র মাঠে মারা যেত। তাই বলে এটা ভাববেন না পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বিরোধ করছি। সবকিছুরই একটা সামঞ্জস্য থাকা দরকার কি বলেন? দেখুন না আমি কি ‘প্রভাকর’-এ প্রাচীন কবিদের অপ্রকাশিত রচনা ও জীবনবৃত্তান্ত যেমন ধরুন না রামপ্রসাদ সেন, রামনিধি গুপ্ত, রাম বসু, গোলা গুঁই, হরু ঠাকুরদের কথা ছেপেছিলাম তো। হ্যাঁ আপনি বলতে পারেন আমি বঙ্গদেশের বউঝিদের নিয়ে তাহলে এমন তেতো কবিতা লিখেছি কেন, যেমন – মাগীদের নাহি আর তিন রাত্রি ঘুম, গড়াগড়ি ছড়াছড়ি রন্ধনের ধুম। আরে সাহেব, তারও একটা মানে আছে বই কি, একটু ঠেলা না মারলে যে চলে না।’ আপনি তো আবার রামপ্রসাদী ধর্মভাবনাকেও বিষয় করতে ছাড়েন নি – শিব রাধা তারা রাম বীজ ঐক্য ভিন্ন নাম, শ্যামা শ্যাম আকারের ভেদ, তুমি শ্যাম তুমি শ্যামা আকার আকারে রামা, একাধারে একাকার লয়। ‘এটা আবার কেমন কথা সাহেব, পাড়ে বসে ভাবছি বলে জলে ডুব দিয়ে দেখব না, পুকুরটা কত গভীর।’ মানুষটার কবিতার মতো কথার ধারও আছে, আরও কত কী যে ভাণ্ডারে আছে কে জানে।
মধ্যাহ্নের তেতে রাখা রাস্তায় পা রাখবার জো আছে! তবুও তো কারা যেন হাঁকাহাঁকি করে, গল্প ফাঁদে নিজের নিজের মতো। কত কী যে ওরা আওড়ায়, অভাব অভিযোগের অন্ত নাই যেন, কে কার কথা শোনে, বলাবলি করলেও কথার পিঠে কথার প্রতিধ্বনি হয়ে একটু আধটু ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে। গুপ্তকবির কত দিকেই না নজর, জীবনের খুঁটিনাটি গিলে নিতে গিয়ে ভুলে যায় আমার সঙ্গ। একাই যেন চলতে শুরু করে উত্তর থেকে দক্ষিণে। মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট থেকে মেছুয়াবাজারের দিকে। হঠাৎ করেই পিছন ঘুরে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘যাবেন নাকি জেলিয়াটোলা? তারপর না হয় ঢুঁ মারবো বড়বাজার। বড় আজব জায়গা। কত যে খোরাক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন।’ রাস্তার দুপাশের লোকগুলো আমাদের হাঁটার গতি দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভাবছে হয়তো এই পাদ্রীর সঙ্গে এই বাঙালি বাবুর এত দোস্তি কীসের! তাকিয়ে দেখি ওরা ফিকফিক করে হাসছে। গুপ্তকবি আমাকে তোয়াক্কা না করে পা চালায়। আমি নিচু হয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে ওনার বাক্যগুলোর অর্থ খোঁজার চেষ্টা করি। কিছুটা হাঁটার পর বললেন, ‘পারলেন পাদ্রী সাহেব কিছু অর্থ উদ্ধার করতে? এত সোজা নয় সাহেব হুগলি নদীতে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, কত রাজ-রাজড়া ছিল, তাঁদের ঘাড় মটকে মোগলরা এসে কাবু করেছে পরে পরে, ওলন্দাজ পূর্তগীজরা কম চুরি জোচ্চুরি তো করেনি, বাঙালিরা সোজা পিঠ টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে আজও। কারণটা বুঝলেন কিছু। এই লোকগুলো মাটি কামড়ে পড়ে আছে, চাষাভুষা, কামার কুমোর তাঁতিদের পা টলাতে পারেনি ওই বেনিয়ারা। এখন এই আপনারা সাদা চামড়ার লোকেরা বুঝুন আমাদের নিয়ে কী খেলাটা খেলবেন।’
কথার সূত্র ধরে কত কথা, শুনে আমি তো থ। এমন কথার উত্তরে কী জবাব দিতে পারি যখন আমরাই স্বয়ং এই দেশে এসে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। তবে মানুষটা যেহেতু ঈশ্বর গুপ্ত, সমীহ তো সকলের কাছে ইতিমধ্যেই আদায় করে নিয়েছেন। তাছাড়া শিষ্য-প্রশিষ্যর সংখ্যা তো নেহাত কম নয়, কে নেই বলুন তো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে দীনবন্ধু মিত্র, হরিমোহন সেন, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, আরও অনেকে। এমন কবির প্রত্যুত্তর দেওয়া সহজ কথা নয়, বিশেষ করে যিনি এমন লাইন লিখতে পারেন – পূজা হোম জপ মন্ত্র নাহি জানি বেদ মন্ত্র, স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র পুঁথি প্রকৃতি পড়ায়, কখনো পড়িনি শ্রুতি পেয়েছি যুগল শ্রুতি, শ্রুতির অধীনে স্মৃতি স্মৃতি কেবা চায়? প্রকৃতির মধ্যে গডের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করা, এমন উপলব্ধি তো পুস্তক থেকে ধার করা হতে পারে না কিছুতেই, হয়তো দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা চেতনার সঙ্গে যোগসাজশ থাকতে পারে, হলেও একেবারেই মৌলিক, বাইবেলের ঈশ্বর চিন্তার সঙ্গে বেমিল হলেও নতুন ভাবনা স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায়। গুপ্তকবি আবারও গটগট করে হাঁটতে আরম্ভ করে। আমিও তাকে অনুসরণ করি। সামনেই তো আর্মেনিয়ান চার্চ, রেলওয়ে জেটি আর আর্মেনিয়ান ঘাটও বেশি দূরে নয়। গঙ্গা নদীর ঢেউয়ের গায়ে গায়ে আলোর রেখাগুলো অবলীলায় কোলাকুলি করছে, কবির চেতনায় খেলা বেড়াচ্ছে নানা রঙ, দৃষ্টিতে এক উদাসী ভাবনায় অক্ষর সাজানো, বাণিজ্য তরণীর মাল ওঠানামায় শ্রমিকদের আনাগোনা আর হাঁড় খাটুনি আমাকেও বিব্রত করে তোলে। এত তো ব্যস্ততা গুপ্তকবির রচনার বাঁধন যেন আঁটি বাঁধে একে একে – নিদারুণ নিদাঘেতে নাহি পরিত্রাণ, জগতের প্রাণ নাশে জগতের প্রাণ, অনিল করিছে বৃষ্টি প্রবল অনল, দে জল দে জল বাবা দে জল দে জল।
কবিকে কাছে পেয়ে কত যে প্রশ্ন উসখুস করে মনের মাঝে আবার সংকোচও হয় কী জানি কী হয়। যে সৃষ্টিকারীকে নিয়ে বাংলার আকাশ বাতাস উত্তাল, যাঁর সৃষ্টির মহিমায় পাঠকরা মহানন্দে ভাসে, তাঁকে যদি বিরূপ কোনো প্রশ্ন করা যায় জবাবটা কেমন হবে এক বুক আশংকা নিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললাম – আচ্ছা বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ নিয়ে আপনার এত অপছন্দ কেন? আপনি তো আবার ব্যঙ্গ করে কবিতাও লিখে ফেলেছেন। ‘ও তাহলে আপনি শুনেছেন?’ না শুনে আর উপায় কী বলুন। মনে তো এখনও গেঁথে আছে – সীমা ছেড়ে নাহি খেলে সাগরের ঢেউ, সাগর যদ্যাপি করে সীমার লঙ্ঘন, তবে বুঝি হতে পারে বিবাহ ঘটন। এমন একটা সাধু উদ্যোগকে আপনি মানতে পারলেন না কেন? ক্ষণেক চুপ করে থেকে কী ভেবে বললেন, ‘এমন অসামাজিক বিষয় নিয়ে আমি কোনো জবাব দেবো না।’ কিন্তু আবার এই আপনিই কৌলিন্য প্রথা নিয়ে ব্যাঙ্গ করতে ছাড়লেন না। কেমন নির্দ্বিধায় লিখলেন – মিছা কেন কুল নিয়া কর আঁটা-আঁটি, এ যে কুল কুল নয় সার মাত্র আঁটি। ‘এতো চটজলদি সমাজটাকে পাল্টানো যাবে না, ধরবে-ছাড়বে প্রক্রিয়াটা জারি রাখতে হবে। কেউ কেউ বলে বেড়ায় আমার পারিবারিক জীবনের শূন্যতায় আমি মেয়েদের সুখ দুঃখের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারি না। আমি যুক্তিবাদী মানুষ, মধ্যযুগীয় ব্রাক্ষণ্যবাদের অসাড়তা আমি পলে পলে টের পাই। সাহেব, খোলনলচে পাল্টে সাফ করতে গিয়ে সবটা তো উপড়ানো যায় না, তাহলে রাতারাতি শিকড় ছিঁড়ে যাবে, সমাজই যদি না থাকবে, মানুষগুলো দাঁড়াবে কোথায়। এটা সত্যি লোকাচারে দেশাচারে জাতি প্রথায় সত্যের প্রকাশ ঘটে না, সত্যের দাস হতে গেলে উপহাসের পাত্র হতে হয়। তাই বলি, যা করবে, রয়ে সয়ে করবে।’ আচ্ছা ধর্ম বিষয়ে আপনার মতামত জানতে পারি কী। ‘ পারেন, আপনাদের বিশ্বাসের রকম সকম মিলাতে যাবেন না, আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে বৈচিত্র্য আছে, এটি আবার মানতে আপনাদের কষ্ট হবে। এই দেখুন না আমি অদ্বৈতবাদ আর ভক্তি বাদে আস্থা রাখি, আবার আমাদেরই কেউ আবার দ্বৈতবাদ নিয়ে মাতামাতি করে, কোনটা রাখবার আর কোনটা ফেলনার সময়ের উপর ছেড়ে দেওয়া ভালো, চাপিয়ে দিলে একদিন ফটাস করে বেলুনের মতো ফেটে যাবে, তখন শ্যামও যাবে, কুলও যাবে।’ সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণি নিয়ে আপনার তো অনেক লেখা আছে ‘আছে বই কি। গ্ৰাম বাংলার সামাজিক অবস্থা নিয়ে আমি লিখেছিলাম – এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তথাপি এত রঙ্গ ভরা। কত কথাই আজকাল ভাবিয়ে তোলে। এই যা কিছু ঘটনার আমরা সাক্ষী হচ্ছি, সব কিছু কালের অধীন, এই ধরাধামে ছেড়ে একদিন আমাদের চলে যেতে হবে, আমরা ক্রমশ মরণের দিনের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। যাবার বেলায় কোনো এক ভোরের আলোয় কিংবা গোধুলীর আলোছায়ায় ফুরুত করে প্রাণবায়ু নিঃশেষিত হলে এই দুনিয়ার সকল মানুষ যেমনি হাঁটার তেমনি হাঁটবে, যেমনি মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে থাকে, তেমনিই থাকবে, উল্লাসে ফেটে পড়বে, কান্নায় ভেঙে পড়বে, বিষাদে মগ্ন হয়েও আগামীর স্বপ্ন দেখবে, সেদিন এই গুপ্ত কবি ছাই হয়ে যাবে।’ কবির চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে দেখে আমার ভাবনায় আসলো না জন্ম মৃত্যুর কোন্ হিসেব আমি ওঁর সামনে তুলে ধরবো, বাইবেল না গীতা না কোরান, সব কল্পনা এই কবির কথনে গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হচ্ছে মানুষটা চিরকেলে আধুনিক আবার মনে হয় অতীতের সকল দূর্গন্ধ গায়ে মেখে বসে আছে, তাই যদি না হবে কেমন করে লেখেন – আগে মেয়েগুলো ছিল ভালো ব্রতধর্ম কর্তো সবে, একা বেথুন এসে শেষ করেছে আর কি তাদের তেমন পাবে। যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে, তখন এবি শিখে বিবি সেজে বিলিতী বোল কবেই কবে। আবার এই তিনিই লেখেন – মাগীদের নাহি আর তিন রাত্রি ঘুম, গড়াগড়ি ছড়াছড়ি রন্ধনের ধুম। এ কেমন দ্বিচারিতা! তবুও এই যুগে সন্ধিক্ষণে মানুষটাকে অস্বীকার করবো আমার এমন বুকের পাটা আছে? জানি না আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছেন কিনা, বললেন ‘ ধন্দে পড়ে গেছেন সাহেব, এমনটাই হয়, কালা পানি পার করে এসে কি এই দেশের মানুষের নাড়ির টান বুঝা যায়! আরও গভীরে যেতে হবে, সত্যি সত্যি যদি এই দেশের আত্মীয় হতে চান।’
কথাটা যে মন্দ বলেন নি এইবার ওনার হাঁটার মন্থর গতি দিকে চেয়ে বোঝা যায়। ডালহৌসি স্কোয়ার এলাকায় লালদীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে বড়লাট ভবনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘ওই বাড়িতে বসে বসে দেশ শাসন করা যায়, মানুষ শাসন করা যায় না।’। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
