তাপস সরকার
লেখক পরিচিতি
( সৃজনশীল সাহিত্য কর্মে নিয়োজিত কিশোর বয়স থেকেই। প্রথম পঠিত গ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত ও গীতা। গদ্যসাহিত্য ও উপন্যাসেই সাবলীল। যদিও শতাধিক গল্প ও দশ-বারোটি উপন্যাসের রচয়িতা কিন্তু সেসব হারিয়ে গেছে অপ্রীতিকর কারণে। প্রিয় বিষয় মহাকাশবিদ্যা। কল্পবিজ্ঞান ও কিশোর সাহিত্য প্রিয় লেখা।কিছু গল্প নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। উন্মীলন নামে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের গল্প ও দুটি উপন্যাস ছাপা হলেও সেই উদ্যোগ থেমে যায়।প্রতিভাস সাহিত্য ম্যাগাজিন চলছে পনের বছর যা মায়ের নামে। সেখানে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত লেখা স্মৃতিচিত্রণ ও বেশ কিছু ছোটগল্প। নব্বইয়ের দশকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে কিছুদিন লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলায় জেলায় সাহিত্য আসরে ঘোরাঘুরি। বিশ্বকে নিজের ঘর বলে ভাবতে অভ্যস্ত। মায়ের মৃত্যুর পর অবসাদে দীর্ঘদিন লেখায় বিরত। তারপর আবার লেখা শুরু কিশোর সাহিত্য ‘গাছবাড়ির বাসিন্দা ‘ দিয়ে। পেশায় অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক। )
অধ্যায় : উনিশ
বিচিত্র আর বহুবর্ণ যেসমস্ত মানবকুলের দর্শন মেলে ছাদে উঠলে তাদের অবস্থান কিন্তু যেমন মনে করা হয় তেমন নয় একেবারেই। তারা সবাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে উল্টেপাল্টে রয়েছে। এরকম ওলটপালট হয়ে থাকা স্বাভাবিক নজরে চোখে পড়বে না কারও। ব্যাপারটা যদি সবাই ভাবে আজগুবি আর মনে করে আমি আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসেছি তো তাদের বিশ্বাস জন্মাতে একটা সরল প্রাকৃতিক সত্যের দৃষ্টান্ত রাখছি। মানুষ ও জীবকুল তো চোখে দেখি সোজাভাবে মাথা ওপরে পদযুগল নিচে রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু নিশাকালে মানুষ ও অপরাপর প্রাণিরা যে ঊর্ধ্বপদ হয়ে মাথা নিচের দিকে রেখে অবস্থান করে তা কি কেউ বোঝে? এমনই ব্যাপার অনেকটা। এই তো গেল নিতান্ত প্রাকৃতিক নিয়মাধীন উল্টোভাবে অবস্থানের গল্প।
ছাদে উঠলে যাদের দেখি উল্টেপাল্টে রয়েছে তাদের থাকাটা আরও বিচিত্র। তারা কতভাবে উল্টেপাল্টে থাকে তা দেখলেই বোঝা যাবে, বলে বোঝানো রীতিমতো অসম্ভব। তাদের হাত,পা, মাথা এবং দেহের নানাবিধ ইন্দ্রিয়গুলিরও অবস্থান সুস্থির নয়, এমনকি তাদের চুল-নখ ইত্যাকার বস্তুসমূহও রয়েছে উল্টোপাল্টা জায়গায়, যেসব স্থানে থাকার কোন যুক্তি বা কারণ নেই। এই যে বিচিত্র সমস্ত মানুষের দল তারা নিজেরা নিজেদের কী অস্বাভাবিকতা তা টের পায়না। সবাই ভাবে, আমি ঠিকঠাক চলছি, ঠিকঠাক বলছি, ঠিকঠাক কাজ করছি। আপাতদৃষ্টিতে সবাই দেখে, তাদের হাতের জায়গায় হাত আছে, পায়ের জায়গায় পা, মুখের জায়গায় মুখ ইত্যাদি কিন্তু সব যে গন্ডগোল হয়ে রয়েছে বোঝার ক্ষমতা কারও নেই। আমি বুঝিনা, ঘুম থেকে উঠে সারাদিন যেসব কাজকর্ম করে গেলাম সেসব আমার দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও আমাকে যে ছাদ থেকে দেখছে তার চোখে সবই অযৌক্তিক এবং আশ্চর্যজনক অস্বাভাবিক। এই যে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এত বিরোধ ও মতান্তর তার পশ্চাতে মূল রহস্য এটাই। হয়তো প্রত্যেকেই দিল্লি যেতে চায়, কেউ ভাবে ট্রেনে যাওয়া বিধেয়, কেউ মনে করে প্লেনে চেপে যাওয়া উচিত, কেউ আবার পায়ে হেঁটে যেতে চায়। নানা মুনির নানা মত, প্রত্যেক মুনিই ভাবে তার পদ্ধতি শ্রেয় এবং অন্য মুনিদের পন্থা অযৌক্তিক ও বর্জনীয়। অন্যদিকে কেউ আবার দিল্লি যেতে চায় পাটনা হয়ে, কেউ ভাবে মুম্বাই হয়ে গেলেই ভালো, কেউ মনে করে চেন্নাই হয়ে যাওয়াটা আরো উত্তেজক। এখানেও আবার নানা মুনির নানা মত, দৃষ্টিকোণ সম্পূর্ণ আলাদা। এভাবে প্রত্যেকে ভাবে, একমাত্র নিজে সে সঠিক আর অন্যরা সবাই ভুল, অন্যদের কাজকর্ম অযৌক্তিক ও বেমানান। নিজেকে নিজের চোখে অস্বাভাবিক পাগলেও ভাবে না। এটা মানুষের অন্তর্গত স্বভাব, এর সঙ্গে ছাদে ওঠার পর যে দর্শন তার অনেকটাই অমিল রয়েছে। নিজেকে ছাড়া অন্যকে বেঠিক দেখার যে অভ্যেস তার মানে এই নয় যে সবাই ছাদে উঠে আছে আর সেখান থেকে অন্যদের দেখে তাদের অযৌক্তিক মনে করছে। এই যে নিজেকে ছাড়া অন্যকে অস্বাভাবিক ভাবা এটা নিছক মনে হওয়া, আর ছাদে উঠলে অন্যদের অস্বাভাবিকতা সত্যি সত্যি চোখে দেখা যায়। একই সঙ্গে ছাদে উঠলে নিজের মধ্যে কী অস্বাভাবিকতা রয়েছে তারও হদিশ মেলে। এমনিতে কেউ কি মনে করে নিজে সে ভুল বা অযৌক্তিক? ছাদে উঠলেই স্পষ্ট বুঝতে পারব আমি এবং অন্যরা যেসব কাজে ব্যস্ত সেগুলি সবই অনর্থক ও সামঞ্জস্যহীন। সবাই এবং আমি যাসব কথা বলছি সবই অসংলগ্ন প্রলাপ, যেভাবে চলছি সবাই তাও ছিরিছাঁদহীন—- এভাবে স্বাভাবিক মানুষ চলে না বা কথা বলে না। ছাদে উঠলে নিজের ও অন্যদের এসব অস্বাভাবিকতা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। বোঝা যায় আমরা সবাই কিভাবে কতটা অস্বাভাবিক হয়ে আছি এবং দেখতে মানুষের মত হলেও কেউ আমরা ঠিকঠাক মানুষ নই। আমরা প্রত্যেকেই ওলটপালট মানুষ, স্বভাবে ও চরিত্রে, দর্শনে বা চলনে, কথায় এবং কাজে। ছাদে উঠলে তবে এসব মালুম হয়, অদেখা কোন চশমা চেপে বসে প্রত্যেকের চোখে যার মাধ্যমে নজরে আসে জগতের যত অদ্ভুত এবং অত্যাশ্চর্য ব্যাপার-স্যাপার। দেখা যাবে তখন আমরা কেউ উল্টো হেঁটে যাচ্ছি, কেউ বা হাঁটছে উর্ধ্বপদ হেঁট মুন্ড হয়ে, কেউ হাঁটছে সরীসৃপসদৃশ্য উপায়ে বুক ঘষে ঘষে। ছাদে উঠলে ঠাহর হয় মানবকুলের এই সমস্ত অদ্ভুতুড়ে রহস্যসমূহ। রাস্তায় আমরা সবাই স্বাভাবিক। ঘরেও কারোর মধ্যে কোন বিকার বা বিকৃতি লক্ষ করা যায় না। সকলেই খাচ্ছে-দাচ্ছে, বেড়াচ্ছে, খেলছে, ঘুমোচ্ছে, হাঁটছে, কাজে-কর্মে ব্যস্ত, কথা বলছে, ঝগড়া-মারামারি করছে—- সমস্ত কিছুই মানুষের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ বুঝতে পারে না এসবের কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা। বোঝা যায় ছাদে গেলে। ছাদে উঠলে দেখা যায়, বিশ্বসংসার অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক। মানুষরা সব বিকারগ্রস্ত, বিকটাকৃতি এবং কিম্ভুত কিমাকার। সকলেই চেনা-অচেনা নানা জাতীয় অসুখে বেসামাল।
মা আমাকে কুরজাখানার কেচ্ছা শুনিয়েছিল। সেটা কি কোন স্থান নাকি অবস্থা তা তখন প্রতীয়মান হয়নি। গল্পের টান ছিল এমনই যে শুনে গেছি মোহিত হয়ে। কিছু আর জিজ্ঞেস করা হয়নি বা জিজ্ঞেস করতে চাইনি এই ভেবে যে আমি কথা বলতে গেলে যদি ব্যাঘাত ঘটে। এখন তো নানা প্রশ্ন মনে। উত্তর কোথায়? কারণ মা আমার চলে গেছে অনেকদিন। রয়ে গেছে সেই অত্যাশ্চর্য আখ্যানের স্মৃতি আর অবিস্মরণীয় রেশ। কুরজাখানায় সকল বস্তুই টালমাটাল, সকলই অস্থির, শান্তিতে থাকে না কোন কিছুই একদণ্ড। কেউ এখন ওপরে তো তখন নিচে, পরক্ষণেই আবার তার গড়াগড়ি খাওয়ার মত পরিস্থিতি। কেউ যদি কুরজাখানায় পাকেচক্রে চলে যায় তো সে দেখতে পাবে ধরাধামে সুস্থিরতা শব্দটি সর্বতোভাবে অর্থহীন। সে এক এমন প্রদেশ বা ঘটনাপ্রবাহ যে তার অন্তর্গত সমস্ত উপাদান অলীক বলে ধারণা করা যেতে পারে। মজার কথা এই যে কেউ তারা অদৃশ্য নয় এবং চোখের সামনেই ঘোরাঘুরি করে। সেখানে আকাশ-পাতাল কোন কিছুরই হদিশ নেই। আকাশ থাকলে আছে, না থাকলেও কারো কিছু যায়-আসে না। ওপরদিকে তাকালে যেমন আকাশ দেখা যাবে, সেখানে কিন্তু তেমনটা নাও হতে পারে। হয়তো বা আকাশ পৃথিবীর পৃষ্ঠতল আর সমস্ত চলমান বিষয়সমূহের বিচরণক্ষেত্র। পাতালের অবস্থান মনে হয় কোনও এক অতল গহ্বরে। কিন্তু সেটাই যে হবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? পাতাল বলতে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী জানি, ভূপৃষ্ঠের কোন সুগভীর অভ্যন্তরে অন্ধকার এক প্রদেশ। কুরজাখানায় তেমন হতেই হবে কেউ তা কল্পনাও করে না। পাতাল যদিবা থেকেও থাকে তার চিত্র পরিষ্কার নয় কারও কাছে। আকাশেরও তদ্রূপ অবস্থা। ওই আকাশে আকাশটাই অনুপস্থিত। কুরজাখানায় কেউ জানে না আকাশ ও পাতালের মধ্যে কোথায় প্রভেদ বা কোথায় মিল। যদি বা আকাশ থেকেও থাকে কেউ তাকে পায় না, কারণ সেখানে না আছে নীল রং, না কোন সূর্য, না মেঘ, না নিশীথের চন্দ্র অথবা তারকারাজি। কী আছে এমন প্রশ্ন অবান্তর, প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়াও মুশকিল। কেউ হয়ত বানিয়ে দিল একটা আকাশ তো মেনে নিতে হবে সেটাই আকাশ। কী, কেন ইত্যাদি প্রশ্ন অযৌক্তিক মেনে নেওয়াটাই ধর্ম। এবং সমতুল্য দশা পাতালেরও, কেবল ধারণাতেই বসবাস।
সেই আজব দুনিয়ার বাসিন্দারা সবাই উল্টেপাল্টে থাকে। কেন, তার কোন জবাব নেই। সবই তালগোল পাকানো ব্যাপার। উল্টেপাল্টে থাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা দুষ্কর। হয়তো তাদের পিঠের দিকটা দেখা যাবে, বুক বলে কোন বস্তু নেই। মা বিষয়টা বিশদে বিশ্লেষণ করেনি। কেবল বলেছিল,
‘কুরজাখানায় যারা থাকে তাদের সাদাসিধে, সোজাসুজি কোন ব্যাপার নেই। তাদের সবকিছু উল্টোপাল্টা, তারা সবাই উল্টেপাল্টে থাকতেই পছন্দ করে। সোজাসুজি থাকতে গেলে ক্রমান্বয়ে হেঁচকি ওঠে তাদের। যদি উল্টেপাল্টে থাকে সব আচরণ তখন স্বাভাবিক হয়ে যায়। নিজেরা তারা উল্টেপাল্টে থাকতে যেমন পছন্দ করে, তাদের তেমনভাবে দেখতেই অভ্যস্ত সবাই। তারা কেউ উল্টেপাল্টে নেই দেখলেই বিষম খেতে হয়।’
আমি গল্পের টানে এমনই মোহিত হয়ে ছিলাম যে কোন প্রশ্ন করতে চাইনি। এখানে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, উল্টেপাল্টে থাকাটা কেমন হয়। করিনি, পরে জেনে নিতেও ভুলে গেছি। মা আরও বলেছিল,
‘বাসিন্দারা উল্টেপাল্টে থাকে, সমতলে বা অসমতলে অথবা বিষমতলে। খুঁটিয়ে দেখতে গেলেই তোমাকে খাবি খেতে হবে, কারণ তলাতল খুঁজে বার করাটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার। তালগোল পাকানো অবস্থায় রয়েছে সব সেখানে। এমনই গোল পাকানো সব কিছু যে আগামাথা পাওয়া যাবে না, কোন্ বস্তু দেখছ বুঝতেও পারবে না।’
বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না এমনই সব ঘনীভূত রহস্যসমৃদ্ধ ঘটনাবলী ও কার্যকলাপের খানাখন্দে ছাওয়া কুরজাখানার প্রকৃতি ও পরিবেশ। এখানে একটি অবস্থা আছে যার অধীনস্থ হলে ইচ্ছে জাগে ফুলতে থাকি। কেউ সে অবস্থাপ্রাপ্ত হলে সে ফুলেই যাবে ফুলেই যাবে, ফাটবে না কখনও, ফুলতে ফুলতে লুচি হবে বেলুন হবে ঢোল হবে আরও যে কী কী হতে পারে কল্পনা করাও কঠিন। তবে আশ্বস্ত হওয়ার ব্যাপার হল এই যে বিরামহীন ফোলা অনাদিকাল ধরে চলে না। ফুলন্ত বস্তুটি ফুলে ফুলে একসময় কোথায় মিলিয়ে যায় সে যেমন বোঝে না যারা দেখে তারাও কূলকিনারা পায় না। আবার কোন পরিস্থিতি কাউকে বাধ্য করে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে। সে এক বর্ণনাতীত ব্যাপার। মনে করা যাক, কোন এক ব্যক্তি দৈর্ঘ্যে বাড়তে লাগল, তার প্রস্থ যেমন ছিল তেমন রেখে, আর লম্বা হতে হতে সে এতটাই নাগালের বাইরে চলে গেল যে তার মুখ-মাথা কিছুই আর দেখা সম্ভব হবে না। কেন যে লোকটা লম্বা হতে লাগল তার কারণ সে নিজেও জানবে না, অন্য কেউও বুঝতে পারবে না। সবাই বলবে, এভাবে লম্বা হতে থাকা একটা অসুখ। সেটাতে কোন সন্দেহ নেই যদিও লম্বা হওয়ার কত যে প্রকারভেদ রয়েছে তার ধারণা খুব কম লোকেরই আছে। কিছু ব্যক্তি আছে, আবার তাদের কিছু বিষয় আছে যা নিঃশব্দে চোখের আড়ালে দীর্ঘতর হয়ে যেতেই থাকে যেতেই থাকে। কিছু লোকের জিভ লম্বা হয়ে যায়, যার হয় সে এবং যারা দেখে তারা কেউই টের পায় না, অথচ জিভটি লম্বা হতে হতে হতে এতটাই বড় হয়ে যায় যে তার নাগালে জগতের সমস্ত বস্তুর আস্বাদ পাওয়া অতীব সহজসাধ্য ব্যাপার হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তির খিদে লম্বা হয়ে যায়, তারও আবার রকমফের রয়েছে, আর সেই বেড়ে যেতে থাকা খিদের গ্রাস থেকে কোন বস্তু রেহাই পায় না। খিদের রকমফের বস্তুভিত্তিক হতে পারে আবার তা গুণবাচকও হয়ে থাকে। খিদেকে আবার অন্যরূপেও ভাবা যায়—- কেউ বলে যাকে লোভ, কেউবা উচ্চাকাঙ্ক্ষা। যাই হোক না কেন, দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পেতে পেতে যে বস্তু নাগালের বাইরে চলে যায় তাকেই খুঁজে পাওয়া যাবে কুরজাখানাতে এবং সে বস্তু ওলটপালট অবস্থায় থাকবে।
এই যে উল্টেপাল্টে থাকা বাসিন্দারা, তারা কত প্রকারে উল্টেপাল্টে যেতে পারে তার আন্দাজ পায়না বিশেষজ্ঞরাও। কোন এক রহস্যাবৃত অঞ্চলে ভাঁজ খেতে থাকে ব্যক্তিবর্গ। তার কপালে ভাঁজ, আচরণে ভাঁজ, ভাঁজ পরিলক্ষিত হয় সর্বাঙ্গে ও মানসিক গঠনে। ভাঁজ খেতে খেতে তালগোল পাকিয়ে যায়, কী বস্তু সে বুঝতে পারে না কেউ। ভাঁজ একদা পরিণত হয় মনোবিকারে। এমনই সব ওলট পালট খাওয়া বিষয়সমূহ নিয়ে গঠিত হয়েছে কুরজাখানার পরিবেশ। হঠাৎ কেউ এসে দেখলে মনে হবে, এ আবার কোন্ ভুতুড়ে জগত! থাকতে থাকতে অথবা দেখতে দেখতে অভ্যেস হয়ে গেলে একদা কেটে যাবে যাবতীয় বিস্ময়ের ঘোর। তখন মনে হবে, এখানে থাকতে বা একে দেখতেই আমি অভ্যস্ত। আসলে কোন অচেনা বিষয় নিয়ে দিনের পর দিন চর্চা হলে তা আর অচেনা থাকে না, মনে হয় সে খুবই পরিচিত। ব্যাপারটা একেবারেই সেইরকম। যতই অদ্ভুত হোক কুরজাখানার হাল-হকিকৎ, যে তাকে একনাগাড়ে দেখছে বা তার সম্পর্কে অবিরল শুনছে তার আর তাকে অস্বাভাবিক মনে হবে না।
বাসিন্দারা সবাই দেখতে মানুষেরই মত, বা বলা যায় যে মানুষরা দেখতে যেমন ওই বাসিন্দারাও ঠিক তেমনই। এক দেহকাণ্ডের উর্ধাংশে মাথা, তাতে রয়েছে চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ও মুখমন্ডলের অন্তর্গত ইন্দ্রিয়সমূহ। দেখে কে বলবে এই মুখ-মাথা মানুষের নয়? তারপরেই রয়েছে দু’ধারে দু’টি কাঁধ ও দু’-দু’টি হাত। দেহকাণ্ডের ওপরাংশ বুক এবং নিম্নাংশ পেট। কোমরের তলা থেকে নেমে এসেছে দু’টি পা। সবমিলিয়ে দর্শনে সে একেবারেই মানুষ, কোন বিভেদ বা প্রভেদ নজরে আসবে না কারও। বহিরঙ্গের এই খোলসটার ভিতরে রয়েছে যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেগুলিও অবিকল মানুষেরই মত এবং তাদের দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষায় দেখা যাবে তাও মানুষেরই রক্ত। অর্থাৎ যে কথা আমি বলার জন্য এত চেষ্টা চালাচ্ছি তা হল, মানুষের সঙ্গে এখানকার বাসিন্দাদের দেহে ও চেহারায় কোন অমিল নেই। তারপর বিচার করে দেখতে হয় তাদের আচার-আচরণ ও কাজকর্ম। আমি জিজ্ঞেস করিনি, কিন্তু মা আমাকে সব বলে গেছে। বাসিন্দারা সবাই রাতে ঘুমোয় আর দিনে জেগে থেকে বিচরণ করে, খাওয়া-দাওয়া বা আমোদপ্রমোদ ইত্যাদি করে যেভাবে মানুষেরা করে থাকে। তারাও অফিসে-আদালতে যায়, স্কুল-কলেজে পড়াশোনায় ব্যস্ত থেকে কাটায়। তাদেরও রয়েছে বাজারহাট, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য। তাদের দেশে গেলে দেখা যাবে তারা বড় বড় প্রাসাদ, অট্টালিকা, সড়কপথ, রেলপথ, বন্দর বা বিমানবন্দর, সেতু ইত্যাদি বানিয়ে নিয়েছে জীবনধারণের জন্য। এতসব দেখে কেউ ধারণাও করতে পারবে না কেন তারা মানুষ নয়। কিন্তু বাসিন্দারা সবাই উল্টেপাল্টে থাকে। দেখলে বোঝা যাবে না, তবে দেখতে দেখতে টের পাওয়া যাবে তাদের অস্বাভাবিকতা। গভীর পর্যবেক্ষণ একসময় বুঝিয়ে দেবে, এদের কার্যকলাপ স্বাভাবিক নয়, সবাই অস্বাভাবিক উপায়ে জীবনধারণ করছে। তাদের খাওয়া-ঘুম-চলাচল বা কথা বলা কিছুই সরল-সাদাসিধে নয়, সবই বিকৃত ও উন্মাদসুলভ। অন্তত আর যাই হোক, তারা মানুষ নয়।
মায়ের কাছে বিবরণ শোনার পর বেশ কিছুদিন পড়েছিলাম আমি কুরজাখানাকে নিয়ে। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, ব্যাপারটা অবশ্যই আছে, কোথাও না কোথাও। মাও এমনটাই বলেছিল। মায়ের সেই আত্মপ্রত্যয়ভরা কথাগুলি এখনও কানে বাজে,
‘আছে বাবা, আছে। লুকিয়ে নেই, চোখের সামনেই। দেখেও দেখতে পাস না, চিনেও চিনতে পারিস না। এমনটা হয় মানুষের। অনেকটা বোবায় ধরার মত অবস্থা। রাতে ঘুমের ঘোরে বোবায় পায়না মানুষকে? তেমনই কাণ্ড।’
আমি ঠিক করেছিলাম, কুরজাখানাকে আবিষ্কার করতেই হবে। অনুসন্ধানে ক্ষান্তি না দিয়ে সন্ধান চালিয়ে গেলে কত দিন সে লুকিয়ে থাকবে? সেই থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছিলাম। একা নয়, একদল বন্ধুও জুটিয়েছিলাম। তারা কেউ আমার সহপাঠী, কেউবা ছেলেবেলার সঙ্গী। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম জেনে যে আমার বন্ধুরাও সবাই কুরজাখানা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। কোন না কোন সূত্র থেকে জানতে পেরেছিল সবাই। অতএব আমার মত তাদেরও কিছু কম আগ্রহ ছিল না খোঁজাখুঁজিতে। ছোটবেলার রঙিন দিনগুলিতে আমরা হৈচৈ করে খুঁজতাম। পাহাড়-পর্বত, মাঠঘাট, বন-জঙ্গল, বাজার বা লোকালয়, এমনকি নদী-নালা, খাল-বিল, থানাখন্দ কিছুই বাদ রাখিনি। খুঁজতে খুঁজতে বাল্যকাল কেটে কৈশোর অতিক্রান্ত হল, একদা যৌবনকালও পেরিয়ে গেলাম। ইতিমধ্যে সঙ্গীসাথিরা পাল্টে পাল্টে গেছে। পুরনো বন্ধুরা সব উধাও হয়েছে এবং নতুন বন্ধুদের সঙ্গলাভ করেছি। সবার মধ্যেই দেখেছি সেই অত্যদ্ভুত কুরজাখানাকে খুঁজে পাওয়ার উৎসাহ। কিন্তু সন্ধান মেলেনি তার আজ পর্যন্ত। জীবনের অর্ধেক সময় পার হয়ে এসেছি এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং একসময় কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। সহকর্মী হল যারা যদিও তারা কেউ বিগত দিনের বন্ধুদের মত নয় তবুও তারা আমার সঙ্গী হয়েছিল খোঁজাখুঁজির। কাউকে পাইনি যে ওই আজব দুনিয়ার বার্তা জানে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে জগৎটাকে দেখতে পাইনি কোথাও। চোখের সামনে যদি থাকে এত খুঁজেও কেন তার নাগাল পেলাম না?
এক সময় ভেবেছিলাম, নিজেরা যখন সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়েছি গোয়েন্দা-টোয়েন্দা নিয়োগ করলে কেমন হয়, কিংবা পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে একটা মিসিং ডায়েরি লেখালে? সাত-পাঁচ ভেবে সেই সমুদয় উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বর্জন করেছিলাম। এই অনুসন্ধান পর্বে কখনও একেবারে একা হয়ে গেছি, সঙ্গী-সাথিরা অন্যত্র চলে গেছে বা হারিয়ে গেছে বহুবার, আবার নতুন সঙ্গ পেয়েছি। তবে একা হয়েও খোঁজাখুঁজি থামিয়ে দিইনি কোন সময়। হতাশাতেও আক্রান্ত হয়েছি বহুবার এবং বিরক্তি থেকে এই খোঁজাখুঁজি থামিয়ে দিয়েছি অনেকবার। তবে একেবারেই ছেড়ে দিতে পারিনি। কিছুদিন সরে থাকার পর আবার উৎসাহ ফিরে পেয়েছি, আবার অনুসন্ধান শুরু করেছি। মনে একটা জেদ চেপে আছে।
রিক্ত আমার বাল্যকালের বন্ধু। সে একসময় জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। বহুকাল তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। মনে আছে, যাদের নিয়ে বাল্যকালে কুরজাখানার সন্ধানে মত্ত ছিলাম সেই দলে রিক্তও ছিল একসময়। সে বেপাত্তা হওয়ার পর অন্য সঙ্গীরা জীবনে এসেছিল। আজ অনেকদিন পর আবার রিক্তকে ফিরে পেয়েছি। এবার দেখছি সে আর আগের মত নেই, আগের তুলনায় অনেক প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ। সুদীর্ঘ জীবনপথ পরিক্রমা তাকে এতটাই ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করেছে যে তাকে দেখে আমি রীতিমত হতবাক। সে আমাকে অনেক অজানা তথ্য ও রহস্যের সন্ধান দিয়েছে। এখন কি আমার জীবনসায়াহ্ন? যা খুশি হোক, রিক্তকে ফিরে পাওয়া আমার অন্ধত্ব ঘুচিয়ে দিতে পেরেছে। কল্পনা হোক বা সত্যি, আমাকে সে ঠিক মানুষ সম্পর্কে সচেতন করেছে। তার কল্যাণে আমি দেখেছি নানাবর্ণ মানুষের নানাবিধ রূপ, নানা জাতীয় অসুখ-বিসুখ। রিক্ত আমাকে দেখিয়েছে আমরা বেঁচে থাকি কিভাবে, কোন্ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ দিনের পর দিন জীবনপথ পরিক্রমা করে আসছে। আমার মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন দেখার চোখ পেয়েছি তারই সযত্ন সাহচর্যে।
জীবনের এই লগ্নে রিক্তকে আবার ফিরে পেয়ে আমি এমনিতেই বিহ্বল ছিলাম, উপরন্তু মানুষ দেখার অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যখন সে পরিচয় করিয়ে দিল তখন অন্য সব কথা ভুলেই গেলাম। এমন যে মানবসভ্যতার সদস্যদের চেহারা কল্পনাই করতে পারিনি কোনদিন। মানুষের জীবন অতিবাহিত করার প্রকৃত অথচ অভাবনীয় প্রক্রিয়া দেখে তাক লেগে গিয়েছিল, তারপর দেখলাম যে আমারও জীবন-যাপন যেমন জানতাম মোটেও তেমন নয় এবং আমিও বিকট সমস্ত অসুখের শিকার। এ সমস্ত অজ্ঞাত তথ্য জানার পর এতটাই ধাক্কা খেয়েছিলাম যে কুরজাখানার কথা বারেকের জন্যও মনে উদয় হয়নি, সমস্ত কিছু সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। ক্রমে ঘোর কাটলে একে একে স্মরণে আসতে লাগল অন্যসমস্ত প্রসঙ্গ। কে আমি, কেন আমি বা কোথায় আমি সেসব ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হয়ে এল আর আমার বেয়াকুব হয়ে যাওয়া অবস্থাটা কেটে গেল। তখন আমি একদিন রিক্তকে স্মরণ করালাম,
‘তোর কি মনে পড়ে ছোটবেলায় আমরা কুরজাখানা নামে এক অদ্ভুতলোকের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতাম?’
রিক্ত কিছুমাত্র চমকে না গিয়ে বলল,
‘মনে পড়বে কী রে? আদ্যোপান্ত সমস্তকিছু সর্বক্ষণ আমার মাথায় আছে।’
কথা শুনে আমি উল্টে অবাক হলাম। সেটা দমন করে জিজ্ঞেস করলাম,
‘সেই অদ্ভুতুড়ে স্থানটা কোথায় তা কি জানতে পেরেছিস?’
‘তা কি জানার কিছু বাকি আছে? কেন, তুই কি এখনও তার সন্ধান পাস নি?’
চমকের পর চমক, আমার অবাক হওয়া আর ফুরোয় না। বিস্মিত গলায় আবার প্রশ্ন করলাম,
‘তুই মনে হচ্ছে সন্ধান পেয়েছিস? আমি তো এখনও কোন হদিশ পেলাম না।’
রিক্ত বিরক্ত না হয়ে আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করল,
‘হদিশ পেতে কোথাও যেতে হবে না। এটা তো তখনই জানতিস যে সেই স্থান চোখের সামনেই আছে। প্রকৃতপক্ষে সেটাই। এই যে তুই মানুষকে দেখার নতুন চোখ আয়ত্ত করলি, তবুও কি ধরতে পারছিস না কুরজাখানা কী?’
আমি বোকার মত চেয়ে থাকলাম। রিক্ত যোগ করল,
‘তুই তো এতদিনে দেখলি, জগতের মানুষ কিভাবে জীবনধারণ করে। জানতে পেরেছিস কেউ স্বাভাবিক নয়, সবাই একাধিক অসুখে আক্রান্ত। তুই কি তবুও কিছু বুঝতে পারিস নি? বাসিন্দারা সবাই উল্টেপাল্টে থাকে, এই তথ্যের ব্যাখ্যা কি এখনো তোর কাছে পরিষ্কার হল না? এখনও কি তোর মনে হচ্ছে কুরজাখানা অধরা স্বর্গে বা অগম্য নরকে অথবা সহস্র আলোকবর্ষ দূরে কোন এক অজানা নক্ষত্রলোকে চোখের আড়াল হয়ে আছে? ভেবে দ্যাখ্, একটু অন্যভাবে ভাবার চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবি যে মোটেই লুকোনো নয় ওই জগতটা।’
এবং রিক্তর কথাগুলি শুনতে শুনতেই হঠাৎ নিজের অন্তরলোকে অদ্ভুত অথবা অপার্থিব কোন আলোর ঝাপটা দেখতে পেলাম। সেই জ্যোতিঃপুঞ্জ এমনই অলৌকিক যে তার আগমনে মনের সমস্ত অন্ধকার কেটে গেল আর আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে কুরজাখানা কী এবং কোথায় রয়েছে। এই আবিষ্কার আমাকে স্তম্ভিত করে দিল।
এতদিনে বুঝলাম কেন মা বলেছিল ওই আজব দুনিয়া চোখের সামনেই আড়াল হয়ে আছে। এতদিন তাকে দেখতে পাইনি এই কারণে যে আমি নিজেই সেই কুরজাখানার বাসিন্দা। প্রতিভাস ম্যাগাজিন| Prativas magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
