তপোপ্রিয়

মিল অমিলের খেলা 

সন্ধেবেলায় কিছু একটা কাজে আচ্ছন্ন ছিলাম। আমার কানে এসে বাজল মিহি গলার এক সুর। গানের কথাগুলি বোঝার জন্য মনোযোগ এনে শুনতে পেলাম,

‘ও সন্ধ্যা এসো তাতাড়ি। বেলা হতে চলল ও-ও-ও। বেলা হতে লাগলো…..’

গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজছিল। কান পেতে শুনি হারমোনিয়ামে নিখুঁতভাবে উচ্চারিত হচ্ছে কন্ঠের সুর।

আর বসে থাকা গেল না। উঠে এসে দাঁড়ালাম দরজার বাইরে। গান ভেসে আসছে মায়ের ঘর থেকে। ওই ঘরে গেলে মাকে এখন খুঁজে পাই দেয়ালের ছবিতে আর অনুভূতিতে। ঘরে মায়ের বিছানা, সোফা-টেবিল যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। এখন সেখানে বাড়তি ঠাঁই পেয়েছে মায়ের ঠাকুরের আসন। আর ওই ঘরে মায়ের বিছানা থাকে ছোট্ট প্রীতন্বিতার দখলে। সে ওখানে ওর স্কুল করে, গান গায়।

দূর থেকে দেখি মায়ের বিছানায় বসে প্রীতন্বিতা একমনে গান গাইছে। ছোট ছোট হাতে হারমোনিয়াম আগলাতে প্রাণান্ত। গানের যে সুরটা তার গলায় সেটাই যেভাবে হোক সে হারমোনিয়ামে তুলে নিয়েছে। একটু অবাক লাগল। তার যে প্রশিক্ষক তাকে গান শেখায় সে কেবল প্রাথমিক রেওয়াজ করানো আরম্ভ করেছে। এমন হালকা গান কবে শেখালো ?

ওর মা-ও হাজির হয়েছিল। তার চোখেও আমার মতই বিস্ময় মেয়ের গান শুনে। আমাদের দেখে গান থামালো সে। কে শিখিয়েছে এই গান ? প্রশ্নের উত্তরে মেয়ে জানালো,

‘আমি নিজেই শিখেছি।’

আরেকটু জিজ্ঞেস করে বোঝা গেল আজই তার মাথায় এসেছে গানের কথা ও সুর, আর এখন বসে বসে চেষ্টা করে নিজেই সব তুলেছে হারমোনিয়ামে।

‘গানটা লিখে রাখো তোমার ডায়েরিতে। পরে ভুলে যাব।’

আমাকে এসে ধরল প্রীতন্বিতা। সে বলতে লাগলো আর আমি আমার ডায়েরিতে গানের কথাগুলি লিখতে লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম তার বয়স পাঁচ হতে এখনও একটু বাকি। 

কোন্ রহস্যে পৃথিবী কিভাবে চলে বুঝতে পারি না। অনেক ভেবেও অজস্র জীবকোষের সমন্বয়ে জীবন রচিত হয় যেসব প্রাণীআধার ভিত্তি করে কত না বিস্ময় এখানে। বিস্ময়ের সর্বোত্তম প্রকাশ মানুষ। সৃষ্টি রহস্যের নৈপুণ্য আমাকে মুহ্যমান করে। হাজার হাজার কোটি মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে অথচ একটি মানুষের মুখের সঙ্গে অন্যটির কিছু না কিছু অমিল থাকবেই। সৃষ্টির আশ্চর্য নিয়ম কোন মানুষকেই রিপিট করে না। একদিক দিয়ে দেখলে মানুষ মানুষে শুধু অমিল, আবার অন্য চোখে দেখলে দেখা যাবে কেবলই মিল। এত অমিলের মধ্যেও কিভাবে একজনের সঙ্গে অন্যজন মিলে যায় ! মা আমার চলে গেছে, তাকে ফিরে পাওয়ার নিয়ম নেই। আজ হঠাৎ প্রীতন্বিতার মধ্যে এভাবে গান জেগে ওঠায় আমি কেবল স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এ তো আমার সেই মায়ের স্বভাব। মেয়ের মধ্যে মায়ের সেই চেনা স্বভাব কোন্ রহস্যে এসে গেল তার তো থৈ পাচ্ছি না। 

মা চলে যাওয়ার পর জগত-সংসার তখন আমার কাছে বিভ্রম আর আমি ছিলাম আপাদমস্তক অস্বাভাবিক। আমাকে বোঝাতে আসে নানাজন, নানা কথা বলে। প্রীতন্বিতা তখন দেড় বছরেরও নয়, অনেকেই তাকে দেখাতো আমাকে।

‘দেখ, মাকে ভালোবাসো বলেই মেয়ে পেয়েছ। মাকে পাবে মেয়ের মধ্যেই।’

এই প্রচলিত সান্ত্বনায় বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না আমার। বলেছিলাম,

‘হ্যাঁ, দুধের স্বাদ ঘোলে।’

জনৈক আত্মীয় তখন মনে করিয়ে দিয়েছিল,

‘কী করবে ? সবসময় তো আর দুধ পাওয়া যায় না।’

তখন থেকেই নীরবে এক বিদ্রোহ সঞ্জাত করেছিলাম দিনে দিনে, ওপরে কাউকে টের পেতে দিই নি। কোনদিনও মেয়েকে মেনে নেব না মায়ের মূর্ত রূপ বলে। বিশ্বাস তখন প্রবল আমার মধ্যে, মানুষ সান্ত্বনা পেতেই এসব সাজায়। ভিত্তিহীন অযৌক্তিক আবেগ। 

তারপর দিন কাটছিল। প্রীতন্বিতা কথা বলতে শিখল, নিজের অনেক কাজ নিজেই করতে পারে। স্কুলে যায়, গান শেখে, ছবি আঁকে, স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনাও করতে জেনেছে। বাবাকে ছেড়ে থাকতে তার মন খারাপ হয়। বাবা বাইরে যাচ্ছে শুনলে মুখ কালো করে, বাড়িতে এলে ছুটে দরজা খুলে আনন্দে নাচতে থাকে, বাবার শরীর খারাপ হলে দুশ্চিন্তায় ভোগে। আমি সব দেখি আর দেখি, ওপরে যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করি না কেন ভিতরে টের পাই কী যেন ভাঙছে কেবল। আমাকে জড়িয়ে তার প্রতিটি কথাবার্তায়, চিন্তায় বা কাজে মায়ের মুখ উপলব্ধি করি অন্তরের গভীরতম প্রদেশে। 

তারপর আমি কোন এক নির্জন অবকাশে বসে নিজের মধ্যে ভাবনা সাজাই। এমনই পরস্পরনির্ভর হয়ে মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে আছে। যদি আমি মানুষ না হতাম তো আমার মধ্যে মাকে হারাবার যন্ত্রণা নিশ্চয়ই এমন প্রবল থাকত না। মানবিক মস্তিষ্ক অর্জন করার অনেক উপকারের পাশাপাশি এই এক ভীষণ বিপদ। আমার কার্যকলাপকে আমি কিছুতেই মানসিক অবসাদমুক্ত রাখতে পারি না, আর অবসাদ আমি খুঁজে পাই প্রতি পদক্ষেপে। অহরহ ছোঁয়া-না ছোঁয়া আঘাতে মন খন্ড-বিখন্ড হতে থাকে, প্রতিবার আমি ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত মনের টুকরোগুলি কুড়িয়ে কুড়িয়ে জোড়া লাগাই, আবার ফিরে পেতে চাই অখন্ড মন। সারা জীবন কাটে আমার এমনই অবিরাম চেষ্টায়। 

মাকে হারিয়ে খন্ড-বিখন্ড মনকে জুড়তে পারছিলাম না। যেখানে কোন সান্ত্বনা নেই, আশ্বাস নেই, খন্ডগুলি জোড়া দেওয়ার উপায় পাব কোথায় ? মৃত্যু এক এমনই হারিয়ে যাওয়া খুঁজে পাওয়ার কোন বাস্তব সম্ভাবনা মানুষের জানা নেই। এখানে আবার কিভাবে আমার মনকে ফিরে পাবো ?

ক্রমশ দেখি আমাকে বিভ্রান্ত করে মনের খন্ডগুলি আমার অজান্তেই জুড়ে যেতে শুরু করেছে, আর সংযোজক উপাদান হয়ে উপস্থিত প্রীতন্বিতা। চিন্তার গভীরে অবশ বসে আমি তখন বুঝি এটাই জাগতিক নিয়ম। এভাবেই মানুষ সান্তনা খুঁজে পেতে বাধ্য হয়।

মেয়ের মধ্যে মাকে আবিষ্কার করার আনন্দে সামগ্রিক হতাশায় তবুও একটু আলোর আভাস আনে, আর এই আলোর বিন্দুটিকে আশ্রয় করে আবার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় ভাবি। এছাড়া বিকল্প আর কিছুর সন্ধানও নেই হাতে। মায়ের শৈশব বা কৈশোর দেখিনি আমি। মা বলত প্রায়ই, শুনতাম। মা বলত এমনি হয়তো কোন কথাপ্রসঙ্গে, শুনে মনে রাখার খুব যে প্রয়োজন আছে বুঝতাম না। আজ সেসব কথা হাতড়ে বেড়াই বাঁচার তাগিদে, ধূসর অববাহিকায় যারা অধিকাংশই বিলীয়মান। মায়ের ওইসব কথা মনে করা আজ যেন মাকে ফিরে পাওয়ারই মত। কথাগুলি মনে করি আর মিলিয়ে দেখি মেয়ের সঙ্গে, মায়ের শৈশব কোনরকমে যদি দেখতে পাই প্রীতন্বিতার শৈশবে। 

মা বলত, ছোটবেলায় মায়েরও এমন আকর্ষণ গড়ে উঠেছিল গানের ওপর। বড় হয়ে যখন-তখন মাকে গান গাইতে শুনতাম। ওইসব গানের অধিকাংশই কোনদিন রেডিওতে বা অন্য কোথাও শুনিনি। মা বলত,

‘এসব গান শিখেছিলাম আমি ঠাকুমার কাছে।’

মায়ের খুবই ছোট্টবেলার কথা। ঠাকুমার ছায়াসঙ্গী হয়ে দিন কাটত তার। মায়েরা ছিল পাঁচ বোন, আমার একদম মনে পড়ছে না এখন। মায়েরা ছ’বোনও হতে পারে, মায়ের ঠিক পরের বোন মারা গিয়েছিল ছোটবেলায়। সবার বড় বোন হয়তো বিয়ের পর অকালেই মারা গিয়েছিল, আজ আর মনে করতে পারছি না। যাই হোক না কেন, মা ছিল মায়ের ঠাকুমার সবচেয়ে প্রিয়। মায়ের মুখে শুনতাম যেসব নীতিকথা, কেবল গানই নয়, সব সেই ঠাকুমার শেখানো। ছিল নানারকম মূল্যবোধ, চলার পথের শিক্ষা। ঠাকুমা মাকে হাত ধরে শিখিয়েছিল ঠাকুরপুজো, ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল তোলা। এভাবেই একজন মানুষ নিজেকে রেখে যায় তার উত্তরসূরীর মধ্যে। এই নিয়মও এক ধরনের অমরত্ব। মানুষ নিজেকে অমর করতে চায় বলেই বংশধর খোঁজে।

কবিগান, পালা গান, যাত্রার আসর থেকে মায়ের ঠাকুমা অনেক গান শিখে নিয়েছিল। তার যে গানের কোন শিক্ষা ছিল শুনিনি মায়ের কাছে। নিজের ভালো লাগা থেকে শেখা সব গান। সেই প্রিয় গানগুলি সে শিখিয়ে গিয়েছিল মাকে। কোন্ ছোটবেলায় শেখা সমস্ত গান, মাকে নির্ভুল গাইতে শুনতাম। কেবল গানই নয়, স্তব-স্তোত্র অনেক জানত মা। ঠাকুরের আসনে দুবেলা বসলে নিয়ম করে গাইতো সমস্ত কিছু। ওই সব মাকে শিখিয়েছিল মায়ের ঠাকুমা। সম্পদের উত্তরাধিকার স্বত্ব এভাবেই হস্তান্তরিত হয়।

‘ঠাকুমা তো পুজো করতে যখনই যেত আমাকে ডেকে ডেকে নিতে রে বাবা। কোথাও ঘুরতে গেলে আমার হাত ধরে সঙ্গে নিয়ে যেত।’

আমি জানি, মানুষের সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছে এভাবেই। আমার পূর্বপুরুষের অর্জিত সঞ্চয় আর অভিজ্ঞতা আসে আমার মালিকানায়, তাকে আশ্রয় করে আমি আরেকটু এগিয়ে যাব, আমার সম্পদের মালিকানা বর্তাবে উত্তরপুরুষে, সে তাকে ভিত্তি করে আরও একটু এগোবে। হাজার হাজার বছরে তিল তিল করে এই নিয়মে গড়ে উঠেছে সভ্যতার সাধারণ ধারা। যদি পূর্বপুরুষের অর্জিত সম্পদের মালিকানা অগ্রাহ্য করতাম তাহলে মানুষের সভ্যতা তৈরি হতো না। 

তবুও এই মালিকানা অর্জন বা গ্রহণ সবসময় সহজ হয় না, বাধাবিঘ্ন লেগেই থাকে। তার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সভ্যতার চলনরেখায়। একবার কোন এক অগ্রজ সাহিত্যিকের সঙ্গে যাচ্ছিলাম কোথাও। যেতে যেতে একটা বড় মাঠ পড়ল আমাদের সামনে। সেই মাঠের মধ্যে দিয়ে কোণাকুণি চলে গেছে পথ। দিনের পথ দিন লোকের পায়ে পায়ে তৈরি হয়েছে সাদা পথরেখা। অগ্রজ সাহিত্যিক মাঠে নামার আগে থামলেন। মাঠের পথরেখাটি দেখিয়ে আমাকে বললেন,

‘এই যে রাস্তাটা দেখছ মাঠের মধ্যে দিয়ে গেছে, এটা কেউ প্ল্যান করে তৈরি করেনি। কিন্তু মজা দেখেছ, রাস্তাটা কেমন আঁকাবাঁকা। এটা তো সরলরেখাও হতে পারতো ?’

আমি ভাবছিলাম। উনি আবার বললেন,

‘লক্ষ করে দেখবে দীর্ঘদিন বহু লোকের চলাচলে যেসব রাস্তা গড়ে ওঠে তা কখনো সোজা হয় না। এরকম কোন মাঠের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া রাস্তা দেখবে সবসময় আঁকাবাঁকা। অথচ রাস্তাটা সোজা হতে পারত অনায়াসে।’

ব্যাপারটা আমারও আশ্চর্য লাগছিল। কারণটা কী ভাবছিলাম যখন উনি বললেন,

‘আসলে কী জানো, মাঠের এই পথটা প্রমাণ করে মানুষের সভ্যতার এগিয়ে চলাটাও এমনই আঁকাবাঁকা। মসৃণ বা সোজা হতে পারে না।’

মসৃণ বা সোজা না হওয়ার কারণ ওইসব বাধাবিঘ্ন। 

মাকে হারিয়ে অহরহ যেসমস্ত হাহাকার আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে তার একটি এই আক্ষেপ, মাকে যেমন হাত ধরে সব শিখিয়েছিল তার ঠাকুমা প্রীতন্বিতা সেই সুযোগ পেল না। তার তেরো মাস বয়সের সময় মাকে হারিয়েছি। এই যে প্রীতন্বিতা মায়ের সঙ্গে থেকে প্রত্যক্ষভাবে তার শিক্ষা পেল না এতেই সভ্যতার মসৃণ চলন একবিন্দু বেঁকে গেল। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি যাতে সভ্যতা বেঁচে থাকে, যাতে তার চলনরেখা খুব বেঁকে দিকভ্রষ্ট না হয়, আর তাই প্রীতন্বিতার মধ্যে মায়ের স্বভাবের প্রতিফলন খুঁজে পেতে আমি এত উন্মুখ। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *