শান্তনু গঙ্গারিডি 

“আমার যা কিছু আকাঙ্খা যা কিছু অনুভব /

পাথর হয়েই বুকের মাঝে জমেছিল সব /

সেই পাথর চাপা ঝরনাকে আবার /

বললে কেন সময় হলো নদী হয়ে যাবার /… 

কী খেলা তুমি নতুন করে যাবে আবার খেলে / 

যে ক্ষতি আমি নিয়ে ছিলাম মেনে।…”

   দূর থেকে সুর ভেসে আসছে। বোঝা যাচ্ছে প্রাইমারি হেল্‌থ সেন্টারের এমবিবিএস ডাক্তার চিত্রকূট সোম ছুটি কাটিয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে এসেছেন।‌ অবসর সময়ে হারমোনিয়াম নিয়ে গলা সাধতে বসে গেছেন। বড্ড দিল দরদিয়া মিশুকে লোক। 

   কখন বর্ষা আসবে সেই আশায় কত শত পাথর চাপা ঝরনা ঢেউ খেলানো সারি সারি ছোট বড়ো মাঝারি পাহাড় গুলোর খাঁজে খাঁজে মুখ লুকিয়ে বসে আছে। 

   সেদিন এক গানের আসরে আলাপচারিতার সময় চিত্রকূটবাবু বলে ছিলেন, —কবিদের জনপদে কমসে কম একটি নদী থাকা খুবই জরুরি৷ যেমন, কপোতাক্ষর কবি মাইকেল মধুসূদন। ধানসিঁড়ির কবি জীবনানন্দ দাশ৷ বরাকের শক্তিপদ ব্রহ্মচারী। ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহের ধলেশ্বরী। অতুলরঞ্জন দেবের কুশিয়ারা। ডিমাসা কবি ধনেশ্বর বাতারি বা অনুপমা নাইডিংয়ের নদীর নাম জাতিঙ্গা। ব্রহ্মপুত্রের কবি নীলমণি ফুকন লিখেছেন, ‘রাতি হ’লে / সূৰ্য হেনো / নামি আহে / এই নদীয়েদি। অর্থাৎ, রাত হলে সূর্যও তো ডুব দেয় এই নদীর জলে।

   —পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতায় আছে, ভালো বাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী।  ওরিন‌ বলেছিল।

   উত্তুঙ্গ বড়াইল পাহাড়ে ট্র্যাকিং করছে ঝিমলি। সঙ্গে তিন বান্ধবী। ওরিনের পাড়াতুতো বন্ধু ঝিমলি। পরবর্তীতে কলেজ লাইফের হার্ট‌-থ্রব। এমন মেয়ে, যাকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। এরা চার জন ছাড়াও মাইবাং থেকে এসে যোগ দিয়েছে ডিমাসা তরুণী দিশ্রুদি বর্মন। এই ডানপিটে তরুণীটি ওদের পথপ্রদর্শক গাইড্ তথা ইন্টারপ্রিটার। নিজের মাতৃভাষা ছাড়া অসমিয়া, বাংলা, কার্বি, নাগামিজ় ও খাসি ভাষায় দক্ষ। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য ডিমাহাসাও জেলা এক রোমাঞ্চকর ভূখণ্ড। জৈব-বৈচিত্রে ভরপুর বড়াইলের প্রাকৃতিক আভা দেশী-বিদেশী পর্যটককে আকর্ষণ করে।

    এত অল্প সময়ের নোটিশে রিলিভার পাওয়া অসম্ভব। তাই ওরিন যেতে পারল না।

   মাস ছয়েক হলো চাকরি পেয়ে মাহুরে এসেছে ওরিন। সুড়ঙ্গের পর সুড়ঙ্গ পার হয়ে রেলগাড়ি আসে যায়। সবুজ পতাকা নাড়ানো শেষ করার পর নিসর্গ দৃশ্য উপভোগ করে ওরিন। স্থিতধী বালিকাদের নূপুরের ছন্দে রিনিঝিনি বয়ে যায় কত নদী। ওদের মনের গহনে অতলান্ত সমুদ্র। সুদূরের সেই সাগরে মিলিত হলে তবেই মোক্ষ লাভ, সমুদ্রকান্তা নামের সার্থকতা। কিন্তু এখন শুষ্ক চৈত্র মাসে বাতাসে জলীয় বাষ্প কমে গেছে। সূর্যরশ্মির‌ দহনে প্রেমহীন দীর্ঘশ্বাসে উদ্‌বায়ু হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে কত নির্ঝর। একটাই লাভ, এই কদিন ধরে চৌবাচ্চার জলে এসে কত জানা অজানা পাখি স্নান সেরে যাচ্ছে। ঝিমলি সৌখিন বার্ড-ওয়াচার।‌ ও থাকলে প্রতিটি পাখির নাম ধাম গোত্র বলে দিতে পারত। গরমের সময় একটাই ভয়, গোখরোরা পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। 

   তিন দিন আগের কথা। গোধূলি বেলায় রেল ঝমঝম স্বপ্নের ফেরিওয়ালার মতো হঠাৎ হাজির হয়ে আকাশের গায়ে রং তুলি বুলিয়ে দিয়েছিল ঝিমলি। আসমানের কোবাল্ট ব্লু রং গাঢ় লাল হতে না হতে সুয্যি ঠাকুর পাটে বসেছিলেন। 

   বেঙ্গালুরু থেকে নিজের শহর শিলচরে এসেছিল ঝিমলি।‌ ওরিন যে মাহুরে চাকরি পেয়েছে সে খবর জানা ছিল। বাল্যবন্ধু বলে কথা। সময় বের করে ঠিক চলে এসেছে।

   “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ”। পাহাড়ের গায়ে কত ধরনের গাছ। রং বেরঙের পাখিদের ঘুম ভাঙানিয়া গান। মেঘের আনাগোনায় গাছের পাতাগুলো সতেজ সবুজ, চিরহরিৎ। জানা অজানা কত ফুল স্বেচ্ছায় মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলেছে। বাহারি পাপড়ি মেলে খিলখিলিয়ে হাসছে। কোয়ার্টারের জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন বড়াইল পাহাড়‌ ছোঁয়া যায়। চিত্রকূটবাবু বলেছিলেন, “এই পাহাড় ডিমাসাদের। ডিমা হাসাও মানে ডিমাসাদের পাহাড়। আর, ডিমা-সা মানে বড়ো নদীর সন্তান। বাচ্চা বোঝাতে ছা শব্দটা তো আমরাও ব্যবহার করে থাকি।”

   যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই দু চারটে রুপোলি রেখা। আসলে ছোটো ছোটো পাহাড়ি নদী। এত এত রিভ্যুলেট। তার মধ্যে একটিকে একান্ত আপন করে নেয়া যায় বইকি। বন্ধু ঝিমলির নামে একটা রিভ্যুলেটের নাম রাখলে বেশ‌ হয়। ওরিনের এই অদ্ভুত অনুভূতির নেপথ্যে যে হৃদয় তোলপাড় করা আকুতি তা ভাষায় লিখে বোঝানো যাবে না।

  পাহাড় পর্বতেরা প্রকৃতিগত ভাবে অনুভূতি প্রবণ হয়ে থাকে। ওরিনের আকুতিতে সাড়া দিয়ে পাহাড় চূড়া বলে ওঠে, 

    —তোমার হাতের সবুজ পতাকাটা আমাকে দাও।‌ আমি তোমাকে নদী দেব।

   —সবুজ পতাকা না দেখালে ট্রেন চলাচল থমকে যাবে। ওরিন বিচলিত বোধ করে।

   —দিনের আলোয় আমাদেরকে নিজের মতো করে থাকতে দাও। রাত ঘনিয়ে এলে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। তখন গ্রীন ল্যান্টার্ন‌ হাতে যত ইচ্ছে ট্রেন পাস করাও, কিছু মনে করব না। দিনের কোলাহল বন্ধ করলে ঝরনা চাইলে ঝরনা, নদী চাইলে নদী দিয়ে দিতে পারি।

   —কিন্তু, তুমিই তো বলেছিলে রাতে আলো জ্বালিয়ে রাখলে পরিযায়ী পাখিরা জাতিঙ্গার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে,  আত্মঘাতী হয়!

   —বন্ধু, মিছে তর্কে লাভ নেই। কুয়াশা ভরা শীতের রাতে পর পর মশাল জ্বালিয়ে রাখলে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। ওদের মস্তিষ্কের চৌম্বক দিক-নির্দেশনা গুলিয়ে যায়।

    ওরিন আমতা আমতা করে। পাহাড় চূড়া বলে, —’তুমি তো পাহাড়কে ভালোবাসো, পাহাড়ের মানুষকে ভালোবাসো। আমার কথা মানলে আমি নিজের শরীরে খাঁজ কেটে জাতিঙ্গা নদীর মতো আরেকটা পাহাড়ি নদীর জন্ম দেব। তুমি তার নাম রাখবে ঝিমলি।

                                   [২]

সবাইকে চমকে দিয়ে মধ্য চৈত্রে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। একদিকে বরফ-শীতল হাওয়া ও অন্যদিক থেকে আসা গরম বাতাসের অভিঘাতে সৃষ্টি হওয়া আকাশচুম্বী উল্লম্ব মেঘপুঞ্জ প্রবল বেগে ঝরে পড়ছে। মেঘ তো নয়, যেন এক সুবিশাল ম্যামথ শুঁড় দিয়ে প্রবল প্রতাপে জল ঢেলে দিচ্ছে। হারেঙ্গাজাওয়ে ভূমিস্খলনের ফলে রেললাইন ঝুলে গেছে। পাহাড় লাইনে রেল চলাচল বন্ধ।

   ধস নামার ফলে সারি সারি দারুচিনি গাছ সমূলে উৎপাটিত হয়ে সড়ক পথে নেমে এসেছে। একটা লরি মাটি চাপা পড়েছে বলে জানা গেল। ছোটো বড়ো গাছ আর বোল্ডার সরিয়ে উদ্ধার কার্য চলছে। ভাগ্যিস, প্রাণহানির খবর নেই। নদীগুলো ফুঁসছে। ধীরে বয়ে যাওয়া নদীগুলো চোখের পলকে খরস্রোতা হয়ে গেছে। সাপ্তাহিক হাট বন্ধ রাখতে হয়েছে। 

   চিত্রকূট বাবুর স্পষ্ট কথা, —জল হাওয়ার খামখেয়ালিপনা রাতারাতি তৈরি হয় না।‌ সভ্য সমাজ মাত্রাছাড়া নদীশাসনে নামার ফলে সুখ সমৃদ্ধি আনন্দের বার্তাবাহক তটিনীও একদিন না একদিন দুঃখ নদীতে পরিণত হয়ে যায়।

  প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কুড়ি একুশ ঘন্টা অতিক্রান্ত। লাইসং রোড ধরে কয়েক ঘন্টা এগিয়ে গেলেই হেজাইচাক নামক জেমে-নাগা বস্তি। রানি মা গাইদিনলিউ-কে ভালবেসে খুব সুন্দর একটি পর্ণকুটির বানিয়ে দিয়েছিল গ্রামবাসীরা।‌ আশির দশকের শেষ দিকে টানা দু বছর সেখানে কাটিয়ে ছিলেন নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামী গাইদিনলিউ। সেই কুটির দেখতে যাবেই যাবে বলে গেছিল স্নিগ্ধা, চামেলি, তৃণা ও ঝিমলি। 

   দিশ্রুদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিল, —ম্যায় হুঁ না। রাস্তা চিনিয়ে ঠিক নিয়ে যাব। মাহুর থেকে লাইসং রোড ধরে এগোলে হেজাইচাক গ্রামের দূরত্ব কমবেশি দশ কিলোমিটার। জানো তো, রানি মা গাইদিনলিউ নাগাদের লোকায়ত কৃষ্টি সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। শি ইজ় মাই ইন্সপিরেশন।

   দিশ্রুদি কি বাকি চারজনকে নিয়ে বিপদ সীমার বাইরে চলে যেতে পেরেছে? হয়তো বা নাগাল্যান্ডেই ঢুকে গেছে।

   ঝিমলিদের ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ ঘরের এক কোনায় পড়ে আছে। ট্র্যাকিংয়ে যাবার আগে বলে গেছিল, —এবার মাত্র তিন দিনের ঝটতি সফরে এসেছি।‌ আগামী বছর জানুয়ারিতে বুসুডিমা ফেস্টিভ্যালে আসব। সপ্তাহ খানেক সময় নিয়ে মাইবাং টু হাফলং, সব ঘুরে ঘুরে দেখব।‌ আজকেই বলে দিলাম, আগে থেকে ছুটির দরখাস্ত করে রাখিস কিন্তু।

                               [৩]

এই অঞ্চলে কফি চাষ হয়। মিস্টার লেইসিং হাফলংবার এক কৌটো লোকাল কফি উপহার দিয়ে ছিলেন। ওরা ফিরে এলে প্যাকেটটা খুলবে বলে ভেবে রেখেছিল। দু দিনের অপেক্ষার পর সেটা থেকেই কফি বানিয়েছে ওরিন। 

   সব ঠিকঠাক থাকলে গতকালই চলে যাবার কথা ছিল ঝিমলিদের। ওদিককার মোবাইল টাওয়ার উপড়ে গেছে। সিগন্যাল না থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

   তমসুকের মতো সামলে রাখা একটি প্রাচীন ডায়েরি।‌ অনেক দিন পর আজ সেটা খুলে বসেছে ওরিন। দিন-পঞ্জিকার ভেতরে গুছিয়ে রাখা প্রিয় বন্ধু ঝিমলির দেয়া নিউ ইয়ার্স কার্ড, বার্থডে কার্ড। খুব বেশি নয়, পাঁচ ছ খানা। ভালোবাসা ভরা দুটো চিঠি। তারপর তো সবকিছু স্মার্টফোন নির্ভর হয়ে গেছে।‌ ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো কিছুটা বিবর্ণ।‌ 

   সর্বশেষ রঙিন ছবিটা সাড়ে তিন বছর আগের স্মৃতি। এম.টেক. পাশ করার সাথে সাথেই চাকরি পেয়ে গেছে। বেঙ্গালুরু চলে যাচ্ছে ঝিমলি। শিলচর ছেড়ে চলে যাবার আগের রাতে তুমুল আড্ডা দিয়েছিল দুজনে। ছোট থেকে দেখে আসা একটি নারীকে আজ রাতে এত অসামান্য রূপবতী লাগছে কেন! ঝিমলি ধবধবে ফর্সা স্নো হোয়াইট সুন্দরী না। গায়ের রং শ্যামলা। সেটাই যেন এক ধরনের চুম্বকীয় আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপ্‌-স্টিক। চুল আবলুস কাঠের মতো কালো। সপ্রতিভ কথাবার্তা ও সামগ্রিক উপস্থিতি দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল উচ্ছল। চোখ সরাতে পারা যাচ্ছিল না।

#

   ডায়েরির শেষ পাতা। সখের ঝরনা কলম দিয়ে কবিতা লেখে ওরিন—

তুই যে ছবিটা উঠিয়েছিলি

                                 সেদিন

তা-ই দেখছি বসে….

নিজের প্রতি নিজের মায়া হচ্ছে।

বুক ভেঙে কান্না আসতে চাইলে নিজেকে ঠিক 

কেমন দেখতে লাগে তা কখনো দেখিনি। 

আজ দেখছি…।

হৃদয় বলে নাকি একটা

                    ভার্চুয়াল দুনিয়া আছে। 

আলতো আঙুলের ছোঁয়ায় 

তার ছবিটাও তুই তুলে রাখিস

আমার মোবাইলে।

তুই ছাড়া আমার কান্নার ছবি

                         কেউ তুলে রাখেনি।

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *