রম্যরচনা

অধ্যায় : ১২

অধিকাংশ সময় মনে হয় যে পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা বেশ ঝকমারি, এত এত শত্রু থাকার জন্য। ঘরে-বাইরে সর্বত্র যদি কেবল শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় তো বেঁচে থাকার আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়। হাচিয়া ফাল এমন একটা পৃথিবীতে থাকতে চায় যেখানে কাউকে দেখে শত্রু বলে মনে হবে না বা সেখানে এমন কেউ থাকবে না যে শত্রু হতে পারে। সেই দেশে কী থাকবে কী থাকবে না তার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম না থাকলেও একটাই শর্ত হল, যে বা যারাই থাকুক সে বা তারা হাচিয়া ফালের সঙ্গে শত্রুতা করতে পারবে না, চেষ্টা করলেও নয়।

সেখানে দরকার হলে জল-হাওয়া না থাকলেও চলবে। জল ও হাওয়া দুটোকেই সে দেখেছে শত্রুভাবাপন্ন। এমনিতে তেষ্টা পেলে জল খেতেই হয় উপায় নেই বলে। যদি না খেলেও হত তো সে জল খেতোই না। জলকে তার অপছন্দ যেহেতু জল সবকিছু ভিজিয়ে দেয়। জলে ভিজলেই তার সর্দি হয় আর অনর্গল হাঁচতে হাঁচতে সে কেবলই জলকে শত্রু বলে ভেবে তার বাপান্ত করে। জল এতটাই বেয়াক্কেলে যে জামাকাপড় ভিজিয়ে দেয়। তাছাড়া জলে ডুবে মরে যাওয়ার ভয় তো রয়েছেই। তাই সে নদী, সমুদ্র, পুকুর ইত্যাদির ধারেকাছেও যায় না। বর্ষাকাল তার দুচোখের বিষ। জল সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়েই তার প্রবল এলার্জি। অন্যদিকে হাওয়াকেও তার তেমন সুবিধের পাত্র বলে মনে হয় না। উল্টোপাল্টা হাওয়ার দাপটে তাকে জীবনে বহুবার নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। বিশেষত ঝড়ের সময়ে। তাছাড়া হাওয়ার চরিত্র সে দেখেছে বিশ্বাসঘাতক টাইপের। যখন দরকার তখন পাত্তা পাওয়া যায় না, অদরকারে সে প্রবল বিক্রমে এসে হাজির হয়। এমন দুশ্চরিত্র যার তাকে বন্ধু ভাবা মুশকিল। হাওয়াকেও সে সঙ্গত কারণেই শত্রু মনে করে। 

তেমন এক দেশে গাছপালা থাকারই বা কী দরকার? লোকে বলে বটে, গাছ লাগাও, গাছ লাগাও। তার এসব কথা শুনলে গা জ্বালা করে। গাছ না হলে নাকি পৃথিবী থেকে জীবন হারিয়ে যাবে, মানুষের সভ্যতা বিপন্ন হয়ে পড়বে। লোকেদের এসব কথা তার আদিখ্যেতা বলে মনে হয় আর লোকগুলিকে মনে হয় তার শত্রু। গাছপালার জন্য অত দরদ কেন তোদের? সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, গাছটাছেরা তার বিশেষ উপকারে লাগে না। বরং গাছপালার কারণে তার অপকার ঘটে থাকে। তার ঠিক ঘরের সঙ্গে গায়ে গায়ে লাগানো কী একটা বিশাল গাছ ছিল যার কারণে তার দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। তার উঠোনে বারান্দায় ওই গাছটা কাড়ি কাড়ি পাতা ঝরাতো যেসব সাফ করতে করতে প্রাণান্ত হওয়ার জোগাড়। আবার ওই হতচ্ছাড়া গাছটার শিকর তার ঘরের ভিত ফাটিয়ে দিয়েছিল। তার বাড়ির বাইরের দেয়ালে নোনা ধরিয়ে দেওয়ার দায়ও ওই গাছেরই। শেষ পর্যন্ত বহু কাঠখড় পুড়িয়ে বহু টাকা খরচ করে লোক ডেকে গাছটাকে কেটে নির্মূল করে তবে শান্তি। অবশ্য শান্তি আর কোথায়? তার বাড়ির আনাচে কানাচে উঠোনের মধ্যে বা ধারে প্রচুর আগাছা জন্মায়। ওসব পরিষ্কার করার ভোগান্তি কি কম? তারপর সে গাছপালাকে শত্রু ভাবলে অন্যায় কোথায়? 

সে যেমন পৃথিবীতে থাকতে চায় সেখানে গাড়ি-ঘোড়া থাকারও দরকার নেই। গাড়ি, বাইক, প্লেন, জাহাজ, ট্রেন ইত্যাদি সমস্ত যানবাহনকে তার বিপদজনক বস্তু ও শত্রু বলে মনে হয়। এসব চেপে যাতায়াত করতে লাগল যেদিন থেকে মানুষ সেদিন থেকেই যতসব দুর্ঘটনার আগমন। পায়ে হাঁটাহাঁটি করলে কি এত এত দুর্ঘটনা ঘটতো? তাছাড়া পায়ে হেঁটে বেড়ানোর উপকারিতাও অনেক। মানুষের বুদ্ধি দেখে তার মনে হয় মানুষ নিজেই তার নিজের শত্রু। একা হাচিয়া ফাল সবাইকে শত্রু ভাবে বলে দোষ দিয়ে লাভ নেই, প্রত্যেকটি মানুষই প্রত্যেক মানুষের শত্রু। সেটা বোঝা যায় এসব যানবাহনকে দেখলে। লোকে বলে বটে এসব যানবাহন ছাড়া সভ্যতা অচল। তার বরং উল্টোটাই মনে হয়। তার মনে হয়, এসব যানবাহন একদিন সভ্যতাকে অচল করে দেবে। তার বাড়ির সামনে দুর্ভাগ্যক্রমে একটা রাস্তা থাকায় সারাদিন সেখান দিয়ে এত গাড়ি ও বাইক বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে বাজিয়ে যেতে থাকে যে অতীষ্ঠ হয়ে তার মাঝেমধ্যে জঙ্গলে চলে যাওয়ার ইচ্ছে হয়। তাছাড়া গাড়িঘোড়া হচ্ছে পরিবেশ দূষণের মূল কারণ। এই ব্যাপারটা অস্বীকার করবে কে? যে অস্বীকার করে সে একা হাচিয়া ফালের শত্রু নয়, গোটা মানবজাতিরই শত্রু। এই সমস্ত কারণে সমস্ত কলকারখানা ও যে কোন প্রযুক্তি নির্ভর বিষয়কেই হাচিয়া ফাল নিজের শত্রু বলে ভাবে। 

তার পছন্দের পৃথিবীটাতে জল, হাওয়া, গাছপালা ইত্যাদির মত মাটি না থাকলেও চলবে। মাটি থাকলেই ধুলো হবে, কাদা হবে। ধুলো আর কাদা দুটোই তার বিরক্তির কারণ বলে মাটিকেও সে শত্রু বলেই বিবেচনা করে। এভাবেই জগতের পশু-পাখি সমস্ত বিষয়েই কোন না কোন কারণে যে কোন সময় তার শত্রু হিসেবে পরিগণিত হয়। 

হাচিয়া ফাল কোন্ ধরনের পৃথিবী পছন্দ করে? কেমন পৃথিবীতে সে থাকতে চায়? সেটা নিশ্চয়ই সবার এতক্ষণে বোধগম্য হয়েছে? তেমন একটা দেশকে খুঁজলে পাওয়া যাবে, না তার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে হবে? অবশ্য বিশ্বকর্মার মতো কোনো বিশারদ নির্মাতাকে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে এমন একটি পৃথিবী বানিয়েও নেওয়া যায়। তেমন অর্ডার দেওয়ার আগে বিশেষ সংযোজন হিসেবে আর একটু তথ্য জেনে রাখা ভালো। হাচিয়া ফাল রোদ, জ্যোৎস্না, অন্ধকার, আলো ইত্যাদি বিষয়গুলিকেও শত্রু বলেই মনে করে। এবার তেমন একটি স্পেশাল দেশের অর্ডার দেওয়ার আগে প্রত্যেকেরই খাতায় তালিকা করে নেওয়া উচিত সেই দেশে কী থাকবে না কী থাকবে। সেটা অবশ্য দেশটি যে বানাবে তাকে মাথা খাটিয়ে বুঝে নিতে হবে। ওটা তার দায়, যে অর্ডার দেবে তার নয়। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *