সৌমিতা রায় চৌধুরী
পর্ব – ১৯
ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে সব ছবিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণনা করা হয় তার মধ্যে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ উল্লেখযোগ্য। মেহেবুব খানের পরিচালনায় নার্গিস, সুনীল দত্ত, রাজেন্দ্র কুমার এবং রাজকুমার অভিনীত একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তু হল মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে এক দরিদ্র, সংগ্রামী, গ্রামীণ ভারতীয় মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের কাহিনী। যিনি সন্তানদের মানুষ করতে এবং সম্মানের সাথে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ মাতৃকার কল্যাণ সাধনের জন্য নিজের সন্তানকে ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হন না।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাধা কৃষক পরিবারের গৃহবধূ, যিনি স্বামীর অনুপস্থিতির সময় দুই ছেলেকে মানুষ করার পাশাপাশি কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মহাজন সুখীলালের কুদৃষ্টি ছিল তার ওপর। সেই কুনজর থেকে নিজেকে রক্ষা করতেও সমর্থ হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের মূল বক্তব্য হল রাধা শুধু একজন মা নন, তিনি মাদার ইণ্ডিয়ার প্রতীক। তার বড় ছেলে বীরু যখন অপরাধের পথে চলে যায় তখন ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দেশের নৈতিকতা রক্ষা করেন।

রাধার সঙ্গে বিয়ে হয় কৃষক সন্তান সামুর। সামুর মা স্থানীয় মহাজন সুখীলালের কাছ থেকে বিয়ের খরচ বাবদ কিছু টাকা ধার করে এই শর্তে যে ফসলের এক তৃতীয়াংশ সুখীলালকে কিছু বছর দিয়ে ধার শোধ করবে। কিন্তু ধূর্ত সুখীলাল ফসলের তিন চতুর্থাংশ প্রাপ্য হিসেবে এবং বন্ধক হিসেবে জমির দলিল নিয়ে স্বাক্ষর করায় সামুর মায়ের অশিক্ষার সুযোগে।
বিয়ের পর রাধার দুই সন্তান রামু এবং বির্জু জন্ম নেয়। এই সময়ে ঋণের বোঝা চালাতে গিয়ে পুরো পরিবারকে চরম দারিদ্রের মুখোমুখি হতে হয়। সামু এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তাই সে স্ত্রী রাধা এবং দুই পুত্র রামু ও বির্জুকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। রামু মায়ের সঙ্গে এই দারিদ্রের মোকাবিলা করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। নাবালক বির্জু সুখীলালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং সুখীলালকে আক্রমণ করে। গ্রামীণ বিচারসভা বির্জুকে গ্রাম থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তী সময় বির্জু একজন দস্যুতে পরিণত হয়। অন্যায়ভাবে পরিবার থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে বির্জুর মন প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলতে থাকে।
সুখীলালের মেয়ের বিয়ের দিন বির্জু সুখীলালের রাইফেল চুরি করে এবং সুখীলালকে মারতে উদ্যত হয়। এই সময় রাধা নিজের সন্তান বির্জুকে গুলি করে এবং গ্রামকে আর কোনো অঘটন হওয়া থেকে রক্ষা করে নিজের সন্তানের বিনিময়ে।
১৯২৭ সালে আমেরিকান সাংবাদিক ক্যাথেরিন মেয়ো ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ বইটি রচনা করেন। এই বইটিতে নিন্দা করা হয়েছিল ভারতীয় সংস্কৃতির। ভারতীয় নারীর চির করুণ পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করার পাশাপাশি ভারতীয় নারীর ত্যাগ ও আত্মমর্যাদাকে মহিমান্বিত করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ রূপকভাবে ভারতকে একটি জাতি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে এবং জাতীয়তাবাদ ও দেশ গঠনের দৃঢ় বোধ চিত্রায়িত করে। কয়েকজন লেখক রাধাকে নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।
রাধার চরিত্রে অভিনয় করেছেন নার্গিস। বির্জুর চরিত্রে সুনীল দত্ত, রামুর চরিত্রে রাজেন্দ্র কুমার এবং সামুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজকুমার। সুখীলালের চরিত্রে ছিলেন কন্যালাল। এছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিলুমা, কুমকুম, শীলা নায়েক, মাস্টার সুরেন্দ্র, মাস্টার সাজিদ এবং সিতারা দেবী।
‘মাদার ইণ্ডিয়া’ চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন ফারদুন ইরানি। সম্পাদক ছিলেন সামসুদ্দিন কাদরি। পরিচালক মেহেবুব খানের প্রযোজনা কোম্পানি মেহেবুব প্রোডাকশনের ছবিটি মুক্তি পায় ২৫ অক্টোবর, ১৯৫৭ সালে হিন্দি ও উর্দু ভাষায়।
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারের বিজয়ীর শিরোপা অর্জন করে ‘মাদার ইণ্ডিয়া’। নার্গিস ১৯৫৮ সালে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ ছবির জন্য। সেরা পরিচালক, শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফি ও সেরা সাউন্ড ডিজাইনিংয়ে পঞ্চম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার ছিনিয়ে নেন যথাক্রমে মেহেবুব খান, ফারদুন ইরানি এবং কৌশিক। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের এগারোতম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন নার্গিস। এই চলচ্চিত্রটি ত্রিশতম আকাদেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)
