শিশির আজম
নির্জন দ্বীপ অথবা এক অপ্রকাশিত কবিতা
এই চলচ্চিত্রটিকে এক নির্জন দ্বীপ অথবা এক অপ্রকাশিত কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। চলচ্চিত্রের নাম ফরাসিতে Je Tu Il Elle, বাংলায় ‘আমি তুমি সে (নারী) সে(পুরুষ)’। রিলিজ হয় ১৯৭৪ সালে। শান্তাল আকেরমানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। শান্তাল কিন্তু বেলজিয়ান। যা হোক, মিনিমালিস্টিক ও ধীরগতির এই চলচ্চিত্রটির মূল ভাষা এর নীরবতা। সংলাপ প্রায় নেই বললেই চলে। আর এই নীরবতার ভাষা কখনও কখনও খুবই মারাত্মক হয়ে ওঠে। যদিও এর তাৎক্ষণিক অভিঘাত তেমন অনুভূত হয় না। হাঙ্গেরিয়ান বেলা তারের কাজেও আমরা দেখেছি নীরবতাকে চলচ্চিত্রভাষায় রূপ নিতে। আর ফিল্মমায়েস্ত্রো তারকোভস্কির কাজে এর সফলতা কীরকম তা তো আমরা জানিই। এমন কি সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রোমারের আক্রমণাত্মক নির্জনতার ভাষাও আমরা অনুভব করেছি ওর ‘ নির্জন সুইডিশ বাড়িগুলি’ কবিতায়। ক্লাসিকাল চিনা চিত্রকলা এবং জাপানি ছাপচিত্রের অন্যতম এক বৈশিষ্ট্য হলো ছবিতে প্রচুর খালি জায়গা রাখা। এট কেন? এর রীতি থেকে এখনও ওরা বিচ্যূত হয়নি। এটা হলো দর্শক বা বোদ্ধার প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধাবোধ। যে ওরা অনুভব করুক, আনন্দিত হোক, বিরক্ত হোক। এটা ওদের অধিকার। অর্থাৎ শিল্পানুরাগীর নিজেরও শিল্পের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। গোইয়া বা হুয়ান মিরোর কাজেও এটা আমরা পাই।ওদের ছবিতে যে পর্যাপ্ত কালো রং তাতে আলোর কোন অভাব দর্শক অনুভব করেনি। এই সিনেমায় নীরবতার চেয়ে বড় ভাষা আর নেই।
এই চলচ্চিত্রে কেবল নীরবতা না, সময় আর শরীরের ভাষায়ও আমরা আক্রান্ত হই। নির্জন একটা ঘরে পড়া, লেখা, শুয়ে থাকা, ফ্লোরে বিছানা পাতা আবার সেটা তুলে দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা আর সেটা এমন জায়গায় যেন বাইরের আলো ঘরে না আসতে পারে। সময়ের তাড়াহুড়ো নেই। মেয়েটা কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখে, দরজা খোলে, বাইরে ঝিরিঝিরি তুষার। এই তুষার ঝরে পড়াটা এই ইঙ্গিত দেয় যে সময় থেমে নেই। এটা ঐ মেয়েটার মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বময়তার দিকে আমাদের মনযোগ আকর্ষণ করে। চলচ্চিত্র-দর্শকের সঙ্গে এটা শান্তালেরও এক সংযোগ-প্রচেষ্টা, যেটাতে কিছুটা ঝুঁকিও বিদ্যমান। নীরবতাই যেখানে ভাষা সেখানে সংলাপের বা চিৎকার-চেঁচামেচির দরকার কী? ক্নদ মনে কত রকমের লিলি ফুল এঁকেছে, দিনের একেক সময়ে, একেকরকম তাদের অভিব্যাক্তি। রেনোয়ার প্যারির একই এভিন্যু দিনে-রাতে বা দিনরাতের একেক সময়ে, কী তাদের আলাদা আলাদা রূপ, আলাদা ভাষা, সুখ, বিষন্নতা! সময়ের এই চিত্রময়তা শান্তালের ক্যামেরা ধরে রেখেছে ভিন্নতর পার্সপেক্টিভে। নিচের এই স্থিরচিত্রটা দেখো। ক্যাফেতে একই টেবিলে সামনাসামনি বসে আছে দুজন। একই টেবিলে, সামনাসামনি। দুজনের হাতেই সিগারেট, এ্যাশট্রে একটাই।
দর্শকের সঙ্গে এখানে মারাত্মক এক খেলা খেলেছেন শান্তাল। টেবিল বা ক্যাফে জাস্ট উছিলা। ওরা আসলে নিজের নিজের জগতে এক অতল দ্বন্দ্বময়তায় নিমজ্জিত। এই স্থিরচিত্রটাকে সেজানের স্টিললাইফের সঙ্গে তুলনা করা যায় অথবা রেমব্রাঁর আলোছায়ায় উদ্ভাসিত কোন পোর্ট্রেট যেন। না কি জাপানি শিল্পীর চেখে বিভিন্ন এ্যাঙ্গেলে দেখা জীবন্ত মাউন্ট ফুজি! সংক্ষিপ্ত সময় পরিসরের এই চলচিত্রের শেষ ১৪ মিনিটের পুরোটাই যৌনতার দৃশ্য। কিন্তু যৌনতা কোথায়? গতানুগতিকভাবে সিনেমায় যে প্রেমের বা উত্তেজক ভোগবাদী অনুসঙ্গে যৌনতাকে আমরা পাই তা শান্তালের আত্মঅন্বেষণমূলক এই চলচ্চিত্রে নেই। শান্তাল কিছুটা দূরত্ব রেখে ক্যামেরা বসিয়েছেন। শরীর দেখানোর ইচ্ছে ওর নেই। কোন সাসপেন্স-ক্লাইমেক্স তৈরি করবার অভিপ্রায় নেই যেন দর্শকের প্যাশন-ইমোশন-অর্গ্যান আচমকা অভিঘাতে নড়ে ওঠে, টালমাটাল হয়। আমরা মুখোমুখি হই শরীর ও সম্পর্কের বাস্তব অভিজ্ঞতার। আর এটা আমরা দেখি পুরুষের চোখে না, নারীর চোখে। এটা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। ক্যাপিটালিজম যেটাকে সন্দেহের চোখে দেখে। কেন না সে সৃষ্টি করে একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতির দুঃসহ স্রোত। কিন্তু এসবের ভার নিতে তার অনীহা। এমন কি সে অস্বীকারও করে। হয় তো এটা দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের আঘাতে ভেঙে গুড়িয়ে চুর্ণ হয়ে যাওয়া ইউরোপের অর্থনৈতিক-সামাজিক অন্তর্জাগতিক বিস্ফোরণ। এটা এড়ানো যায়নি। শান্তাল একে অস্বীকার করতে পারেননি। নারীর সমলিঙ্গের এই যৌনতার সঙ্গে আধুনিক পশ্চিমা নারীবাদের কোন সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়া অবান্তর। বরং স্মৃতি ও পরিচয়ের অবিসম্ভাবী অংশ হিসেবে এটাকে এক অস্বস্তিকর মানবিক অভিজ্ঞতা বলে মেনে নেয়াটা যথাযথ। দর্শকের দিক থেকে আরেকটা ব্যাপার অনুভব না করে পারা যায় না। আচ্ছা শরীর ও যৌনতার এই দীর্ঘ শটটাকে যদি আমরা হাজার হাজার স্থিরচিত্রে ভাগ করে নিই? দর্শক বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। মনে হবে রদাঁর গড়া একেকটা শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য। তাদের একেক রকমের ভঙ্গি, চাওয়াপাওয়া, সুখ, যন্ত্রণা, অসহনীয় বিবমিষা থেকে মুক্তির আকুতি। পাঠক, রেনেসাঁগুরু লিওনার্দোর ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর মুখগুলোকে একটা একটা করে আবার দেখো তো। একেকটা মুখের কি অসহনীয় অভিব্যাক্তি! সিনেমা আসলে দেখা না, অনুভব করবার ব্যাপার। যেমন আমরা শিরিনকে (Shirin-2008) দেখেছি আব্বাস কিয়ারোস্তামির সংবেদনশীল ক্যামেরায়। যেন একেকটা পোর্ট্রেট। হ্যা, শান্তালের অস্বস্তিকর নীরবতাকে আমরা এড়াতে পারবো না। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
