নীলাদ্রি পাল

শীর্ণ শরীরে বাঘের মত ডোরা কাটা দাগ। হলুদ এবং উজ্জ্বল ত্বক। সাদা মুখমন্ডল। মোটা পাকানো গোঁফের দু’দিক দিয়ে লালা ঝরছে অনবরত। তীর, ধনুক, ঢাল, তলোয়ার, বল্লম নিয়ে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত লোকদেবতা দক্ষিণ রায়। পায়ে বুট পরিহিত। গায়ে জামা, পরণে ধূতি ও মাথায় মুকুট। কোলে বন্দুক। জামার পিছনে ঝুলছে লম্বা লেজ — জামার লেজ। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিস্তির্ণ অঞ্চল জুড়ে যে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অস্তিত্ব সে হল চিরপরিচিত সুন্দরবন। সেখানে প্রকৃতি অরণ্য, লবণাক্ত জল, প্রচুর কীটপতঙ্গ, কুমির এবং সর্বোপরি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের লোকদেবতা হলেন দক্ষিণ রায়। সুন্দরবনের সমস্ত হিংস্র ও অহিংস পশুর নিয়ন্ত্রক। ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সুন্দরবন অঞ্চলের সমস্ত মানুষের কাছ থেকে পূজিত। 

এই অঞ্চলের মানুষ প্রধানত মৎস্যজীবী। বনের মধু সংগ্রহ করাও এখানকার মানুষদের প্রধান জীবিকা। কীটপতঙ্গ এবং জলে কুমির ডাঙায় বাঘ নিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের বিপদসংকুল জীবনযাপন। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ এই প্রবাদকে শিরোধার্য করে এই অঞ্চলের লোকদেবতা দক্ষিণ রায়ের কাছে সমস্ত বিপদের ভার সপে এই অঞ্চলের মানুষ নিজেদের জীবন অতিবাহিত করে। 

ভাটি অঞ্চলের অধিপতি হিসেবে দক্ষিণ রায়কে সবাই মেনে চলে। ভাটি অঞ্চল বলতে বোঝায় যশোরের ব্রাহ্মণ নগরের রাজা মুকুট রায়ের অধিনস্ত অঞ্চল। লোকদেবতা দক্ষিণ রায়ের প্রতি বিশ্বাসের সীমানা হল পূর্বে বাকলা থেকে পশ্চিমে ঘাটাল, উত্তরে ভাগীরথী থেকে দক্ষিণে কাকদ্বীপ। 

১৬৮৬-৮৭ সালে লোককবি কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যে লোকদেবতা দক্ষিণ রায়ের বিষয়ে জানা যায়। শোনা যায় দক্ষিণ রায় একজন শক্তিশালী মানব ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর শৌর্যবীর্যের কারণে তিনি লোকদেবতায় পরিণত হন। এছাড়া ধনাই বণিক ও মনাই বণিক সুন্দরবন এলাকার মাছ, মধু ও কাঠের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। 

ইসলাম ধর্মে বড় গাজী খাঁ — ইনিও বাঘের দেবতা। পায়জামা, চোগাচাপকান, পিরাণ পরিহিত এক ঘোরসওয়াড় যোদ্ধা। কিছু অঞ্চলে গাজী খাঁকেও লোকদেবতা হিসেবে পুজো করা হয়। এলাকার জনশ্রুতি ও লোককথা থেকে জানা যায় স্থানীয় হিন্দুদের জোর করে ভয় দেখিয়ে ইসলামে রূপান্তরিত করতেন গাজী খাঁ। এই পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ রায়ের সাথে গাজীর বিরোধ ঘটে এবং যুদ্ধ হয়। 

দক্ষিণ রায়ের মন্দিরটি বেশ উল্লেখযোগ্য। রেলপথে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনের ধপধপিতে রয়েছে দক্ষিণ রায়ের মন্দির। দক্ষিণ রায়ের মন্দির বর্তমানে দক্ষিণেশ্বর নামে পরিচিত। লোকমুখে ছাড়া কোনো লেখায় যেহেতু এখনো পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বর নামের পরিচয় পাওয়া যায়নি, তাই মন্দির খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়। বিশেষ চেহারার মূর্তি দক্ষিণ রায়ের পরিচয়। রাস্তার লাগোয়া একতলা মন্দিরটিতে নিয়মিত পুজো হয়। নাচগান পছন্দ করার কারণে হয় সারা রাত ধরে নাচগান। পয়লা মাঘ দক্ষিণ রায়ের জন্মদিন হিসেবে রাত আড়াইটের সময় ‘জাতাল’ উৎসব পালন করা হয়। 

মন্দিরটি তৈরি হয়েছে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে। পুজো চলে আসছে শত শত বছর ধরে। মন্দিরের থামগুলোয় ব্রিটিশ স্থাপত্যের পরিচয় মেলে। মন্দিরের চূড়োয় দেবশিশু, দু’পা তুলে দাঁড়ানো ঘোড়া, গোলাকার ফুলের স্তবক, ট্রফির কাপের মত বসানো নির্মাণগুলো ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যের কথা স্মরণ করায়। মন্দিরের বারান্দা পেরিয়ে ঢুকতে হয় গর্ভগৃহে। দক্ষিণ রায়ের প্রায় সাত ফুট উঁচু মাটির মূর্তি রয়েছে এখানে। পিছনের দেয়ালে কাঠ ও কাগজের তৈরি নানান অস্ত্রশস্ত্র। দক্ষিণ রায়ের পায়ের কাছে সিঁদুর লেপা বড় পাথর ও একজোড়া খড়ম রয়েছে যা মন্দির ও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই পুজো হয়ে আসছে। বর্তমানে দক্ষিণ রায়ের গুরুত্ব কিছুটা কমলেও ঐতিহ্য সমানভাবে বহন করে চলেছে এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষ। 

প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

                                                       

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *