অমিতাভ সরকার
রবি গানের দেবজন
দেবব্রত বিশ্বাস
তিনি দেবব্রত বিশ্বাস। নামটুকুই যেখানে যথেষ্ট, বাকি কথা সেখানে নেহাৎই অপ্রয়োজনীয়।
রবীন্দ্রসংগীতকে ওঁর মতন করে মনে হয়, আর কেউ বোঝেননি; অনুভব করেননি রবীন্দ্রগানের কথা- ভিতরকার অন্তর্নিহিত অর্থ।
মন্দ্র সপ্তকে গলা – বজ্রকণ্ঠের আওয়াজ, মীড়, গমকের দমকা হাওয়া মনকে এমনভাবে স্পর্শ করে যাবে, বারবার যেন ঘুরেফিরে সেই তাঁর কাছেই ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে। ভাবই এখানে প্রধান, বাহ্যিক ক্যারিশমা গৌণ- সুর ভিতরের আবেগকে জলধারার মতো কলকলি বয়ে নিয়ে চলবে, বাঁধা বলে কিছু নেই, শুধু ভেসে থাকা, ডুবে হারিয়ে যাওয়া- যাঁর গানের অধরা মাধুকরীতে কিংবা সঞ্চারীতে এসে কণ্ঠের আবেদনে অন্য এক অদ্ভুত অনুভবী ঝোঁক যিনি তৈরী করতে পারেন তিনি আর কেউ নন – স্বয়ং দেবব্রত বিশ্বাস। দেববাণীর মতো তিনি গান শুনিয়ে মাত করে যান আজও।

পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার এতদিন পরেও। রবীন্দ্রনাথের বর্ষা ঋতুর গান তো দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে চিরশাশ্বত। এছাড়া প্রকৃতি পর্যায়ের অন্যান্য গান তো আছেই, সঙ্গে পূজা, প্রেম, বিচিত্র পর্যায়ের গানগুলোও দেবব্রতর দৈব উপস্থাপনায় অসাধারণ হয়ে ওঠে। ‘ও আষাঢ়ের পূর্ণিমা’,’এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও’,’বাদলধারা হলো সারা’, ‘বহু যুগের ওপার হতে’-র কথাই হোক, বা, ‘চাহিয়া দেখো রসের স্রোতে’, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়’, ‘শুধু যাওয়া আসা’,’যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়’,
কিংবা নাটকের গান- ‘যাবই আমি যাবই’, ‘হেরো সাগর ওঠে তরঙ্গিয়া’ -সবই যেন এক যুগান্তরের দিগনির্দেশক। গলা ছেড়ে উদাত্ত কণ্ঠে কীভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে হয়, তা যেন তাঁকে দেখেই বুঝতে হয়, ভাবতে হয়, শিখতে হয়।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডের এই ব্রাত্য কণ্ঠকার, আজও সবচেয়ে বেশি বিক্রিত, সেই রেকর্ড, ক্যাসেট যুগের মতো, ইউটিউবে আজও চির অবিকৃত হয়েই। ‘মেঘ বলেছে যাব, যাব’, ‘আমি চঞ্চল হে’,’ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’,’সুনীল সাগরের শ্যামল’, ‘আমি যখন তার দুয়ারে’,’রুদ্র বেশে কেমন খেলা’- উদাহরণ যতই দেওয়া হবে, কম পড়ে যাবে।
এরকম একজন মানুষ তাঁর সময়ে একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন। নানা বিরূপ সমালোচনা, অসম্মান, বিপরীত প্রতিক্রিয়া- মানুষটাকে রেকর্ড করাই বন্ধ করে দিতে বাধ্য করে দিয়েছিল। তবে জীবনের একলার রবীন্দ্রযাপন কিন্তু থেমে থাকেনি একটি দিনের জন্যেও।
কিছু মানুষের সূচনা থেকেই তার উত্তরজীবনের ভাগ্য পথের নির্দেশ থাকে। তিনি তাঁর স্বভাবগত মেজাজে, দাপটে কিংবা রসিকতায় মানুষ হিসেবে সবদিকেই ছিলেন ‘জর্জ’-ই। ডাকনামের সঙ্গে স্বভাব মিলে গেলেও তাঁকে সারাটা জীবনই ভাগ্যবিধাতা মানুষের স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া থেকে ব্রাত্য করে রেখেছে। ব্রাহ্ম পরিবারের জন্ম হওয়ার কারণে ছোটোবেলায় বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সহপাঠীরাও ওঁর সঙ্গে মেলামেশা করতো না- ম্লেচ্ছ বলে দূরে সরিয়ে রাখতো।
তবে দেবব্রত বিশ্বাসের বাবা-মা উদারমনস্ক ছিলেন, বলে মা-বাবার এই গুণ তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। ঊনসত্তর বছরের জীবনে তিনি শিখেছিলেন মানুষকে ক্ষমা করে যেতে। যারা তাঁর উপর বিভিন্ন সময়ে রেকর্ড আটকে অন্যায় করেছিল, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুণ্ণ হলেও পরবর্তীকালে তাদের ‘গুরু’ দোষকে আপন স্বভাবচ্ছলে অনেকটাই লঘু চালে ভেবে মার্জনা করেছেন। চাইলেই তিনি ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে তাদের মত অনুযায়ী পথে হেঁটে আরও বহুগুণ রেকর্ড করতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। বিসর্জন দেননি আদর্শকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতচিন্তাকেই বারবার তুলে ধরেছেন এবং (সেই সময় না হলেও কালের অমোঘ বিচারে পরবর্তীতে এসে) তাতে সফলও হয়েছেন। দেবব্রত বিশ্বাসের বিভিন্ন বয়সী অনুগামী শিল্পী এবং শ্রোতারাই আজও সংখ্যায় অধিক- এই অত্যাধুনিক যন্ত্রচালিত প্রযুক্তির যুগে এসেও।
যেমন সহজভাবে অনায়াসে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে পরিবেশন করতেন, যেভাবে গায়নের অনাবশ্যক কাঠিন্য বর্জন করে শ্রোতাদের সমক্ষে মনোজ্ঞ এবং আন্তরিক করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন – সময়ের সকল দোষগুণকে ছড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অধীশ্বর।
জন্ম ২২শে আগস্ট, ১৯১১ বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। এখানেই তাঁর শৈশব কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে। ১৯২৭ সালে কলকাতায় চলে আসেন। পরবর্তীকালে কলকাতার রাসবিহারী ট্রায়াঙ্গুলার পার্কে বসবাস করেছিলেন। দীর্ঘদিন কলকাতায় থাকলেও বাংলাদেশকে ভোলেননি একটি মুহূর্তের জন্যেও। কলকাতার আদবকায়দা, আড়ম্বর কোনোদিন তাঁকে স্পর্শ করেনি। কথ্য বাঙালভাষায় কথা বলতে কথা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
মায়ের কাছেই তাঁর প্রথম গান শেখা। এগুলোর অনেকগুলিই ছিল ব্রহ্মসংগীত। শুধু গান শেখাই নয়, মানুষ হিসেবে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার প্রাথমিক শিক্ষাও এই ব্রাহ্ম পরিবার থেকেই। মা নিজেও ব্রাহ্মসমাজে গান গাইতেন।
পরবর্তীকালে প্রথাগতভাবে কারোর কাছে গান না শিখলেও ‘প্রকৃত শিল্পের শিক্ষা এবং অন্তরের শৈল্পিক সত্ত্বা’কে লালিতপালিত করেছেন আমৃত্যু।
রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখা ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে। কবির কণ্ঠে গান শোনা এবং পরবর্তীকালে কবিগুরুকে গান শোনানোর সুযোগও তাঁর হয়েছিল।
কবিপুত্র রথী ঠাকুর, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীত বিশেষভাবে পছন্দ করতেন।
সেইসময় রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও নজরুল ইসলাম, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, হিমাংশু দত্ত, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি হয়। সেকালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ দেবব্রত হিন্দুস্তান ইনসিওরেন্স কোম্পানির অফিসে করণিক হিসাবে (প্রথমে বিনা মাইনেতে এবং একবছর পরে কাজের স্থায়ীকরণ হয়) স্বল্প মাইনেতে কর্মজীবন শুরু করেন। এখান থেকেই (কবিগুরুর সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই অফিসে আসতেন।) অফিসের প্রাক্তন কর্মী সুরেন্দ্রনাথের পুত্র সুবীর ঠাকুরের(উনিও ওই অফিসে কাজ করতেন এবং দেবব্রত বিশ্বাসের সহকর্মী ছিলেন।) সূত্র ধরেই ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর কাছে দেবব্রত বিশ্বাস গান শিখতে শুরু করেন। একে একে অনাদি ঘোষদস্তিদার থেকে শুরু করে সুচিত্রা মিত্র, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, খালেদ চৌধুরী প্রভৃতি বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তাঁর নৈকট্য স্থাপিত হয়। একসময় নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকি সরকারের নৃত্যের সঙ্গে দেবব্রতর গান ছিল মণিকাঞ্চনযোগ। এসব না হয় শিল্পীর একান্ত নিজস্ব কিছু কথা।
তবে সূচনা হয়েছিল কিছু আগেই।
পথই পথকে খুঁজে নেয়। চলতে চেষ্টা করে। হয়তো যাওয়া হয় না। শিল্পী কষ্ট পান। কাউকেই থামলে চলে না। সময়ের পালে আষাঢ় আসে। জল ভরে ছাপিয়ে ওঠে ভাবনার খেয়া পারাপার মাঠ। দুঃখ নিয়েও শিল্পী কাজ করে যান। কারোর জন্য কিছুই থেমে থাকে না। তাই সব নিয়ে সব দিয়েও শিল্প এগিয়ে চলে। দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়।
নিজের অনেক চেষ্টাতেই সফল স্বপন লাভ করেছিলেন। বরং কিছুটা নীরবেই। তবে যখন নাম করে ফেললেন, তখন থামতে হয়নি। রবীন্দ্রসঙ্গীত সে যুগে রবীন্দ্র পরিমণ্ডলের মানুষজন ছাড়া তেমন কেউ গাইতো না। তখন এই গানের প্রচারও তেমন হয়নি। দেবব্রত চাইলেই রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে অন্য গান আরও বেশিমাত্রায় গাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁর অনুভূতির শুরু ও শেষ যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।
১৯৪৪ সালে এইচএমভি থেকে প্রথম রেকর্ড কনক বিশ্বাসের (পরবর্তীকালে যিনি বিবাহসূত্রে দেবব্রত বিশ্বাসের বৌদি হবেন) দ্বৈতকণ্ঠে ‘সংকোচের বিহ্বলতা’ এবং ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’। বৌদির সঙ্গেই দ্বিতীয় রেকর্ড দ্বৈতকণ্ঠে ১৯৪৫ সালে ‘ওই ঝঞ্ঝার ঝংকারে’ এবং ’ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা’। পরের বছর প্রথম রেকর্ড এককভাবে ‘আছো আকাশপানে তুলে মাথা’ এবং ‘এ শুধুঅলস মায়া’। ১৯৫৪ সালে এইচএমভি রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য বেসিক গান রেকর্ড করতে বললে অসম্মত হয়ে এইচএমভি থেকেই রেকর্ড করা বন্ধ করেন। ১৯৬১ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি থেকে ‘আকাশভরা সূর্য তারা’এবং ’যেতে যেতে একলা পথে’ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়। ১৯৭১ পর্যন্ত হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে বিভিন্ন রেকর্ড বের হলেও বিশ্বভারতী সেই সব গানের ওপর নানা অছিলায় নানারকম বিধি নিষেধ আরোপ করলে দেবব্রত বিশ্বাস বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে সেগুলো নানাভাবে খন্ডন করতে থাকেন। এতে ওঁর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার থেকে আরো বহুগুণ বেড়ে যেতে থাকে।
রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া নজরুলগীতি, গণসংগীত, সলিল চৌধুরীর কথা সুরে গান রেকর্ড করেছেন। বন্ধু সন্তোষ সেনগুপ্ত ‘সেনোলা’ রেকর্ড কোম্পানিতে নিয়ে গেলে কবি নজরুলের সঙ্গে তাঁর সেখানেই পরিচয় হয়। বিদ্রোহী কবি দেবব্রত বিশ্বাসকে দিয়ে ওঁর লেখা ও সুরেদুটো গান রেকর্ড করেছিলেন, যদিও তা প্রকাশ পায়নি।
পরবর্তীকালে দেবব্রত ‘দোলনচাঁপা বনে দোলে’,’ বনকুন্তল এলায়ে’ -এই দুটো নজরুলগীতি রেকর্ড করেন। সলিল চৌধুরীর ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’,’আমার প্রতিবাদের ভাষা’- ইত্যাদি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘অবাক পৃথিবী’, বিষ্ণু দে, মনীন্দ্র গুপ্তের রচনাও গানের আকারে রেকর্ড করেন।
গণসংগীত এর সঙ্গেও দেবব্রত বিশ্বাসের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। উনি শিল্পীসংঘ কিংবা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গানও পরিবেশন করেছেন। ১৯৫৩ সালে ভারতীয় শান্তি কমিটির হয়ে এবং ১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে চিনে গিয়েও সমাদর লাভ করেছিলেন। ভারতীয় গণনাট্যের সূচনাপর্বে দেবব্রত বিশ্বাসের ভূমিকা ছিল অনন্য। পরবর্তীকালে মতানৈক্য ও মনান্তর; ফলে সম্পর্কের নৈকট্য অনেকটাই হ্রাস পায়।
এছাড়া রবীন্দ্রনাথের কিছু গান রেকর্ড করেছিলেন। এগুলোর স্বরলিপি আজও অপ্রকাশিত। যেমন- এ যে মোর আবরণ, আমার হারিয়ে যাওয়া দিন, তোমার রঙিন পাতায় লিখব, মধুঋতু নিত্য হয়ে রইল, সাধন কি মোর আসন, যাবার দিনে এই কথাটি, মেঘেরা চলে চলে যায়।
তিনশোর অধিক রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড ছাড়াও রবীন্দ্র-গানের কিছু ইংরেজি অনুবাদ গেয়েছেন, যেমন- বড় আশা করে, তোমার হল শুরু, তুমি রবে নীরবে।এছাড়া রবীন্দ্রনাথের সুরে স্তোত্রগান (ত্বমীস্মরাণাং, ত্বমাদিদেব), ‘প্রণমামি অনাদি’,’অন্তরতর অন্তরতম’ ইত্যাদি ব্রহ্মসঙ্গীতও গেয়েছেন।
মঞ্চেও অভিনয় করেছেন দু-তিন বার। ১৯৪৭ সালে ‘রক্তকরবী’ নাটকে বিশু পাগলার ভূমিকায়, ১৯৪৮ -য় তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়া তার’ নাটকেও রূপদান করেছিলেন। এছাড়া চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন হেমেন গুপ্তের ‘ভুলি নাই’(১৯৪৮), ‘কোমল গান্ধার’ প্রভৃতি আরও কিছু চলচ্চিত্রে। ’দেবী চৌধুরাণী’(১৯৪৯), ‘ওরে যাত্রী’(১৯৪৯), ‘মেঘে ঢাকা তারা’(১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’(১৯৬১), হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’, ’দাদাঠাকুর’(১৯৬২), ‘যুক্তি তক্ক গল্প’(১৯৭৪) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠদান করেছেন।
১৯৭১ সালে যখন তিনি রেকর্ডের টপ ফর্মে, তখন তিনি রেকর্ড বন্ধ করেন। রেকর্ড বিক্রি তাতে তো কমেনি, বরং আরও বেড়েই গেছে।
তবে গান শেখানো চলছিলই। রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েই সে আমলে তাঁর রয়্যালটি ছিল অনেকটাই।
(এই সময়ে দেবব্রত বিশ্বাসের বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গাওয়া অনেক রবীন্দ্রসংগীত, যেগুলো নেহাতই তিনি মজার ছলে গেয়েছিলেন, সেইসব গানগুলোর সঙ্গে মিউজিক যুক্ত করে তা বিভিন্ন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছে, আজও তার চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। তবে এ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের দেবব্রত বিশ্বাসের গানের সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা তৈরী না হলেই মঙ্গল।)
তবে ১৯৭১ সালে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড বন্ধ করলেও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা ও সুরে ‘শোনো বাংলার জনসমুদ্রে’,’ওই তারা চলে দলে দলে’, প্রবীর মজুমদারের সুরে অর্চন পুরী এবং স্বামী সত্যানন্দের দিব্যগীতি, অনাথবন্ধু দাসের সুরে ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের কথায় ‘আমি আহত এক’,’এত কেন ভুল হল’ ইত্যাদি নানা রকম গান রেকর্ড করেছিলেন।
গায়ক সত্ত্বার পাশাপাশি দেবব্রত বিশ্বাসের মনেপ্রাণে একজন ব্যতিক্রমী স্রষ্টা সত্ত্বা ছিল, যা বিভিন্ন সময় নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
‘গুরুদেব গুরুদেব’ এবং ‘বিশ্ববীণার কলধ্বনি’-রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে গান দুটো দেবব্রতরই লেখা ও সুর করা। এছাড়া আরও দুটো গান লিখে নিজের সুরেই রেকর্ড করেছিলেন -‘ক্যারে হ্যারা আমারে গাইতায় দিল না’, এবং ‘চাইন্দ সুরজ গ্রহ তারা ভরা আসমান’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তত্ত্বাবধানেই এটা সম্ভব হয়।
বাণী ঠাকুরের সংগীত দল ‘কিংশুক’এর উদ্যোগে দেবব্রত বিশ্বাসকে নাগরিক সম্বর্ধনাও হেমন্তই দিয়েছিলেন। সেটাই দেবব্রত শেষ পাবলিক ফাংশন(মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে)।
নিজের ভালো ছবিও আঁকতেন। ওঁর বক্তব্যের ভঙ্গি ছিল অনন্য৷ দেবব্রত বিশ্বাসের লিখিত বই ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’,’অন্তরঙ্গ চীন’ বইগুলো থেকে অনেক তথ্য জানা যায়।
ওঁর জন্ম-মৃত্যু একই মাসে। ১৯৮০ সালের ১৮ই আগস্ট উনি অনন্তধামে পাড়ি দেন।
কিন্তু যে শিল্পী মৃত্যুর ছত্রিশ বছর পরেও আজও শ্রোতাদের মনে এত দাগ কেটে যান, তিনি তো কখনোই ব্রাত্য হতে পারেন না। আজও ‘আমার যে গান তোমার পরশ পাবে’, ‘সুর ভুলে যে ঘুরে বেড়াই’, ‘নাইবা ডাকো রইব তোমার দ্বারে’,’পুষ্প দিয়ে মারো যারে’-র অভিঘাতে আবিষ্ট হয়ে থাকে আবেগাপ্লুত শ্রোতামন- গান এগিয়ে চলে- ‘চাহিয়া দেখো রসের স্রোতে’, ‘গোধূলিগগনে মেঘে’, ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে’,’ ঝর ঝরো ঝরো ঝরো ঝরে রঙের ঝরনা’,’ আজ শ্রাবণঘন গহন মোহে’ অথবা ‘এসেছিলে তবু আসো নাই জানায়ে গেলে’-র ‘পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু জল ঝরিয়ে পাড়ি জমাতে হয় এক অনিন্দ্য সুন্দর ভাবের দেশে- যেখানে মন্ত্রহীন দেবব্রত বিশ্বাস চিরন্তন বসন্তের গায়ক হয়েই আমাদের মনে বেঁচে রয়ে যান; আর এখানেই জন্ম নেয় অপার মুগ্ধতা। আর এটাই হল একজন শিল্পীর আসল কৃতিত্ব। সময় তাঁকে ব্রাত্য করলেও মহাকালের বিচারে তিনি অমর হয়েই থাকবেন। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine
