মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস

পর্ব – ৩১

সব পাড়াতেই কম বেশি এক একটা মানুষ থাকত যারা প্রতিদিনের জীবনে আলাদা করে হয়ত দাগ কাটত না, কিন্তু তারা যখন একেবারেই হারিয়ে গেল, পাড়ার জনজীবনে কখন‌ও হয়ত তাদের অভাব বোধ হত। ভাদুড়িপাড়ার চ্যাটার্জি বাড়ির ফেলুদা বা বর্মন ডাক্তারবাবুর গলিতে বুঁচির পিসি যেন এমনই দুটো চরিত্র ছিল। নামে শহর হলেও কালনার সময়ের স্রোত তখন যেন গ্রামের সময়ের মতো ঢিমে তালে বইত। মানুষ মানুষের বাড়ি যেত আসত, অবসরে রাস্তার মানুষের আসা যাওয়ায় নজর রাখত, ডেকে খোঁজ নিত। তেমনি অলস বিকেলে অথবা পড়ায় ফাঁকি দেওয়া বেলায় আমার চোখে এই মানুষদুটির কার্যকলাপ চোখে পড়ত।

দেখতে দেখতে আমাদের পাড়াতে আমার কাছাকাছি বয়সের ছোটরা স্কুল কলেজ (যার যেটুকুর কপাল ছিল) উতরে ফেললাম। বড়দের চুলে পাক ধরছে, নতুন প্রজন্মের সামনে এক আকাশ স্বপ্ন অথবা কিছু পূর্ণতা, কিছু অপূর্ণতা নিয়ে সংসার শুরুর হাতছানি। পাল্টাচ্ছে পাড়ার চরিত্র। ধীরে হলেও বদলাচ্ছে মানুষজনের খোলামেলা স্বভাব। মালিকানা বদল শুরু হয়েছে কিছু বসত বাড়ির। রূপলাগির প্রেরণায় সুজাতাদি পার্লার করেছে পাড়ায়। সেই বাড়িটাও আগের মালিকের কাছ থেকে দুভাগে বিক্রি হয়েছে। বেলাগাম জীবন মানুষের স্হাবর অস্হাবরে কি ভাবে যে প্রভাব ফেলে তা ধীরে ধীরে অনুভব করার মতো ম্যাচিওরিটি আসছে।

জীবনের অনেকটা খানাখন্দভরা পথ পার করে একদিন স্কুল মাস্টারি শুরুর চিঠিটাও বাড়িতে পৌঁছে গেল। সে সময় যে পথটাকে মনে হত হিমালয়ের চড়াই উতরাই, আজকাল সেই ফেলা আসা রাস্তাঘাট সত্যিই খানাখন্দ মনে হয়। জীবনটা এমনই মনে হয়। রূপকথার মতো সব কিছুর এক লাইনে মধুর সমাপ্তি হয় না। তবে ছোট ছোট স্বপ্নপূরণ মানুষকে অনেক অনেক অম্লজান দেয় নিশ্চয়ই। নিজের পাঁচ বছর থেকে যে স্কুলটাকে নিজের জানতাম, রেকমেন্ডেশন লেটারে যখন সেই স্কুলের নামটাই দেখতে পেলাম তখন খুশির আর শেষ থাকল না। 

এতদিনে একটা স্হায়ী চাকরি হল। নিজের স্কুলে নিজেরই শিক্ষিকাদের স্নেহচ্ছায়ায় ফিরতে পেরে কত কাজ শিখলাম, কত চিরকালীন বন্ধুত্ব তৈরি হল সহকর্মীদের প্রশ্রয়ে, আর কত মেয়ের ভালোবাসার টানে আটকালাম! কত শক্ত সুতোয় বাঁধা পড়লাম ঐতিহ্যশালী হিন্দুবালিকার সাথে! সে সুতোয় আজও মসলিন বুনে চলেছি মনে। তাদের মনে যদি এক ইঞ্চি জায়গাও চিরদিনের জন্য পেয়ে থাকি তবেই এ জীবনের সার্থকতা। 

যা বলছিলাম, সেই চেনা রাস্তায় আবার সাড়ে দশটায় ছোটা শুরু হল।

ছুটতে ছুটতে খেয়াল হয় মাঝে মাঝে, উঁচু বারান্দা- জুতোর দোকানের সারিতে ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউস হাসছে, মাঝের দোকানটার জমা হচ্ছে কত রং বেরঙের স্যুটকেস বাহারি ব্যাগের সম্ভার, বন্ধ হয়ে গেল গোবিন্দকাকার শাড়ির সম্ভার শ্রাবণী, গ্যালাক্সি রেডিমেড বস্ত্রর আলাদা সুসজ্জিত কাউন্টার সাজালো, আবার রূপ বদলালো ছাত্রবন্ধু বই দোকানের বিল্ডিং, কিন্তু ছাত্রবন্ধু আর পুরোপুরি বই দোকান থাকলো না, হাত বদলে গেল আর কত বাড়ির। কিন্তু একই থেকে গেল মাজীর বাড়ির মন্দির চূড়া, তমাল কাকুর হোমিওপ্যাথি ডিসপেনসারি আর তার পাশাপাশি পুরোনো ফ্রিজ আলমারি নতুন রং করার ছোট্ট দোকানটি।

এর মাঝে চলে গেছেন সুপ্রাচীন পল্লীবাসী পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। রাস্তার দিকে চেয়ে বৃদ্ধ মানুষটি যখন বাড়ির পৈঠায় বসে থাকতেন মনে হতো এক প্রাচীন গাছ। আমার সহকর্মী রত্না নাম দিয়েছিল সিধু জ্যাঠা, ফেলুদার সেই সিধুজ্যাঠা। অবশ্য পল্লীবাসী পত্রিকা বন্ধ হয় নি, ‘সাম্প্রতিক’ সম্পাদক, সাংবাদিক, শিল্পী, আলোকচিত্রী কবি তরুণ সেন দায়িত্ব গ্রহণ করে হইহই করে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে ওই বাড়ির ছাপাখানাটি হারিয়েছে তার অস্তিত্ব। অস্তিত্ব হারিয়েছে বনেদি সিংহরায় বাড়ির বাগানের ম্যাগনোলিয়া গাছটি। 

চারপাশের এমন সব ভাঙাগড়ার মাঝে আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। বিয়ের পর ডাঙাপাড়ার বাড়ির বাস ছেড়েছি তবে এলাকা ছাড়িনি। প্রথমে কিছুদিন কালীনগর পাড়ায় থেকে এসে গেছি পুরোনো বাড়ির কাছাকাছি ভাদুড়িপাড়ায়, স্বনামধন্য সাংবাদিক ও শিক্ষক সৌমেন পালের বাড়িতে। ভাইও পড়াশুনা আর চাকরির সূত্রে কালনার বাইরে। আর আমার কোলে এসে গেছে আমার পুরোনো পাড়ার গল্পের একনিষ্ঠ আগামী শ্রোতা, আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার নতুন সূচনা প্রবাহনীল। প্রতিভাস ম্যাগাজিন | Prativas Magazine

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যায়)

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *